চন্দ্রকৌঁস

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

অলংকরণ - তৌসিফ হক

সন্ধের পর থেকেই আশেপাশের সব কিছু কেমন পালটে যায়। একটাই পৃথিবী, তাও কেমন ভিন্ন ভিন্ন জগৎ... পৃথিবীর বহু-ব্যক্তিত্বের অপার্থিব প্রকাশ... ভিন্ন ভিন্ন চেতনার মত। না... চেতনা কি আর ভিন্ন? সেও তো একটাই... এই পৃথিবীর মত। আমরা কেবল ক্ষণে ক্ষণে তাকে নিজের মত করে চিনে নিই, কারও ছোঁয়া পেয়ে যেভাবে সে ধরা দেয়। হ্যাঁ, আলো কমে আসছে ধীরে ধীরে... আকাশটা লালচে থেকে ঘোলাটে হতে হতে কেমন বেগুনী হ'ল... তারপর গাঢ় নীল। তারপর আর নেই... রঙ নেই, আলো নেই... কিচ্ছু নেই। না আলো থাকে, আকাশে না থাকলেও... আলো থাকে। ওই তো, গলির মোড়ে লাইটপোস্টের হলুদ আলো ঠিক সময় হলেই নিজে থেকে কেমন জ্বলে ওঠে... আশেপাশের বাড়ির পর্দা দেওয়া জানলা; হাওয়ায় দুলে দুলে ঘরের আলো ফসকে বাইরে এসে পড়ে। জাফরি, ঘুলঘুলি, খরখরি আর মন... ওই অল্প ফাঁকে চোখ রেখে কেউ ভেতর থেকে বাইরের আলো কে খোঁজে, আর বাইরে থেকে ভেতরের আলোকে বোঝে। চারিদিকে আঁধার নেমে এলেও খোঁজে... কারও চোখ না থাকলেও, আলো ঠিক এপার ওপার খেলে বেড়ায়, অল্প ফাঁক পেলেই। এখন ওই মানুষের জ্বালানো আলোগুলো এখানে ওখানে জ্বলছে... ওয়াটের হিসেবে সঞ্চয় পুড়িয়ে পুড়িয়ে জ্বালানো আলোগুলো অন্ধকার ঘর আর রাস্তাগুলোর ছিরি ফেরাতে পারে বটে, কিন্তু আকাশে রঙ ছড়াতে পারে কই? যে যার মত সীমিত ক্ষমতায়, কিছুটা অন্ধকার ঝাঁট দিয়ে সরিয়ে রেখেছে বৃত্তের বাইরে। সে বৃত্তের বাইরে জুলজুল করে চেয়ে থাকা আলোকশূন্যতার দায়িত্ব তার নয়। বরং সে দিতে পারে আরও লম্বা এক কালো ছায়া, কাছাকাছি এলে... সেই আলোর পরিসরেই। তারপর, ছোট হ’তে হ'তে শুধুই একটা টেবিল ল্যাম্প, উলটো দিকে চিত হয়ে টেবিল থেকে হড়কে মেঝেতে পড়ে থাকা লম্বা ছায়া... আর সামনে ফরফর করে উড়ে চলা বইয়ের পাতাগুলো... বাইরের আকাশে আঁধার নেমে এলেও... জানলাটা যে এখনও খোলা রয়ে গেছে!

"গান্ধর্বীঈঈঈঈঈঈ... ওওওওও গান্ধর্বীঈঈঈঈঈঈ!!!! চাঁদ হয়ে জ্বলতে জ্বলতে যে পুড়ে ছাই হয়ে গেলেএএএএ..." পূব দিকের ঘর থেকে ভেসে আসছে চিৎকার। উফ! এই সন্ধে হ'লেই জ্যাঠামশাই এই ভাবে জানলার গরাদ ধরে হাঁক পারে। ওদিকের জানলাটা রাস্তা দেখতে পায় না, সদর দরজা দেখতে পায় না। শুধু তেঁতুল গাছের ঝিরি ঝিরি পাতাগুলোর ফাঁক দিয়ে আকাশ দেখে... আর নিচে কচু পাতার ঝোপ, শ্যাওলা মাখা পাঁচিল। সেই জানলার গরাদ আঁকড়ে মুখটা যতটা সম্ভব বার করে আকাশের দিকে চেয়ে থাকে। মাথাটা তো বেরোতে পারে না গরাদের ফাঁক দিয়ে... নাক আর তার আশেপাশের খানিকটা, হয়ত সঙ্গে একটা চোখ। ওই ভাবেই হাঁক দিতো আগে দক্ষিণের ঘর থেকে... রাস্তার লোক চমকে উঠত... নিচে বাসন মাজতে মাজতে ঠিকে ঝি আঁতকে উঠত ভয়ে... সে তো গান্ধর্বী কে দেখেনি কোনওদিন! তারপর বাড়ির অন্যদের গম্ভীর চিন্তার কয়েকটা দিন... তারপর পূবের ঘরই জ্যাঠামশাইয়ের আগ্রার কেল্লা, যেখান থেকে তাজমহলকে একটা বেলের কুঁড়ির মত দেখা যায়। “গান্ধর্বীঈঈঈঈঈঈ... ওওওওও গান্ধর্বীঈঈঈঈঈঈ!!!!...” ওই আবার! এমন মাঝে মাঝেই চলবে... গভীর রাত অবধি। হয় ঘুম আসতে হবে, না হ'লে চাঁদকে সরে যেতে হবে জানলার সামনে থেকে। রোজ নয়, মাঝে মাঝে এমন হয়। বাড়ির সকলের অভ্যেস হয়ে গেছে। বারণ করলে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে... কেন বারণ করা হচ্ছে কি করতে বারণ করা হচ্ছে... ভেবে অবাক হয়... তার অবাক প্রশ্নের উত্তর কেউ দিতে পারে না, তাই বারণও করে না কেউ আর। সে স্থির চেয়ে থাকে, হাসে মিটিমিটি, দেওয়ালের টিকটিকিটার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ে... তারপর জানলার কাছে চলে যায়। এখনও সেই জানলার গরাদ ধরেই দাঁড়িয়ে আছে, ঘোলাটে হয়ে আসা দৃষ্টি নিয়ে। সবাই বলে জ্যাঠামশাইয়ের চোখ দু'টো কেমন ঘোলাটে হয়ে এসেছে... জ্যাঠামশাই কেমন অন্যরকম! কিন্তু মৈনাক দেখেছে, জ্যাঠামশাইকে ছোটবেলা থেকে দেখেছে সে। সন্ধেবেলাও দেখেছে নিচ থেকে, জানলার সামনে দাঁড়িয়ে জ্যাঠামশাই তেঁতুল গাছের ওপারের আকাশটা দু'হাত দিয়ে ধরতে চাইছে... গরাদের দু'দিক দিয়ে দু'টো হাত বাড়িয়ে ধরতে চাইছে। কোথায় ঘোলাটে চোখ? দু'টো চোখে চাঁদ আটকে রয়েছে... তাই অমন দেখায়। শুধু অন্ধকারে দেখলে বোঝা যায়... কেউ কি এভাবে অন্ধকারে জ্যাঠামশাইকে দেখেনি কোনওদিন? কেউ কি চাঁদ ভেসে ওঠা চোখ দু'টো খেয়াল করেনি সন্ধের সময়? জ্যাঠামশাইয়ের আইরিসে যে সত্যিই চাঁদের রঙ লেগে গেছে!
"গান্ধর্বীঈঈঈঈঈঈ... দু'টো ভাতের জন্য এক বেলা ভিক্ষে কোরোওওওওও... অনাহারে থেকো একটা রাআআআআআত!" চমকে উঠল মৈনাক। আসলে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল। সন্ধে হয়ে গেছে অনেকক্ষণ, ক'দিন পরেই হাইয়ার সেকণ্ডারীর পরীক্ষা, তবু মোটা পদার্থবিজ্ঞানের বইটা বেয়ারা হয়ে ফরফর করে উড়ছে এ চ্যাপ্টার থেকে ও চ্যাপ্টার। নিজের মর্জি মতই তারা এক একটা সূত্রকে চোখের সামনে মেলে ধরেই আবার সরিয়ে নিচ্ছে। ডান হাতটা বাড়ালেই একটা সংজ্ঞা, একটা সূত্র, একটা বিশ্লেষণ মৈনাকের থাবার মাঝে চলে আসবে... কিন্তু নাহ্‌ , শুধু টেবিল ল্যাম্পের আলোয়ে তাদের এই আসা-যাওয়া দেখে যাচ্ছে মৈনাক। সামনের খাতায় একটা অসমাপ্ত জটিল প্রমানের অঙ্ক, তার এককটা ডিরাইভ করতে করতে আর করা হ'ল না... বেশ খানিকটা নিচে হিজিবিজি ক'টা লাইন -
একে একে স্থবির নতজানু
যত পর্বত
আরাধ্য, উপাস্য গিরি শৃঙ্গ সব
তবু জলে ডুবে মৈনাক
নিমজ্জিত নীল, দ্বৈপায়নে দুর্যোধন
তবু ডানা দু'টো থাক
মানুষ যাকে স্পর্ধা বলে চিনবে একদিন।

