প্রো-চার কথা

সুমন্ত চট্টোপাধ্যায়
“Women need a reason to have sex. Men just need a place.” :
Billy Crystal.

--ওপরের ইংরাজী উদ্ধৃতিটা পড়লেন নাকি? না
পড়লেও চলতো। ওটা কেবল দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য দিয়েছি, “Sex” শব্দটাও আছে আর
বেশ “Catchy”-ও বটে। কি লিখলাম, বা সেটার আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে কিনা সেটা
বিচার্য বিষয় নয়, বিষয়টা হল কতটা রঙচঙে উপায়ে সেটাকে তুলে ধরতে পারলাম।
তাই “প্রচার” নিয়ে দু-চার কথা বলতে এসে বেশ এমন কিছু কৌশলের কথা বলবো,
যেগুলো প্রায় রোজই আপনার নাকের ডগায় ঘুরে বেড়ায়, অথচ আপনি ধরতে পারেন না,
বা যখন ধরতে পারেন তখন আর কিস্যু করার থাকেনা।
প্রথমেই প্রচারের ইতিহাস সম্পর্কে কিছু বলে
নেওয়া যাক। আরো পেছনে যাওয়া যেত, কিন্তু আমি যীশুখ্রীষ্ট দিয়েই শুরু করতে
চাই। যীশুখ্রীষ্ট একটা নতুন ধর্ম চালু করলেন, আধুনিকভাবে বলতে গেলে
যীশুখ্রীষ্ট একটা নতুন “ব্র্যান্ড” বা “প্রোডাক্ট” বাজারে আনলেন। আনলেন
তো ঠিকই, কিন্তু সেটা বাজার কাটবে কতটা, কিকরে? উনি এখানে-সেখানে ঘুরে
নিজের ব্র্যান্ড “প্রোমোট” করলেন; না, খুব বেশী পারলেন না। তবে যারা এই
ব্র্যান্ড ব্যবহার করতে শুরু করলেন, তারা মার্কেটিং-এর দায়িত্ব নিলেন,
অনেকটা “চেইন সিস্টেমের” মত। খ্রীষ্টান মিশনারীরা আফ্রিকা ও এশিয়ার নানা
দেশে ছড়িয়ে পড়লো। উপনিবেশ স্থাপনের ফলে কাজটা সহজ হয়ে গেছিল। আজ পৃথিবীতে
যীশুখ্রীষ্টের ব্র্যান্ডের বিক্রি সবথেকে বেশী। এভাবেই হজরত মহম্মদ, গৌতম
বুদ্ধ বা চৈতন্যদেবকেও টানতে পারেন। সব ব্র্যান্ডই প্রায় এক, কিন্তু যার
প্রচার যত বেশী, যত মনোগ্রাহী, যত আকর্ষণীয় তার বাজার তত ভালো। এভাবেই
হয়ে আসছে সেই পুরোনো দিন থেকে।
দেখুন, বর্তমান সময়ে “প্রচার” জিনিষটা খুব গুরত্বপূর্ণ
বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধর্মের কথা তো বলেইছি, এর সাথে
রাজনীতি-শিল্প-ব্যবসা-স িনেমা-খেলাধুলো থেকে শুরু করে আপনি যদি আপনার
পাড়াতে একজন ছোটোখাটো “মস্তান” হিসেবেও পরিচিতি পেতে চান, তাতেও “প্রচার”
লাগবে। আরে মশাই, আপনার কাজের কথা (সে ভালোই হোক, বা খারাপ) যদি
দূরদূরান্ত অবধি নাই-ই ছড়ালো, তবে আপনার সে কাজ করে লাভ কি! যা করেই হোক,
“Famous” বা “Notorious” হতে গেলে “Publicity” করতেই হবে।
এবার আসা যাক, শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রে। ধর্ম-ব্যবসা বা
বিনোদনের থেকে এই ক্ষেত্রটা অনেকটাই আলাদা। আপনি নিশ্চয় মাইক নিয়ে আপনার
আঁকা ছবি, কবিতা বা ভাস্কর্য শিল্পের প্রচার করতে পারবেন না। তাই শিল্পের
ক্ষেত্রে “প্রচার” বিষয়টা আরো শৈল্পিক হয়ে ওঠে। আপনাকে হতে হয় আরো
সূক্ষ্ম। নাহলে ঐ যা হয়ে থাকে আরকি, কবি মারা যাওয়ার পর তাঁর কাজের
মূল্যায়ন হয় এবং তিনি “Famous” হন। কিন্তু কে চায় মৃত্যুর পর নামজাদা
হতে! সবাই “Living Legend” হতে চায় আর চাহিদা অনুযায়ী একজন শিল্পীকে তার
প্রোডাক্ট বা ব্র্যান্ড বিকোনোর জন্য খুব সচেতন হতে হয়।
আপনি যদি মহিলা কবি বা চিত্রকর হন এবং বলতে
নাই, একটু সুন্দরী হন, তাহলে আপনার সোনায় সোহাগা! এডিটর-প্রদর্শনী
প্রযোজক-পাঠক-দর্শক সব আপনার হাতের মুঠোয়। যদি সুন্দরী না হন, তবে কাজটা
