কবিতাগুচ্ছ

সৌমিত্র চক্রবর্তী

অলংকরণ- তৌসিফ হক


শীতসন্ধের হিজিবিজি

শীতের রোঁয়া ওঠা সিরসিরে চাদরটা সাটারের স্পীডে নামিয়ে সন্ধেটাও নামলো ঝুপ্পুস-
আর যতো কিলবিলে চিন্তাগুলোও হিজিবিজি টানে আঁকতে শুরু করলো মনখারাপী বিমূর্ত।
পুরনো তক্তাপোষের ওপরে শতচ্ছিন্ন শতরঞ্জিতে যে ছায়ামানুষ উদাসী,
বড়জোর করুণা ছাড়া হয়তো তাকে কেউ কিছু দেয়নি - কেউ কিছু দেয় না।
চোখের কোটরে যে মাছের অক্ষিবলয় ভাবলেশহীন ধরাছোঁয়ার সাতশো হাত দূরছবি অস্তে-
সেই অবতলে এতটুকু স্পর্শের ক্ষমতা হয়নি কোনও স্বঘোষিত পিয়ামুখচন্দার।
সন্ধে নামে ভয়ে ভক্তিতত্ত্বে সাংবিধানিক অজস্র সংকটে প্রেম প্রেম খেলায়,
শুধু মোমপিয়ালী আলোর তুরতুর নাচে ছায়ামানুষ নির্ধারণ করে চরম ব্যক্তিগত উদাসীন জগৎ-
সব সম্পর্কসুতো টুকরো হয়ে ভাঙাছেঁড়া তক্তাপোষের নীচে পড়ে আছে দলাপাকানো।



চিরকালীন

তারপর?
প্রশ্নটা থেকেই যায়, অন্তহীন।
যেখানে শেষ হল মনে করা হয়
সেখানেই শুরু আরোও এক
অনিকেত সওয়াল।
ধনপতি বণিকের ময়ুরপঙ্খী
ডুবে যাওয়া সাত রাজার মানিক
তেনজিং এর পতাকা বহন
ছেচল্লিশের নরমেধ যজ্ঞের পর...
তারপর ... তারপর ...?
কৈশোর স্বচ্ছতোয়া নিচের সাতহাত
তলদেশ অনায়াসে দেখায়,
বিশ্বাসে খোদাই করে একদিন
পাল্টাবে রক্তমাখা রাজার ত্রিশূল
একদিন মাটিও মা হয়ে সত্যিকারের
চুমু খাবে পেলব গালে,
তারপর, তারপর মানুষও
মানুষ হবে নিয়তির জাল ছিঁড়ে।
এখনো কোকিল ডাকে বসন্ত
ভেবে চাঁদের ছলনার কারুমায়ায়,
আকন্ঠ সোমপান সদ্য মড়া পুড়িয়ে
চালগন্ধমাখা ছেঁড়াফাটা কুটিরে
ডোমকেও করে ভারতসম্রাট!
খোঁয়ারি ভাঙা সকাল রক্তচোখেই
আছড়ায় ধোবানির পাটে,
তখন, তখনই চাগিয়ে ওঠে
বহুধাভক্ত নিরন্তর প্রশ্নতালিকা,
তারপর, এ দুনিয়ায়
কে কার কড়ি ধারে?



দুধ সাদা দুপুরের কাব্য


ধানকাটা মাঠ শুয়ে
খড়ি ওঠা গায়ে
প্রসব সময় শেষ
শুয়ে আছে ক্লান্ত জরায়ু মেলে।
হাওয়ায় মিঠাস ওড়ায়
দেশজ শ্যাম্পেন।
বাসনার স্তুপ কাঁখে গাঁয়ের নতুন বউ
নিস্তরঙ্গ শাড়ির ভাঁজে ইশারায়
তামাকের গন্ধমাখা
নড়বড়ে লাউ।
বিবর্ণ রঙের বাক্স কাঁধে
সরীসৃপ চলন,
মাথা উঁচিয়ে গন্ধ শোঁকে গিরগিটি সময়।



এক্সপ্রেসওয়ের কোলাজ



যেমনটি দেখছি তেমনটিই বকমবকম এ সাজাবো
সেরকম মাথার দিব্যি ছিলনা সাতসকালে,
চলো ইয়ার যে যার ফূর্তিতে।

মাঠ আহা ধূধূ মাঠ প্রাচীন খড়ের কাটা পা
বিস্তর আগাছগাছালি বক টক
বেশ সুখী সংসারে বেশ ছিলো,
রেশ ছিলো, টকটক দৃশ্যরা নোরিস্ক জোনে।

তাহলে সে হুশহুশ হাওয়া বওয়া শনশন
প্রান্তরে সূক্ষ্ম নকশি দুধসাদা মসজিদ কে বসালো
ঠিকঠাক জিম করা আলাদীনি জিন?

একমনে পড়ে থাকা লম্বা খালের জল
ছলছল করেনি কোনোদিন যৌনতা হারানো
বাচ্যসম্বল ম্রিয়মান পুরুষের মতো।

সবুজের রকমফেরে সবুজে সবুজ, অবুঝ -
সেখানেই গুনেগেঁথে পাক্কা দুখান
গাছের ঘাড়ে পিঠে থোকা থোকা গোলাপী বেগনি
কম্বিনেশন লেপে দিলো কে?

হাওয়া কেটে ছচাকার গড়াগড়ি, ভুস
করে উঠে আসে মস্ত কোল্ডস্টোর
ত্রাহি ত্রাহি দৃশ্য বিনাশী।

আর কিছু অনুপ্রাস
সিগ্রেট চা মৌ, খানিক ইতিউতি
চাউনিতে সকাল মন্দ নয়,
হাইওয়ে সাবওয়ে দেবদারু ফাঁক ও ফোকরে
অসৎ ছোঁয়া ড্রিবলিং এ এপাশ ওপাশ,
চলুক না বস, এভাবেই শনশন।


কালসময়ের টুকরো খন্ডে

-তুমি বস, আমি দরজা টা নিভিয়ে দিই৷
-দরজা নেভানো যায়? দরজা কি আলো?
-যখন সব নিভে যায়, নিভৃতে দুজনে, প্রতিবিম্বের রেখা, সুন্দরী বিকেল, অভিভাবকদের তর্জনী ...
তখন দরজা নিভাতে দোষ কোথায়?
-তবুও দরজা কি বাংলা লাইভ, ইচ্ছে মত জ্বলবে নিভবে?
-মনের মধ্যেই যদি বেরঙ দেওয়ান হয়, সে ইচ্ছেয় জোরও থাকেনা জ্বলা নেভাও মর্জিমত ...
-তোমার বুঝি খুব মনের জোর? আমাকে সোনালি ফিনিক্সের ডোরাকাটা পালক দিতে পারো?
-তুমি চাইলেই পারি। আরোও পারি অনেক কিছুই। তোমাকে দিই একটা ডানা লাগিয়ে!
-আমি! কি করব পাখা নিয়ে?
-উড়বে পাখিছানা হয়ে, তরুনী ছলনা পলকা রোদ্দুরে, উড়েই ভাসিয়ে দিও যত চিন্তার মায়াজঞ্জাল! উড়ে যাবে ...যাবে...যাবেই...
-দাও তবে তোমার ইচ্ছেডানায় ভর দিই, মাথা রাখি বুকের নিশ্চিন্ত বালিশে।
দরজা টা নিভিয়ে ই রাখো আগ্রাসী কালসময়ে ...!

আপনার মতামত জানান