... ... ...

মাঝে মাঝে খুব কষ্ট হয়... এমনিতেই দিনের পর দিন এই ভাবে কোনও কিছুকে গোপনে লালন করার সাধনা, দম বন্ধ হয়ে আসে... তারপর এই বুকের ওপর চাপা পাথরটা ভারী হ’তে হ’তে এখন এক আতঙ্কের রূপ নিচ্ছে ধীরে ধীরে। মাথার মধ্যে আবোলতাবোল চিন্তাগুলো ঘুরতে ঘুরতে এমনিতেই অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে শর্মিষ্ঠা, মাঝে মাঝে চমকে ওঠে... টিকটিকিটা ওভাবে কেন ‘ঠিক ঠিক ঠিক’ বলল? দুশ্চিন্তাটা কেমন করে শুনতে পেলো ও? তাহ’লে আরও কি কেউ শুনে ফেলল এই ভাবে?! সকলেই জানে, মিতা হাসতে পারে খুব... মামার বাড়িতে ওই নামেই শর্মিষ্ঠাকে ডাকে সকলে... মিতা। মিতা সব কাজ করে, মিতা মন দিয়ে পড়া আর মামিদের কথা শোনা ছাড়া আর কিছু করে না, মিতা আজকালকার মেয়েদের মত কলেজের ছেলেদের সঙ্গে ঘোরে না কোথাও। এম এ’র রেজাল্ট বেরোনোর আগে থেকেই মেজো মামা তার বাবার সঙ্গে কথা বলে রেখেছে... প্রায় সব ঠিক। মিতার কোষ্ঠী চলে গেছে এদিক ওদিক, কুলীন পরিবারে। মিতা সব দেখেছে, সব জানে... কিন্তু কিছু বলে না। খুব বাধ্য মেয়ে তো! অন্যমনস্ক হ’লে মেজো মামীমা জিজ্ঞেস করে – “কি রে মিতা? কি ভাবছিস?” মিতা হেসে বলে – “কই? কিছু না তো...” এর থেকে বেশি কারও ভাবার প্রয়োজন হয়নি কখনও... সবাই জানে -মিতা হাসতে পারে খুব। অনার্স পড়ার সময় মামার বাড়ি থাকতে এসেছিল শর্মিষ্ঠা, রিশরা থেকে কলকাতার কলেজ। ইংলিশ-এ অনার্স নিচ্ছে শুনে মামিরা হেসেছিলো... আর মা-বাবা... অভিভাবকের নিরপেক্ষতা বড় দুর্বিষহ হয়। “তুই যা ভাল বুঝবি কর”-এর বিরুদ্ধে যে খানিক অভিযোগ করেও শান্তি পাওয়া যায় না কোনওদিন! শুধু বড়মামার চোখগুলো বেশ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল শুনে, কেমন অদ্ভুত আবেগ নিয়ে বলেছিল, “ইংরিজী পড়বি! ইংলিশে হনার্স... বেশ করেছিস, বেশ করেছিস... শেলী, বাইরন, কিট্‌স, মিলটন... সব পড়বি... সব!”
Art thou pale for weariness
Of climbing Heaven, and gazing on the earth,
Wandering companionless
কেমন অদ্ভুত সুন্দর ইংরিজী উচ্চারণ, বলার কায়দা... মোটেই ফেক অ্যাক্সেণ্ট লাগত না... গলাটা কেঁপে উঠত আবেগে, এক এক সময়। বড়মামা নিজে কি নিয়ে পাশ করেছিলেন কে জানে? কখনও জিজ্ঞেসই করা হয়নি কাউকে... মায়ের কাছেও জানতে চায়েনি... আর এখানে তো প্রশ্নই ওঠে না। প্রায় পাঁচ বছর শেষ হ’তে চলল... এখন খালাস পাওয়ার সময়... তারপর এক জেল থেকে আর এক জেল... যাবজ্জীবন কারাদণ্ড!

