ছবি ছাপার কল-কৌশল ও উপেন্দ্রকিশোর

সিদ্ধার্থ ঘোষ
আরমানি বাজারের দক্ষিণে প্রথম বাড়ি, যে-বাড়িতে একটি নিমগাছ আছে, সেখানে ‘ডগলেশ সাহেব’ আশ্চর্য এক যন্ত্র দিয়ে “ছায়া আকর্ষণ করিয়া ঠিক প্রতিমূর্ত্তি প্রস্তুত করিতেছেন।” ১৮৪৪ এর ‘সংবাদ ভাস্কর’-এ প্রকাশিত বিজ্ঞাপন থেকে এই খবর জানা যায়। বাংলা পত্রিকায় কলকাতায় ফোটোগ্রাফি আগমনের প্রথম সমাচার। ছোট আকারের ছবি তুলতে কড়কড়ে বারোটা টাকা ও বড় ছবির জন্য সেকালে পঞ্ছাশ টাকা দিতে ক’জন উৎসাহী হয়েছিলেন বা ক’জনের সে সামর্থ্য ছিল, অনুমান করা যেতে পারে। বিজ্ঞাপন থেকে আরো জানা যায় পর্দানশিনদের ছবি তোলার জন্য সাহেবকে বাড়িতে ডেকে আনলে আট টাকা বেশী দিতে হতো। তবে সাহেব আশ্বস্ত করতে ভোলেননি যে, “স্ত্রীলোকদিগকে সাহেবের সাক্ষাতে আসিতে হইবেক না, সাহেব অন্তরে থাকিয়া ছবি করিয়া দিবেন।”

ফোটোগ্রাফার ডগলাশের সাফল্যের কথা বিশেষ জানা যায় না, কিন্তু বাংলা কাগজে ফোটোগ্রাফি বিষয়ে দ্বিতীয় বিজ্ঞাপনদাতা নিউল্যাণ্ড ছিলেন কোলকাতার প্রথম ডাকসাইটে আলোকচিত্রী।

বিজ্ঞাপন।
প্রতিমূর্ত্তি নির্মাণ কর্ত্তা।
জে ডবলিউ নিউল্যাণ্ড সাহেব
তাহার কৃত অনেক ব্যক্তির উত্তম ও ঠিক ছায়ায় নির্ম্মিত প্রতিমূর্ত্তি তাঁহার জাগার
লেডিন বিল্ডিংগের [Loudon Building] ৬ নং ভবনে দর্শনার্থ কলিকাতাস্থ বাবুদিগকে
নিমন্ত্রণ করিতেছেন; এবং জানাইতেছেন যে, যে কেহ অল্পক্ষণ তথায়
বসিলেই তাঁহার অবয়ব প্রতিমূর্ত্তি ঐরূপে করিয়া দিতে পারেন।
প্রত্যেক প্রতিমূর্ত্তির মূল্য মায় মায়ার্কিন চামড়ার সুদৃশ্য কেশ ১২ টাকা লয়েন।”

১৮৫০-এর ১৬-ই এপ্রিল ‘সংবাদপূর্ণচন্দ্রোদয় ’-এ প্রকাশিত এই বিজ্ঞাপনের পরের অংশ ছিল, ‘সিন্দুরিয়াপটীস্থ শ্রীযুত বাবু লালমোহন মল্লিকের বাটীতে’ পরের দিন ‘অক্সি হাইড্রোজেন যন্ত্র দ্বারা হিরকের ন্যায় প্রবল-আলোক সন্দর্শনের কথা।’ আট আনা করে টিকিট। নিউল্যাণ্ড এই আলো দিয়ে কি কি ছবি দেখাবেন, তাঁর স্লাইড শোয়ের ছবির তালিকাও পেশ করেছিলেন।
কলকাতায় এই প্রথম স্লাইড-শো। অবশ্য, ছবি তোলার কল প্রথম কলকাতায় পৌঁছেছে ১৮৪০-এ। কিন্তু তার চল শুরু হতে বছর দশেক লেগেছিল। ‘চেহারা উঠাইবার’ বা ছবি তোলার কল ব্যবহারে বাঙ্গালিদের কৃতিত্বের কথা এই প্রবন্ধের আওতার মধ্যে পড়ে না।২ আদত ক্যামেরা নিয়ে যিনি মৌলিক গবেষণা করেছেন, একজন বাঙ্গালিই করেছেন আজ অবধি, তার কথাই সংক্ষেপে বলছি।

ফোটোগ্রাফি বা পেইণ্টিংয়ের প্রতিচ্ছবি সুলভে বইয়ের পাতায় ছাপার প্রথম ব্যবস্থা হলো, উনিশ শতকের শেষের দিকে, হাফটোন ব্লকের প্রচলেন পর। হাফটোন ব্লক তৈরী করার জন্য এক বিশেষ ধরনের ক্যামেরা ব্যবহার করতে হয়, যা প্রসেস ক্যামেরা নামে পরিচিত। মুদ্রণ বিশারদ উপেন্দ্রকিশোর রায়ের কারিগরি গবেষণা এই প্রসেস ক্যামেরা সংক্রান্ত। প্রসেস ক্যামেরা ব্যবহারের পদ্ধতির মধ্যে গাণিতিক নির্ভুলতা আনা ও এই ক্যামেরাকে অভিনব ভাবে ব্যবহার করার বহু উপায় তিনি বাতলেছিলেন। সেকালের মুদ্রণজগতের লোকের কাছে ‘পেনরোজ’ পত্রিকাটি ছিল বাইবেলের মতো। এই পত্রিকায় ১৮৯৭ থেকে ১৮১২ র মধ্যে উপেন্দ্রকিশোরের নটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছিল। পরবর্তীকালে তার পুত্র সুকুমারের দুটি হাফটোন সংক্রান্ত গবেষণাপত্রও এই ‘পেনরোজ’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। পিতা-পুত্রের এই গৌরবে আজ অবধি দ্বিতীয় কোনো বাঙালি ভাগ বসাতে পারেনি।৩

