সবজেটে গ্রিন ক্যাম্পাস/কৌস্তভ ভট্টাচার্য

প্রথম পর্ব

photo courtesy: Bikramaditya Guha Roy



ACT I


“What we call the beginning is often the end. And to make an end is to make a beginning. The end is where we start from” - T.S. Eliot



(১)
দোলনা মেয়েটার ভালো মেয়ে হিসেবে কোনো বদনাম নেই। দোলনা সেনগুপ্ত, যে পদবীটাকে সেনগুপ্তা শুনতেই বেশি পছন্দ করে। সামান্য পরে জন্মে গেছিলো – নইলে বিভূতিভূষণ যদি আশেপাশে থাকতেন আর দৈবাৎ যদি দোলনার নাম দুগগা হতো – তাহলে ও মাঠেঘাটেই চড়ে বেড়াতো, বৃষ্টিতে ভিজে টিজে ‘নেবুর পাতা করমচা’ গাইতো, গর্তে হাত ঢুকিয়ে বেজি টেজি বের করতো।
অ্যালাস – বিভূতিভূষণ গত হয়েছেন বেশ কিছুদিন হলো – সত্যজিতও আজকাল আর সিনেমা টিনেমা বানান না। তাই দোলনাকে ফিলহাল আমার ভ্যাদভ্যাদে গল্পের ক্যারেক্টার হয়েই থাকতে হচ্ছে।
ব্যাকগ্রাউন্ড স্টোরিটা বলে দেওয়া যাক এই ফাঁকে। জন্মকর্ম দোলনার কোলকাতাতেই। বেহালাতে জন্ম, বড়ো হয়ে ওঠা যাদবপুর এইটবি থেকে যে রাস্তাটা গিয়ে লেক গার্ডেন্সে মিশেছে – সেখানে। রাস্তাটায় এককালে অটো চলতো শুধু, আজকাল কিছু উদ্ভ্রান্ত যৌবন ইনোভা ঢোকাবার সাহসও করে ফেলছে।
স্কুলে স্কুলে ঢলে ঢলে দোলনা এঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে ২০০৭-এ। তারপর দ্য গ্রেট গ্র্যান্ড আইটি উদযাপন – তারপর - তারপরটুকু নিয়েই গল্প।
গড়পড়তা বাঙালির কাছে বি-স্কুল শব্দটাই অপরিচিত। আসলে নাবালক বাঙালি বরাবরই নিজেকে বেশ একটা গ্রোন আপ হনু দেখাতে ভালোবাসে। তাই ক্লাস টুয়েলভ পেরোলে – স্কুল শব্দটার মায়া কাটিয়ে কলেজ, ইউনিভার্সিটি এসবেই অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এই গড়পড়তা বাঙালির লিস্ট থেকে অবশ্য ক্যাট অ্যাসপির্যারন্টসদের বাদ রাখাই শ্রেয় – তারা মেরিট লিস্ট ছাড়া আর কোনো লিস্টে আদৌ থাকতে অ্যাট অল ইন্টেরেস্টড কিনা – সে ব্যাপারে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
