কাউন্ট ড্রাকুলা

সায়ন্তনী পূততুন্ড

অলংকরণ- তৌসিফ হক

১. আধুনিক টুইলাইটের আলোয় ড্রাকুলা—ফিল্মি সংস্করণ

--“আমি তোমায় কক্ষনো ছেড়ে যাবো না, কিন্তু আমার একটা শর্ত আছে’।
--‘কি শর্ত?’
--‘আমায় ভ্যাম্পায়ার বানিয়ে দাও’।
কি ভয়ঙ্কর শর্ত!
এমন শর্ত শুনলে যে কোনও প্রেমিকেরই স্ট্রোক হওয়ার কথা! কিন্তু ইদানীং তা হওয়ার জো নেই! কারণ ‘টুইলাইট’—এর ধুমা হ্যান্ডসাম ভ্যাম্পায়ার হিরো এডওয়ার্ড কালেনকে দেখে অনেক মেয়েই কাত! স্বাভাবিকভাবে নায়িকা বেল্লাও। এডওয়ার্ডের প্রেম তার কাছে এতটাই অমোঘ এবং কাম্য যে তার জন্য সে ভ্যাম্পায়ার হওয়ার জন্যও পিছ পা নয়!
সাবাশ! এই না হলে প্রেম! এমন প্রেম কিন্তু ‘টুইলাইটের’ আগে দেখা যায়নি তা নয়। কোথায় দেখা গেছে? এই বহু মূল্যবান প্রশ্নটি ‘কৌন বনেগা ভ্যাম্পায়ারপতির’ প্রতিযোগীদের জন্য থাকল। তারা উত্তর খুঁজুন। না পারলে সঠিক উত্তর নিয়ে ফিরছি একটু পরেই। ততক্ষণ—হ্যাভ এ ব্রেক, অ্যান্ড হ্যাভ সাম ব্লাড!
‘টুইলাইট’ সিরিজের আগে অবধি কিন্তু ভ্যাম্পায়ার নামক জীবটি মানুষের স্ট্রোকের কারণই ছিল। সাহিত্যে কিম্বা ফিল্মে বারবার দেখা গেছে ভ্যাম্পায়ারের ভয়াল রূপ। বেশি উদাহরণ দিতে হবে না। ‘ব্লেড-সিরিজ’, ‘ফ্রাইট-নাইট’, ‘আন্ডারওয়ার্ল্ড ইভোলিউশন’ থেকে শুরু করে রামসে ব্রাদার্সের ‘ভিরানা’(শূন্যতা) অবধি ভ্যাম্পায়ার মানুষকে স্ট্রোকাতে...স্ট্রোকাত ে...এই রে, আই মিন স্ট্রোক দিতে দিতে এসেছে। এমনকি হেমেন্দ্রকুমার রায়ের ‘মিসেস কুমুদিনী চৌধুরী’ও এই তালিকার অন্যতম। শশশশ্‌ ফির কোই হ্যায়... এবং ‘আহট’ এর দরুণ ভ্যাম্পায়ার ভারতীয় জনসমক্ষে হয়ে উঠেছে আরও ভয়াল! আর এই স্ট্রোকানোর শুরু যাঁর হাত ধরে হয়েছিল—তিনিই ব্রাম স্টোকার। যাঁর এক ও অনবদ্য সৃষ্টি ‘ড্রাকুলা’! এরকম ভয়ঙ্কর অথচ বিখ্যাত চরিত্র সম্ভবত মেরি শেলির ‘ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের ’ পর দ্বিতীয়টি আসে নি।
যাঁদের ভূতের ভয় আছে তাঁরা ব্রাম স্টোকারের নাম শুনলেই দ্রাম্‌ করে দরজা দিয়ে দেন। অন্যায় কিছু করেন না। কারণ ১৮৯০ সালে ‘দ্য স্নেকস্‌ পাস্‌’ এবং ১৮৯৭ সালে ‘ড্রাকুলা’ দিয়ে তিনি এই ভয়াবহ যাত্রা শুরু করেন। এবং ‘দ্য লেডি অব দি শ্রাউড’ ও ‘দ্য লেয়ার অফ দ্য হোয়াইট ওয়ার্ম’ পর্যন্ত এই যাত্রা দীর্ঘায়িত হয়। অর্থাৎ ১৮৯০ থেকে ১৯১১ অবধি ভয় দেখানোর পালা চলতেই থাকে। কিন্তু সব সৃষ্টির মধ্যে যে সৃষ্টিটি তাঁর অমর হয়ে আছে—সে--ই ড্রাকুলা।
ড্রাকুলা কে? ড্রাকুলা কি? কি করে সৃষ্টি হয়েছিল ড্রাকুলার? সত্যিই কি কাউন্ট ড্রাকুলা বলে কেউ ছিল? ...ড্রাকুলার নাম বললেই অনেক প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়ায়। অনেকে ভাবেন –যাহাই বাহান্ন, তাহাই তিপ্পান্ন। মানে, ভ্যাম্পায়ার মানেই ড্রাকুলা। তাদের জন্য বলে রাখি ভ্যাম্পায়ার মানে মোট্টেও ড্রাকুলা নয়। ড্রাকুলা ব্রাম স্টোকারের একটি অনবদ্য চরিত্র, যিনি আদতে একজন ভ্যাম্পায়ার । “ড্রাকুলা” ফিল্মে প্রথমে ড্রাকুলা আমাদের মত স্বাভাবিক মানুষই ছিলেন। তাঁর সম্পূর্ণ নাম কাউন্ট ভ্লাদ ড্রাকুলা। ১৪৬২ সালে তুর্কির যুদ্ধে জয়প্রাপ্ত হয়ে এসে তিনি আত্মহত্যা করেন ও ভ্যাম্পায়ারে পরিণত হন!
