সুখ ও দুঃখের দিক

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়


একদিন তাঁর সঙ্গে দেখা। আকাশে ছিল চৈত্রের রোদ।মাঠে সেবার ফসল হয় নি। খাল-ডোবা থেকে বাস্প হয়ে উড়ে গেছে জল। আকালের দেশ ছেড়ে আমি যাত্রা করলুম। পূবের দেশ ছেড়ে পশ্চিমের দিকে। খবর পেয়েছি, পশ্চিমের দেশে বৃষ্টি হচ্ছে। সেখানে লকলকিয়ে উঠছে ফসল। নদী বয়ে যাচ্ছে কলকল করে, গাঢ় ভালবাসায় মাটিতে মেখে মেখে। পেরিয়ে গেলুম ফসলহীন মাঠ, জনহীন গ্রাম, ছায়াহীন পথ। পাখী ডাকে না, মানুষের শব্দ হয় না, বাতাস বয় না। সেই দীর্ঘ জনহীন রাস্তায় ঠিক দুপুরে দূর থেকে দেখলুম একটা ঝুপসী গাছ ছায়া গেলে দাঁড়িয়ে আছে। শ্রান্ত আমি সেই গাছের ছায়ার দিকে এগিয়ে যেতে চোখ তুলে দেখি, উল্টো দিকে থেকে সেই ছায়ার দিকে হেঁটে আসছেন তিনি। দীর্ঘকায় লোকটি, পরনে সাদা পোশাক, ধূলায় মলিন তাঁর চেহারা। বড় শ্রান্ত তিনিও।
গাছের ছায়ায় দুজনের দেখা “মুখোমুখি”।
তিনি পূবের দিকে হাত তুলে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন- ওদিকেই কি আকাল? মহামারী? দুর্ভিক্ষ?
বললুম – হ্যাঁ, ওদিকেই দুর্ভিক্ষ, মহামারী, আকাল। ওদিকে কিছু নেই। যাওয়া ঠিক হবে না।
তিনি হাসলেন।
পশ্চিমের দিক দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলুম- ওদিকে কি খুব ফসল হচ্ছে? সুখে আছে মানুষেরা? অভাব নেই?
বললেন- হ্যাঁ, ওদিকে ফসল, সখ ও অভাবহীনতা- যা মানুষকে পঙ্গু করে দেয়। ওদিকে যাওয়া ঠিক হবে না।
আমরা পরস্পরের চোখে চোখ রাখলুম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন – কেন চলেছো পশ্চিমে?
-সুখে থাকব বলে।
আমি জিজ্ঞেস করি- কেন চলেছেন পূবে?
-আমি চলেছি মানুষের কাছে কাছে থাকবো বলে। পূবের আকালের সঙ্গে মানুষের যুদ্ধ। আমি চলেছি সেই যুদ্ধ জয়ে।
তারপর আমরা সেই গাছের ছায়া ছেড়ে পরস্পর বিপরীত দিকে চললুম। তিনি পূবে- দুঃখের দিকে, আমি পশ্চিমে- সুখের দিকে।

অলংকরণ- তৌসিফ হক

আপনার মতামত জানান