তাই এমবিএ কলেজই সই – বহুদিন অবধি একটা এমবিএ কলেজের নামই জানতো কলিকাতা কল্লোলিনী – ডিয়ার ওল্ড আইআইএম জোকা। ইদানীং আমেদাবাদ আর ব্যাঙ্গালোরটাও মোটামুটি ফেসবুকের মতোই - সর্বত্র পূজ্যতে।
দোলনা যখন, পিনাকল ইন্সিটিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট চুজ করলো – তখন বন্ধুবান্ধব, কলিগস নাহয় ছেড়েই দিলাম – দোলনার বাবা মাও যথেষ্ট কিন্তুকিন্তুময় ছিলেন। কিন্তু ভালো ভালো কথা শুনলে তো দোলনা ভালো মেয়েই হয়ে যেতো। তাই চরৈবেতি – চাকরিতে ইতি – এমবিএ করতে চললো বাউলিনী প্রকৃতি।তবে স্থান-কাল-পাত্র লাহুল-স্পিটি নয়। চেন্নাই। ল্যাটিটিউড-লঙ্গিটিউড সবই জানবেন – যথাস্থানে। প্রকাশক উপন্যাস লেখার বরাত দিয়েছেন – প্রথম অধ্যায়ে পুরো গপ্পোটা বলে দিলে আপনারা থোড়াই বেস্ট সেলার বানাবেন বইটাকে? (এমনিও বানাবেন না সে আমি জানি। আশীর্বাদ কোরো মা – আর জন্মে যেন জে কে রাউলিংয়ের সহোদর হই – যাতে আঙুল তুলে সবাই দেখায় – রাউলিংয়ের ভাই হয়েছে)।
উপন্যাস লেখার প্রথম শর্ত – প্রথম অধ্যায়টাকে ক্যাচি বানানো – যাতে পরবর্তী পথের অজস্র ভ্যানতাড়া –পৈশাচিক আনন্দে পাঠককে পড়তে বাধ্য করা যায়।
তাই ইতিহাস ভূগোলটা একটু শর্টেই সারি। যেকোনো সুস্থ কলেজে দুইখান ক্যাটিগরির স্টুডেন্ট থাকে – একদল নোটস নেয়, ক্লাস অ্যাটেন্ড করে, প্রেম করেনা, ল্যাপটপে পানু না দেখে অ্যাসাইনমেন্ট ঠিক সময়ে সাবমিট করে। আরেক দল নোটস জেরক্স করে, ক্লাসে ‘এই আমার অ্যাটেন্ডেন্সটা দিয়ে দিসনা’ বলে জনান্তিকে, প্রেম? উমম একটু পরেই বলছি, আর ল্যাপটপে দু-তিন জিবি পানু জমায় – সেটা এক্সচেঞ্জ করে অ্যাসাইনমেন্টের সাথে।
দোলনা ওয়াজ ফ্রম দ্য থার্ড কাইন্ড। ক্লাস অ্যাটেন্ড করতো – আবার মাঝেসাঝেই কোলকাতা চলে আসতো। অ্যাসাইনমেন্টে নিজের পার্টে চট করে লেট করতো না। আর পানু দেখতো না – কিন্তু ওর হার্ড ডিস্কটা লোকের কাছেই থাকতো পানু হস্তান্তরের মহৎ উদ্দেশ্যে।
গল্পটা যখনকার তখন প্রথমদিকের পড়াশুনোর নামে টর্চার পর্বটা শেষ হয়ে গেছে। কিছু কিছু মানুষ তখন দিনে পাঁচ-ছ ঘন্টা ঘুমোচ্ছে। কিছু কিছু মানুষ টাটা ম্যাজিক ভাড়া করে প্রায়শই নাইট আউট করছে ইদিক সিদিক। আর বাকিরা?
