একটি সোয়েটার নিয়ে

বুদ্ধদেব গুহ


তুমি যখন উলের দোকানে গিয়ে নানারকম উলের লাছি নাড়বে- চারবে তখন সেই বহুবর্ণ উলের রঙের সঙ্গে তোমাকে ঘিরে আমার সমস্ত রঙিন ইচ্ছাগুলি মিলে মিশে একাকার হয়ে যাবে। দোকানি বলবে, এটা নিন, রঙটা দারুণ। তুমি মুখ টিপে হাসবে, বলবে, যার জন্য নিচ্ছি তাকে এ রঙ মানাবে না। তারপর একসময় তুমি উল কিনে বাড়ি ফিরবে।
সেদিন রাতে, সকলের খাওয়া – দাওয়ার পর সমস্ত পাড়া নিস্তেজ হয়ে গেলে, তুমি রেকর্ড প্লেয়ারে রবিশঙ্করের রেকর্ড চাপিয়ে ডিজাইন বইয়ের গোছা কোলে নিয়ে বসবে। মোটা মোটা উজ্জ্বল উলের কাঁটা ঠোঁটে বুলোবে, তা দিয়ে মাথা চুলকোবে, তার পরে ক’ঘর উল্টো, ক’ঘর সোজা সব ঠিকঠাক করে নিয়ে তুমি বুনতে বসবে। কর্তব্য করার জন্যে। কাঁটা আর তোমার সুন্দর আঙুলে উল জড়িয়ে জড়িয়ে তুমি আমার জন্য সোয়েটার বুনবে।
তারপর বেশ কিছুদিন বাদে, সোয়েটারের এক পিঠ প্রায় হয়ে গেলে, তোমার হাতের ঘামের গন্ধ, তোমার নিঃশ্বাসের গন্ধ, তোমার বুকের গন্ধ সব জড়িয়ে যাবে ঐ সোয়েটারের সঙ্গে। সোয়েটারের অন্য পিঠ আরম্ভ হলে আমি মাঝে মাঝেই স্বপ্ন দেখব, আমি তোমার দেওয়া সোয়েটারটা পরে তোমার সঙ্গে দূ- রে কোথাও বেড়াতে গেছি। কোনো শীতের বিকেলে তুমি আমার কাঁধের উপর মাথা এলিয়ে আছ। দূরের লাল মাটির পথ বেয়ে হাট- ফিরতি মেয়েরা হলুদ শাড়ি পরে কথা বলতে বলতে গ্রামে ফিরছে- চারিদিকে এক অদ্ভুত শান্তি। ধুলোর গন্ধের সঙ্গে কুয়াশার গন্ধ মিশে গেছে চারিদিকে। তুমি আমার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছ।
তারপর সোয়েটারটা যেদিন শেষ হবে, সেদিন আমাকে চমকে দেবার জন্যে তুমি সেটা একটা প্যাকেটে মুড়ে সন্ধ্যেবেলা আমাদের বাড়ির দিকে আসবে, এমন সময় তার সঙ্গে হঠাৎ তোমার দেখা হয়ে যাবে। সে বলবে, কি ব্যাপার? প্যাকেটে কি? তুমি বলবে কিছু না, একটা সোয়েটার। সে বলবে, দেখি দেখি। তারপর বলবে রঙটা দারুণ কিন্তু। তুমি বুনেছ? দারুণ হয়েছে।
তখন তুমি বলবে, তোমার পছন্দ? তাহলে তুমি নাও।
কার জন্য বুনেছিলে?
তুমি বলবে সে আছে একজন; হ্যাংলা।
একেবারে নাছোড়বান্দা একটা সোয়েটার না নিয়ে ছাড়বে না।
তখন সে বলবে, তাহলে?
নাও নাও, এটা তুমি নিয়ে যাও। ও অপেক্ষা করতে পারবে। এতদিন এত কিছুর জন্য অপেক্ষা করল, আর সোয়েটারের জন্য অল্প কিছুদিন অপেক্ষা করতে পারবে না? আমার স্বপ্নের সোয়েটারটা তুমি তাকে দিয়ে দেবে।
তারপর তুমি বাড়ি ফিরে আমাকে ফোন করে বলবে, বিশ্বাস কর, তোমার সোয়েটারটা প্রায় শেষ করে এনেছিলাম, এমন সময় তোতোন...।
আমি বলব তোতোন কে?
তুমি বলবে তোতোন আমার হুলো বেড়াল। আমি বাড়ি ছিলাম না, দুপুর বেলায় নখ দিয়ে আঁচড়ে আঁচড়ে সমস্ত ঘর ফেলে দিল। বুঝলে? ঘরগুলো পড়ে গেছে।



অলংকরণ- তৌসিফ হক

আপনার মতামত জানান