বিলেত থেকে বইপত্র ও যন্ত্রপাতি আনিয়ে উপেন্দ্রকিশোর হাফটোন ব্লক তৈরীর বিদ্যা নিজেই অল্পদিনের মধ্যে আয়ত্ত করেন। ১৮৯৫-এ স্থাপিত হয় তাঁর প্রতিষ্ঠান ‘ইউ রায়’, কালক্রমে যা ‘ইউ রায় অ্যাণ্ড সন্স’ নাম নিয়েছিল।

১৮৯৭ খ্রীস্টাব্দে প্রকাশিত একটি বিজ্ঞাপন সাক্ষ্মী, উপেন্দ্রকিশোর ব্লক তৈরী করার সঙ্গে-সঙ্গেই গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। বিজ্ঞাপিত হয়েছিল যে, তিনি ৭৫, ৮৫, ১২০, ১৩৩, ১৭০, ২৪০, এমনকি ইঞ্চিপিছু ২৬৬ লাইন বা বিন্দি-বিশিষ্ট হাফটোন ব্লক তৈরী করতে পারেন।৪

আজও যদি আমরা ইঞ্চিপিছু ১৩৩ লাইনের চেয়ে সূক্ষ্ম (অর্থাৎ ১৭০ বা তারও বেশি) হাফটোন ব্লক তৈরী করার চেষ্টা করি, কলকাতায় হয়তো গুটিতিনেক প্রতিষ্ঠান সে সুযোগ দিতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শুনতে হবে, অত সূক্ষ্ম ব্লক ছাপার উপযোগী কাগজ কোথায়! সেরকম কাগজ পাওয়া গেলেও কিন্তু তাঁরা অক্ষম, কারণ একাজে যে গ্লাস স্ক্রিন দরকার, তা তাঁদের নেই। আমার অনুসন্ধান থেকে যতদূর জানি কলকাতায় ইঞ্চিপিছু ১৭৫ লাইনের বেশি সূক্ষ্ম কোনো গ্লাস স্ক্রিন কারও কাছেই নেই। উপেন্দ্রকিশোরের উপরোক্ত বিজ্ঞাপন পড়লে প্রসেস-শিল্পে নিযুক্ত কর্মীরা আরেকটি মন্তব্য করবেন, ১৭০, ২৪০ বা ২৬৬ লাইনের স্ক্রিন হয় এমন কথা কেউ কোনোদিন শোনেনি। হয়তো তাঁরা এ সন্দেহও ব্যক্ত করতে পারেন, সত্যিই যে উপেন্দ্রকিশোর এসব স্ক্রিন দিয়ে কোনো ব্লক তৈরী করেছিলেন তার কি কোনো মুদ্রিত প্রমাণ পাওয়া গেছে ? না তা যায়নি এবং তার চেও বড়ো কথা, সত্যিই কিন্তু ১৭০, ২৪০ বা ২৬৬ লাইনের স্ক্রিন কোনদিনই তৈরী হয়নি এবং যা তৈরী হয়নি তা নিশ্চয় উপেন্দ্রকিশোরের কাছেও ছিল না।