অঙ্কটা মিলল না, তাই না? সাধারণত পরাজয়ের সঙ্গে মৃত্যুর যোগ থাকে। কিন্তু যুদ্ধ জিতে এসে কেউ আত্মহত্যা করেছে—এমন নজির বিরল। তবে কেন আত্মহত্যা করলেন কাউন্ট ড্রাকুলা? কি গভীর বেদনা তাঁকে ক্রুশের চেয়েও গভীরভাবে বিদ্ধ করেছিল যে নিজের বুকে ক্রুশ বিঁধিয়ে আত্মহত্যা করতেও তাঁর বাঁধল না?
এখানেই আসলে ‘কঁহানি মে ট্যুইস্ট’। পরিচালক কাউন্ট ড্রাকুলার মত এমন ভয়ঙ্কর, ভয়াল, নিষ্ঠুর চরিত্রকে মর্যাদা দিলেন শ্রেষ্ঠতম প্রেমিকের! পরবর্তীকালে যে মানুষটি রক্তপায়ী রাক্ষসে পরিণত হতে চলেছে, আসলে সে একজন প্রেমিক ছিল! প্রেমের জন্য এমন একটা ঘৃণ্য জীবন বেছে নিতে তাঁর একবারের জন্যও দ্বিধা হল না! নিজের প্রিয়তমা এলিজাবেথ বা এলিজাবেতার জন্যই তিনি রুখে দাঁড়ালেন ঈশ্বরের বিরুদ্ধে। তুর্কির যুদ্ধে কাউন্ট ড্রাকুলা মারা গেছেন, এমন একটা ভুল খবর পেয়ে এলিজাবেথ আত্মহত্যা করেছিলেন। প্রিয়তম ড্রাকুলাকে ছাড়া জীবনধারণ তাঁর পক্ষে অসম্ভব ছিল। অন্যদিকে ড্রাকুলার পক্ষেও এলিজাবেথের মৃত্যু মেনে নেওয়া নরকযন্ত্রণার চেয়েও যন্ত্রণাদায়ক। তাই ঐশ্বরিক শক্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সর্বনাশের পথে চলে গেলেন ড্রাকুলা। মনে মনে এলিজাবেথকে হয়তো বলেছিলেন--
“যে দুনিয়ায় তুমি নেই, সেই দুনিয়া আমার কাছে মূল্যহীন”।
অনুভবটা খুব চেনা চেনা লাগছে না? হ্যাঁ, এ জাতীয় কথা এডওয়ার্ডের মুখেও শোনা গেছে। বেল্লাকে সে নিজেই এই অনুভবের কথা জানিয়েছে। তবে এডওয়ার্ডের সঙ্গে ড্রাকুলার কতটুকু তফাৎ? অথবা কতটুকুই বা তফাৎ শেক্সপিরিয়ান ট্র্যাজেডির নায়কের থেকে?
স্বভাবতই টুইলাইটের নায়ক এডওয়ার্ডকে যেমন দর্শক ভালোবেসে ফেলে, ঠিক তেমনই কাউন্ট ড্রাকুলাকেও ঘৃণা করতে পারে না। ড্রাকুলা যখন জানতে পারেন যে তাঁর প্রিয়তমা এলিজাবেথ পুনর্জন্ম লাভ করেছে, এবং এ জন্মে তার নাম মিনা মারে, বা পাঠান্তরে মিনা মুর—তখন তাকে ফিরে পাওয়ার জন্য সব অসাধ্য সাধন তিনি করেছেন! মিনা মুরের জন্য তাঁকে অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৪৬২ থেকে ১৮৯৭ সাল অবধি। অর্থাৎ ৪০০ বছরেরও বেশি। এই ৪০০ বছর ধরে তাঁর আতঙ্ক ও রক্তপিপাসু দানবীয় কার্যকলাপের ইতিহাস মানুষকে ভয় দেখিয়ে এসেছে। কিন্তু আসলে এই ৪০০ বছরের ইতিহাস ধ্বংস হতে চলেছিল মিনা মুরের প্রেমের হাত ধরে। ১৮৯৭ সালে যখন মিনা মুরের বর্তমান প্রেমিক জোনাথন হার্কার কার্পেথিয়ার দূর্গে আসেন ঠিক তখনই কাউন্ট ড্রাকুলার বীভৎস ও বেদনাদায়ক জীবন সমাপ্তির পথ ধরে।
কাউন্ট ড্রাকুলার উদ্দেশ্য ছিল জোনাথন হার্কারকে খুন করার। কিন্তু তিনি ব্যর্থ হন! দর্শক জোনাথন হার্কারের মুক্তিলাভে খুশি হয় ঠিকই, কিন্তু পাশাপাশি মিনা মুরের সঙ্গে তার বিয়েটা মেনে নিতেও তাদের কষ্ট হয়। এ কষ্ট দর্শকের নিজস্ব নয়। এ কষ্ট কাউন্ট ড্রাকুলার বেদনাবোধ থেকে জন্ম নেয়। যার জন্য তিনি মৃত্যুর চেয়ে বীভৎস একটা শাপগ্রস্ত জীবনযাপন করছেন, যার অপেক্ষায় কয়েক শতাব্দী পাড়ি দিয়েছেন, কি করে তাকে অন্য পুরুষের জীবনসঙ্গিনী হতে দিতে পারেন! এ যৌনঈর্ষা তো