তিন-চার দিন মাঝে এমন গেছিল, মিতাকে কেউ হাসতে দেখেনি। তাতে অবশ্য এই বাড়ির কারও কিছু বিশেষ আসে যায়নি। ছাতের কাপড়টা ঠিক সময় নিয়ে আসলে, আনাজ-পত্তর কেটে মামীদের হাতে এগিয়ে দিলে... আর দু-তিন বারের বেশি না ডেকে সাড়া পাওয়া গেলেই হ’ল... হাসি তার থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। এই না-হাসা দিনগুলোর মাঝেই... একটা দুপুরে, খাবারের থালাটা বড়মামার ঘরে নিয়ে যেতে, দেখল বড়মামা টানটান হয়ে বিছানায় শুয়ে আছে। কপালের ওপর হাতটা এমন করে রাখা, যে চোখটাও ঢাকা পড়ে গেছে। ধবধবে সাদা হাফহাতা গেঞ্জি... তেমনই সাদা হয়ে আসা মাথার চুলগুলো... মাথার ওপর সিলিং ফ্যানের হাওয়া হালকা হালকা হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। মৃদু শ্বাস-প্রশ্বাসে বুকের ওঠা নামা দেখে মনে হয়েছিল ঘুমোচ্ছে, অবেলার ঘুম... এত ওষুধ খেতে হয়। ঘুম না ভাঙিয়েই থালাটা রেখে চলে আসছিল শর্মিষ্ঠা। হঠাৎই বড়মামা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল ফোঁশ করে, এক বিন্দুও নড়ল না, ঐ ভাবেই শুয়ে শুয়ে বলল “বুঝলি... দু’টো শব্দ আছে - প্যাশন আর কম্‌প্যাশন। কম্‌প্যাশন মানে কিন্তু কম প্যাশন নয়... হা হা হা...” হঠাৎ বড়মামার এই কথাগুলো শুনে কিচ্ছু বুঝতে পারছিল না শর্মিষ্ঠা, একবার মনে হয়েছিল ঘর থেকে চলে যাওয়াই ভাল... হয়ত... কিন্তু পারল না। বড়মামা সেই একই ভাবে আবার বলল, “মাঝে মাঝে এই কমপ্যাশন জিনিসটা থাকাও খুব জরুরি। আমাদের আশেপাশে কারও ওপর যখন খুব রাগ হয়, তীব্র বিরক্তি জন্মায়... সেই অপদার্থ বিরক্তিকর লোকটা নিজেও সারাজীবন বোঝে যে রাগ আর বিরক্তি ছাড়া তার আর কিছুই কুড়োনোর নেই... কিন্তু কি জানিস, সেই রাগ করার, দোষ দেওয়ার লোকটাকে আর যেদিন হাতের নাগালে পাওয়া যায় না, সেদিন বোঝা যায়... একটু সহানুভূতি দেখালে হয়ত খুব বেশি ক্ষতি হ’ত না কারও। চরম অপদার্থেরও ওইটুকু প্রাপ্য থাকতে পারে।” শর্মিষ্ঠা কি বলবে, কাকে বলবে... কেনই বা বলবে... কিচ্ছু বুঝতে পারেনি সেদিন। বড়মামাও কিছু জিজ্ঞেস করেনি... একইভাবে শুয়ে ছিল নির্বিকার ভাবে। আচ্ছা, মানুষ নিজেকে কখনও সহানুভূতি দেখাতে পারে? ফোনের ম্যাসেজ টোনটা বেজে উঠল ক্ষীণ শব্দে... আবার টিকটিকিটা খুব জোরে ডেকে উঠল জানলার পাশ থেকে... ‘টিক টিক টিক’। যে বার্তা পাঠালো তার আসল নামটাও মোবাইলে ঠাঁই পায়নি... একটা মন গড়া মেয়েলি নাম। বার্তাটা কি, তাও তো শর্মিষ্ঠা দেখেনি এখনও... টিকটিকিটা জানল কি করে? কি ভেবে আবার সায় দিলো ওই ভাবে? মোবাইলটার দিকেই একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল শর্মিষ্ঠা, মেয়েলি ছদ্মনামটা নীল পর্দায় ক্রমে ম্লান হ’তে হ’তে হারিয়ে গেল... মোবাইলের পর্দায় অন্ধকার। আর বাইরের অন্ধকারে খচমচ শব্দ... কেউ শিকার খুঁজছে, না হ’লে শিকার হবে শিগগির। একতলার ঘর বলেই, বাইরের ওই মাৎস্যান্যায়ের আভাস স্পষ্ট টের পাওয়া যায়। ঘরের ভেতরেও প্লাস্টিকের ওপর দিয়ে খচমচ করে কি একটা চলে গেল... স্যানিটারি ন্যাপকিনের প্যাকেটের ওপর দিয়ে। এই সপ্তাহেই ওটা ব্যবহার করার কথা... এত দেরি হচ্ছে কেন?... তা হ’লে কি... “গান্ধর্বীঈঈঈঈঈঈ... ওওওওও গান্ধর্বীঈঈঈঈঈ... ডুববেই যদি তো হাত বাড়ালে কেনওওওওও?” বড়মামার গলা... বেশি রাত করলে আর খেতেও চাইবে না পরে হয়ত... নিজের টুকরোগুলোকে গুছিয়ে নিয়ে আয়নায় নিজেকে দেখে নিলো একবার শর্মিষ্ঠা... নাহ্‌ চোখের কোণে জল নেই, লালচে নয় চোখ। বাকিটা মিতার হাসিকে ঢেকে নিতে হবে।

... ... ...