তাহলে উপেন্দ্রকিশোরের এই বিজ্ঞাপনের অর্থ কি? একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে ৮৫, ১২০, ও ১৩৩- এই তিনটি সংখ্যার প্রত্যেকটিকে যদি দুই দিয়ে গুণ করা হয় তাহলে যথাক্রমে গুণফলগুলি দাঁড়ায় – ১৭০, ২৪০ ও ২৬৬। এইখানেই লুকিয়ে আছে আসল রহস্য। উপেন্দ্রকিশোর ৮৫, ১২০ ও ১৩৩ লাইনের গ্লাস স্ক্রিনের সাহায্যেই বিশেষ কৌশলে স্ক্রিন লাইনের দ্বিগুণ সূক্ষ্মতা আনতে পেরেছিলেন হাফটোন ছবিতে। ৮৫ লাইনের স্ক্রিন ব্যবহার করে প্রস্তুত হাফটোন ছবিতে সাধারণত ইঞ্চি পিছু ৮৫ টি ডট
(বা বিন্দু) দেখা যায়, কিন্তু উপেন্দ্রকিশোর এই স্ক্রিনের সাহায্যেই সৃষ্টি করতে পারতেন ইঞ্চি পিছু ১৭০ টি ডট্‌। এবিষয়ে তার প্রবন্ধ ‘হাউ মেনি ডটস্‌’ প্রকাশিত হয় ‘পেনরোজ অ্যানুয়াল’-এ (১৯০১)। অর্থাৎ প্রবন্ধ প্রকাশের অন্তত চার-পাঁচ বছর আগেই তিনি হাতে-কলমে এবিষয়ে সাফল্য অর্জন করেছিলেন। শুধু স্ক্রিন লাইনের দ্বিগুণ নয়, চারগুণ ডট-বিশিষ্ট ছবিও তিনি তৈরি করতে পারতেন।
সাধারণ ক্যামেরার সঙ্গে প্রসেস ক্যামেরার মূল পার্থক্য একটি কাচের স্ক্রিন-ঘটিত। সূক্ষ্ম জাফরি কাটা এই স্ক্রিনের দৌলতেই মূল চিত্রটি নেগেটিভে বিন্দুর সমাহারে পরিণত হয়। আলোক-সংবেদী প্লেট বা ফিল্মের থেকে ঠিক কতটা দূরে এই স্ক্রিন স্থাপন করতে হবে, সেই হিসেবটা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু সেকালের ব্লক-নির্মাতারা কিছুটা অন্ধের মতোই অভিজ্ঞতা-সর্বস্ব আচরণের পক্ষপাতি ছিলেন। উপেন্দ্রকিশোর পেনরোজের জন্য বেশ কয়েকটি প্রবন্ধ রচনা করেন এই ‘রুল অফ দা থাম্ব’ বা হাতড়ে বেড়ানো পদ্ধতির অবসান ঘটানোর ইচ্ছায়- ‘দা হাফটোন ডট’ (১৮৯৮), ‘দা হাফটোন থিয়োরি গ্রাফিক্যালি এক্সপ্লেণ্ড’ (১৮৯৯) ও ‘মোর অ্যাবাউট হাফটোন থিয়োরি’ (১৯০৩-০৪)। ব্যবহারিক কর্মের মধ্য দিয়েই অনেক কিছু আবিষ্কৃত ও উদ্ভাবিত হয় সত্য, কিন্তু তারপর এমন একটা সময় আসে যখন প্রয়োগকর্মের অন্তর্নিহিত তত্ত্বটিকে অনুধাবন করতে না পারলে অগ্রসর হওয়া সম্ভব হয় না।
যান্ত্রিক উপায়ে স্ক্রিনদূরত্ব নির্ধারণের জন্য তিনি একটি যন্ত্রও উদ্ভাবন করেন। নাম ‘স্ক্রিন অ্যাডজাস্টমেন্ট ইন্ডিকেটর’। তাঁর হয়ে পেনরোজ কোম্পানি এটির পেটেণ্ট নেয় এবং নিজেদের প্রসেস ক্যামেরার অতিরিক্ত যন্ত্রাংশ। (অ্যাটাচমেন্ট) হিসেবে তারা এটি বিক্রি করত।
এই যন্ত্রটি আবিষ্কারের ফলে সবচে বড় লাভ হল, সাধারণ ফোটোগ্রাফি ও হাফটোন ফোটোগ্রাফির ব্যবধানটি এলো কমে। উপেন্দ্রকিশোর লিখেছিলেনঃ
Anyone with a good knowledge of photography can now make a negative with the help of a Screen Adjustment Indicator. Thus, while in the one hand the cost of negatives will be reduced owing to decreased demand on the operator’s skill, the average quality of work, on the other hand, will be improved, owing to the element of uncertainty being eliminated from the most vital portion of the work. Amateurs may henceforth be expected to take more kindly to half-tone photography.

সেকালে J. Verfasser প্রণীত ‘দা হাফটোন প্রসেস’ নামে বইটি ছিল সবচেয়ে চালু পাঠ্যপুস্তকের মতো। গ্রন্থটির চতুর্থ সংস্করণে (১৯০৭) উপেন্দ্রকিশোরের ‘স্ক্রিন অ্যাডজাস্টমেন্ট ইণ্ডিকেটর’- সংযুক্ত প্রসেস ক্যামেরার একটি ফোটোগ্রাফের প্রতিচ্ছবি ছাপা হয়। সঙ্গে ছিলো উপেন্দ্রকিশোরের কারিগরি কল্পনার মুক্তকণ্ঠের স্বীকৃতিঃ

Attempts have been made to devise automatic methods of adjusting the screen or of indicating its correct position, proportionately to the extension of the camera. Whilst such an apparatus is quite a possibility, and has been patented in two or three forms, there is not at the time of writing any apparatus on the market for the purpose, the fear being probably that the apparatus would prove too complicated to be useful. A most promising idea of this kind is an apparatus invented by Mr. Ray, of Calcutta, which seeks only to indicate the correct position of the screen, so that the operator may set it himself without having to think about the matter. This apparatus consists of a pair of rods of equal length, looking very much like half of a pantograph parallelogram. One of the free ends of these two rods is attached to a point opposite to the diaphragm of the lens. A point placed on the rear rod then indicates increase or dimunition of the screen distance proportionate to the extension or closing up of the camera. Such an arrangement implies, of course, the use of a constant size diaphragm or screen, but provision is made in Mr. Ray’s invention for correcting the indication according to any alteration of these heads.

১৯০১-এ পেনরোজ-এ উপেন্দ্রকিশোরের পূর্বোক্ত প্রবন্ধটিতে এই যন্ত্রের কার্যকরতার প্রমাণ দাখিল করতে উপেন্দ্রকিশোরকৃত ব্লকের চারটি নমুনা ছাপানো হয়েছিল। উপেন্দ্রকিশোর জানিয়েছিলেন, এগুলি একবার মাত্র এচ্‌ করা ব্লক থেকে ছাপা। অর্থাৎ ফাইন-এচিঙ্গের কেরামতি এখানে একেবারেই অনুপস্থিত। ইলফোর্ড প্রসেস প্লেটে ছবিগুলো তোলা হয়েছিল। উপেন্দ্রকিশোর লিখেছিলেন, প্রবন্ধটি রচনাকালে তাঁর প্রতিষ্ঠানে আগের মতো মাইক্রোস্কোপ ব্যবহারের পাট উঠে গেছে, তার আর প্রয়োজনও পড়ে না
‘স্ক্রিন ইণ্ডিকেটর’ এর দৌলতে।
খুব ছোট ছিদ্রের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় আলো তার সরলরেখা চরিত্র থেকে বিচ্যুত হয়, অর্থাৎ কিঞ্চিত বেঁকে যায়। এই ঘটনাটিই ডি-ফ্র্যাকশান নামে পরিচিত। উপেন্দ্রকিশোরের আগে হাফটোন ছবির তত্ত্ব নিয়ে যত আলোচনা সবই ছিল পিনহোল সংক্রান্ত (অর্থাৎ আলোর সরলরৈখিক বিস্তার সংক্রান্ত)। অথচ সকলেই জানতেন হাফটোন নেগেটিভের উপর ডি-ফ্র্যাকশানজনিত প্রভাব পড়েই। কিন্তু এ বিষয়ে স্বল্পজ্ঞানের জন্য বড় আকারের ছিদ্রযুক্ত ডায়াফ্রাম ব্যবহার করে ড-ফ্র্যাকশান ঘটিত অনাচারের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্যই সকলে ব্যস্ত ছিলেন। এই বক্তব্যের সমর্থনে ভেরফাসার এর লেখা থেকে উদ্ধৃত করছিঃ
Diffraction is known to have considerable action, but its phenomenon are difficult to explain and it hardly seems profitable to go into these bypaths of scientific speculation, if the principle of the pinhole idea is sufficient to serve our purpose as a working principle