কোনও দানবের নয়! বরং যথেষ্ট মানবীয়। যে কারণে এডওয়ার্ড সহ্য করতে পারেনা জেকবকে! যে কারণে কাউন্ট ড্রাকুলা প্রতিশোধ নেন। তাঁর শিকার হয় মিনা মুর অথবা অধুনা মিসেস হার্কারের প্রিয় বান্ধবী লুসি! মারা যায় আর এম রেনফিল্ড! কিন্তু শেষ পর্যন্ত মিনাকে তিনি অধিকার করে নেন। ড্রাকুলা মিনার কাছে স্বীকার করেন যে লুসির মৃত্যুর জন্য তিনিই দায়ী। রেনফিল্ডকে উন্মাদ করার পিছনেও তাঁরই হাত। মিনা ক্রুদ্ধ হয়। কিন্তু আশ্চর্য! এই চূড়ান্ত ঘৃণ্য পুরুষটিকে সে ঘৃণা তো করতেই পারে না, বরং তাঁর ভালোবাসায় উন্মত্ত হয়! আগের জন্মের কথা মনে পড়ে তার। এবং মিনা ঠিক বেল্লার মতই প্রিয়তম পুরুষটির প্রেমের জন্য ভ্যাম্পায়ারে পরিণত হতে চায়। তার মনোভাবও মিলে যায় বেল্লার সঙ্গে—“যদি তাঁকে পাওয়ার মূল্য একমাত্র মৃত্যুই হয়, তবে মৃত্যুবরণ করতেও আমি রাজি”।
ঠিক এই একই কারণে মিনা জন সেওয়ার্ড, ডঃ আব্রাহাম ভ্যান হেলসিং এমনকি নিজের এককালীন প্রেমাস্পদ জোনাথন হার্কারের বিরুদ্ধেও রুখে দাঁড়ায়। মিনা জানত শেষপর্যন্ত ওদের মিলিত শক্তির কাছে ড্রাকুলাকে হার মানতেই হবে। তবু সে বর্গো পাসে ডঃ ভ্যান হেলসিংকে আক্রমণ করে। ঠিক একইভাবে তেজিয়ান প্রতিরোধ গড়ে তুলতে দেখি টুইলাইটের বেল্লা সোয়ানকেও। ভলটুরির সামনেও সে নতিস্বীকার করে না। ঠিক যেমন এডওয়ার্ডের জন্য নিজের প্রাণকে তুচ্ছ করে লড়ে যায় বেল্লা, ঠিক তেমনই লড়ে মিনা হার্কার—ড্রাকুলার জন্য! এবং শেষপর্যন্ত যেমন বেল্লা জেকব আর এডওয়ার্ডের মধ্যে এডওয়ার্ডকেই বেছে নেয়, অবিকল তেমন ভাবেই মিনা মুর জোনাথন হার্কারের বদলে বেছে নেয় ড্রাকুলাকে!
যদিও আসল গল্পটা এত রোম্যান্টিক ছিল না। কিন্তু ব্রাম স্টোকারের কাহিনীর মধ্যেই কোথাও যেন অন্তর্লীন হয়ে ছিল এই বিয়োগান্তক প্রেমের কাহিনী। চলচ্চিত্রে তাকেই তুলে এনেছেন পরিচালক।


২. তৎকালীন আলোয় ড্রাকুলা
ব্রাম স্টোকার ড্রাকুলাকে শুধু ভয়াবহ জীব তৈরি করেননি, তাঁকে অদ্ভুত জোরাল একটা চরিত্র করে তুলেছিলেন। কিন্তু প্রাথমিকভাবে তাঁর ড্রাকুলা কিন্তু খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। পরবর্তীকালে যখন ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলা ‘ড্রাকুলা’র চলচ্চিত্রায়ণ করেন তখন বইটি বেস্ট সেলারের পর্যায়ে যায়। ১৯৯২ সালে গ্যারি ওল্ডম্যান, উইনোনা রাইডার, অ্যান্থনি হপকিনস ও কিনু রিভস অভিনীত ফিল্মটি ড্রাকুলাকে অবিস্মরণীয় করে রাখে। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে তার আগেই কিন্তু ব্রাম স্টোকারের অনবদ্য সৃষ্টিটি পরে নিয়েছে শ্রেষ্ঠত্বের তাজ। তৎকালীন ‘ডেইলি মেল’ ব্রাম স্টোকারকে মেরি শেলি , এডগার অ্যালান পো ও এমিলি ব্রন্টির সাথে তুলনা করে এবং সমালোচনায় বলে—‘"In seeking a parallel to this weird, powerful, and horrorful story our mind reverts to such tales as The Mysteries of Udolpho, Frankenstein, The Fall of the House of Usher ... but Dracula is even more appalling in its gloomy fascination than any one of these."