আস্থা জালান – একটি বিশুদ্ধ গুজরাতি বম্বশেল। দোষের মধ্যে মেয়েটার একটু অল্প বয়েসেই বিয়ে হয়ে গিয়েছিলো। যাগগে – সে তো রাধারও হয়েছিলো। তাই জালানে আস্থা হারাবার কিছু নেই।
মায়াঙ্ক অরোরা – বয়েজ হস্টেলে জি-ওয়ান-জি রুমটা অকুপাই করেছিলো। দিব্যি রুম, সামনে লন, লনের পেছনে গার্লস হস্টেল থেকে মেয়েরা ট্র্যাকস কি শর্টস পরে ঘোরাঘুরি করে। আর কলেজটার প্রত্যেকটা রুমই সিঙ্গল অকুপেন্সি – তাই ওই রাজকীয় সেলিবেসিযাপনের দেদার সুখসুবিধে।
কিন্তু বালাই ষাট আস্থা থাকতে মায়াঙ্কের সেলিবেসি যাপন করতে হবে কোন দুঃখে? প্রায়শই দেখা যেতো – আস্থা এই মোটামুটি রাত্তির এগারোটা নাগাদ মায়াঙ্কের ঘরে ঢুকছে – বেরোচ্ছে পরদিন সকালে – কিছুই না দু’জনে নির্দোষ গ্রুপ স্টাডি করেছে সারারাত। এরকম গ্রুপ স্টাডি অবশ্য বয়েজ হস্টেলে বেশ কিছু রুমেই চলতো – তবে কিনা বাই ডেফিনিশন গ্রুপ শব্দটায় টু প্লাস মেম্বার হওয়া বাধ্যতামূলক।
যাগগে সেসব টেকনিকালিটিস –তো গ্রপ স্টাডি চলছে, আর সেই গ্রুপ স্টাডিগুলোকে নির্মোহ দৃষ্টিতে স্টাডি করছে আরো কয়েকটা গ্রুপ। আস্থা আর মায়াঙ্কের দুর্ভাগ্য – তাদের একটার মধ্যে দোলনাও ছিলো।
তখন সবে দিওয়ালির মোচ্ছব শেষ হয়েছে – থার্ড টার্মের কিছু আগে – দোলনার মাথায় অ্যাজ ইউজুয়াল একটা দুর্বুদ্ধি এলো – মেন্টসের অ্যাডের বাতি যেটা শুনলে সিওর ফিউজ হতো।
দুর্বুদ্ধিতে কনভিন্সড হবার জন্য কিছু লোক সবসময় উন্মুখই থাকে – আর আফটার অল এরা বি-স্কুল স্টুডেন্টস – বড়ো হয়ে আইডিয়া বেচে খায়। তাই মহৎ আইডিয়াকে ইমপ্লিমেন্ট করতে বেশি সময় লাগায় না।
জি-ওয়ান-জিতে গ্রুপ স্টাডি একরাতে সবে শুরু হয়েছে। হঠাৎ দিগব্দিক বিদীর্ণ করে একটা দড়াম শব্দ। ভেস্ট ও শর্টস পরিহিত মায়াঙ্ক ধড়মড়িয়ে বেরিয়ে এলো। এসে দেখলো কিছু সমতুল্য উদ্ভ্রান্ত মুখ জি-ওয়ান-এইচের সামনে।
নিতান্ত বন্ধুকৃত্য করতেই সবাই মায়াঙ্কের কাছে এলো। মায়াঙ্ক বেশ কয়েকবার বাধা দিয়েছিলো – কিন্তু তাতে সদলবলে জি-ওয়ান-জিতে ঢোকা আটকায়নি বাকিদের।
ঢুকে দেখলো আস্থা আপাদমস্তক চাদরমুড়ি দিয়ে – ঘুমোচ্ছে। দলের মধ্যে কয়েকটা মেয়ে ছিলো, অবশ্যই দোলনা সহ। তো তারা আস্থার খাটের পাশে গিয়ে বসে পড়লো – গিয়ে ‘কি রে ভয় পেয়েছিস?’, ‘কি রে কথা বলছিস না কেন?’ – কিন্তু কমলিকে অ-চাদরা করা গেলনা। আস্থার ওড়নাটা অবশ্য খাটের পাশে একটা চেয়ারেই পড়ে ছিলো।
দোলনা বেশ নিরীহ মুখেই মায়াঙ্ককে জিজ্ঞেস করে বসলো – ‘আচ্ছা ও ঘুমোচ্ছে কেন?’