বাড়ি পুরনো হ’তে হ’তে যেমন হয়... ক্রমে বিবর্ণ, রোদে জ্বলা রঙ আর বৃষ্টির রেখে দেওয়া জলের দাগ। কোথাও কোথাও খসে পড়া প্লাস্টারের ওপার থেকে বেরিয়ে আসা ক্ষতচিহ্নর মত ইঁট। তবুও বাড়ি, তবু আশ্রয়। শ্যাওলা জমে থাকা পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। আর একটা কাঠের দরজা সবুজ রঙের, জমা জলে কাঠ পচে যাবে বলে নিচে সবুজ রঙ করা টিন... সেই দরজার পাশে কোনও ফলক নেই, বাড়ির নামও নেই। হয়ত এক কালে ছিল, এখন নেই... তাই নেই। পোস্টবক্সে সাদা রঙে লেখা কটা নাম আর পৈতৃক পদবী আর সংখ্যার পিঠে সংখ্যা তির্যক ব্যবধানে... ঠিকানা, যা দিয়ে বাড়িটাকে সনাক্ত করে পাড়ার লোকজন। প্রাচীন বা জরাজীর্ণ নয়, উপেক্ষিত। অথচ, এখনও কোনও বিপন্নতা নেই... এইসব কিছু নিয়েই তার অস্তিত্ব। এই যে ঘেরা টোপের মধ্যে খানিকটা সবুজ, খানিকটা জল-কাদা, খানিকটা পুরনো মড়চে ধরা... খানিকটা নতুন রঙ চড়ানো অন্দরমহল... কিন্তু এক ফোঁটাও বিপন্নতার সংশয় নেই। অথচ কাছাকাছি বেশ একতরফা জাঁকজমকের সঙ্গে রোদ পোয়ানো কাঠামোগুলো কেমন অস্তিত্ব সংকটে ভুগতে ভুগতে আসতে আসতে ধুঁকে পড়েছে। আসলে প্রমাণ করার তেমন কিছুই নেই... অথচ প্রমাণ করতে করতে ক্লান্ত... বাড়িগুলো, আর তার কোটরে কোটরে জ্বলজ্বল করা জোরা জোরা চোখ। কেউ দিন... কেউ রাত জেগে জেগে ক্লান্ত। অথচ এই যাবতীয় আলাদা আলাদা করে চেনা, এইসবই সকাল থেকে সন্ধের মাঝে... তারপর অন্ধকার, তারপর সেই সাদা আর হলুদ আলো... আর সেগুলো এক এক করে নিভে গেলে সবটাই কালো... কনক্রিট। অথচ রাতের অন্ধকারে কোনও নিশাচর, কিংবা পথ ভুল করা যার আজন্ম অভ্যাস... যখন এমনই অন্ধকার গলির কোথাও দাঁড়িয়ে আশপাশের কিছু ঠাওর করে খুঁজতে যায়, বা চিনতে চায়... হাত কি স্পর্শ করবে বলা মুশকিল, তবে চোখে দেখবে সেই অন্ধকার সিলোয়েটে মিটিমিট জ্বলা জানলাগুলো। কোথাও কাঁপা কাঁপা, কোথাও স্থির... ওই আলোই জানিয়ে দেয়, কোন কোন প্রকোষ্ঠে প্রাণ পোষা আছে।

খুব চড়া সুরে সংলাপ চলছে। কিছু বাক্য একই সঙ্গে এক এক দিক থেকে ভেসে আসছে। টিভিতে চলা ধারাবাহিক। এ বাড়িতেও একটা টিভি আছে, সেখানেও একই সংলাপ। একজন সেইদিকে তাকিয়ে থাকে রাতের খাবার গরম করার আগে অবধি... একবার টিভির পর্দা, আর একবার তার খানিকটা ওপরের দেওয়াল ঘড়ি... কখন ন’টা বাজবে। রঙচঙে নাটকীয়তার মেয়াদ ওই ন’টা পর্যন্ত। আর একজনের, কানে পৌঁছয় সব কিছু... ওই কান পর্যন্তই। ঘরে বাইরে, বেশির ভাগটাই তো এই ভাবে এখানে ওখানে ঠোকা খেয়ে প্রতিসৃত হয় অথবা ছিটকে যায় অন্য কোথাও ধাক্কা খাওয়ার জন্য... ভেতরে আর প্রবেশ করে কত টুকু? ভাল না লাগার ভারটা বাড়তে বাড়তে এমনিতেই একটা উদাসীনতার ঢাল তৈরী হয়ে যায়, ঠিক যেমন শরীরের মধ্যে বর্ধিত অনাক্রম্যতা। তারপর খারাপ লাগাগুলো ওই চলছে চলুক, এর বেশি কিছু নয়। যা থাকে, তা উদাসীনতা আর কিছু থেকে যাওয়া ভাল লাগা। মালতীর যেমন এই সময়টা টিভিতে নিজেকে খোঁজার বিশ্রাম, তেমন যতীনের সামনে চিৎ পড়ে হয়ে থাকে খবরের কাগজ, পাতা উলটে উলটে আরও একবার গতকাল কে দেখে নেওয়া। টিভি জিনিসটা কোনওদিনই যতীনের ভাল লাগে না, ছেলে মৈনাক টিভি দেখলে বিরক্ত হয়। রেডিও শুনতে ভাল লাগত... সেও আজকাল শোনা হয় না। পুরনো রেডিও দাদার ঘরে... আর ছোট ট্রাঞ্জিস্টারটা চালানো হয়... যেদিন সন্ধেবেলা কারেণ্ট থাকে না। মালতীও কেমন আশ্চর্যরকম চুপ করে যায়! পর পর তিনটে ধারাবাহিক... একটা কথাও বলে না। নাহ্‌, একটা দু’টো কথা বলে... শুধু বিজ্ঞাপনের বিরতিতে। আর বিরতির সময় টিভির বাইরে যে সংলাপ শুরু হয়, সেও বেশ... দু’তরফের উদ্বেগ আর উদাসীনতা ঠোকাঠুকি করে, জড়াজড়ি করে আবার নিজের জগতে ফিরে যায়।
“টিভিটা একটু কমাও।”
“মানে?”
“মানে সাউণ্ডটা একটু কমাও... বাবুর পরীক্ষা সামনে।”
“ওহ্‌... হুম, কমানোই আছে... শোনা যাবে না আর কমালে।”
“যা ভাল বোঝো!”
সশব্দে দু’তিনটে পাতা উলতে দিলো যতীন। মালতীর হাতে রিমোট, আওয়াজ নয় চ্যানেল পালটানোর জন্য।

“গান্ধর্বীঈঈঈঈঈঈঈ... জল নয়এএএএএ... অন্তঃসীলা লাভা বয়ে ছিলোওওওওও”
কাগজ থেকে চোখ তুলে জানলার দিকে তাকালো যতীন। “আজ এমন বাড়াবাড়ি করছে কেন?... হঠাৎ কি হল বল তো?” মালতী আবার আগের চ্যানেলটায় ফিরে এসে শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলল, কিছু বলল না।
-“ক’টা বাজল... তাড়াতাড়ি খাবারটা রেখে এসো... বেশি রাত হ’লে...”
-“ও মিতা দিয়ে আসবে।”
-“আহ্‌... দেখছ তো মাথাটা গরম হয়েছে... ছেলেমানুষ, শেষে একটা...”
-“ছেলেমানুষ!... চৌবাচ্চা!... মেলা বোকো না, কিচ্ছু বুঝতে পারলাম না কি হয়ে গেলো... শেষ হোক, তারপর দেখছি!”
চরম অসন্তুষ্ট হলেও যতীনের মুখে-চোখে বিরক্তির ছাপ ফুটে ওঠে না। যথেষ্ট অনুশীলনের পর মানুষ এই ভাবে নির্বিকার থাকার মুখোশ বানিয়ে নেওয়ার কৌশল আয়ত্ত করতে পারে। তবে তার কতটা উদাসীনতা, আর কতটা অন্যমনস্কতা তা টিভির পর্দায় আটকে থাকা মালতীর চোখ দু’টো বুঝতে পারল না।
-“রেডিও বাজছে?”
-“কি?”
-“রেডিও চালিয়েছে দাদা... শুনতে পাচ্ছ না?”
মালতী চুপ করে কিছু শোনার চেষ্টা করল... ক্ষীণ শব্দ ভেসে আসছে শাস্ত্রীয় সংগীতের। গম্ভীর ভাবে টিভির দিকে তাকিয়ে বলল, “যাক, একটা কিছু নিয়ে থাকুক... শান্ত থাকবে।”
-“হুম, সেই... কিন্তু হঠাৎ পুরোনো রেডিওটা...”
-“কি করবে বল? একটা কিছু নিয়ে তো থাকতে হবে... একা মানুষ... এভাবে...”
-“একা থাকার মাথার দিব্যি তো কেউ দেয়নি... আর... একা কোথায়?”
মালতী সেই প্রশ্নের কোনও উত্তর দিলো না। ধারাবাহিকের শেষে নাম দেখাচ্ছে... রাত ন’টা, মেয়াদ শেষ। যতীন তখনও কান খাঁড়া করে শোনার চেষ্টা করছে রেডিওতে কী বাজছে... মালতীর চাপা দীর্ঘশ্বাস ওর কানে পৌঁছলো না।