উপেন্দ্রকিশোর ব্যাপারটি এড়িয়ে যেতে চাননি। ‘দা থিওরি অফ হাফটোন ডট্‌’-এ (১৮৯৮) তিনি লিখেছেন, ডিফ্র্যাকশানের দরুন একের পরে এক সাদা, কালো, সাদাকালো কিছু ‘ব্যান্ড’ সৃষ্টি হয় যার সাহায্যে নেগেটিভের সবচেয়ে সূক্ষ্ম ডট্‌গুলিকে আরও পাকাপোক্ত করা সম্ভব। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, “ডিফ্র্যাকশানের সাহায্য নিয়ে ইচ্ছামতো ভালো নেগেটিভ তৈরি করা খুবই শক্ত, কারণ ব্যান্ডগুলির উপর সর্বদা কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ থাকে না এবং সেগুলি ভুল স্থানে গঠিত হলে এমন নকশা সৃষ্টি হয় যা হাফটোন নেগেটিভের চেয়ে কার্পেটেই বেশি মানায়।”
এ-সম্বন্ধে তাঁর বিস্তারিত আলোচনা ‘ডিফ্র্যাক্‌শান ইন হাফটোন’ প্রকাশিত হল ১৯০২-০৩ এর ‘পেনরোজ’-এ। উপেন্দ্রকিশোর শুধু ব্যাখ্যা পেশ করেই নিরস্ত হননি, ডিফ্র্যাক্‌শানকে কাজে লাগানর জন্য তৈরি করলেন একাধিক ক্ষুদ্র ছিদ্র বিশিষ্ট ডায়াফ্রাম, নাম দিলেন, ‘ডিফ্র্যাক্‌শান মাল্টিপ্‌ল স্টপ’।
ডিফ্র্যাক্‌শান স্টপ ব্যবহার করার প্রধান সুবিধে হচ্ছে ভাল গ্রেডেশান লাভ ও মূল চিত্রের ছায়াময় অংশের প্রতিচ্ছবি গ্রহণে সাফল্য। তাছাড়া ডিফ্র্যাক্‌শানকে কাজে লাগিয়ে সাধারণ হাফটোন ডট্‌কে ভেঙে ক্ষুদ্রতর ডটে পরিণত করা সম্ভব যা আর অন্য কোনো উপায়েই সম্ভব নয়। এই ডিফ্র্যাক্‌শান স্টপ ব্যবহার করেই ইপেন্দ্রকিশোর ইঞ্চি-পিছু স্ক্রিনের লাইন-সংখ্যার দ্বিগুণ বা চতুর্গুণ ডট পেতেন হাফটোন ছবিতে। এই ব্যাপারটার উল্লেখ আগেই করা হয়েছে ১৮৯৮-এ প্রকাশিত তাঁর একটি বিজ্ঞাপন আলোচনা প্রসঙ্গে। ‘হাউ মেনি ডটস’ নামে একপাতার একটি রচনায় (‘পেনরোজ অ্যানুয়াল’ ১৯০১) তিনি তৎকালীন একটি ভ্রান্ত ধারণার বিরুদ্ধে লেখনী ধারণ করে জানিয়েছিলেন, ডাব্‌ল অ্যাপারচার ব্যবহার করলেই ছবিতে স্ক্রিন লাইন সংখ্যার দ্বিগুণ সংখ্যক ডট্‌ পাওয়া যায় না। পাওয়া যায় স্ক্রিনের লাইন সংখ্যার ১ ১/২ বা মোটামুটি ভাবে ১১/৭ গুন ডট। অর্থাৎ ১১০ লাইন স্ক্রিনের ক্ষেত্রে ১৭০টি ডট। কিন্তু উপেন্দ্রকিশোর ডিফ্র্যাক্‌শান স্টপের সাহায্যে ১১০ লাইন স্ক্রিন দিয়ে ২২০টি ডট-বিশিষ্ট ছবির ব্লক ছেপেছিলেন আলচ্য রচনার সঙ্গে (‘দা উইচ অফ ঘুম’)।
ফোর-লাইন স্ক্রিন মূলত ডিফ্র্যাক্‌শানের কাজের উপযোগী স্ক্রিন। ডিফ্র্যাক্‌শান - সংক্রান্ত আলোচনার সময়েই উপেন্দ্রকিশোর, স্ক্রিন প্রস্তুতকারী লেভি এই স্ক্রিন আর তৈরি করবেন না—এই সংবাদে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন :
The four-line screen is essentially a diffraction screen and gives excellent result with diffraction stops. It does not command such a variety of dot effects as the cross-line screen. But this defect is more than made up for by its excellence in other directions… it is a great pity that the manufacture of such a beautiful screen is going to be discontinued as announced by Mr. Levy in the last Year Book. The introduction of this screen was a step distinctly forward and ought to have marked a new era in halftone work.
ডিফ্র্যাক্‌শান-বিষয়ক প্রবন্ধটির স্বভাবসিদ্ধ পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে উপেন্দ্রকিশোর বলেছিলেন, সঠিক ব্যবহার না জানলে হাজারো সম্পদ থাকলেও আমাদের অবস্থা দাঁড়ায় সেই প্রহরীর মতো, ‘যার এক হাতে আছে তরোয়াল অন্য হাতে ঢাল, তাই চোরটা যখন ছুটে পালাল প্রহরী তাকে পাকড়ে ধরতে পারলো না।’