শার্লক হোমসের জন্মদাতা স্বয়ং আর্থার কোনান-ডয়েল ব্রাম স্টোকারকে বলেছিলেন—‘"I write to tell you how very much I have enjoyed reading Dracula. I think it is the very best story of diablerie which I have read for many years."
এরপর কি ‘ড্রাকুলার’ শ্রেষ্ঠত্বের কোনও প্রমাণ লাগে? ড্রাকুলা তার নিজের গৌরবে সবসময়েই অধিষ্ঠিত থেকেছে। একটা অদ্ভুত বিষাদময়, হন্টিং পরিবেশ নিয়ে গল্পের মধ্যে ড্রাকুলাই আসলে নায়ক! জোনাথন হার্কার, ডঃ জন সেওয়ার্ড কিম্বা ডঃ ভ্যান হেলসিং...নাঃ—কেউই কখনও সেই তথাকথিত এক্স-ফ্যাক্টর দেখাতে পারেননি। বরং মহাকাব্যের নায়কদের মত তাঁরাও দুর্বল মুহূর্তে, ছলে-বলে-কৌশলে কাজ হাসিল করেছেন। ড্রাকুলার সঙ্গে সামনা সামনি লড়ার সাধ্য তাঁদের কখনই ছিল না। পাঠকের কাছে তাই তাঁদের আবেদন মারাত্মক হয়ে ওঠেনি, যতটা ড্রাকুলার ক্ষেত্রে হয়েছে। এই গল্পে তাই ড্রাকুলাই নায়ক!


৩. ড্রাকুলার রচনাশৈলী
ব্রাম স্টোকারের ‘ড্রাকুলা’ চরিত্রটির মত এর রচনাশৈলীও চিত্তাকর্ষক। একটু মন দিয়ে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে এটি মূলত তথ্যপূর্ণ একটি দলিলের মত। কারুর ডায়েরিতে বা চিঠিতে কখনও কাহিনী এগোচ্ছে। আবার কখনও বা নিউজপেপার কাটিঙের মাধ্যমে। কখনও বা কারুর জবানবন্দীতে গল্প চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছচ্ছে! এটা একজাতীয় সাহিত্যিক কৌশল। একে বলে ‘এপিস্টোলারি নভেল’।
এপিস্টোলারি নভেল লেখা খুব চাট্টিখানি কথা নয়। এমনিতেই এই ফরম্যাটে লেখার বেশ কিছু অসুবিধাও আছে। গল্পের গতি ধরতে সমস্যা হয়। কারণ একাধিক চরিত্রের মনোভাব ও চিন্তা নিয়ে কাহিনী এগোতে থাকে। তাই ঠাসবুনোটে কাহিনী লেখা মুস্কিল। লেখককেই বিভিন্ন চরিত্রের কথা বলতে হয়, এবং অনেক সময় ঘটনা পারম্পর্য বজায় রাখাও কঠিন। বলাই বাহুল্য কাহিনীকারকে এখানে নিজেকেই বিভিন্ন চরিত্র প্লে করতে হয়। ইয়ে...তাতে তার মাল্টিপল পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার হয় কি না তা জানা নেই। অন্তত ‘ভুলভুলাইয়ার’ বিদ্যা বালানের মত ব্রাম স্টোকার নিজেকেই ড্রাকুলা ভেবে নৃত্য করতে শুরু করেননি এই রক্ষে! যাই হোক্‌, এপিস্টোলারি নভেলের ক্ষেত্রে কাহিনী সূত্র তরতর করে এগিয়ে যাওয়ার বদলে একটু যেন শ্লথ হয়।
কিন্তু ব্রাম স্টোকার এই অসাধ্যও সাধন করেছেন। তাঁর ‘ড্রাকুলা’র কাহিনী শুরু থেকেই এমন চিত্তাকর্ষক টান নিয়েছে যে পাঠক সেই চৌম্বকশক্তিতে পড়ে গিয়ে বইটি শেষ করে তবেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে। রহস্যময় কার্পেথিয়ার দূর্গে প্রবেশের আগেই জোনাথন হার্কারের ফিটন গাড়ির তালে তালে কাহিনী প্রায় রোমহর্ষক পর্যায়ে পৌঁছেছে। গল্পের কোথাও স্বয়ং লেখক এসে লম্ফঝম্প বা হাঁউমাউ করেননি। কোথাও ড্রাকুলাকে নির্দেশ করে বলেননি—‘ঐ দেখো...ঐ হল পাপাত্মা ড্রাকুলা। অসহায়া নারীবর্গের রক্তপান করিয়া দূরাত্মা উদরপূর্তি করিয়াছে...উহার নরকেও ঠাঁই হইবে না...ঐ দ্যাখো...পাষন্ড পরস্ত্রী মিনা মুরকে চুম্বন করিতেছে...হায় হায়...লজ্জা লজ্জা...!’