... ... ...

পুরনো রেডিওর আওয়াজটা একটু বেশিই জোরে বাজছে, নাকি রাত হয়ে আসছে বলে চারিদিকের নিস্তব্ধতা বাড়ছে ক্রমশ? সিঁড়িটা বড় থমথমে থাকে আজকাল... ওঠানামা করার লোকগুলো কমে গেছে এক এক করে। এখন শুধু মাঝে মাঝে দু-একজনের যাওয়া আসা। আর ধাপগুলো... ধাপগুলোর ছায়া একে অপরের ওপর... কেউ ওপর, কেউ নিচের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করে। কারেণ্টের বিল বেশি হবে বলে সন্ধের পর আর সিঁড়ির আলোটাও জ্বালানো হয় না। অভ্যাসের পদক্ষেপ ধাপ খুঁজে খুঁজে ঠিক ওঠা নামা করে নিতে পারে অন্ধকারেই। শুধু বাড়তি ভার বইতে হ’লে আলোটার প্রয়োজন আর এড়িয়ে যাওয়া যায় না... সে নিজের জন্য নয়, ওই বস্তুর জন্য, যার ভার বইতে হয়। পূব দিকের ঘরের দরজাটার একটা পাল্লা খোলা। ফিকে হয়ে যাওয়া কমলা পর্দায় হলুদ আলো পড়ছে। আর সেই পর্দা পার করেই অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে রেডিওর সুর... একতলায় ছড়িয়ে যাচ্ছে। এই সময় কোন স্টেশনে শাস্ত্রীয় সংগীতের অনুষ্ঠান হয়? সে তো অনেক রাতে হওয়ার কথা, যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ে। শর্মিষ্ঠা চুপ করে শুনলো কিছুক্ষণ। খেয়াল, দ্রুত তাল... কিন্তু রাগটা চিনতে পারল না। অত বিস্তারিত সংগীতের জ্ঞান নেই... তবু শুনতে শুনতে কিছু চেনা রাগ চিনে নিতে পারে। এটা পারল না... এমন কি কোন পুরুষকণ্ঠ, তাও ঠিক আন্দাজ করতে পারল না কিছুতেই। বড়মামা ঠিক জানবে, খাবার দিতে গিয়ে জেনে নেওয়া যাবে। ওড়নাটা ঠিক করে জড়িয়ে নিয়ে, দরজার দিকে এগিয়ে গেলো শর্মিষ্ঠা। তারপর অন্ধকার অলিন্দ, অন্ধকার সিঁড়ি... তাকে পাশ কাটিয়ে রান্নাঘর। ঠক করে ছিটকিনিটা খোলার শব্দ হ’ল। রেডিওর পুরুষ কণ্ঠ ‘আলাপ’ পার হয়ে বন্দিশ বাঁধছে, খেয়ালের হিন্দুস্তানি বোলগুলো স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে এবার।

কোনওরকমে তিনটে কঠিন অঙ্কের প্রমাণ করেছে মৈনাক। মোবাইল ফোনটা একদম সুইচ্‌ড অফ্‌ করে দেওয়া, যাতে কেউ ফোন করলেও না পায়। বাবা ভীষণ রাগ করেছিল। তবে, বাবা রাগ করলেও চেঁচায় না, আজ অবধি গায়ে হাত তোলে নি কখনও। ঠান্ডা মাথায় বলল, পরীক্ষার আগে ফোন নিয়ে সময় কাটালে সিমটা ভেঙে ফেলবে... ভেঙে ফেলার কথাটাও খুব ঠাণ্ডা মাথায় বলল, শান্ত ভাবে। খুব হিসেবী মানুষ, না হ’লে রাগের মাথায় বলত ফোন ভেঙে ফেলবে। মৈনাক জানে, যে ফোনের কারণে যদি আর একবার কোনও প্রসঙ্গ ওঠে, তাহলে সিমের অবশেষটা সত্যিই ঝাঁট দিয়ে ফেলে দিতে হবে। অবশ্য, সে সাবধানী, সেইরকম কিছু হতেও দেবে না। নিজের ইচ্ছেতেই আজ সুইচ্‌ অফ করে রেখেছে। আসলে আর কিছুই না... ভাল লাগছে না। ফিজিক্স ভাল লাগছে না, পরীক্ষার জন্য পড়া ভাল লাগছে না, ফোনে এর-তার ম্যাসেজ ভাল লাগছে না... সন্ধে থেকে কিছুই ভাল লাগছে না। কোনও ভাবে রাতটা কাটিয়ে পরের দিন সকালটা হ’লে যেন বাঁচে। এই ক্রমাগত না-ভাল লাগাটা একটা অজগর সাপের মত ধীরে ধীরে কেমন জড়িয়ে ফেলছে। পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে সব ছেড়ে। আসলে, যেদিন স্কুল থাকে, টিউশনে পড়তে যাওয়া থাকে... অনেক অনেক পড়ার মধ্যে ঘাড় গুঁজে পড়ে থাকতে হয়... আর তারপর ক্লান্তির ঘুম... সেদিনগুলো বেশ কেটে যায়। কিন্তু এইভাবে সারা সন্ধে ঘরে বসে থাকলেই রাজ্যের ভাল না লাগাগুলো ঘিরে ধরে এই ভাবে। মনে হয় আশেপাশের কেউ ভাল নেই। মা ভাল নেই, মিতা দিদি ভাল নেই, জ্যাঠামশাই ভাল নেই... কেউ না... সবাই ভাল থাকার চেষ্টা করতে করতে হাঁফিয়ে উঠেছে। ছোটমা ভাল নেই বলে ছোটকা ওই ভাবে বেরিয়ে গেলো, এখন নিউ জার্সি... দু’জনে নিশ্চয়ই খুব ভাল আছে! ওদের ঘরই এখন মৈনাকের স্টাডিরুম। মৈনাকের বোঝার আওতার মধ্যেই এই সব কিছু, পদার্থবিজ্ঞানের মতই এইসব এক একটা সূত্র ধরেই ‘অতয়েব প্রমাণিত’ হয়ে চলেছে অবিরত। তাই কিছুতেই হাঁফিয়ে উঠবে না বলে ছুটে বেরিয়ে যাওয়ার ইচ্ছেটা আরও বেশি করে পেয়ে বসে। অন্ধকার রাতেই ছুটে বেরিয়ে যাবে, পূর্বদিকে রুদ্ধশ্বাস একটা দৌড় সারা রাত ধরে... যতক্ষণ না ভোরের আলো ফোটে। যেখানে সূর্য উঠবে, সেই জায়গাটা ওর... সেখানে থামবে। সেখানে ভাল থাকার চেষ্টা করতে করতে কেউ হাঁফিয়ে উঠবে না।

