মনে রাখা

রাতুল

অলংকরণ তৌসিফ হক

জাস্ট ট্রেন ছাড়ল। গেটে দাঁড়িয়ে বন্ধুটির দু’চোখ তন্নতন্ন করে খুঁজছে কিছু, শেষ বারের মতো।
ট্রেনের গতি একটু বাড়ল। পিঠের ব্যাগ লাফাতে লাফাতে এই বুঝি ছিটকে পরে যাবে, তবুও শেষ চেষ্টা ছুটছে ছেলেটা। গেটে দাঁড়িয়ে বন্ধুটি দেখে ফেলেছে তাকে। একহাত গেটের হাতল ধরে, অন্য হাতটি বাড়িয়ে দিয়ে চিৎকার করছে “ফাস্ট... ফাস্ট... মেক ইট ফাস্ট” কাছাকাছি এসে কোনোমতে হাতটা ধরে হ্যাঁচকা দিয়ে তুলে নিল। হাঁফাচ্ছে ছেলেটা। এমন সময় বন্ধুটি ছেলেটার দিকে রাগ মুখে তাকিয়ে “শালা, একঘণ্টা আগে থেকে ফোন করে তাড়া দিচ্ছি তোকে !! ট্রেনটা মিস করলে কত লস্‌ হতো বলতো আমাদের !!!?”
অনেকদিন পর, এই বন্ধুদের কথা আমাদের আর মনে থাকে না। অথচ রোজ সকালে ফেসবুকে স্ট্যাটাস আপডেট দিতে ভুলে যায় না।

সকাল ৬ টায় ফোন কল। রিং হচ্ছে। বার বার রিং হচ্ছে। রিসিভ করতে বিরক্ত লাগছে। খুব কষ্টে একটা চোখ খুলে যে নামটা স্ক্রিনে দেখতে পেলাম ‘পারমিতা’। ঘুম ঘোরে ফোনটা রিসিভ করার পর খুব ছোট্ট করে “বল ??”
“ঘুমচ্ছিস ?? ঠিক আছে, ঠিক আছে, ঘুমো। পরে ফোন করবো...”
অল্প একটু শক্তি দিয়ে ঘুম জড়িয়ে “আরে বল না !! এতো সকালে হঠাৎ করে ফোন করলি... !! ? ?”
“এমনি, কিছু না। তুই ঘুম থেকে উঠে মিস্‌ড কল করিস। ঘুমো এখন তুই”
“ঠিক আছে...” ফোনটা কাটার পর হাতের মুঠোয় ধরে আবার ঘুমিয়ে পরলাম।
তারপর দিনের অর্ধেকটা পেড়িয়ে গেল। দুপুরের স্নান – খাওয়া হয়ে গেল। টিভির দিকে অমনোযোগী তাকিয়ে থাকতে থাকতে দেখলাম একটা সিরিয়ালে বার বার ফোনে রিং করেও পাচ্ছে না। দুম করে আমার মাথার হার্ডডিস্ক ঘুরতে শুরু করলো। সকালের ফোনের কথাটা মনে পরে গেল। নিজের মোবাইলটা হাতে নিয়ে তাড়াহুড়ো করে পারমিতাকে মিস্‌ড কল করলাম। সঙ্গে সঙ্গে কল ব্যাক “হুম, লাঞ্চ করেছিস ?”
“এই মাত্র খেয়ে উঠলাম। সকাল থেকে একটু বিজি ছিলাম রে, তাই আর কল করা হয়নি তোকে। বল, কি বলছিলিস তখন যেন... !!!”
“না, তেমন কিছু নয়। আজ দুপুরে একটু ঘুমিয়ে নিস তুই...”
“মানে ??? হঠাৎ এই কথা কেন ??”
“একটু ঘুমিয়ে নিস দুপুরে। শুয়ে পর”
একটু বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম “কেন বলবি তো ??”
“আজ রাত ১২ টার পর তোর মোবাইলে অনেক ফোন আসবে। তোর বন্ধুরা ঘুমোতে দেবে না তোকে। তাই দুপুরে একটু ঘুমিয়ে নিস...”
এবার অনেক বেশি বিরক্ত হয়ে চিৎকার করলাম “কেন ফোন আসবে আমার মোবাইলে ??? কি কারণে ??”
“কাল তোর জন্মদিন”
এই বান্ধবীদের কথা আমাদের আর মনে থাকে না, অথচ রোজ একবার করে ফেসবুকের ফ্রেন্ড লিস্টটা চেক করি।

