পুকুরচুরি

রঞ্জন ঘোষাল


"সদানন্দবাবু, আপনি ঘড়ি ধরে অপিসে আসেন, ঘড়ি ধরে বেরোন। কিন্তু ঘড়ি যে ভারী গ্যাঁড়াকলের জিনিষ সেটা লক্ষ করে দেখেছেন?"
পঞ্চানন পুতুতুণ্ড অপিসের কর্তা। বদ লোক বলে বদনাম আছে, সদানন্দ বাবু এখানে বদলী হয়ে আসার আগে থেকেই ওঁর নামডাক শুনেছেন। ডাকনামটাও যে শোনেন নি এমন নয়। ডাকনাম ‘পাঁচ কাহন’। হেড অপিসে তাঁর অধীনের অফিসারদের নামে পাঁচকাহন করে নালিশ করে আসেন এবং কুচুৎ করে চাকরিটি খেয়ে দ্যান। তার ওপরে মোড়লগিরি তুঙ্গে। উনি যদি বলেন ঘড়ি গ্যাঁড়াকলে্র বস্তু তাহলে তার উপরে তর্ক করা চলবে না। উনি জানেন না এমন বিষয় নেই। সদানন্দবাবু দেরাজের টানা বন্ধ করে চাবি মারতে যাবেন, কারণ ঘড়িতে পাঁচটা বেজে এক মিনিট এবং এবার বেরিয়ে পড়তেই হয়, কিন্তু ঘড়িটা কেন গ্যাঁড়াকলের ব্যাপার সেটা না জানলেও চলবে না, বিশেষত ত্রিলোক যাঁর নখদর্পনে সেই পঞ্চাননবাবু যখন শ্রীবক্তা, সদানন্দবাবু বললেন, "স্যার, চলুন, যেতে যেতে বৃত্তান্তটা শুনে নিই"। পঞ্চাননবাবু বললেন, “না না আপনি এগোন। অপিসের ডায়েরিতে সই মারা আছে। তালা লাগানো্র কাজ আছে। তবে জেনে রাখবেন, ঘড়ি হল মেরামতির বশ। মানে শক্তের ভক্ত নরমের যম"।
সদানন্দবাবু এই পরম জ্ঞানটিও হজম করে গেলেন। এই অপিসে প্রাণী বলতে তিনি, অর্থাৎ ফরেস্টার বাবু, আর ত্রিলোকদর্শী পঞ্চানন পুতুতুণ্ড, রেঞ্জ অফিসার। এ ছাড়া ফরেস্টের গার্ড আছে জনা বারো। তারা অপিসে আসে শুধু মাইনের দিন, কিম্বা ডেকে পাঠালে। অপিসঘর ঝাড়ু মারেন ফরেস্টার সদানন্দবাবু। কুঁজোয় জল ভরেন রেঞ্জার সাহেব, মিস্টার পুতুতুণ্ড। গঁদের আঠা, কালির দোয়াত, টর্চ লাইট, জমি মাপবার ফিতে, ফরেস্টার বাবু। থিওডোলাইট, কম্পাস, রেইন-গেজ, অ্যাটেন্ডেন্স রেজিস্টার, ব্যারোমিটার এ সব রেঞ্জার সাহেবের জিম্মায়।

পঞ্চানন পুতুতুণ্ডু ঘড়ির ব্যাখ্যায় এলেন। “যত যন্ত্রপাতি আছে এই ভূ-ভারতে, তার মধ্যে জানবেন ঘড়িই একমাত্র প্রাণী যার আত্মা বলে পদার্থ আছে। একমাত্র যন্ত্র, খেয়াল করে দেখবেন সদানন্দবাবু, যা যন্ত্রী না হলেও বাজে। টক্‌টক্‌ শব্দ এর হৃদ্‌স্পন্দন। ইনি চলমান, ইনি ঘণ্টাধ্বনি করেন, যেমন করেন মন্দিরের পুরোহিত, আমাদের বিবেকের চিত্রগুপ্ত। ঘড়িদেব কখনো ধীরে চলেন, অতি ধীরে, যখন আপনি প্রতীক্ষায়। আবার চলনে ইনি দ্রুত যখন আপনার সুখের সময়। ঘড়িই আপনাকে জানায় সেই অমোঘ সত্য – চক্রবৎ পরিবর্তন্তে – সুখানি চ, দুঃখানি চ। এই অবধি কোনো গ্যাঁড়াকল নেই। গ্যাঁড়াকল আছে বলে আপনার বোধ হয়?”
সদানন্দবাবু সজোরে মাথা নেড়ে বলে দিলেন, “প্রশ্নই ওঠে না”।
“ওঠে সদানন্দবাবু, প্রশ্ন ওঠে। যখন দেখবেন ঘড়িই আপনাকে ঘাড়ে ধরে ঘোরাচ্ছেন। তেমন ঘড়ির পাল্লায় যদি আপনি কখনো পড়েন তখন টের পাবেন”।
“আপনি কি কখনো এমন বিপদ-ঘড়ির সম্মুখীন হয়েছেন”?
“না সদানন্দবাবু, আমি হই নি। উনি থেমে অর্থপূর্ণভাবে বললেন, “কিন্তু আপনি হয়েছেন।
আমাদের অপিসে দেওয়াল ঘড়িটি, যেটার সময় মিলিয়ে আপনি অপিসে ঢোকেন, সেটি চলে ঘোড়ার চালে। রোজ সকালে আমি তো আপনার চেয়ে পাঁচ মিনিটা আগেই পৌঁছে যাই, এসে আমার হাতঘড়ির সঙ্গে মেলাতে গিয়ে দেখি, উনি আডাই ঘণ্টা এগিয়ে রয়েছেন। আমি ঘড়ির কাঁটা যথাস্থানে পিছিয়ে দিই। আপনি খেয়াল করেন না। কিন্তু যখন পাঁচটা বেজেছে ভেবে আপনি দেরাজ বন্ধ করেন, তখন আসলে বেজেছেন মোটে চারটে পাঁচ। মানে গত একবছর ধরে আপনি রোজ পঞ্চান্ন মিনিট করে সময় চুরি করে চলেছেন। তার মানে আপনি গত একবছরে দু শো নব্বইটি ওয়ার্কিং ডে তে প্রায় দুশো সাতষট্টি ঘন্টা সময় চুরি করেছেন। অ্যাটেন্ডেন্স রেজিস্টার খুলে দেখবেন সেই রকমই দাগানো আছে।
সাধে কি আপনার প্রোমোশন আটকে আছে সদানন্দবাবু? ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট ছোটোখাট চুরি মেনে নিতে পারে। কিন্তু পুকুরচুরির আসামীকে তো আর প্রমোশনের সিঁড়ি চড়তে দেওয়া যায় না। যায় কি? আপনিই বলুন সদানন্দবাবু”?


অলংকরণ- তৌসিফ হক

আপনার মতামত জানান