নাহ্‌, আজ কোনও মতেই বেশি রাত জাগা যাবে না... খেয়ে একটু পাতা উলটেই ঘুমিয়ে পড়তে হবে। মৈনাক পড়ছে বলে কেউ বিরক্ত করতে আসবে না। শুধু দশটা বাজলে মা খাবারের থালাটা ঘরেই রেখে দিয়ে যাবে। কিন্তু এতটা সময় ঠিক কী করবে বুঝতে পারছিল না। জ্যাঠামশাই হঠাৎ চুপ করে গেছে... এখন রেডিওটা বাজছে। মৈনাক এইরকম গান কিচ্ছু বোঝে না। অন্য সময় হ’লে হয়ত কানে ইয়ার ফোন দিয়ে বসত, ফোনে নিজের পছন্দের গান চালিয়ে। অথবা ঘরের দরজাটা গিয়ে বন্ধ করত সবার আগে। কিন্তু আজ হঠাৎ এই সুরটা বেশ লাগছে শুনতে। কান পেতে শুনতে শুনতে অন্যমনষ্ক হয়ে গেল... ময়াল সাপটা যেন আসতে আসতে ফাঁশটা আলগা করছে বুকের ওপর থেকে। হিন্দিতেই তো বলছে কিছু... একটাই লাইন এক এক ভাবে, এক এক বার গাইছে... উস্তাদের গায়কীর রকমফের। বৈশালী ক্লাসিকাল গান শেখে... এইসব বেশ ভাল বোঝে। ওর কাছে শুনেছে মৈনাক... আরোহন-অবরোহন... কেমন রেচন-ক্ষরণ, প্রশ্বাস-নিঃশ্বাস, অলিন্দ-নিলয়ের মত লাগে শুনতে... জীবনবিজ্ঞানের ভাষার মত। এমন কটা রাগের নাম, আর তাদের এইসব আরোহন-অবরোহন, আরও যা কিছু এসব জেনে রাখলে মন্দ হয় না। বৈশালীর সামনে দু’কথা বলা যাবে... কিছু বললে একটু আগ্রহ দেখিয়ে শোনার চেষ্টা করবে। যদিও এইসব গাওয়া মৈনাকের কম্য নয়... তাও একেবারে নিরেট তো ভাববে না। মিতা দিদিকে জিজ্ঞেস করলে ঠিক বলতে পারবে! ও তো গান শিখতো, কিছু নিশ্চয়ই জানবে... জানবে না?
“গান্ধর্বীঈঈঈঈঈ... শুধু কোমল স্বরগুলো ছুঁয়ে দিয়ে যাও... শুদ্ধ হোওওওওওওওওওওক”
চমকে উঠল মৈনাক, মা কখন এসে ভাতের থালা রেখে দিয়েছে বুঝতেই পারেনি। ঘাড় ফিরিয়ে দেখল দরজার সামনে মা দাঁড়িয়ে... “বাবু, মনযোগ নষ্ট করো না... খেয়ে নাও, ভাত ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।”

... ... ...

এখন ঠিক কি চলছে? আরোহন না অবরোহন? সিঁড়ি দিয়ে উঠছে না নামছে? সিঁড়ি বললে মৈনাকের আবার সেই ঘোড়ানো লোহার সিঁড়িটার কথা আগে মনে পড়ে, যেটা ছাতে আছে, জলের ট্যাঙ্কে ওঠার জন্য। ওইরকম ঘোরানো, প্যাঁচানো সিঁড়ির একটা আলাদা মজা... ওঠা নামা দু’টোই সাবধানে করতে হয়... আবার লোহার ধাপগুলোতে পাও বুঝে বুঝে রাখতে। তবু কেমন একটা অন্যরকম অনুভূতি, অন্যরকম আনন্দ। ঘুরে ঘুরে উঠতে নামতেও বেশ লাগে... সোজা উঠে যাওয়া বা নেমে আসাই কি শুধু জীবন হ’তে হবে? ওই ঘোরানো সিঁড়িটাই একটা অন্য জগৎ। চিলে কোঠার ঘরের কথা ঢের শুনেছে মৈনাক, নিজে সেরকম কিছু পায়নি বলে আফসোস হ’ত এক কালে – যখন প্রথম ‘চিলেকোঠা’-র অস্তিত্বকে অনুভব করতে লেগেছে, বুঝতে শিখেছে সকলের জীবনে একটা চিলেকোঠার নিভৃত জগৎ প্রয়োজন হয়... কোনও না কোনও সময়। চিলেকোঠার ঘর, ছাতের কাছাকাছি, আকাশের কাছাকাছি নিজের একটা জগৎ। সেটা না থাকা মানে অনেক অনেক গল্প, যা হ’তে পারত... যা ঘটতে পারত, তা আর হয়ে উঠল না সেভাবে। কিন্তু সেই চিলেকোঠার ঘর না পাওয়ার মন খারাপটা মিটিয়ে দিয়েছিল এই ঘোরানো সিঁড়িটা। ট্যাঙ্কে ওঠার জন্য এমন একটা সিঁড়ি, যার যে কোন একটা ধাপে বসলেও পা ঝুলিয়ে রাখা যায় শূন্যে, গাছের ডালে বসে থাকার মত। যার লোহার ধাপে বসে থাকলে ছাতের অন্য অংশ থেকে দেখাও যায় না। নিভৃত বাঁকের মাঝে তখন একা মৈনাক।