মাত্র ১০ মিনিট সময় আছে। ভিড় ভিড়, লম্বা লাইন... কীবোর্ডের স্পেস বারের মতো লম্বা লাইন। পিঠে ভারী একটা ব্যাগ। যেমন করেই হোক আজ আমাকে এই ট্রেনটায় বাড়ি পৌঁছোতে হবে। কিন্তু টিকিট কাউন্টারে যা ভিড় দেখছি তাতে আর ট্রেন পাব বলে মনে হয় না। খিদে পেয়েছে, তাড়াহুড়ো করে কিছু খাওয়া হয় নি। হাতে আর ৫ মিনিট আছে। যাক, ট্রেনটা পাবো বলে মনে হচ্ছে। আমার সামনে আর দু’জন আছে। হাওড়া থেকে বোলপুর ৫৩ টাকা ভাড়া। ১০০ টাকা বের করে কাউন্টারের মুখগহ্বরে ভরে দিলাম। ওদিক থেকে গম্ভীর উত্তর পেলাম “খুচরো দিন ৩ টাকা”
আমি এই পকেট, সেই পকেট, মানিব্যাগ সব খুঁজতে শুরু করলাম। ৩ টাকা পাচ্ছি না... পাচ্ছি না, পেলাম না। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে আমার। ট্রেনটা মিস করলে আপশোস থেকে যাবে আমার, মাকে ডাক্তার দেখাতে পারব না। মায়ের জন্য একটা কাজও কি আমি ঠিকঠাক করতে পারব না !! কাঁদো কাঁদো মুখে আমি
মুখগহ্বরে মুখ রেখে বললাম “স্যার, আমার কাছে খুচরো নেই, দেখুন না স্যার একটু প্লীজ। এই ট্রেনটা মিস করলে আমার অনেক লস্‌ হয়ে যাবে স্যার...”
১০০ টাকা আমার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলল “খুচরো নিয়ে আসুন...” আমার হাতে আর ২ মিনিট সময় আছে, এখন আমি কোথায় খুচরো জোগাড় করবো !! একরাশ ব্যর্থতা আমার মনে ভর করলো। আমি কাউন্টার ছেড়ে বেরিয়ে আসতে যাবো এমন সময় খুব সাধারণ মানের একটি মানুষ আমার হাতে ৩ টাকা খুচরো গুঁজে দিয়ে হাসি মুখে বলল “টিকিটটা কেটে নিন, ট্রেন পেয়ে যাবেন...”
আমার চোখে জল চলে এল। ইঁট, কাঠ, পাথরের শহর কলকাতা, যেখানে সময়ের মুল্য জীবনের থেকেও অনেক বেশি, যেখানে কারোর জন্য একটু জায়গা ছেড়ে দেওয়া মানেই পিছিয়ে পরা, যেখানে ঘুম ভাঙ্গার পরই লাভ – লোকসানের হিসেব বুঝে নিতে হয় টুথ্‌পেস্টের পিছন টিপে ধরার সময়... সেখানে একটা অপরিচিত মানুষ ধার বাকির কথা ভুলে, আমাকে ৩ টাকা খুচরো হাতে গুঁজে দিল। আমি হাতে চাঁদ পেলাম। টিকিট কাটার পর আমার সময় ফুরিয়ে এল। ট্রেনের অ্যানাউন্সমেন্ট শুনতে পেলাম। আমি ছুটতে শুরু করলাম...
বাড়ি ফিরে আসার পর এই মানুষগুলোর কথা আমাদের আর মনে পরে না, অথচ মোবাইল Balance থেকে ৩ টাকা অহেতুক মাইনাস হয়ে গেলে কাস্টমার কেয়ারে খিস্তি দিয়ে ফেলি।