ড্রাকুলার নৈতিক ধর্ম নিয়ে লেখকের কোনরকম মাথাব্যথা ছিল না। সে পরস্ত্রীকে চুম্বন করছে, কি পরনারীর সাথে করোনারির খেলা খেলছে তা নিয়েও তাঁর বিশেষ হেলদোল নেই। পাঠককে কোলে নিয়ে চরিত্রদের কাজ কর্মও বোঝাতে বসেননি। স্বাভাবিকভাবেই দয়াবান পাঠকের বুদ্ধির প্রতি তাঁর আস্থা ছিল। তাই উদাসীন কলমের আঁচড়ে চমৎকার ভাবে ঘটনাবলী পরিসমাপ্তির দিকে এগিয়েছে।

৪. ড্রাকুলার নাম, উৎপত্তির মূল উৎস
এখন প্রশ্ন হচ্ছে যে ব্রাম স্টোকার এই অদ্ভুত চরিত্রটিকে সৃষ্টি করলেন কি ভাবে? একেবারেই কি স্বকপোলকল্পিত? না অন্য কোনও উৎস আছে? এত নাম থাকতে হঠাৎ তাঁর নাম কাউন্ট ভ্লাদ ড্রাকুলাই বা হতে গেল কেন? কাউন্ট সায়ন্তনী পূততুন্ড হলে কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ হত? তবে কি নামকরণের পিছনেও কোনও ইতিহাস আছে?
প্রথমেই বলে রাখি যে ভ্যাম্পায়ারকে কেন্দ্রীয় চরিত্র করে উপন্যাস লেখার ব্যাপারে ব্রাম স্টোকার কিন্তু ফার্স্ট বয় নন! এ বিষয়ে তাঁর আগেই ছক্কা হাঁকিয়ে বসে আছেন শেরিদাঁ লে ফানু। ১৮৭১ সালে তিনি লেখেন ‘কার্মিলা’। একজন লেসবিয়ান ভ্যাম্পায়ারকে নিয়ে লিখিত উপন্যাসটি ব্রাম স্টোকারকে অনুপ্রাণিত করে। এরও আগে জেমস ম্যালকম রাইমার লিখে বসে আছেন “ভার্নি দ্য ভ্যাম্পায়ার’। আরও একটি নাম যোগ না করলে এ আলোচনা অপূর্ণ থাকে। জন পলিডরির ‘দ্য ভ্যাম্পায়ার” উপন্যাসের ভ্যাম্পায়ারের চরিত্রটিও ঠিক ড্রাকুলার মতই হাই ক্লাস সোসাইটির সদস্য। মিল লক্ষ্যনীয়! “বুঝ লোক যে জানো সন্ধান”! এছাড়াও তাঁকে উপন্যাসের শাখা-প্রশাখা তৈরি করতে সাহায্য করেছিল কিছু ইউরোপিয়ান গাঁথা যেগুলো তিনি দীর্ঘ সাত বছরের রিসার্চে জেনেছিলেন। তার সঙ্গে অবশ্যই এমিলি জেরার্ডের ‘ট্রান্সিলভ্যানিয়া সুপারস্টিশনস্‌’।
এর সঙ্গে মিলে গিয়েছিল কার্পেথিয়ান লিজেন্ড। বিশেষ করে বিসিৎস্যা নামের এক যুবতীর কাহিনী। বিসিৎস্যা বঙ্কিমবাবুর কপালকুন্ডলার মতই এক অরণ্য-কন্যা। হাটশালশায়নার অরণ্য আলো করে সে ঘুরে বেড়াত। অপূর্ব সুন্দরী বিসিৎস্যার কন্ঠস্বর ও ছিল চমৎকার সুরেলা ও সম্মোহনী। কোনও পথিক যদি তাকে দেখত বা তার গান শুনত তবে সে পুরোপুরি বিসিৎস্যার নিয়ন্ত্রণে চলে আসত। সম্মোহিত পথিক তার নিজের সমস্ত কিছু ভুলে যেত। তার ঘর, পরিবার কিম্বা সন্তান—কারুর কথাই আর তার মনে থাকত না। এইভাবে যখন সেই হতভাগ্য পুরোপুরি বিসিৎস্যার করায়ত্ত হয়ে যেত, তখন বিসিৎস্যা সুন্দরী তার পথ ভুলিয়ে সেখান থেকে অদৃশ্য হয়ে যেত! অথবা তাকে ধাক্কা মেরে এক অন্ধকূপে ফেলে দিত। বেচারা পথিকের জীবন সেখানেই সমাপ্ত!
এছাড়াও কার্পেথিয়া পর্বতের আড়ালে লুকিয়ে আছে অনেক রহস্য। অনেক সম্মোহনকারী ব্ল্যাক ম্যাজিক সাধকের দল। এক ভ্রমণকারী রোমোভিৎস্যা বার্ডনাইলের ভাষায়—‘... they can turn into wild beasts, they know how to cure illnessess and overcome harmfull spells. But the evil once can do a lot of mischief; they can deprive a man of his reason, or even of his life by their black magic.......’!
