ভূমিকাবদল

সমরেশ মজুমদার



এক।
একমাত্র বত্রিশ বছরে মেয়ে তিন বছরের ছেলে নিয়ে বিধবা হয়েছে, মা তো তাঁকে জড়িয়ে কাঁদবেই। খবর পেয়ে স্বামীকে নিয়ে মালদা থেকে ছুটে আসতে আসতেই দিন দুই গিয়েছে। যার স্বামী চলে গিয়েছে আচমকা সে পাথর হয়ে ছিল এই ক’দিন। মাকে পেয়ে তার শরীর কাঁপল, কান্না ছিটকে বেরুলো। সবাই বলল, যাক শেষ পর্যন্ত কাঁদল। একবার মা জ্ঞান হারায় তো আর একবার মেয়ে। বাবার চোখে জল।
শ্রাদ্ধ চুকলো। মেয়ের পরনে সাদা শাড়ি, মায়েরও তাই। একে একে আত্মীয়স্বজন বিদায় নিল। স্বামী স্ত্রী সন্তানের সংসারে স্বামী এখন নেই। মা বলল “তোর এখন কি হবে”! মেয়ে বলল “দেখি থাকতে পারি কিনা!” দূর সম্পর্কের মাসিমা পিসিমারা বলে গেলেন “শোন আজকাল ওসব কেউ মানে না। মাছ মাংস খেয়ো, রঙিন শাড়ি পরো”। মা বলল “তাই কর রে। তুই নিরামিষ খেলে আমি কি করব!”

দুই।
মাস তিনেক পরে মায়ের চিঠির উত্তর লিখতে বসল মেয়ে, “এখন একরকম আছি। ওঁর অফিসের সব টাকা পাওয়া গিয়েছে। তা ধরো সাত লক্ষ টাকা। সব পোস্ট অফিসে রেখেছি। মাসে সাত হাজার সুদ পাই। খোকাকে ভাল স্কুলে ভর্তি করব। ওঁর অফিস থেকে চাকরি দেবে বলেছে, দেখি কি হয়। চিন্তা কোর না”।

তিন।
মা এসে হাজির। একাই। বাবার বাতের ব্যথা বাড়ায় শয্যাশায়ী। মা দেখল মেয়ের শরীর স্বাস্থ্য আরও ভাল হয়েছে। মাংসের ঝোল দিয়ে ভাত খেয়ে মা কথাটা তুলল, “খুব ভাল ছেলে। দশ হাজার টাকা মাইনে পায়। বৌ মরেছে বছর তিনেক। বাচ্চা নেই। তোর ছেলেকে নিজের ছেলে ভাববে। তুই কি বলিস?”
মেয়ে ঠোঁট বেঁকালো “ম্যাগো”।
মা বলল “মুখপুড়ী, এই বয়সে তোর স্বামী গেছে, তোর আছেটা কি!”
মেয়ে বলল “আমি এখন মুক্ত। সে যখন ছিল তখন দশ টাকা চাইলে জিজ্ঞাসা করত কি করবে? কাউকে কিছু দিতে হলে ওর কাছে হাত পাততে হত। না দিলে অপমানে লজায় মরে যেতাম। অফিস থেকে তাস খেলে বাড়ি ফিরত রাত এগারোটায়। এসে খেয়েই ঘুমত। আমার খবর রাখার সময় ছিল না তার। দাসীগিরি করতাম। আর এখন? পোস্টঅফিসের সাত হাজার টাকায় নিজের ইচ্ছেমতো খরচ করি প্রতি মাসে। টাকা জমছে, শাড়ি কিনছি, সিনেমা দেখছি। বিয়েতে ঘেন্না ধরে গেছে। এসব তুমি এখন বুঝবে না”।
মায়ের মনে পড়ল মালদা থেকে আসার সময় স্বামীর কাছে পাঁচশো টাকা চেয়ে তিনশো পেয়েছেন। গিয়ে তারও হিসেব দিতে হবে।
সধবা মা বিধবা মেয়েকে আড়চোখে দেখলেন। সিনেমায় যেমন দেখে।


অলংকরণ- তৌসিফ হক

আপনার মতামত জানান