কবিতাগুচ্ছ

রুহুল মাহফুজ জয়

অলংকরণ- তৌসিফ হক

আত্মহত্যাপ্রবণ ক্ষুধাগুলো
১.
শ্রীরামপুরমুখি ক্ষুধার পেটে সূর্য অস্ত যায়; ফারজানা মুমুর দিকে ধাবমান আমার সব ক্ষুধা আত্মহত্যাপ্রবণ। অনেকের অনেক ক্ষুধার চিঠি আমি খুলেও দেখি নাই, অনেক ইশারা সানাই বাজিয়ে চলে গেছে সারিবদ্ধ পিঁপড়ার মতো। যেভাবে মানুষেরে নাচায় অদৃষ্ট, রূপালি পর্দায় মেগাস্টাররে নাড়াচাড়া করে রিল মাস্টার –ওভাবেই আঙুল নাড়াও, দূরবর্তী দেয়ালে নেচে উঠুক আমার নিজস্ব ক্ষুধা – ফাঁসির দড়ি থেকে আমার আত্মহত্যাপ্রবণ ক্ষুধাগুলো জীবনের দিকে ফিরে যাক।

১০.
খাচ্ছিস
খেয়েই যাচ্ছিস
থরে থরে সাজিয়েছিস ব্যঞ্জনথালা।
ওদিকে
টাকমাথা হয়ে গেছে পৃথিবী;
সৌরঅভিশাপে সব চুল
তোদের দিকেই
উল্কার মতো ধেয়ে আসছে।
পালাবার জন্য কোনো গুহা
খালি নেই। পাহাড়ের পেট সব
ভ'রে দিয়েছে মাটির যৌনতা।

নিজের খেয়ে বেঁচে থাক –
অন্যের পেটের দিকে আর
ক্ষুধা ঢুকাবি না শালা!


নাইটমেয়ার
১.
আগুন নিভায়ে ফের আগুনের কাছেই ফিরে আসি
অসুস্থ হই, অসুখে জমানো থাকে পুরনো আদর;
আদরের লোভে আমিও এক অসুখপ্রিয় বাঙালি।
যদিও জানা নাই কার ঠোঁটে লেখা আমার পুনর্জন্ম।
আটাশ বছর বয়সে অসুস্থ হলে মনে হয় লাল লিপস্টিক
মেখে শোবার ঘর হয়ে যাচ্ছে সুচিত্রা সেনের নাতনি!

ঘর পালাই, দেখি আমার গ্রাম ঘুমিয়ে আছে এক
ম্যাজিক গাছের ছায়ায়। এ গাছের তলে জায়গা নেবে
বলে ধেয়ে আসছে শহুরে আগুনের ছাই, গাছের
পাতারা গাজী-কাল্লুর কিস্সা থামিয়ে আলকাপ গানে
সুর তুলছে ওয়াজ মেহফিলের, নারায়ে তাকবির....!

ফের অসুস্থ হচ্ছি আমি, ঘরভর্তি অন্ধকার ক্ষুধার্ত অজগর
মৃত্যুর ঘোরে কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না আমার মাকে।

আগুন নিভায়ে ফের আগুনের কাছেই ফিরে এলে
আমি হয়ে হয়ে যাচ্ছি আশ্চর্য কুহক। আমায় ঘিরে
পাখিরা অড্রে হেপবার্ন, পাতাগুলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আর শাখা-প্রশাখাগুলো মলিন গেরুয়ার লালন সাঁই।

৪.
কিছু ধোঁকা জমে আছে শীতের স্তনে – রমণীর বিষাদ যেরকম দুর্বোধ্য প্রাচীন পুঁথি। সেসবের নাম কেউ রেখেছে পৌষালি – কারো কাছে তা নিছক সঙ্গমঋতু। মানব ইতিহাসের বয়স কত হলো, চুলে পাক ধরেছে পৃথিবীর?
:অ্যাই শোন, শুনে যা! পৃথিবীর বয়স এখনো ষোল, মানুষের ভালবাসা আটকে আছে কনডোমে। আমায় জড়িয়ে নে বুকে, আমি যুবতী হতে চাই!
নয়নতারার ডাকে ফড়িং উড়ে আসে সমস্ত কবরখানা পেরিয়ে, একদিন কয় প্যাগ কুয়াশা গিলে বউকে শীতের রূপকথা শোনায় ফড়িং – তখন ক্রুশবিদ্ধ যীশুর চিৎকার হয়ে তেত্রিশ সাবেক প্রেমিক ঝুলে ছিলো ফড়িংবধূর ধ্যানে।

