অন্ধকুটির

সামিউল আজিজ সিয়াম


লোকটাকে আমি খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছিলাম।
বয়স কত হবে ? ত্রিশ কিংবা বত্রিশ? কিংবা তারো কম হতে পারে। রুক্ষ জীবনযাপনের জন্য হয়তো চেহারায় আগাম বার্ধক্যের একটা ভাব এসেছে। খোঁচা খোঁচা দাড়ি, উস্কুখুস্কু চুল আর চামড়ায় পোড়া পোড়া ভাবটা বাদ দিলে লোকটাকে সাহস করে সুদর্শন বললেও বলা যেতে পারতো। লোকটা খুব স্বাভাবিকভাবে বসে আছে, কোন অপ্রকৃতস্থ ভঙ্গী নেই। কোন অস্থিরতা নেই, বরং একটা অস্বাভাবিক শান্ত ভাব আছে। কিছু মানুষকে দেখে মনে হয় তাকে আশেপাশের কিছুই ছুয়ে যায়না, আলো বাতাসও না। ভদ্রলোক হয়তো তাদের মতোই কেউ।
সিনিয়র ডাক্তাররাও বলে দিয়েছেন, সে অন্য রোগীদের মতো নয়, বেশ স্বাভাবিক। শুধু হঠাৎ হঠাৎ অদ্ভুত আচরণ করে, যদিও হিংস্র কিছু নয়। আমি হাত মেলানোর জন্য হাত বাড়িয়ে দিলাম।
-আমি সায়রা জামান। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি। আপনি ?
লোকটা খুব মনোযোগ দিয়ে পায়ের নখ দেখছিল। পায়ের নখই হয়তো এমন গুরুত্বহীন কিছু যা আমরা মাঝেমাঝে ভীষণ মনোযোগ দিয়ে দেখি। আমার কথা শুনে সে চোখ তুলে তাকালো। তবে হাত বাড়ালো না। আস্তে করে বললো, “আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম। এখন পড়িনা। মানুষ খুন করতাম একসময়, এখন করিনা। আর কোন পরিচয় নেই আমার।”
আমি চমকালাম। কন্ঠটা নির্পিপ্ত, দৃষ্টিটা তার চেয়েও বেশি। কথার পিঠে কথা বলার ক্ষমতা যার আছে তাকে খুব অসুস্থ নিশ্চয়ই বলা যায়না। হাত মেলানোর কোন সম্ভাবনাই না দেখে হাত সরিয়ে বললাম, ‘নামটা তাহলে জানা হচ্ছেনা, তাইতো?’
“হাসপাতাল থেকে আপনি আমার নাম জেনেই এসেছেন। আপনি বরং মূল পর্বে চলে যান। কুশলাদির দরকার নেই।”
আগের মতোই নির্লিপ্ত কন্ঠ। আমি একটা বিপদ যা সে কোনোরকমে কাটাতে পারলেই সে বাচে, কন্ঠে সেরকম কোন উদ্বেগ পর্যন্ত নেই। আমি বললাম, "আমি একটা থিসিস করছি। তার অংশ হিসেবে আপনার একটা সাক্ষাৎকার নেয়া দরকার। শুরু করতে পারি ?"
লোকটা কেমন তাচ্ছিল্যের সাথে হাসলো। আমি সাহস করে আরো একটা প্রশ্ন করলাম, “আপনি কতদিন ধরে আছেন এখানে ?” সাথে সাথে উত্তর, “পাঁচ বছর হতে পারে। কিছু কম হবে হয়তো, সময়ের হিসাব নেই তেমন।” কণ্ঠে কোন বিকার নেই। আমি প্রশ্নোত্তর পর্ব এগিয়ে নেয়ার জন্য মনে মনে বেশ কিছু প্রশ্ন গুছিয়ে নিচ্ছি, দুয়েকটার সংকেত খাতায় লিখে রাখছি। ঠিক তখনই অনেকক্ষণ ধরে চলতে থাকা প্রকৃতির জেদি ভাবটা ঝড় থেকে বৃষ্টিতে রূপ নিল। এখন বাজছে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা। এই বৃষ্টির মধ্যে ফিরে যাওয়াটা কঠিন হবে নিশ্চয়ই। এধরণের বৃষ্টিগুলো হুট করে গলায় ঝুলে পড়া নিঃস্বার্থ প্রেমিকের মতো, এত শজ ছাড়তে চায় না।
বৃষ্টি সংক্রান্ত চিন্তাকে আপাতত তুলে রেখে পরবর্তী প্রশ্ন করতে যাচ্ছি, তখনই খেয়াল করলাম লোকটা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে একমনে বৃষ্টি দেখছে। বৃষ্টিতে দেখার তেমন কিছু নেই, দেখার কিছু বরং লোকটার বৃষ্টি দেখার ভঙ্গি। বিড়বিড় করে লোকটা কিছু বলছেও মনে হলো। আমি জানতে চাইলাম, “কিছু বলছেন ?”
লোকটা ফিরে তাকালো। কেমন এলোমেলো দৃষ্টি, উদাসীন এক চাহনি। বললো, “ওইদিনও বৃষ্টি ছিল। ভীষণ বৃষ্টি ছিল।”
-কোনদিন ?
-আমি শেষ খুনটা যেইদিন করি, ওইদিন। বৃষ্টি ছিল খুব। পুরো রাস্তা বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে গিয়েছিলাম। ভদ্রলোক নক করতেই দরজা খুলল। আমি বললাম, বাইরে বৃষ্টি, কিছুক্ষণ কি ভেতরে বসতে পারি!...”
লোকটা নিজের মনেই বলতে থাকলো। মনে হলো সে নিজ থেকেই বুঝি কাউকে বলতে চায়, যেন অনেকদিন কাউকে কিছু বলতে পারেনি। আমিও শুনতে থাকলাম আগ্রহ করে, কিঞ্চিৎ অবাকও হলাম। কি সাবলীল ভাবেই একটা মানুষ খুনের বর্ণনা দিচ্ছে। অপ্রকৃতস্থ মানুষের পক্ষেই কি তা সম্ভব শুধু ? ভুল বললাম বোধ হয়, আমরা কম বেশি সকলেই কি অপ্রকৃতস্থ না!
লোকটা নিজের মতো বলে চলেছে।
-আমাকে বসিয়ে রেখে ভদ্রলোক ভেতরের দিকে গেল। আমি বাসার ঠিকানা, টার্গেটের ছবি মিলিয়ে দেখলাম, সব ঠিকঠাক। তখনই কারেন্ট চলে গেল। আমি অন্ধকার ঘরে চুপচাপ বসে আছি, কাজ সারার জন্য অনুকূল পরিবেশ।
-তারপর?
আমি আগ্রহ নিয়ে বললাম। আগ্রহটা সত্যিকারের ছিল নাকি ভান আমারো মনে নেই। লোকটা কিঞ্চিৎ থামলো। আমি আবারো বললাম, ‘বলুন, থামলেন কেন?’
-পিস্তলটা বের করে যেই হাতে নিয়েছি, সেসময় একটা মোমবাতি নিয়ে কে যেন ঘরে ঢুকলো। আমি আধো আলো ছায়ায় ধরেই নিলাম টার্গেট আসছে, সোজাসুজি গুলি করলাম। একবারে ঠাস ঠাস করে তিনটা গুলি করলাম...”
লোকটা থামলো। এই প্রথমবার তার মধ্যে আবেগের মতো কিছু লক্ষ্য করলাম। আবেগটা একবার মনে হলো ভয়, যেন এরপরের কিছু সে আর মনে করতে চায়না। আরেকবার মনে হলো অদ্ভুত এক শুণ্যতা। আমি নিজে থেকেই জিজ্ঞেস করলাম, “তারপর ? মারা গিয়েছিল লোকটা?”
লোকটা বিক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে একবার তাকালো। তারপর আগের চেয়ে নিচু গলায় বললো, “না। মোমবাতি নিয়ে ঢুকেছিল লোকটার মেয়ে। গুলি করার সাথে সাথে লোক আর তার স্ত্রী ছুটে চলে এলো। আমার তখন কোনদিকে খেয়াল নেই, এক দৃষ্টিতে মাটিতে লুটিয়ে থাকা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আছি। মোমবাতির আবছা আলোয় মেয়েটাকে দেখা যাচ্ছিল না ঠিকমতো, তবুও দেখলাম তার নিভু নিভু চোখ দুটাও আমার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ বোজার আগ পর্যন্তই তাকিয়ে ছিল। একবার বিদ্যুৎ চমকালো, আমি সেই আলোয় মেয়েটার চেহারা দেখলাম একবার ভালো করে, এক মুহুর্তের জন্য মনে হলো নিষ্প্রাণ এই মুখটাই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর কিছু। ঐ এক মুহুর্তই।”
লোকটা আবারো থামলো। চোখেমুখে অদ্ভুত এক শুণ্যতা। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “এরপরই কি আপনি এরেস্ট হলেন?”
