এপিটাফ

জয়ন্ত দেবব্রত চৌধুরী


তুমি কি এখানে এসেছিলে আমার সাথে, কখনো কি এসেছিলে এই আগাছায় ঘেরা ছায়ায় ? এখানে কেউ আসে না, নিজ দেশের । একা আমি আসি প্রায়ই, এখন আমার কোলের ওপর টপটপ কান্না ঝরে পড়ছিলো, অনর্গল আকাশের । এখানে বৃষ্টি হুহু শব্দে মাটিতে এসে পড়ে, থামলে চেনা রামধনু ওঠে আবার । চারিদিকে পূর্বপুরুষের মতো দৃঢ় গাছেরা পাহারায়; আমায় ছায়ায় ছায়ায় ঘিরে রাখে । প্রজাপতি ভিজে নীল ডানা ঝাপটে কত কথা বলে তোমাদের সাথে, আশ্বাস দেয় চিরন্তনের । কেউ ঘুম ভেঙ্গে উঠতে চাইলে সাথে সাথে সরসর বাতাসেরা ছুটে এসে ঘুমপারানিয়া গান শোনায় । তবু কখনো বুকজ্বলা পাথর ঠেলে উঁকি দেয় চারাগাছ । ওপড়ানো শিকড়, ভাঙা ফলকে ঢাকা ছায়াপথে কখনো বা পায়ে পায়ে হাঁটা ইতিউতি । ওঠো সাহেব, আর কতো ঘুম ? চেয়ে দ্যাখো, তোমরা বিতাড়িত আজ, চারিদিকে সংকর সংস্কৃতির অস্ফুট আহ্বান । তোমাদের নিজের আর কেউ নেই এখানে, এক ওই খৃস্টবিলাসী কাকেরা ছাড়া । এখন চুপচাপেরা হারিয়ে যাবে, এখানে অক্ষমেরা ঘুমে যাবে; লজ্জাবতী লতা আর পাওয়া যাবে না কোথাও, পাতা মুড়ে লুকিয়ে থাকবে সাধারণের ভীড়ে । মহাকালের মন্দিরের কালোপাথর খুলে নিয়ে যাবে লুটেরা, পাথুরে কান্নায় কারো ভ্রূক্ষেপ নেই আর । কেউ এখানে আলো ঝলসিয়ো না অযথা, বরং চোখের তারা ঝলসে দ্যাখো, ওরা সবাই শুয়ে আছে, পড়ে আছে অনড় সরীসৃপের মতো । বিলুপ্ত সব প্রজাপতির শেষ প্রতিনিধিদের কবরে জংলা ফুল ফোটে দিনের বেলায়, রাতে জোনাকিরা বাতি জ্বালে । ফলক, স্তূপ, স্থাপত্য, স্মৃতির পাথর-মাটির কাছে সব এক, মাটি ভেঙ্গে চলে শুধু । বাঁদিকের সারির মাঝামাঝি কবরের দেবদূত আজ মাতৃহারা, মাটিহারা; শোকে পাথর হয়ে ঝাপসা দুচোখে কাকে যেন খুঁজে চলে শুধু । আর ওই ডানদিকের সারির একেবারে শেষের কবরটা-আমার ভালবাসার; ‘এখানে সাড়ে তিনবছর বয়সী একজন অতৃপ্ত শিশু ঘুমিয়ে আছে অনন্তকালের জন্য, ওকে কেউ আর কাঁদিয়ো না’ । মাটির তলার এই নিঝুম নগরী অনেক বেশী আপনার বলে মনে হয়; এখানে মৃত্যু, প্রেম, প্রতীক্ষা, একাকীত্ব, অন্ধকার-সব কেমন মিলেমিশে যায় সহজে । আজ যাবার সময় হলো, আবার একদিন আসতে হবে, ঘুমোতে এ পুরু ঘাসের গালিচায় । তোমাদের উদ্দেশে একটা চিঠি লিখলাম এখন বসে বসে, বুকের পাথর চাপা দিয়ে রেখে গেলাম ওইখানটায়, সময় পেলে পড়ে দেখো ।

আপনার মতামত জানান