জটিল অঙ্কের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে যে না-ভাল লাগাটা ঘিরে ধরেছিল, সেটা জ্যাঠামশাইয়ের ঘর থেকে ভেসে আসা সুরটা কেমন হুস হুস করে কাক উড়িয়ে দেওয়ার মত উড়িয়ে দিলো! দূর! আর জটিল অঙ্ক নয়, এরপর আলোর চ্যাপটারগুলো থেকে ক’টা ছবি… ওই উত্তল-অবতলে আলোক রশ্মি… ব্যস্‌ আর কিচ্ছু না। কিন্তু পেন্সিলের শিস ভোঁতা, ভোঁতা শিস দিয়ে ওই মোটা দাগের রশ্মি হয় না... উত্তল-অবতলে ‘ফোকাল পয়েণ্ট’ এসে ঠিকঠাক কিছুতেই মেলে না। তন্নতন্ন করে খুঁজেও শার্পনার বা একটা ব্লেড পাওয়া যাচ্ছে না ঘরের কোথাও! অন্যসময় হ’লে মৈনাক ভাবত, “দূর! কাল সকালে দেখা যাবে।” কিন্তু আজ কেমন খুঁজতে খুঁজতে একটা জেদ চেপে গেছে। যেন এই ভাবেই, হাতের কিছু না পাওয়ার জন্য এক একটা ভাল লাগে আরও দূরে চলে যায়। ওই পেন্সিলের সরু শিস দিয়ে আলোর রশ্মিগুলোকে ফোকাল পয়েণ্টে মেলানোই আজকে রাতের ভালোলাগা... যেভাবেই হোক... সেটাকে দূরে সরে যেতে দেওয়া যাবে না। এখনও গানের সুর ভেসে আসছে, আগেরটা শেষ... এটা অন্য গান... খুব ধীরে আলাপ চলছে... হ্যাঁ ‘আলাপ’, বৈশালী বলেছিলো... বিলম্বিত। নাহ্‌, কোত্থাও নেই... টেবিল ঘড়ির ছোট কাঁটা এগারোতে মিশবে গিয়ে এবার... মিতা দিদি নিশ্চয়ই জেগে। মিতা দিদির কাছে শার্পনার না থাকুক, ব্লেড ঠিক থাকবে।

সিঁড়ি বেয়ে তখনও সুর গড়িয়ে পড়ছে। অন্ধকারকে আলো করে রেখেছে আধখোলা দরজার পাল্লা, হলুদ আলো। মিতা দিদি রাত জেগে পড়াশুনো করে... ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া মেয়ে। অথচ ‘মামার বাড়ির আহ্লাদ’ প্রবাদটা যে একেবারেই সার্বজনীন নয়, তা এই মেয়েটাকে দেখেই চিনেছে মৈনাক। দরজার পাল্লাটা বন্ধ ছিল, দু’বার টোকা দিলো মৈনাক... চাপা স্বরে ডাকল শর্মিষ্ঠার পরিচিত ডাকনাম ধরে। কিন্তু কোনও সারা নেই। আলগা চাপ দিতেই খুলে গেলো দরজাটা। কিন্তু তবু ভেতরে ঢুকতে পারল না মৈনাক। দরজা খোলা থাকলেও মাঝে মাঝে প্রবেশ করা যায় না, পর্দাও সরানো যায় না। মিতা দিদি না থাকলে এই ঘরেও ঢোকে না মৈনাক। একবার মা দেখেছিল মৈনাক কে একা, তখন শর্মিষ্ঠা কলেজে... বেকায়দায় দিদির বইটা হাত থেকে পড়ে গেছিল, বিবর... সেই শেষ, আর আসা হয় না একা একা। ঘরে আলো জ্বলছে, অথচ কেউ নয়... পর্দা না সরিয়েও বুঝতে পারল মৈনাক। সবাই ঘুমিয়ে পড়লে, অন্ধকার রাতে সীমান্তে অনুপ্রবেশ এর চেষ্টা চলে। কিন্তু মৈনাকের এখান থেকে কিচ্ছু পাওয়ার নেই, একটা ব্লেড ছাড়া। অনুপ্রবেশ করলেও, টেবিলের এক ধারে পড়ে থাকা ব্লেডটা নিয়েই বেরিয়ে গেল মৈনাক। এত রাতে মিতা দিদি কোথায়? রান্নাঘর অন্ধকার... সাদা মেনি বেড়ালটা মাছের কাঁটা চিবোচ্ছে অন্ধকারে, চোখ জ্বলছে। একতলার বাথরুমও অন্ধকার... তাহ’লে কি... আলাপ এখন দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে ধাপে ধাপে গড়িয়ে আসছে... আরোহন? না অবরোহন? নিজের ঘরে না গিয়ে সেই সিঁড়ির ধাপে ধাপেই ওপরে উঠে গেল মৈনাক। আবছা আলো অন্ধকারে, তবু সেই পেঁচিয়ে ওঠা লোহার সিঁড়িটার মত না, অন্ধকার জড়িয়ে আকাশের দিকে উঠে যায় ওই সিঁড়ি... পাক খেতে খেতে। চাঁদের আরও খানিকটা কাছে, লোহার জাল জাল ফাঁকের মধ্যে দিয়ে চাঁদকে দেখেছে মৈনাক, একা একা... যখন কেউ থাকে না ছাতে। ডি এন এর মত সিঁড়ি আর তামার মতো চাঁদ। রূপো নয়, তাম্রযুগের তামার তৈরী ধুকধুকি... যাতে স্বপ্ন খোদাই করা থাকে। নেহাৎ ছেলেমানুষ, সে ফিজিক্সের অধীরবাবুও বলেন। সেই ছেলেমানুষী আর ব্লেড নিয়েই ছাতে যাবে বলে এক পা এক পা করে সিঁড়ির ধাপ পেরোচ্ছিল মৈনাক। দিদি বোধহয় ছাতে আছে, ছাতের দরজাটাও ঠিক আলগা ভাবে বন্ধ যেমন দিদির ঘরের দরজাটা এখন। অথচ দো’তলায় ওঠার পর আর সিঁড়ির সাথে ঘুড়তে পারল না ছাতের দিকে। পর্দার নিচ আর ওপর থেকে হলুদ আলো উঁকি দিচ্ছে, হাওয়ায় দুলে দুলে ডাকছে মৈনাক কে... জ্যাঠামশাইয়ের ঘর। গানটা এখনও চলছে, দরাজ কন্ঠে বন্দিস... মৈনাক কাউকেই চেনে না... উস্তাদ, পণ্ডিতদের নাম... একটা হাত দিয়ে কান ছুঁয়ে বলে বৈশালী। ছাত নয়, এক পা এক পা করে সেই পূব দিকের অর্ধেকটা খোলা দরজার দিকেই এগিয়ে গেল মৈনাক। বেশ অনেকক্ষণ হয়ে গেছে, জ্যাঠামশাই তার গান্ধর্বীকে ডাকেনি আর।