৬.
মদ্যপানে আমি জমিদার হয়ে যাই। আমিটা এক দু:শ্চরিত্র লোক। সাবানে হরিণের অস্থিরতা মেখে বাঈজিকে পুষ্পস্নানে পাঠাই। নির্দেশ দেই, শরীর শুকাতে শুকাতে কিশমিশের ত্বক থেকে আঙুরের বেদনাগুলো চেটে খাও –
আমি এক দু:শ্চরিত্র লোক। হেরেমে হেরেমে রাত্রি কাটাই, পতিতার চিবুক আমার মক্কা। মুর্শিদকুলি খাঁ’র পানশালা থেকে বেরিয়ে সমুদ্রের দিকে দেখি, দূরবর্তী জেলেনৌকায় ঝুলে আছে ব্যাবিলন।
মদ্যপানে ভুলে যাই- জুয়েল মোস্তাফিজের ভাঙা সেলফোন যতটা জোরে আওয়াজ তোলে, আমার ক্ষমতা তারও কম। এখনো মাছ কোটা বটি বেয়ে পড়া রক্তে ভেসে থাকে আমার মায়ের মুখ।



১৬.
তানজিমার পিতাকে বাবা ডাকতাম আমি, বাবা ডাকি মুমির বাপেরেও। আমি মৃত্যু চিনি না, মৃতের ঠোঁটের ডগায় কথারা দৌড়ায় যেন বা ভীত শজারুর দল। তারচেও ভীত আমার মুখের বাবা শব্দটা।

পুত্রকে কাঁধে নিয়ে পুলসিরাত পেরিয়ে বেহেশতের দিকে হেঁটে যেতে যেতে, পুত্রের আঙুল ধরে পিতাও একদিন পুত্র হয়ে যান। একবার আমার পিতাও আমাকে কাঁধে নিয়ে পাড়ি দিয়েছিলেন ভাঙ্গা দেওনাই সাঁকো–পুলসিরাতের মতন। এ ছাড়া পিতার সঙ্গে কোনো সুখস্মৃতি নেই আমার।

বাবার কথা বলতে গেলে আমার মুখের সব শব্দই শিশুর আধোবোল হয়ে যায়, ছবি আঁকলেই নদীর ভাঙ্গা পাড়ে দুজন মানুষের ছায়া দাঁড়ায় পাশাপাশি। তানজিমার পিতাকে বাবা ডাকতাম আমি, বাবা ডাকি মুমির বাপেরেও....।

১৮.
এই দ্যাখো যাদুর ঝুলি। এখানে পাতায় মুড়ানো কুহকের মুখে
পরাজিত অশ্বারোহীর ক্লান্তিকে ভাতের মতো সাজিয়ে রেখেছি –
বেনামি ব্যথারা ফিরে এলে পাতে তুলে দেব
আমার মৃত্যু দিনের বিলাপ – একাকি ক্রন্দনরতার অশ্রুজল।
মেয়েটার কান্না কেবল মায়ের প্রতীক্ষা হয়ে যাচ্ছে দেখে
একটা আমি জরাগ্রস্ত শুয়ে থাকি, আরেকটা দৌড়াতে গিয়ে
পড়ছি আর উঠছি...উঠছি...পড়ছি...দৌড়াচ ্ছি গন্তব্যহীন।
কুহকের ঝুলিতে দুধমাখা ভাত নিয়ে যিনি বসে আছেন –
তিনি কার মা?




১৯.
মৃত্তিকা মাতারে চিনি আমিও একটা দেবী বানায়ে আমারেও দিও, পূজা-টুজা বুঝি না অত আমাকে পাবে না প্রার্থণারত, নারীরে ভালবাসতে পারি নাই তাই তোমার দেবীরে চাই। খোয়াবে খোলামকুঁচির দাগ হাতে লেগে থাকা রাগ, অভিশাপ দিয়াছেন ঈশ্বর,‘তুই ব্যাটা হারামি নশ্বর। যতবার মরেছি আমি তুই ডুবেছিস ব্রহ্মপুত্র জলে, ডুবে ডুবে ডুবুরি সেজেছিস বেঁচে থাকার ছলে।‘

ঈশ্বরের পুনর্জন্ম
যদি
ঘুম ভেঙে দেখো সকাল বলে আর কিছু নেই
অশেষ অন্ধকার মেখে বাড়ি ফিরে গেছে সূর্য –
চ্যাল হারানোর শোকে কাতর বালকের অশ্রু
থেকে বিন্দু বিন্দু আলোর উৎস খঁজছে পৃথিবী
আর চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে
পাউরুটি চিবুচ্ছেন ঈশ্বরের পেয়াদারা –
ধরো
মাতার চোখে মেসোপটেমিয়ার অন্ধকার রেখে
পিতা নিরুদ্দেশ; আমরা সকলেই ঠিকানাহীন
হারানোর বেদনায় সময় বলে আর কিছু নেই
সবাই ভুলে গেছে নিজের নাম –
প্রিয়তম মানুষের অবয়ব মনে নেই কারো –
তখন
যে শিশুর জন্ম হবে, তার নাম হতে পারে
জীবনানন্দ দাশ!


দ্বিধা-২
সত্য শেখাও মিথ্যা শেখাও
ভাল শেখাও মন্দ শেখাও
জোড়াতালির পিরিত শেখাও
বিষ গিলে শেখাও পলায়ন
কার দীক্ষা মানবো গুরু
বুদ্ধের ধ্যান নাকি বাৎসায়ন?

আপনার মতামত জানান