সাধারণ গ্লাস স্ক্রিনে দুইগুচ্ছ সমান্তরাল রেখা থাকে। প্রতিটিগুচ্ছের সমদূরবর্তী রেখাগুলি অপর গুচ্ছের সমান্তরাল রেখাগুলিকে ৯০ ডিগ্রিতে ছেদ করে।
উপেন্দ্রকিশোর নতুন একটি স্ক্রিনের প্রস্তাব করেন যাতে ৯০ ডিগ্রির পরিবর্তে গুচ্ছদুটি ৬০ ডিগ্রিতে পরস্পরকে ছেদ করবে। এরকম একটি স্ক্রিন তৈরি হওয়ার আগেই ৬০ ডিগ্রি কোণে আনত রেখা বরাবর হাফটোন ডটের সজ্জার উপযোগিতার কথা তিনি ‘পেনরোজ অ্যনুয়াল’-এর ১৮৯৭ ও ১৮৯৮-এ তার প্রকাশিত রচনায় উল্লেখ করেন। তারপর দুই গুচ্ছের বদলে তিন গুচ্ছ রেখা, যাতে প্রত্যেকটি গুচ্ছের সমান্তরাল রেখাগুলি অপরটির সঙ্গে ৬০ ডিগ্রি কোণে আনত অবস্থায় থাকবে—এই ধরনের একটি স্ক্রিনের পরিকল্পনা করেন উপেন্দ্রকিশোর। স্ক্রিনটির নাম করন করেন ‘থ্রি লাইন স্ক্রিন’।
১৯০৫-০৬এর ‘পেনরোজ অ্যানুয়াল’-এ দ্য সিক্সটি ডিগ্রি ক্রস-লাইন স্ক্রিন’ প্রবন্ধে থ্রি লাইন স্ক্রিন সম্বন্ধে উপেন্দ্রকিশোর লিখেছেন: “১৮৯৯ নাগাদ মেসার্স পেনরোজ কম্পানি মারফত আমি মিস্টার লেভিকে অনুরোধ করেছিলাম আমাকে এইরকম একটি স্ক্রিন তৈরি করে দেওয়ার জন্য, কিন্তু তিনি সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন। সত্যিই এ-ধরনের স্ক্রিন তৈরি করা খুব শক্ত। মিস্টার শুল্‌ৎজেও সেই কথা বলেছেন, এবং অন্যান্য নির্মাতাদের কাছে অনুরোধ জানানোর পর আমিও তা জানতে পেরেছি। কিন্তু এইসব অসুবিধার চরিত্র ও মাত্রা যা-ই হোক না, ফোর-লাইন স্ক্রিন নির্মাতার প্রতিভার কাছে [মিস্টার লেভি] তা কখনোই অনতিক্রম্য হতে পারে না।
“যাই হোক, আমার পছন্দ মতো স্ক্রিন যখন নির্মাতারা তৈরি করলেন না, তখন তারা যা তৈরি করতে পারবেন তাই গ্রহণ করা ছাড়া আমার আর বিকল্প রইল না। আমি মিস্টার লেভিকে দিয়ে আমার জন্য একটা ৬০ ডিগ্রি ক্রস-লাইন স্ক্রিন তৈরি করিয়ে নিলাম। এর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই খবর পেলাম মিস্টার শুল্‌ৎজে এটির পেটেন্ট নিয়েছেন।”
আশ্চর্য লাগে, যখন দেখি শুল্‌ৎজের লেখা থ্রি লাইন্‌ড হাফটোন এনগ্রেভিং’ প্রকাশিত হচ্ছে ‘পেনরোজ’ পত্রিকায় ১৯০৩-১৯০৪-এ, আবার পরবর্তী বছরে (১৯০৫-১৯০৬) একই পত্রিকায় উপেন্দ্রকিশোর রচিত এই পেটেন্ট গ্রহণের নেপথ্যকাহিনীও ছাপা হয়েছে কিন্তু অন্যায়ভাবে বঞ্চিত হওয়া সত্ত্বেও কোনো তিক্ততা প্রকাশ পায়নি। তিনি শুধু নৈর্ব্যক্তিকভাবে পুরো ঘটনাটির ইতিহাস তুলে ধরেছেন।
তবে এই প্রসঙ্গে তাঁর সবচেয়ে স্মরণীয় উক্তি :
To the craft it matters little who gets the credit for a particular invention. What directly concerns them is the addition of a valuable resource to their equipment.
এর পরেই তিনি ৬০ ডিগ্রি স্ক্রিন সম্বন্ধে প্রবঞ্চক শুল্‌ৎজের প্রকাশিত রচনার কয়েকটি ত্রুটি ধরিয়ে দিয়েছেন।
৬০ ডিগ্রি স্ক্রিনের উদ্ভাবক হিসেবে, পেটেন্ট তালিকার কোটি কোটি নামের মধ্যেই শুধু বেঁচে থাকবে শুল্‌ৎজে। ৬০ ডিগ্রি স্ক্রিনের পেটেন্ট-কার হিসেবে অর্থ ছাড়া সে কিছুই পায়নি, কেননা ৬০ ডিগ্রি স্ক্রিনের ব্যবহারবিধি সম্বন্ধে কিছুই সে জানত না।
এই স্ক্রিনকে কাজে লাগাতে হলে, এর থেকে বিশেষ উপযোগিতা পাওয়ার জন্য কি আকৃতি ও আকারের স্টপ বা দায়াফ্রাম ব্যবহার করতে হয় সেটাও হিসেব কষে, এঁকে, ব্যাখ্যা করে দেখিয়ে দিয়েছিলেন উপেন্দ্রকিশোর, আলচ্য প্রবন্ধটিতে।