ঘরের পাখাটা ঘুড়ছে বন বন করে, তবে স্পিড কমানো। জানলার পর্দাটা সরিয়ে রাখা, যেমন থাকে সবসময়। খাটে জ্যাঠামশাই নেই, মিতা দিদি বসে আছে পাথরের মত, চোখ বন্ধ করে... পা ঝুলিয়ে। নাহ্‌, পাথরের মত নয়... ডান হাতটে ধীরে ধীরে নড়ছে, জ্যাঠামশাইয়ের মাথার ওপর। মেঝেতে হাঁটু মুড়ে বসে জ্যাঠামশাই, মাথাটা মিতা দিদির কোলে রাখা, তারও চোখ বন্ধ। মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে মিতা দিদি... তানপুরায় যে ভাবে আঙুলগুলো তান ধরে, ঠিক সেই ভাবে। মৈনাকের আর ছাতে যাওয়া হ’ল না। ঘরেও ঢুকতে পারল না... কাউকে বলতেও পারল না কিছু। কিই বা বলবে? খোঁজার চেষ্টা করল, কারও গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে কি না, কারও চোখের কোন কি চিকচিক করছে? কই... না তো! রেডিওর গান, বাইরে ঝিঁঝির ডাক আর পাখার শব্দকে বাদ দিলে একরকম নিস্তব্ধতাই আছে ঘরে। কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল ওই ভাবে মৈনাক, খেয়াল নেই। হঠাৎ চমকে উঠল জ্যাঠামশাইয়ের গলার আওয়াজ শুনে... “ব্লেড শব্দের অনেক ব্যবহার হয় জানিস তো? গিলোটিনের ব্লেড হ’ত, তলোয়ারের জন্যেও ব্লেড শব্দটা ব্যবহার হয়... পাখারও ব্লেড হয়, আবার গাছের পাতার অংশকে বোঝাতেও ব্লেড শব্দের ইউজ্‌ হয়। ধার তো জীবনকে আরও ধারালো করতেও কাজে লাগে... দেখিসনি, কেমন ধারালো বাটালি দিয়ে ঠুকে ঠুকে ঘসে ঘসে নিখুঁত ভাস্কর্যগুলো জীবন পায়? যত নিখুঁতই হোক, সে তো মূর্তি... আর তুই তো আস্ত মানুষ... এখনও তো মানুষ আছিস... তাই না?” দু’জনেরই চোখ এখনও বন্ধ, কেউ কারও দিকে দেখল না। জ্যাঠামশাইও চুপ করে গেল আবার, নেপথ্যে গান চলছে আগের মতই। মৈনাক কি শুনল, আর কি বুঝলে কে জানে... শুধু বুঝতে পারল, যে হাতে ব্লেডটা ধরা ছিল, সেই হাতটা কাঁপছে। মিতা দিদির পায়ের কাছেও ঠিক ওইরকম একটা ব্লেড পড়ে আছে! তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াতেই নিজের আঙুলের ফাঁকে আশ্রিত ব্লেডটা মাটিতে ফেলে দিলো মৈনাক... ঠুন্‌, একটা ক্ষীণ ধাতবে শব্দ। সন্তর্পনে পা দিয়ে ঠেলে দিলো। নিঃশব্দে, দ্রুত... জোরে। কাউকে পা দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দিতে হলেও অনেক সময় সাবধান থাকতে হয়! অন্ধকার কোনও কোণে হারিয়ে গেলো ব্লেডটা। আজ আর ফিজিক্সের এক বর্ণও মাথায় ঢুকবে না... মোবাইল ফোনে সেভ করা গানগুলো কানে ইয়ারফোন দিয়ে শুনবে... শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়বে... যে গানগুলো বৈশালী দিয়েছে, ওর নামে প্লে-লিস্ট করা। ঘরে তখনও সেই খাতাটা খোলা পড়ে আছে, যেখানে সন্ধে থেকে জটিল অঙ্ক নিয়ে সাপ-লুডো খেলা চলছে... খাতাটা বন্ধ করার আগে ওই ভোঁতা পেন্সিলটা দিয়ে মৈনাক লিখে রাখল –
“গান্ধর্বী, সময় নয়... শুধু তুমি আর আমি বয়ে যাই...”

... ... ...

-“নকাই দা... একদম পাক্কা খবর, দু’দিন আগেও দুকুরবেলা পাঁচিল টপকে গিস্‌লাম... কাঁচামাল আর লোহালক্কর নিয়ে নেহাৎ কম হবে না।”
-“এই বলার জন্য রাতদুকুরে এখেনে নিয়ে এলি!”
-“আরে শোনোই না... এখন রাতবিরেতে সাফ করে দিলে, কেই বা দেখছে... এমন কি দিনের বেলাও কেউ দেখতে আসবে না।”
-“আমি এসবের মধ্যে নেই... বারণ করছি, যাস নে... ”
-“কি বলছ কি? তুমিও শেষকালে... কেউ কি আর থাকে ওই বাড়ি তে?”
-“থাকেনা জানি... সব কেটে পড়েছে... ওই আধপাগলা বুড়োটা টপকানোর পর আর বেশিদিন থাকেনি... ছেলেপুলের চাগরি-বাগরি... সব তলপি তলপা গুটিয়ে হাওয়া... ”
-“তাহ’লে?”
-“তা হ’লেও কিছু না... এখেনে দু’দণ্ডও থাকার ইচ্ছে নেই... আমি চললুম... ”
কথা বলতে বলতে নকাই দেখল তার কম বয়সী শাগরেদ লোটন হাঁ করে ওপর দিকে চেয়ে আছে। নকাই পেছন ফিরে তাকাল... কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না।
-“কি হ’ল? কি আছে ওখেনে?”
-“না মানে... কেউ যেন... ”
লোটনের হাতে হ্যাঁচকা টান মেরে রুদ্ধশ্বাসে সেখান থেকে ছুট লাগাল নকাই... বড় রাস্তার দিকে, যেখানে আলো অনেকটা বেশি। লোটনও কিছু না বুঝে দৌড়তে লাগল ওস্তাদের পেছন পেছন... অন্ধকার আর অন্য সবকিছুকে পেছনে ফেলে। পূব দিকের তেঁতুল গাছটা হাওয়ায় সরসর করে করে একটা শব্দ তুলল... কেউ ফিস্‌ফিস্‌ করে বলে উঠল - “গান্ধর্বীঈঈঈঈঈ, সময় নয়... শুধু তুমি আর আমি বয়ে যাআআআইইই...” অবিশ্যি সে সব তো এই ছিঁচকে চোরদের শুনতে পাওয়ার কথা নয়। তারা তো গান্ধর্বীকে দেখেনি কোনওদিন!

আপনার মতামত জানান