এই উপরোক্ত বিসিৎস্যার সঙ্গে বেশ মিল পাওয়া যায় ড্রাকুলার প্রাসাদের তিন যুবতী বোনের সঙ্গে(three sisters)। যারা তাদের সৌন্দর্যে, মধুর কন্ঠে জোনাথন হারকারকে সম্মোহিত করে ফেলে। তাদের পাল্লায় পড়ে জোনাথন হারকার প্রায় স্বর্গের দিকে পা বাড়িয়েই ফেলেছিল। শেষপর্যন্ত তাকে রক্ষা করেন স্বয়ং কাউন্ট ড্রাকুলা।
এছাড়াও ব্ল্যাকম্যাজিক সাধকদের কান্ডকারখানার সঙ্গে বেশ মিলে যায় স্থানীয় জিপসিদের গল্প। তারা পশুরূপ ধরতে জানত। জোনাথন হারকারকে তারাই উদ্ধার করে ও খানিকটা সুস্থও করে তোলে।
সুতরাং ব্রাম স্টোকার যে কার্পেথিয়ার বিভিন্ন উপকথায় প্রভাবিত হয়েছিলেন তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
শুধু তাই নয়, তিনি ড্রাকুলার প্রাসাদের যে বর্ণনা করেছেন, তাও সরাসরি মস্তিষ্ক থেকে আমদানি হয়নি। উনিশতম আর্ল অব এরোলের নিমন্ত্রিত অতিথি হয়ে ব্রাম স্টোকার একবার ‘স্লেইন্‌স্‌ কাস্‌লে’ বেড়াতে গিয়েছিলেন। ‘স্লেইনস্‌ কাস্‌লের’ আভ্যন্তরীণ জাঁকজমক ও পরিবেশ দেখে তিনি এতটাই অভিভূত হয়েছিলেন যে ড্রাকুলার প্রাসাদের বিবরণের ছত্রে ছত্রে লিখলেন হুবহু সেই ‘স্লেইনস্‌ কাস্‌লেরই’ বর্ণনা—
1. There are certainly odd deficiencies in the house, considering the extraordinary evidences of wealth which are round me. The table service is of gold, and so beautifully wrought that it must be of immense value. The curtains and upholstery of the chairs and sofas and the hangings of my bed are of the costliest and most beautiful fabrics, and must have been of fabulous value when they were made, for they are centuries old, though in excellent order. I saw something like them in Hampton Court, but they were worn and frayed and moth-eaten.

2. The view was magnificent, and from where I stood there was every opportunity of seeing it. The castle is on the very edge of a terrific precipice. A stone falling from the window would fall a thousand feet without touching anything! As far as the eye can reach is a sea of green tree tops, with occasionally a deep rift where there is a chasm. Here and there are silver threads where the rivers wind in deep gorges through the forests.

3. I looked out over the beautiful expanse, bathed in soft yellow moonlight till it was almost as light as day. In the soft light the distant hills became melted, and the shadows in the valleys and gorges of velvety blackness. The mere beauty seemed to cheer me. There was peace and comfort in every breath I drew.

‘ড্রাকুলা’ নামকরণের আগে ব্রাম স্টোকার উপন্যাসটির নাম রেখেছিলেন ‘দ্য ডেড-আনডেড’। ‘আনডেড’ কি পদার্থ তা আলাদা করে বুঝিয়ে বলতে হবে না! যারা মিলা জোভোভিচ অভিনীত ‘রেসিডেন্ট ইভিল’এর পার্টগুলো দেখে ফেলেছেন তারা হাড়ে হাড়ে জানেন—আনডেড কিদৃশ বস্তু বটেক! ব্রাম স্টোকারেরও বোধহয় ‘আনডেড’এর প্রতি একটু পক্ষপাতিত্ব ছিল। কারণ পরবর্তী কালে তিনি পান্ডুলিপির নাম রাখেন শুধু—‘আনডেড’। কিন্তু আনডেড নামটাও বোধহয় তাঁর পছন্দ হয়নি। সুতরাং ফের নাম পাল্টাল উপন্যাসের। নতুন নাম ‘কাউন্ট ভ্যাম্পায়ার’। উপন্যাসের নায়কের নামও ছিল তাই। এরপর উইলিয়াম উইলকিনসনের -- অ্যাকাউন্ট অফ দ্য প্রিন্সিপ্যালিটিস অফ ওয়ালাশিয়া(ওয়ালাচিয়া) পড়ার পর ব্রাম স্টোকার তার নায়কের নাম খুঁজে পেলেন। ওয়ালাশিয়ার কাউন্ট দ্বিতীয় ভ্লাদ নিজের নাম “ড্রাকুল” রেখেছিলেন। তিনি ‘অর্ডার অফ দ্য ড্রাগন’এর সদস্য ছিলেন। রোমানিয়ান ভাষায় “ড্রাকুল” এর অর্থ ছিল “দ্য ড্রাগন”।