একটু অসুবিধার, তবে ততটাও অসুবিধার নয়, ভুলে যাবেন না আপনি একজন নারী।
শহুরে পুরুষ শিল্পীদের ক্ষেত্রে বিষয়টা সহজ। বর্তমানে ফেসবুক-ট্যুইটারের
মত সোশ্যাল নেটওয়ার্কের ফলে আপনি আপনার যোগাযোগ খাটিয়ে এবং নিজেকে
কেউকেটা হিসেবে জাহির করে আপনার পণ্যের প্রচার করতে পারেন। সবথেকে বড়ো
অসুবিধাটা হয় প্রান্তিক বা মফস্বলের শিল্পীদের। অনেকসময় ভালো প্রতিভা বা
সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও প্রচারের অভাবে এনারা হারিয়ে যান।
এবার আসি শৈল্পিক প্রচারের রকমফের বিষয়ে।
দেখুন, আপনি দু’ভাবে প্রচার করতে পারেন। প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ। প্রত্যক্ষ
মানে আপনার ক্রুশকাঠ আপনাকেই বহন করতে হবে। বিতর্ক তৈরী করে হোক, ভালো
কাজ দেখিয়ে হোক বা যেকোনো রকমের পাবলিসিটি স্টান্ট করেই হোক। পরোক্ষ
প্রচার এই মুহূর্তের খুবই একটা প্রচারিত উপায়। যেমন ধরুন, A, B, C এবং D
এনারা নিজেদের কাজের প্রচার না করে একে-অন্যের কাজের খুব প্রশংসা করেন।
অথবা A কোনো ম্যাগাজিনের সম্পাদক। তিনি B, C এবং D এই তিনজনকে তাঁর
চ্যালা রেখেছেন তাঁর পণ্যের প্রচারের জন্য। প্রতিদানে A এই তিনজনের লেখা
তাঁর ম্যাগজিনে জায়গা করে দেবেন। হ্যাঁ, গোয়েব্বলসের সেই কথাটা মনে আছে
তো, মিথ্যাকে বারবার চিৎকার করে বললে সেটাও সত্যি হয়ে যায়। ব্যাস, কাজ
হবে, নাহলে জড়িয়ে পড়ুন তুমুল একটা “সাজানো” ঝগড়ায়। মানুষ জানুক আপনি কি
বলতে চাইছেন, বা আসলে আপনি মশাই ঠিক কে। এরজন্য অবশ্য শত্রুর সাথে আড়ালে
একটা বোঝাপড়ার প্রয়োজন আছে, কিছু সাঙ্গোপাঙ্গোও তৈরী রাখতে হয়; রাজনীতিতে
ঠিক যেমনটা হয়ে থাকে আরকি।
শিল্পের প্রচারের ক্ষেত্রে আরেকটা বিষয় আছে,
সেটা হল আপনার শিল্প। স্বাভাবিকভাবেই “Sexual”, “Nude”, “Forbidden”,
“Banned” বা “Adult” জিনিষের প্রতি মানুষের আকর্ষণটা চিরকালের। তাই আপনার
শিল্পে সেসব জিনিষ রাখুন, প্রয়োজন না থাকলেও। ডিমান্ড বুঝে সাপ্লাই দিন।
এতে কেউ কেউ যদি আপনার শিল্পকে “চটকদার”-ও বলে তাতে আপনার বয়েই গেল! আপনি
তখন জনপ্রিয়তার সপ্তম স্বর্গে।
প্রচারের সুফল-কুফল প্রসঙ্গে বলি সামান্য। সুফল
বলতে গেলে, অল্প একটু প্রচার অনেক প্রতিভাবানদের লাইমলাইটে নিয়ে আসে।
যোগ্যতা থাকলে প্রচার জিনিষটা ভালো মাধ্যম হিসেবে পরিগণিত হয়, নাহলে কালো
মাধ্যম হিসেবে।
যাদের যোগ্যতা কম, অথচ বিন্দাস প্রচার-টর্চার
করে বাজার জমিয়ে দিতে চাইছেন, তাদের বলছি, কোনো লাভ হবেনা মশাই। প্রচার
একটা সাময়িক অস্ত্র মাত্র। একটা সময়ে আপনাকে “মগজধোলাইহীন মানুষ” এবং
“সময়”-এর সামনে নগ্ন দাঁড়াতেই হবে মুখোমুখি। বিচার হবে আপনার কাজের। তখন
না আপনার প্রচার, না আপনার কোনো চালাকি কাজে আসবে। তাইতো দেখুন না, এত
রকমের ধর্মের ব্র্যান্ড এবং তাদের নানা রকমের বিপণন সত্ত্বেও মানুষ কেমন
যুক্তিশীল অজ্ঞেয়বাদ কিংবা নাস্তিকতাকে বেছে নিচ্ছে। অথচ শেষের
ব্র্যান্ডদুটির প্রচার কিন্তু সেরকম নয়। সেই কারণেই বলা-প্রচারে নয়, কাজে
মন দিন। বেশ মনোযোগ দিয়ে প্রবন্ধটা লিখলাম, যাই, এবার নিজের ক্রুশ নিজেই
বয়ে আসি একটু। বেশী প্রচার আমার ভালো লাগেনা, অল্প একটু, হেঁ হেঁ ...

আপনার মতামত জানান