ক্যামেরা হাতে বেরিয়ে পড়লো ঋষি। আজ তার ঠিকানা পলাশপুর গ্রাম। সারাদিন ছবি তুলবে ঋষি। একটু ভয় ভয় করছে ঋষির, কারণ গ্রামের মানুষদের সাথে কেমনভাবে কথা বলবে সে, কেমনভাবে মিশতে হবে তাদের সঙ্গে... এইসব চিন্তা করছে ঋষি। সকাল ৯ টা, ঋষি উপর দিকে মুখ তুলে মনে মনে ঠাকুরকে একবার ডেকে নিল। তারপর বাসে উঠে পড়লো। ১ ঘণ্টা পর কেয়াপাতা মোড়, তারপর সেখান থেকে হাঁটা পথে ২০ – ২৫ মিনিট গিয়ে পলাশপুর গ্রাম। এখন ঋষি হাঁটছে। হাতে নিকন D 7000 ক্যামেরা। ক্লিক্‌ করছে গ্রামের মেঠো পথ, আলতোলা জমি, তালগাছের শীর্ষ পয়েন্ট, আরও অনেক কিছু। সামনে থেকে একটা ছেলে কালো শরীর, কালো চোখ, মাথায় আলুথালু চুল, বিড়ি খাওয়া দাঁত বের করে হাসছে। ঋষি ছেলেটাকে একবার খালি চোখে দেখল, তারপর লেন্সের চোখ দিয়ে দেখতে শুরু করলো। ক্লিক্‌... ক্লিক্‌... ক্লিক্‌... বসে, উঠে, অর্ধ বসে, বেঁকে আরও অনেক ক্লিক্‌ করলো ছেলেটার ছবি। তারপর ঋষি ছেলেটার কাছে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলো “কি নাম তোমার ?” ছেলেটা আঙুল তুলে অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো “ওটো কি বটে ?”
ঋষি ক্যামেরাটার শরীরে আদুরে হাত ছুঁয়ে হাসিমুখে বলল “এটা ক্যামেরা, ছবি তোলা হয় এতে”
ছেলেটা আবার অবাক হয়ে বলে ফেলল “এতো বড় ক্যামেরা !! খুব দামি বটে না ?!!”
ঋষি একটু হাসল, তারপর “তা একটু দামি। আমাকে তোমার গ্রাম চিনিয়ে দেবে ? ?”
ছেলেটা কোনো কথা বলছে না। পিছন ফিরে একবার নিজের গ্রামের ধূসর অবয়বটা দেখে নিল। তারপর ভাবল যে, এই পঞ্চায়েত ভোটের আগে গ্রামের মানুষগুলো কেমন যেন কুঁকড়ে আছে। চারিদিকে শুধু ভয় ভয়, এই বুঝি কোথাও খুব জোরে শব্দ হবে... এই বুঝি কারোর বাড়ির উঠানে কান্না শোনা যাবে, এই বুঝি সব শেষ হয়ে যাবে, ডেডবডি নিয়ে মিছিল হবে, শহীদ বলে ঘোষণা হবে। কিছু তো একটা হবে। লাল – সবুজের বদল হবে। ছেলেটা ভাবছে, এই শহুরে ছেলেটাকে ঘিরে যদি উত্তেজনা বেড়ে ওঠে !! পক্ষে – বিপক্ষের মানুষগুলো যদি কিছু ভুল বুঝে চোখ রাঙ্গানি দিয়ে ফেলে !! ছেলেটা সামনের দিকে মুখ ফেরাল।
ক্লিক্‌... ক্লিক্‌... ঋষি বলল “নিয়ে যাবে তোমার গ্রাম ??”
ছেলেটা চুপ।
ঋষি ক্যামেরাটার দিকে ইশারা করে বলল “এতে তোমার কিছু ছবি আছে, তুমি দেখবে ?”
ছেলেটা ঋষির কাছে এগিয়ে গেল। ঋষি পর পর সব ছবি দেখাতে শুরু করলো। ছেলেটা হাসছে। অবাক হচ্ছে। আবার হাসছে, ঋষির দিকে একবার করে তাকাচ্ছে। শেষ। ছবি দেখা শেষ। এখন ছেলেটা ক্যামেরাটা আলতো ভাবে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছে। হঠাৎ ছেলেটা দূরে সরে গেল। তারপর গ্রামের দিকে হাঁটতে শুরু করলো। ঋষি দাঁড়িয়ে থাকল, অবাক চোখে ছেলেটার চলে যাওয়া দেখছে। ক্লিক্‌... ক্লিক্‌... ক্লিক্‌...
লেন্সের চোখে ঋষি দেখছে ছেলেটা দাঁড়িয়ে পড়লো। ছেলেটা পিছন ফিরে ঋষিকে হাত নেড়ে ডাকল, চিৎকার করলো “চলে আ...আ...আসুন...ন...ন...। আমি থাকবো আপনার পাশে”
ঋষি খালি চোখে ছেলেটাকে দেখল, অবাক হয়ে গেল। ছেলেটার পিছন পিছন ঋষি গ্রামের দিকে এগিয়ে গেল। ঋষি ছবি তুলছে... ছবি তুলছে... ছবি তুলছে... ছবি তুলেই যাচ্ছে। সারাদিন ধরে গ্রামের অলিগলি, কানাকলি, পুকুর, ঝিল, গাছ, পাখি, মানুষ, মিড ডে মিল, পুরোনো বাড়ি, একশারি গোরুর দল, রাখাল বালক ... আরও অনেক ছবি তুলে নিল ঋষি। ঋষি বাসে ওঠার পর ছেলেটা বলেছিল “আবার আসবে, আমাদের গাঁয়ে একটা মেলা হয়। তখন...” বাস ছেড়ে দিল। ঋষি জানালার দিকে সিট পেয়েছে। সারা দিনের ক্লান্তি বন্দী রাখল নিকন D 7000 , ঋষি আর একবার ক্যামেরাটার শরীরে আদুরে হাত রেখে চোখ বন্ধ করলো।
ঋষি এখন অটোগ্রাফ দিচ্ছে। মাস ৬ পরে, ঋষি এখন একটা গল্প শেয়ার করছে, কিন্তু কিছুতেই ছেলেটার নাম মনে পরছে না। শুধু ‘ছেলেটা’ ‘ছেলেটা’ বলছে আর দেওয়াল ভর্তি ছেলেটার ছবির দিকে আঙুল তুলে বলছে “ঐ ছবিটা লন্ডন আর্ট গ্যালারীতে স্থান পেয়েছে, আর ঐ ছবিটা ‘দেশ’ ম্যাগাজিনে কভার ফটো হয়েছে... আর ঐ ছবিটা... ”