রঙিন ছবির হাফটোন প্রতিচ্ছবি ছাপার জন্য হয় গোলাকার, নয়তো দুটি আয়তাকার গ্লাস স্ক্রিন ব্যবহার করে তিনটি নেগেটিভ তৈরি করে নিতে হয়। উপেন্দ্রকিশোর প্রথম প্রমাণ করলেন যে একটিমাত্র আয়তাকার ৬০ ডিগ্রি স্ক্রিন ব্যবহার করেই (বিশেষভাবে প্রস্তুত কয়েকটি ডায়াফ্রামের সাহায্যে) থ্রি কালার হাফটোন ছবি ছবি ছাপার উপযোগী তিনটি হাফটোন নেগেটিভ প্রস্তুত করা সম্ভব। এই ধরনের রঙিন ছবিতে যে লাইন-এফেক্ট পাওয়া যায় তা ক্ষেত্রবিশেষে অতি সন্তোষজনক।
প্রসেস ক্যামেরার কর্মপদ্ধতির উন্নতি সাধনে উপেন্দ্রকিশোরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান মালটিপ্‌ল স্টপ। উপেন্দ্রকিশোরের প্রস্তাবগুলির পরিচয় দেওয়ার আগে জেনে নেওয়া দরকার সে-সময়ে কী ধরনের স্টপ ব্যবহার করা হত (আজও তাই হয়) এবং সেই সাধারণ স্টপ-এর (সিঙ্গল স্টপ-এর) কার্যপ্রণালী ছিল কী ধরনের। ভেরফাসারের বই থেকেই সেই বিবরণ দেওয়া হচ্ছে।
হাফটোনের কাজে নানা ধরনের আকৃতির স্টপ ব্যবহার করা হত, কিন্তু ডায়াফ্রাম পাতের মধ্যে ছিদ্র থাকতো একটিই। (তাই এগুলিকে উপেন্দ্রকিশোর ‘সিঙ্গল স্টপ’ আখ্যা দিয়েছিলেন।) চৌকো আকৃতির স্টপ ব্যবহার করলে পাওয়া যায় চৌকো ডট্‌। কিন্তু এই চৌকো স্টপটির বাহুগুলি যদি স্ক্রিন-লাইনের সঙ্গে ৪৫ ডিগ্রি কোনে স্থাপিত হয় (রুইতনের ফোঁটার মতো) তাহলে ডটের চেহারাটা হয় প্রায় আটকোণা ক্ষেত্রের মতো, কারণ স্ক্রিনের লাইন চৌকো স্টপের কোণগুলিকে ছেঁটে ফেলে। কিন্তু এই স্টপের কোণগুলি যদি কেটে বাড়িয়ে দেওয়া যায় তাহলে ডটগুলি ওই কোণাগুলি বরাবর ছড়িয়ে পড়বে। এই ছড়িয়ে পড়াকেই সাধারণত ‘জয়েনিং আপ’ বলা হয় এবং প্রসেস কর্মীরা এই ঘটনাটিকে স্বাগত জানায়। কারণ এর ফলে হাইলাইট অংশের সাপেক্ষে নেগেটিভের ডটগুলি আংশিক ভাবে একে অন্যের ওপর এসে পড়ে (overlap) এবং দাবা বোর্ডের মতো বাঞ্ছিত নকশা গঠন করে। ভেরফাসারের লেখা থেকে জানা যায় চৌকো স্টপ, বর্ধিত কোনাসমেত চৌকো (square stop with extended corners) ছাড়াও ক্রস চিহ্নের, তারার বা পিনকুশনের আকৃতির স্টপও ব্যবহার হতো, কিন্তু এসবের কার্যকরতা সম্বন্ধে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সন্দিগ্ধ। এবং বর্ধিত কোনা সমেত চৌকো স্টপ ছাড়া আর কোনো আকৃতির স্টপের বিষয়েই একটি ছত্র বর্ণনা করেননি।
এবার দেখা যাক ভেরফাসার এইসব সিঙ্গল স্টপ ব্যবহারের প্রণালী সম্বন্ধে কী জানিয়েছিলেন। সাধারণত ফোটোগ্রাফ তোলার মতো শুধু যদি একটি মাপের (size) ডায়াফ্রাম ব্যবহার করে এক্সপোজার দেওয়া হয়, তাহলে শ্যাডো অংশে ডটগুলি গঠিত হওয়ার আগেই নেগেটিভের হাইলাইট অংশ পুরোপুরি গঠিত হয়ে যায়। মিড্‌ল টোন অংশের ডট্‌গুলিও অসম্পূর্ণ থাকে। তাই সাধারণ পদ্ধতি হল শ্যাডো অংশে জোর করে ডট ফুটিয়ে তোলা। এটা করার জন্য খুব ছোটো মাপের একটা গোলাকার ডায়াফ্রামের সাহায্য নেওয়া হয়—এই ধরা যাক f/64 মাপের বা তারও ছোটো। এই স্টপ ব্যবহারের সময় কপির উপর একটা সাদা কাগজ ধরা হয় এবং মাঝে-মাঝে সেটা নাড়া হয় যাতে কাগজের কোনো ভাঁজ বা দাগ ইত্যাদির প্রতিবিম্ব নেগেটিভে না আসে। এই স্টপ ব্যবহারের ফলে নেগেটিভের সর্বত্র ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিচ্ছিন্ন ডট সৃষ্টি হয় (একেই বলে ফ্ল্যাশিং)। এরপর হিসেব করে প্রয়োজনীয় আকারের একটি চৌকো স্টপ লাগিয়ে এমনভাবে এক্সপোজার দেওয়া হয় যাতে ছবির প্রতিবিম্ব নেগেটিভে গৃহীত হয়। এই এক্সপোজারের মান হিসেব করা হয় এইভাবে—স্ক্রিন ব্যবহার না করে ছবি তুলতে যতক্ষণ এক্সপোজার দিতে হতো এখানে তার মোটামুটি ভাবে পাঁচগুণ বেশি সময় লাগবে। বেশিরভাগ সাধারণ হাফটোন ছবির ক্ষেত্রে দুটি এক্সপোজারই (দু’ধরনের স্টপ ব্যবহার করে) যথেষ্ট (কোনোরকমের দায়সারা কাজ)। কিন্তু জটিল ছবির ক্ষেত্রে যেমন ধরা যাক একটি ‘ফ্ল্যাট’ বা ভোঁতা ছবি—যার মধ্যে বৈষম্য ও উজ্জ্বলতার অভাব, যার হাইলাইট অংশ তুলনামূলকভাবে ঘন (dark) এবং শ্যাডো অংশ হালকা (light)—সেক্ষেত্রে কিন্তু আরেকটি স্টপ ব্যবহার করে আরেকবার এক্সপোজার দেওয়া দরকার। এই তৃতীয় স্টপটিই হল বর্ধিত-কোনা বিশিষ্ট চৌকো স্টপ, যা জয়েনিং আপ ঘটাতে সাহায্য করবে। এইসব বিভিন্ন এক্সপোজারের মধ্যকার অনুপাত নির্দিষ্ট করা অসম্ভব। বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা মারফতই তা জেনে নিতে হয়।
এই ঠেকে শেখার ও হাতড়ে বেড়ানোর ‘এম্পিরিকাল’ প্রণালীর অবসান ঘটাতেই উপেন্দ্রকিশোরের গবেষণা। তিনি চেয়েছিলেন টপ ও এক্সপোজার ব্যবহারের মধ্যে বৈজ্ঞানিক শৃঙ্খলা।। এবং সে কাজ শুধু ব্যবহারিক দক্ষতা দিয়ে হয় না, তাঁর জন্যই প্রয়োজন তত্ত্ব-অনুশীলন। উপেন্দ্রকিশোর ১৮৯৮ খ্রীষ্টাব্দে ‘পেনরোজ পত্রিকায় সচিত্র গাণিতিক ও জ্যামিতিক আলোচনা সহকারে মাল্টিপল স্টপ তৈরি করার ও ব্যবহারের প্রণালী ব্যাখ্যা করেন। মালটিপল স্পট ব্যবহার করলে একাধিক সিঙ্গল স্টপ ও একাধিক এক্সপোজারের আর প্রয়োজন পড়ে না।
১৮৯৯-এর ‘দা হাফটোন থিওরি গ্রাফিক্যালি এক্সপ্লেন্‌ড’ প্রবন্ধে তিনি স্লিট আকৃতির একটি মালটিপল স্টপের কথা বলেছেন। ‘ডিফ্র্যাকশান হাফটোন’ (১৯০২-০৩) প্রবন্ধে উল্লিখিত তাঁর ডিফ্র্যাকশান স্টপের কথা আগেই বলা হয়েছে, এটিও ‘মালটিপল স্টপ’। ‘দা সিক্সটি ডিগ্রি ক্রস-লাইন স্ক্রিন’-এ (১৯০৫-০৬) তিনি এই স্ক্রিনের উপযোগী ‘মালটিপল স্টপ’ এবং এই একটিমাত্র স্ক্রিন নিয়ে ‘থ্রি কালার হাফটোন’ তৈরির উপযোগী স্টপ নির্মাণের পদ্ধতি (ব্যাখ্যা সমেত) বর্ণনা করেছেন। তবে ‘মালটিপল স্টপস’ (১৯১১-১২) নামে ‘পেনরোজে প্রকাশিত তাঁর শেষ রচনাটি এ-বিষয়ে ব্যবহারিক কর্মীদের (গবেষকদেরও) পক্ষে আজও অবশ্যপাঠ্য হওয়া উচিত। এর মধ্যে নানা ধরনের ‘মালটিপল স্টপ’-এর সচিত্র বর্ণনা আছে।
এই ‘মালটিপল স্টপস’ প্রবন্ধটিতে আছে এই স্টপগুলি দিয়ে প্রস্তুত ব্লক থেকে মুদ্রিত চিত্রের নমুনা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি আলোকচিত্র থেকে চারভাবে প্রস্তুত (একটি নর্মাল-দূরত্বে গোলাকার স্টপ দিয়ে, ও বাকি তিনটি তিন ধরনের মালটিপল স্টপ দিয়ে তোলা) চারটি হাফটোন ছবি। তাছাড়া হেরম্বচন্দ্র মৈত্রের একটি আলোকচিত্র থেকেও চারভাবে প্রস্তুত হাফটোন ছবি।
‘পেনরোজ’ অ্যানুয়্যাল’-এ প্রকাশিত উপেন্দ্রকিশোরের ন’টি রচনার কালানুক্রমিক তালিকা এখানে দেওয়া হল :
1. Focusing the Screen By U. Ray, 1897, pp.108 to 111.
2. The Theory of the Half-tone Dot, Upendrakisor Ray, (Calcutta), 1898, pp. 33 to 40.
3. The Half-tone Theory Graphically Explained By U. Ray, 1899, pp. 49 to 53.
4. Automatic Adjustment of the Half-tone Screen, By U. Ray, Calcutta, 1901, pp 76 to 80.
5. How Many Dots? By U. Ray, Calcutta, 1901, p.81
6. Diffraction in Half-tone Theory By U. Ray, Calcutta, 1902-03, pp. 81-91.
7. More about the Half-tone Theory By U. Ray, Calcutta, 1903, pp. 17-23.
8. The 60° Cross-Line Screen By Upendrakisor Ray, 1905-06, pp. 97 to 102.
9. Multiple Stops By Upendrakisor Ray, Calcutta, 1911-12, pp 81-88.