মায়াঙ্কের দুর্ভাগ্য – ও জানতেও পারলো না – পাশের ঘরে তখন একটা মুড়ির টিনের ভেতরে কয়েকটা ফেটে গিয়ে কেলটে মেরে যাওয়া চকোলেট বোম নিজেদের জীবন সার্থক করছে। দিওয়ালিতে বেঁচে গিয়েছিলো – না বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিলো – সেসব প্রশ্ন করলে চলবে না বস।
এই সব কিছুর সাক্ষী রয়ে গেলো – ফ্যাটফ্যাটে সাদা দেওয়াল, একটা ঝিলমিলে বেডল্যাম্প, স্প্লিট এসি, দেওয়াল আলমারিসহ – চিরকালীন জি-ওয়ান-জি রুমটা।


(২)
স্মরণ যখন জি-ওয়ান-জিতে নিজের র্যাযকস্যাকটা নামালো, তখন অবশ্য ওর এতো কিছু জানার কথা নয়। মধ্যিখানে একটা বছর কেটে গেছে প্রায়। পিনাকলে ফ্ল্যাগশিপ কোর্সটা এক বছরের। দোলনারা লাস্ট টার্ম শেষ হয়ে যাওয়ায় বেরিয়ে গেছে – যদিও কনভোকেশান এখনো হয়নি। স্মরণদের ব্যাচের লোকেরা ধীরেসুস্থে জড়ো হতে শুরু করেছে, এক বছরের রগড়ানির আশায় উজ্জ্বল মুখে।
স্মরণকে বেশ ভালো ছেলেই বলা যায়। মানে ওই আলু খায় (একটু বেশিই খায়), ভাতে দিলে গলে যায় টাইপস। স্মরণের ব্যাকগ্রাউন্ড না লিখেই কমন নিয়ে নেওয়া যায় – সেই এঞ্জিনিয়ারিং, সেই কোলকাতা, সেই আই-টি বগেরা বগেরা।
স্মরণের এটা ফোর্থ ক্যাট ছিলো। আস্তে আস্তে বেড়াল আর ঘন্টার দূরত্ব বেশ সুদূরপ্রসারী হচ্ছিলো – এবারের ক্যাটে একটা বেশ মার্কামারা রেজাল্টও হয়েছিলো – সেই পারসেন্টাইলে আই-আই-এম এর এম অর্থাৎ ম্যানেজমেন্ট শুধু আশা রাখলেই হয়তো টিউশন ফিজ দাবি করতো। তো জীবন স্মরণকে অনেক কিছুই মেনে নিতে শিখিয়েছে – অফিসে চোদ্দো ঘন্টার দৈনিক কাহন, দিবস ও রজনী অফিস বাসে দেড় দেড় তিন ঘন্টার সোচ্চার লীলা এবং সর্বোপরি একটি গার্লফ্রেন্ড –রুচিরা - যে প্রতি সাড়ে তিন নম্বর দিনে ‘আই উইল নট টক টু ইউ এনিমোর’ লিখে শর্ট মেসেজে বিক্ষোভ জানায়।
এসব কিছু যখন মেনেই নিয়েছে তখন চার নম্বর বারে মাথা হেঁট হওয়ার কোনো কারণ স্মরণ দেখেনি কমরেড – ভবিতব্যকে মেনে নিয়ে বসের ঝোলানো অনসাইটের মূলোকেই ফাইনাল ডেস্টিনেশান মেনে নিয়েছিলো।
২৫শে মার্চ, ২০১১ – একটা মেইল এলো স্মরণের পার্সোনাল মেইলবক্সে – ওয়েলকাম অনবোর্ড লেখা – পিনাকল থেকে। ১৬ই এপ্রিল জয়েনিং।
মেইলে আরেকটা গেরো ছিলো যদিও – পিনাকলের দক্ষিণাটাও লেখা ছিলো – তিনটে ইন্সটলমেন্টে পেমেন্ট করতে হবে – সাকুল্যে বেশি নয় – লাখ পনেরো – যেটা ওইটুকু সময়ের মধ্যে কিডনির কাস্টমার না পেলে – স্মরণের নিজের পক্ষে দেওয়া সামান্য সমস্যাই বলা উচিৎ।
আরেকটা ছোট্টো চাপ ছিলো – নিজের বসকে কনভিন্সড করা – যে ৮০ বন্ধু আবার দেখা হবে।
