প্রেমে পড়ার পর

সার্থক মজুমদার

অলংকরণ তৌসিফ হক

১।
হারানো সুর

'আশীয়ানা' মানে আশ্রয়,
'আবুদানা' কথাটার মানে জানতাম না।
তবু ভারী দরদ দিয়ে গানটা গাইতাম,
মনে হতো যেন আমায় ভেবেই লেখা।
তারপর,
তুই এলি,
বসন্তের বাতাস নয়, সমুদ্রের ঝোড়ো হাওয়ার মতো।
আজ ছ'মাস হল গানটা গাইতে পারছি না।
একদিন স্নানের সময় চেষ্টা করলাম,
তাও ঠিক সুর লাগলো না।
এখন বুঝতে পারছি,
এটা আমার হারানো সুর।






২।
বিদ্যুৎ

সেই প্রথম আমি জানলাম,
কত নরম, কত নরম হতে পারে ভালোবাসা,
আর তারই মাঝে লুকিয়ে থাকে কি তীব্র বিদ্যুৎ।
হেমন্তের নেমে আসা অন্ধকারে,
আধো কুয়াশার মাঝে,
সেই আশ্চর্য স্থির তড়িৎ,
প্রথমবার পেয়েছিলাম,
সপ্তমীর সন্ধ্যায়
তোর ঠোঁটে ঠোঁট রেখে।

৩।
কবিতা

জেদ চেপে গেল,
আজ রাতে কবিতা লিখবই একটা।
এমন একটা কবিতা,
যা কোনকিছু বদলে দেবে না,
শুধু,
আনন্দ দেবে তোমায়।

জন্ডিসে কাবু হয়ে শুয়ে রয়েছ বিছানায়,
মার পাশে।
কথাবার্তারও নো চান্স।
ফেসবুকের গরুদের ঘাস খাইয়ে
কতই বা সময় কাটে।
তাই কবিতা লিখব এখন থেকে,
রোজ রাতে, রোজ।
তারপর,
তুমি সেরে উঠলে,
তুমি পড়বে, ব্যাস।


৪।
অধরা

একটা স্বপ্ন আমাদের কাছাকাছি এনেছিল।

বিশাল নদীর মাঝে নির্জন এক চর,
চরে একটাই বাড়ি।
বাড়ির ছাদে টেলিস্কোপ
রাতে তারা দেখব আমরা।

সে নদীতে তারপর কত জল বয়ে গেছে,
সেই চর, যেখানেই থাক, সমান নির্জন,
নক্ষত্ররা রাতের আকাশে তেমনই সজীব।
শুধু এতগুলো বছর পথ চলার পরেও,
ভেবে দেখ, এখনও সে চরে যাওয়া হল না।

৫।
আমাকে নাও
মনের মধ্যে অদ্ভুত এক অবস্থা,
এই ভীষণ আনন্দ,
মনে হয় আমি দুনিয়ার রাজা।
আবার এই মনখারাপ,
বর্ষাকালে আকাশের মুখভারের মতো।
কখনো প্রবল রাগ,
আবার একটু পরেই গলে জল।
ভাগ্যিস এসব তুমি ছাড়া কেউ জানে না।

এই সবকিছু তোমার জন্য,
আমার অদ্ভুতুড়ে আনন্দ,
অল্প রাগ,
আবছা মনখারাপ,
এই সবকিছু তোমার।
সব তুমি নাও সোনা।


৬।
জ্ঞানপাপী

নির্লিপ্ত ছিলাম,
ভাবতাম এটাই ভালো,
দিব্যজ্ঞানীর লক্ষণ।
আসলে কিন্তু কান্না ছিল তলে তলে,
অন্তঃসলিলা নদীর মতো।

আর কেউ কেউ সব বুঝে নেয়,
সব দেখে ফেলে,
সব খুঁজে নেয়।

তেমনই কারুর অপেক্ষায় ছিলাম,
যার বুকে মুখ গুঁজে একদিন
ভেঙে পড়ব কান্নায়।

আর বলব,
"কেন এতো দেরী করে এলে?"





৭।
পথ

একটা ব্যস্ত ভিড় ঠাসা রাস্তায়
তোকে প্রথম দেখেছিলাম।
অনেক মুখ আর মুখোশের ভিড়ে
কাউকে খুঁজে পাওয়াই মুশকিল।
তবুও খুঁজছিলাম তোকে।
আর তুইও অমনি,
হাতছানি দিয়ে ডেকেছিলি কাছে,
যেন আমারই অপেক্ষায় ছিলি।

আশ্চর্য, সেই সব ভিড়,
এত মুখ আর মুখোশ,
সব কোথায় মিলিয়ে গেল।

এখনও আমরা পথ হাঁটি,
প্রতিদিন সকালে, সন্ধ্যায়, রাতে,
সে পথ কিন্তু নির্জন।
শুধু দুজনে হেঁটে চলি দুজনাতে মগ্ন হয়ে।



৮।
রবিবার

দেখা হয়না তোর সাথে,
তাই অনেক কান্না, অনেক মনখারাপ
অনেক মিঠে রোদ্দুরমাখা পথে চলতে গিয়ে
হঠাথ করে তোমার জন্য মনকেমন।
একটা নভেম্বরের সকালে,
শীতের আগমনী বাতাসে,
তোমার আভাস।
আর একটা রবিবারের দুপুরে,
হাতে কোন কাজ নেই, অথচ
এখনও ফোন করছনা দেখে,
তোমায় নিয়ে আরো একটা কবিতা লিখে ফেলা।

৯।
আশ্চর্য

কেমন অবাক লাগে ভেবে,
তুই আসার আগেও একটা জীবন ছিল।
তখনও গান গাইতাম,
'পুকারতা চলা হু ম্যায়',
তখনও মনে হত
'এই বেশ ভালো আছি'।
আশ্চর্য,
কোন ভালো থাকাটা সত্যি!
সে সময়ের না এখন!

১০।
ঈর্ষা
পাহাড় ভালোবাসো তুমি,
বারে বারে ফিরে ফিরে যাও
পাহাড়ের কোলে।
যেন সে তোমার পুরনো প্রেমিক।
তাকে আমি ঈর্ষা করি!
তোমার থেকে এতদূরে থেকে,
যখন ভাবি, বারেবার
সে পেয়েছে তোমার দেখা।

আবার হাসি নিজের মনেই,
পাহাড় সুগম্ভীর, হয়তো প্রবল সুপুরুষও,
তবু, পারবে কি কাঁদতে তুমি,
পাহাড়ের বুকে মাথা রেখে!

আপনার মতামত জানান