উপেন্দ্রকিশোরের গবেষণার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির নিদর্শন রূপে পেনরোজ-সম্পাদক গ্যাম্বল-এর একটি লেখা পরিশিষ্টে উদ্ধৃত হলো।
ভারতীয় শিল্পীদের কাজের সঙ্গে সাধারণ মানুষের প্রথম পরিচয় ঘটে উপেন্দ্রকিশোরের হাফটোন ব্লকের মধ্যস্থতায় ‘প্রবাসী’ ও ‘মর্ডান রিভিউ’ পত্রিকার পাতায়। উডকাট ও লিথোগ্রাফিকে অতিক্রম করে হাফটোন ব্লকের সৌজন্যে বাংলা গ্রন্থ চিত্রণে যে যুগান্তর এল, তার পিছনেও উপেন্দ্রকিশোরের অনিবার্য উপস্থিতি।
‘বঙ্গীয় গ্রন্থচিত্রণ’ প্রবন্ধে কমল কুমার মজুমদার লিখেছেন, “বাংলায় আধুনিক গ্রন্থ-চিত্রণে দুইজন আমাদের চৈতন্য দিয়া থাকেন—ধার্মিক গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অন্যজন দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার।” ‘ঠাকুমার ঝুলি’র জন্য আঁকা, গ্রন্থকার দক্ষিণারঞ্জনের ছবিগুলিকে কাঠ খোদাই করে ব্লক তৈরি করেছিলেন খ্যাতনামা প্রিয়গোপাল দাশ ও আরও তিনজন। কমলকুমার সম্ভবত জানতেন না, গগনেন্দ্রনাথের ছবিগুলির ব্লক নির্মাণ করেছিলেন উপেন্দ্রকিশোর। প্রিয়গোপালের বুলির আঁচড়ে কাঠের ব্লক তৈরি করার উপযোগী করেই ছবিগুলি এঁকেছিলেন দক্ষিণারঞ্জন। উপেন্দ্রকিশোর ফটোগ্রাফির সাহায্যেও এই ব্লক তৈরি করে দিতে পারতেন, কিন্তু কোনো উড-ব্লক নির্মাতার সাধ্য ছিল না গগনেন্দ্রনাথের ছবির তরল রঙের ছড়িয়ে পড়া আর ঘন হওয়াকে মুদ্রণোপযোগী রূপ দেওয়া। লিথোগ্রাফিতে রবি বর্মা ও অন্নদাপ্রসাদ বাগচী এবং কাঠ-খোদাইয়ে ত্রৈলোক্যনাথ দেব ও প্রিয়গোপাল দাশ প্রমুখের প্রতিভাকে পূর্ণ মর্যাদা দিয়েও স্বীকার করতে হবে যে, গ্রন্থ-চিত্রণের জগতে লিথোগ্রাফি, উড ও স্টিল এনগ্রেভিং ও এচিং ইত্যাদিকে যদি এক একটি জানলা রূপে কল্পনা করা যায়, তবে হাফটোন-এর বাতায়নই সেখানে সবচেয়ে বেশি রঙ আর তার আমেজ ছড়িয়েছে।
১৯০২ খ্রীষ্টাব্দে উপেন্দ্রকিশোর কৃত ব্লক থেকে রঙিন প্রতিচ্ছবি প্রকাশিত হওয়ার পর ‘প্রবাসী’ সম্পাদককে চিঠি দিয়েছিলেন রবি বর্মা। সম্পাদকের ভাষায়, “রবি বর্মা স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া ইহার প্রশংসা করেন”
উপেন্দ্রকিশোর প্রতিষ্ঠিত ‘ইউ রায় এন্ড সন্স’ প্রতিষ্ঠানেই হাতেখড়ি হয় কলকাতার যাবতীয় হাফটোন ব্লক-কুশলীদের–যাঁদের অনেকেই পরবর্তীকালে স্বাধীনভাবে ব্যবসায় নামেন। কলকাতায় হাফটোন ব্লক নির্মাণ কালক্রমে কুটিরশিল্পের মতো হয়ে দাঁড়ায়। এতা এক ধরনের চেন-রিঅ্যাকশান—এক থেকে দুই, দুই থেকে চার করে যা প্রসারিত হয়। এই বিক্রিয়ার জন্মদাতা উপেন্দ্রকিশোর।

আপনার মতামত জানান