মন খারাপ করছে। কারণ জানা নেই, তবুও মন ভারী হয়ে আছে। হাসতে ইচ্ছে করছে। অকারণ হাসতে ইচ্ছে করছে। মনে পরেছে। মোবাইলটা হাতে নিয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে একের পর এক কন্ট্যাক্‌ লিস্ট পেড়িয়ে যাচ্ছে দিতি। খুঁজে পেয়েছে, এই ছেলেটা... এই ছেলেটা খুব হাসাতে পারে। বুড়ো আঙুলে স্ক্রিনটা ছুঁয়ে কানে ফোনটা চেপে ধরল। রিং হচ্ছে।
ফোনটা রিসিভ করেই ছেলেটা বলল “কি ব্যাপার, নেমে এল চাঁদ মাটিতে !!”
দিতি শব্দ না করে একটু হাসল, তারপর বলল “কেমন আছিস্‌ ??”
“ঐ চলছে। হুম্‌ম্‌... চলে যাচ্ছে দিন, ঠিক পাঁচটা তিন। তুই কেমন আছিস ?”
দিতি আবার একটু হাসল, তারপর বলল “তুই কি এখন ব্যাস্ত আছিস ?”
“ধুর্‌র্‌, ব্যাস্ত হতে চাইছি, কিন্তু পারছি না। ‘ব্যাস্ত আছি... ব্যাস্ত আছি’ বলাটাও মানুষের একটা অহংকার, জানিস তো। আমি সেই অহংকারটা করতে পারছি না, তারফলে আমিও ব্যাস্ত হয়ে পরছি। হি হি হি...”
দিতি এবার অট্টহাসি হাসতে হাসতে বলল “তুই পারিস বটে !!! হি হি হি... এতো সব ভাবিস কীভাবে। তোর সাথে কিছুক্ষণ কথা বললেই পেট ব্যাথা শুরু হয়ে যায়। হি হি হি...”
“আমি তো মন খারাপের ওষুধ বিক্রি করি... তুই আজ বহুদিন পর আমাকে ফোন করলি, নিশ্চয় আজ তোর মন খারাপ !!??” ছেলেটা একটু গম্ভীর হয়ে পড়লো।
দিতি নিজের কাছে একটু অপরাধী হয়ে গেল। যেন সব ধরা পরে গেছে চালাকি। তারপর দিতি একটু শান্ত গলায় বলল “কিছু দিন ধরে তোর কথা মনে পরছিল... ফোন করবো, করবো ভেবে আর করা হয়ে উঠে না...”
“হুম, আসলে আমি তো টাওয়ারের নিচে থাকি, তাই হয়তো তোদের মনে পরার সিগন্যালটা সব সময় আমাকে ছুঁতে পারে না। হি হি হি... কি বলিস তুই ?”
দিতি আবারও হাসতে থাকলো। তারপর বলল “এই রাখি রে, আমার ব্যালেন্স কাটছে। পরে কথা হবে। টা টা...”
মন খারাপের মেঘ সরে যাবার পর এই ছেলেটার কথা আমাদের আর মনে থাকে না। অথচ আমরা ফেসবুকে...

আপনার মতামত জানান