ব্যস্‌। আর যায় কোথায়! ব্রাম স্টোকার এই নামটিই পছন্দ করলেন। শুধু তাই নয়, ভ্লাদ ড্রাকুলের চরিত্রকেই প্রায় আঁকলেন নায়ক হিসেবে। ‘ড্রাকুলা’ গল্পে কাউন্ট ড্রাকুলা নিজের সম্পর্কে যা বলেছেন, ইতিহাস সাক্ষী দেয়—আসলে তা ভ্লাদ ড্রাকুলেরই কথা—“Who was it but one of my own race who as Voivode crossed the Danube and beat the Turk on his own ground? This was a Dracula indeed! Woe was it that his own unworthy brother, when he had fallen, sold his people to the Turk and brought the shame of slavery on them! Was it not this Dracula, indeed, who inspired that other of his race who in a later age again and again brought his forces over the great river into Turkey-land; who, when he was beaten back, came again, and again, though he had to come alone from the bloody field where his troops were being slaughtered, since he knew that he alone could ultimately triumph! (Chapter 3, pp 19)
যাঁরা ভ্লাদ ড্রাকুলের ছবি দেখবেন তাঁরাই রীতিমত অবাক হবেন। এ তো হুবহু কাউন্ট ড্রাকুলার ‘জুড়ুয়া’ ভাই! অবিকল সেই লোক। যাঁর বর্ণনা আমরা জোনাথন হারকারের ডায়েরিতে পাই—‘Within, stood a tall old man, clean shaven save for a long white moustache, and clad in black from head to foot, without a single speck of colour about him anywhere…....His face was a strong, a very strong, aquiline, with high bridge of the thin nose and peculiarly arched nostrils, with lofty domed forehead, and hair growing scantily round the temples but profusely elsewhere. His eyebrows were very massive, almost meeting over the nose, and with bushy hair that seemed to curl in its own profusion. The mouth, so far as I could see it under the heavy moustache, was fixed and rather cruel-looking, The general effect was one of extraordinary pallor.’ (chapter-2)
কাউন্ট দ্বিতীয় ভ্লাদ নিজেও বোধহয় জানতেন না যে, তার নাম সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়তে চলেছে। অথচ সেটাই ভবিতব্য হল। ব্রাম স্টোকার তাঁর নায়কের নাম রাখলেন কাউন্ট ড্রাকুলা। এবং বইটির নাম হল ‘ড্রাকুলা”।

৫.কাউন্টেস ড্রাকুলা
এইয়োঁ! এতক্ষণ তো কাউন্ট ড্রাকুলারই চর্চা চলছিল! হঠাৎ কাউন্টেস কোথা থেকে আমদানি হলেন? মাথা-টাথা খারাপ হল নাকি!
ইয়ে...মানে কাউন্ট ড্রাকুলার চর্চা এখনও চলছে। কিন্তু প্রবন্ধ লিখতে বসে একটু দেখাবো না যে আমি কত্ত জানি! তাই কাউন্টেস ড্রাকুলাকেও আমদানি করতে হল।
ভ্যাম্পায়ার সম্পর্কে আলোচনা করতে করতে অনেক সময় মনে হয় যে এই ভ্যাম্পায়ার নামক ভয়ঙ্কর প্রাণীটি আমদানি হল কোথা থেকে! রক্তচোষা বাদুড় অবধি ঠিক ছিল। বাদুড়রা এমনিতেই ভয়ঙ্কর প্রাণী, দেখলেই মনে হয়—এই বুঝি তেড়ে খেতে এল। বাদুড়ের মত যাচ্ছেতাই প্রাণীর পক্ষে রক্তচোষা হওয়া অসম্ভব নয়। ইনফ্যাক্ট মেক্সিকো, ব্রাজিল, চিলি এবং আর্জেন্টিনায় এই জাতীয় রক্তচোষা বাদুড় বিখ্যাত। মূলত এরা রক্ত খেয়েই বেঁচে থাকে। তার জন্য অবশ্য ওরা দায়ী নয়। দায়ী ওদের খাদ্যাভ্যাস—অর্থাৎ ডায়েট চার্ট। রক্ত থেকে খুব সহজেই প্রোটিন আর লিপিড নিয়ে নিতে পারে এরা। এই খাদ্যাভ্যাসটির নাম “হেমাটোফ্যাজি”। মশা, জোঁক প্রভৃতির মধ্যে এই জাতীয় ডায়েট চার্ট দেখা যায়। বাদুড়ের ব্যাপারটাও তাই। কিন্তু নেহাৎ এক থাপ্পড়ে মারা যায় না বলে রক্তচোষা বাদুড় একটু বড়মাত্রার বিভীষিকা। মোটামুটি তিন প্রজাতির রক্তচোষা বাদুড় দেখা যায়। ডেসমোডাস রোটানডাস বা কমন ভ্যাম্পায়ার ব্যাট, ডাইফাইলা ইকডাটা বা হেয়ারি লেগড ভ্যাম্পায়ার ব্যাট, এবং ডায়ামাস ইয়ঙ্গি বা হোয়াইট উইঙ্গড ভ্যাম্পায়ার ব্যাট।
এ তো গেল রক্তচোষা বাদুড়ের কুষ্ঠী-ঠিকুজি। বলাই বাহুল্য যে ভ্যাম্পায়ারের কনসেপ্টে ভ্যাম্পায়ার ব্যাটের কিঞ্চিৎ প্রেরণা আছে। কিন্তু রক্তচোষা মানুষ! ক্ষিদের তাড়নায় নয়, যে শুধু নিজেকে অনন্ত যৌবন প্রদান করার জন্য ও অমরত্বের লোভে রক্ত শোষণ করে। প্রোটিন-লিপিডের এখানে নিকুচি করেছে। এ অভিনব থিওরি কোথা থেকে এল সাহিত্যিকদের মাথায়!
