স্পুটনিক

অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায়


তখন, গরমের প্রায় লেজুড় হয়েই আসত লোডশেডিং। সন্ধেবেলায় খেলা সেরে, খোঁচা খোঁচা চুল আঁচড়ে, দুলে দুলে পড়া মুখস্ত শুরু করার প্রায় সাথে সাথেই - ঝুপ! সাড়া পাড়া অন্ধকার, শুধু রাস্তার শেষ মাথা দিয়ে পাশের পাড়ার আলো দেখা যাচ্ছে। এবার হাতপাখা টানো আর বিনবিনে মশার কামড় খাও চিমনি টিমটিমে আলোয়।
তবে আমার মজা হত খুব। মিনিট দশেক দেয়ালে ছায়াবাজি সেরে, মাদুর বগলে, আমার ঠাকুরদা, দাদাই এর সাথে ছাদে - একা একা ভয় করে যে! এবার পুরো পিকনিক - সব ছাদেই সব বাড়ির সবাই, ঠাট্টা, ইয়ার্কি, বিকেলের খেলার ফল বিশ্লেষণ আর বড়দের জ্যোতিবাবু উদ্ধার।
মিনিট পনেরো এমন চালিয়ে, দক্ষিনের ঠান্ডা হাওয়ায় ঝিমোতে বসত সবাই; আর আমি শুয়ে পড়তাম টানটান, দাদাই এর পাশে, ন্যাড়া ছাদের আলসেতে ঝুলত আমাদের পোষা কুকুর। শুরু হত আমাদের অন্তরীক্ষচর্চা - মহাকাশ-বাসিন্দাদের চেনাতো দাদাই; আমি ভাসতাম চিৎসাঁতারে, হাওয়ায়, নিকষ কালো অন্ধকারে, ব্যাকগ্রাউন্ডে চলত মহাকাশবিবরণী। তারাগুলো ঝিকিয়ে উঠত হঠাৎ হঠাৎ, গ্রহগুলো কাঁচঢাকা পিদিমের মত রাস্তা দেখাত ছায়াপথের; আর আমি পড়ে ফেলতাম সপ্তর্ষিমন্ডল, কালপুরুষের গ্রহনক্ষত্র।
চটক ভাঙত দাদাইয়ের কোথায় - “ওই দেখো স্পুটনিক!” চোখ বোলাতে শুরু করতাম আকাশ জুড়ে; দাদাইয়ের আঙুলনির্দেশ মেনে খুঁজে পেয়ে যেতাম সেই অলৌকিক ব্যোমযানকে - একটা আলোর ডট - জ্বলছে-নিবছে, জ্বলছে-নিবছে আর উঠে যাচ্ছে আরও ওপরে। মাঝে মাঝে হারিয়ে যাচ্ছে সাদা সাদা মেঘের দঙ্গলে, আবার মাথা তুলছে ঠিক।
জিনিসটা যে মানুষের তৈরী একটা যন্ত্র, যে সারাদিনরাত যোগাযোগ রাখছে পৃথিবীর সাথে, পাঠাচ্ছে হাজার তথ্য আর সাহায্য করছে গবেষণায় - এ আমার বালকমন মানত না। যেন দেখতে পেতাম স্পুটনিক এর ভেতরে তিন-চারজন বসে আছে বিচিত্র পোশাকে, আড়চোখে জানলা দিয়ে দেখছে পৃথিবীটাকে - এমনকি আমাদের ছাদটাকেও! লাইকার মত কুকুরও হয়ত তাদের সাথে আছে - যে বা যারা আর পৃথিবীতে নামবেনা কখনো, হারিয়ে যাবে ছায়াপথের দেশেই।
“হো:” - চারদিকে একটা সোল্লাস চিৎকার আর দেখতাম কারেন্ট এসে গেছে; এবার টেলিস্কোপের কায়দায় মাদুরটাকে পাকিয়ে হাঁটা দাও সিঁড়িপানে - কাল ইতিহাসের ক্লাসটেস্ট!
এমন চলতে চলতেই কবে যেন দাদাই খসে গেল আমার কক্ষপথ থেকে - চিরতরে; মাদুর আঁকড়ে পড়ে রইলাম আমি। আকাশ জুড়ে খুঁজতাম লোকটাকে; মাঝে মাঝে চোখে পড়ত স্পুটনিক - জ্বলছে-নিবছে, জ্বলছে-নিবছে আর উঠে যাচ্ছে আরও ওপরে। পোষা কুকুর তখনও ঝুলত আলসেতে, মাঝে মাঝে এসে শুত মাদুরটাতে, আমার হাতে ঠান্ডা নাক ঠেকিয়ে। একদিন সেও দল ছাড়ল; ছাদজুড়ে আমি একা আর আকাশে স্পুটনিক!
এখন যখন রাতের প্লেনে কোথাও থেকে ফিরি, জানলার পাশে সিটটাতে বসে তাকিয়ে থাকি মেঘের তলার রাজ্যটার দিকে, মাঝে মাঝে খুচখাচ আলো চোখে পড়ে ইতিউতি। জানলায় চেপে ধরি কপাল আর ধাঁ করে ডুবসাঁতারে ঢুকে পড়ি কবেকার ফেলে আসা রাতগুলোয় - মাটির আলোগুলো হয়ে যায় অসংখ্য স্পুটনিক - জ্বলছে-নিবছে, এগোচ্ছে, মুছে যাচ্ছে, আবার ফিরে আসছে ঠিক আগেকার মতো। শুধু টেলিস্কোপটা উল্টোবাগে ধরেছি এখন, আর হাত বাড়ালেও ঠেকেনা দাদাইএর হাত!

আপনার মতামত জানান