দ্বিতীয় চাপটা উতরে গেলো কিছুটা প্রত্যুৎপন্নমতিত্ত্ব ে, কিছুটা কয়েকজন সিনিয়র কলিগরূপী দেবদূতের দয়ায়। প্রত্যুৎপন্নমতিত্ত্ব টা ছিলো বসকে বলার আগেই পাতা ফেলে দেওয়া (সাধারণ মানুষের ভাষায় রেজিগনেশান দিয়ে দেওয়া)।
দ্বিতীয়টা ওয়াজ মোর চাপের। স্মরণ আর স্মরণের হতভাগ্য এমবিএ অ্যাসপিরান্টের হতভাগ্য বাপ মোটামুটি কোলকাতা খুঁড়ে ফেললো লোনের আশায়। কিন্তু সুন্দরী প্রেমিকা আর দরকারের সময়ে এডুকেশান লোন দুটোই পেতে প্রায় প্রথমবার এভারেষ্ট সামিটে চড়ার আগে যতোগুলো অ্যাটেম্পট নিতে হয়েছিলো – তার প্রায় কাছাকাছি সংখ্যক ট্রায়াল এন্ড এরর করতে হয়।
কিন্তু নিয়তি কেন বাধ্যতে। আর নিয়তিদেবী বোধহয় কোনোকালে এমবিএতে ফলস প্রচেষ্টা করে পরাভূতা হয়েছিলেন। তাই স্মরণকে হেল্পই করলেন। জানা গেল একটা সংস্থার সাথে পিনাকলের ভাইচারা প্রায় গাঁটছড়া পর্যায়ের।
যাওয়া হলো সেখানেও। দেখা গেল কথাটা মিছে নয়। প্রায় নামমাত্র গ্যারান্টী ও ভেরিফিকেশানের পরেই – মোটামুটি একটা অ্যাকসেপ্টেবেল রেটে এডুকেশান লোন গ্র্যান্ট হয়ে যাবে – তিন-চারদিনের মধ্যেই।
তা হলো – ব্যাগবাঁটোরা তৈরী হতে লাগলো সাথে সাথেই। তবে পিনাকল বেশ না নামকরা নয়, নামকরা দরকার এ’রম কলেজ। নইলে কখনো এক্সিট ইন্টারভিউতে সবজান্তা এইচ-আর জিজ্ঞেস করে যে – ‘আচ্ছা এটা কী আই লিগের কলেজ?’ (এই জোকসটা এমবিএ না করলে হয়তো ধরতে পারবেন না। কাটিয়ে দিন। পরের লাইনে কনসেনট্রেট করুন)।
এই অধ্যায়টার দুটো সাব অধ্যায় লেখা দরকার। নাহলে ব্যাপারটা শেষ হবেনা।

পাগলগাই
জানি বাবা জানি – গল্পে ব্র্যান্ডের নাম ইউজ করা বারণ – কিন্তু এই নামটা এতোই লোভনীয় – সামলাতে পারলাম না।
এমবিএ উন্মুখদের ফুলটু গণতান্ত্রিক প্ল্যাটফর্ম পাগলগাই ডট কম। সার্থক নামই বটে।
এখানে সমস্ত পাগল ষন্ড এবং পাগলিনী গাভীরা নিজস্ব স্বপ্নের অথবা দুঃস্বপ্নের কলেজটির থ্রেডে একের পর এক প্রশ্ন করতে থাকেন। আর কিছু ডেডিকেটেড হতভাগ্য যারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কলেজের অ্যাডমিশন কমিটির স্টুডেন্ট মেম্বারস হয় তাদের প্রশ্নগুলোর একের পর এক উত্তর দিয়ে যেতে হয়।
প্রশ্নগুলো অনেক সময় এ’রম হয়।
- বি-স্কুলে শেষ দশ বছরে ওয়েটিং লিস্ট কতোটা মুভ করেছিলো?
- আচ্ছা আমি ছোটোবেলায় ‘কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের’ নোটবুক আবৃত্তি করে সেকেন্ড প্রাইজ পেয়েছিলাম। ওখানে কোনো রিসাইটেশানের জন্য ফোরাম আছে?