-হ্যা। আমি ঠাই ওভাবেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। একটুও নড়িনি। কিভাবে কি হয়েছে জানিনা।
-পালানোর চেষ্টাও করেননি?
-না। জীবনে সেই প্রথমবার করিনি। কিংবা শেষবার।
লোকটা থামলো, মনে হলো এরপর কিছু বলতে চায়, আবার বলতেও চায়না। সুযোগটা আমিই করে দিলাম, ‘মেয়েটাকে খুনের অপরাধবোধটা এখনো কাটাতে পারেননি?’
-অপরাধবোধ নেই। ছিলও না। আমি মেয়েটাকে কাটাতে পারিনি।
-কিরকম?
-ওই মুহূর্তের পর থেকে চোখে শুধুই মেয়েটার চেহারা ভাসতো, সবসময়। যখন আমাকে গাড়িতে তোলা হচ্ছিল, তখন ভাবছিলাম, ‘মেয়েটা নীল শাড়ির সাথে সবুজ টিপ পরেছিল কেন? নীল কোনো টিপ কি ছিলনা?’ যতদিন জেলে ছিলাম, খেয়াল করিনি কতগুলো দিন গেছে। এরপর একসময় বৃষ্টি হলে অদ্ভুত ভাবে চিৎকার করতাম, আর্তনাদ করতাম। কোর্টে আমাকে মানসিকভাবে অসুস্থ দেখানো হলো, মৃত্যুদণ্ড না হয়ে এখানে পাঠানো হলো। আমার মনে নেই, আমি নাকি চিৎকার করে মৃত্যুদণ্ড চেয়েছিলাম!
লোকটা থামলো। টানা অনেকগুলো কথা বলে কিঞ্চিৎ হাপিয়ে গেছে। অনেকদিন কথা বলে অভ্যাস নেই তা বেশ ভালোই বোঝা যায়। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “বৃষ্টির সমস্যাটা কি এখনো আছে? এখনো ওরকম করেন?”
-প্রথম প্রথম বৃষ্টি হলেই বৃষ্টির পানির রঙ লাল দেখতাম। ভয়ে চিৎকার করতাম। আর সারাক্ষণ মেয়েটার চেহারা চোখে ভাসতো। এখনো ভাসে, তবে বৃষ্টি হলে ভয় পাইনা। তবু হাসপাতালে থাকার জন্য বৃষ্টি হলেই অভিনয় করে আগের মতো চেচামেচি করি, পাগলামি করি। যেন কেউ না টের পায় আমি সুস্থ। জীবনটা খারাপ লাগছে না এখন। মাঝে মাঝে জানালা দিয়ে বৃষ্টি দেখি, মেয়েটার কথা ভাবি। মেয়েটা চোখ বন্ধ করার আগে যে একবার তাকিয়েছিল আমার দিকে, সেই দৃষ্টিতে থাকা অদ্ভুত বিস্ময়ের কথা ভাবি। মেয়েটা মনে হয় ভেবেছিল, এই লোকটা কতই না বাজে। অথভ সেই লোকটাই বাকিটা জীবন সেই দৃষ্টিটুকুর কথা ভেবে কাটিয়ে দিচ্ছে।...
আমি এবার সত্যিই বিস্মিত হলাম। তবে সেই বিস্ময় সামলে ওঠার আগেই মুখোমুখি হলাম নতুন বিস্ময়ের। লোকটার কথা শেষ হওয়ার আগেই একজন ডাক্তার ঘরে ঢুকলেন। সাথে সাথে লোকটা ভীষণ চেচামেচি শুরু করলো। মাটিতে গড়াগড়ি করে আর চেচিয়ে সে কি বীভৎস নারকীয় তান্ডব। ডাক্তাররা আমাকে দ্রুত বের করে আনলেন। আমি আজকে সাক্ষাৎকার টা নিতে পারছি না এজন্য দুঃখও প্রকাশ করলেন।
ঘরের দরজা বন্ধ হওয়ার আগে ঘরের বাইরে থেকে লোকটাকে শেষ একবার ভালোমত দেখার চেষ্টা করলাম। লোকটার পুরো জীবনটা অদ্ভুত এক বিচিত্র এক মুহূর্তে আটকা পড়ে গেছে। তীব্র অন্ধকার এক কুটিরের মতো সেই মুহূর্ত থেকে তার মুক্তি নেই। ভালোবাসা ভয়ংকর জানতাম। এদিন জানলাম ভালোবাসার মানুষের মৃত্যু যতটা ভয়ংকর, মৃত কারো প্রেমে পড়া তার চেয়েও ভংয়কর, নিশ্চয়ই ভয়ংকর!

আপনার মতামত জানান