এল, মানে আসতেই হল! আর এর জন্য মূলত দায়ী একজনই। যাঁকে পরবর্তীকালে কাউন্টেস ড্রাকুলা নামে অভিহিত করা হয়েছে। কাউন্টেস এলিজাবেথ বেথোরি। যিনি ইতিহাসে ‘ব্লাড কাউন্টেস’ নামে পরিচিতা। সবচেয়ে বিখ্যাত মহিলা সিরিয়াল কিলার! বিধবা হওয়ার পর সম্ভবত কাউন্টেসের মধ্যে মানসিক বৈকল্য দেখা গিয়েছিল। এবং তিনি তাঁর যৌবন ও সৌন্দর্য ধরে রাখার জন্য একের পর এক গ্রামের মেয়েদের হত্যা করে তাদের রক্তপান করতে থাকেন ও সেই রক্তে স্নান ও করেন। এই সব কর্মকান্ড চলত কার্পেথিয়ার কুয়াশার অন্তরালে। শেষপর্যন্ত তাঁর অপরাধ ধরা পড়ে ও তিনি ৎসেজে কাস্‌লে নির্বাসিতা হন। মৃত্যু অবধি সেখানেই চতুর্দিকে ইঁটের গাঁথুনি নিয়ে জ্যান্ত কবর হয়ে ছিলেন তিনি। শুধু তার চোখের সামনেটা খোলা ছিল। সে চোখের দৃষ্টি যে দেখেছে তারই রক্তহিম হয়ে গেছে।
এবার বোঝা গেল যে ভ্যাম্পায়ারের তথাকথিত কনসেপ্ট কোথা থেকে এসেছিল? ব্রাম স্টোকারও এলিজাবেথ বেথোরির কাছে ঋণী তাঁর কাউন্ট ড্রাকুলার জন্য।

৬. উপসংহার— আমার অভিজ্ঞতা
যাই হোক্‌, ড্রাকুলার উপর প্রচুর জ্ঞান দিয়ে ফেললাম। এবার একটু নিজের কথা বলি?
প্রথম যেবার বইমেলা গিয়েছি, সেবারই বাবা কিনে দিলেন ব্রাম স্টোকারের ‘ড্রাকুলা’!এমনিতেই আমি ভীতু মানুষ, তার উপর বইয়ের কভার দেখে আত্মারাম খাঁচাছাড়া হয়ে গিয়েছিল। তবু ঠিক করলাম পড়েই ছাড়বো।
পড়লাম। পড়া তো শেষ হল! ও মা, তারপর থেকে রাতের বেলায় কোথাও বেরোতে ভয় পাই! নতুন কোনও মানুষের সঙ্গে আলাপ হলেই দেখে নিই তাঁর দাঁত কত বড়! আদৌ বড় কি না! সবসময়ই মনে হয়, এই বুঝি ড্রাকুলা এসে ধরল আমাকে!
এইরকম পরিস্থিতিতে একদিন রাতে দেখি আমার দাদা ঘরে ঢুকছে। ওর মুখটা কেমন যেন অদ্ভুত লাগছে! তখন লোডশেডিঙের প্রবল প্রতাপ! কেরোসিন বাতির হাল্কা আলোয় পরিষ্কার দেখাও সম্ভব নয়। আর তার উপর দাদা মুখটা নীচু করেই কথা বলছে।
আমার বুকের ভিতরে দুরুদুরু শুরুই হয়ে গিয়েছিল। যখন ব্যাটাকে ভালো ভাবে নজর করতে যাবো, ঠিক তখনই সে মুখ তুলে তাকাল আমার দিকে...
কেরোসিন বাতির আলোয় স্পষ্ট দেখলাম তার ঠোঁটের কষ দিয়ে বেরিয়ে আছে দুটো ধারালো লম্বা দাঁত!...সে দাঁত রক্তাক্ত!...কি ভয়ানক!...অবিকল ড্রাকুলার মত...!
হয়তো সেদিন স্টোকারের দৌলতে আমার একটা স্ট্রোক হয়েই যেত। কিন্তু দাদা সঙ্গে সঙ্গে দাঁত জোড়া খুলে ফেলেছিল। তাই রক্ষে!
এটা আমার ছোটবেলার ঘটনা। যখন আমি পুঁচকি ছিলুম...এই এত্তটুকুন ছিলুম,...তখন এতটাই ভয় পেতাম ড্রাকুলাকে।
এখন? নাঃ, এখন আর পাই না। তবে...
ইয়ে, মানে...আমি ভয় পাই না। তবে আমার পুঁচকি ভাইঝি সদ্য সদ্য “ড্রাকুলা” পড়েছে।
আমি এখন নকল দাঁত পরে তাকেই ভয় দেখাই!...
কাউন্ট ড্রাকুলা যে অমর, —এর থেকে তার বৃহত্তর প্রমাণ আর কি দেবো বলো দিকিন!

আপনার মতামত জানান