- আচ্ছা বাথরুমে সারাক্ষণ গরম জল আসে? একেকজন চাপের টাইমে বাথরুম কতক্ষণ আটকে রাখে?
- কাছাকাছি ভালো বিয়ার পাওয়া যায়?
- সমস্ত চেন্নাইআইটস, দিল্লীআইটস, মুম্বাইকরস, কোলকাতান্সদের জন্য একটা করে মিট করলে কেমন হয়? (ওহ আই অ্যাম গেম ফর ইট – হয়তো কোনো ললনার রিপ্লাই)।
তো এই প্রচন্ড তান্ডবের মধ্যে যে রিপ্লাই দেবে তার পাগলগাই কেন, পাগলপিপিলীকাভুক হলেও কিছু বলার ছিলোনা।
বলতে নেই স্মরণও কয়েকটা প্রশ্ন করেছিলো। তবে কিনা – সেকেন্ড লিস্ট থেকে ক্লিয়ার হয়েছিলো – তাই বেশি সময় পায়নি – ভাগ্যিস!
এবং রুচিরা
রুচিরা চক্রবর্তী নারী নন। তিনি একজন কনসেপ্ট।
বলতে নেই ভদ্রমহিলা – শিক্ষিতা, সুন্দরী, সাদা সাদা এবং বেশ ভালো ভরতনাট্যম নাচতেন।
স্মরণ সাবালক হবার পর থেকে মোটামুটি বছরে একটা ফ্রিকোয়েন্সিতে প্রেমে পড়ে। মাইন্ড ইট প্রেমে পড়ে – প্রেম করেনা – কারণ প্রেম করতে গেলে রাস্তায় লেভেল ক্রসিং না থাকা বাধ্যতামূলক। স্মরণ লেভেল ক্রসিংয়ে এতোবার আটকেছে যে লাইনটা যে ক্রসও করা যায় – সেটা প্রায় ভুলেই গেছিলো।
সেই সময়ই রুচিরার আবির্ভাব এবং কেন জানিনা প্রায় হঠাতই স্মরণের প্রেমে পড়ে যাওয়া।
সেদিনটা নববর্ষ ছিলো। ১৫ই এপ্রিল, ২০১১। পরদিন স্মরণ চলে যাবে। তাই দু’জনে সাউথ সিটিতে দেখা করেছিলো একবার। স্মরণ একটা লাল রঙের পাঞ্জাবি পরেছিলো। রুচিরা একটা শাড়ি – এথনিক দিন বলে কথা।মোটের ওপর দু’জনকেই বেশ দেখাচ্ছিলো।
স্মরণ রুচিরা এগিয়ে দিয়েছিলো ওর বাড়ি অবধি – ঢাকুরিয়ায়। এখানে বলে রাখা ভালো উপন্যাসের এখনো পর্যন্ত সমস্ত নারীচরিত্র যে যাদবপুর এরিয়াতেই থাকে – সেটা কোলকাতা শহরের কিম্বা নারী চরিত্রদের বাবার ইচ্ছেয়। লেখকের এখানে কোনো হাত নেই।
রুচিরার গলির মুখে দাঁড়িয়ে, যেখানে বাবুবাগানের পুজো হয় – ওরা কথা বলেছিলো। গলিটায় স্মরণ ঢুকতোনা। রুচিরার মা স্মরণকে ঠিক পছন্দ করতেন না – আর তাঁর মেয়ে যে স্মরণের সাথে তাঁদেরই পাড়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে – সেটা কানে যাওয়া আরো এক ডিগ্রি বেশি অপছন্দ ছিলো।
রুচিরার বাবা ছিলেন না।
দু’জনের তৎকালীন শেষ কথা –
স্মরণঃ কাল সাড়ে তিনটের ফ্লাইট।
রুচিরাঃ অলরেডি তিনবার বলেছিস।
স্মরণঃ ইয়ে –
রুচিরাঃ ইয়ে?
স্মরণঃ ভালো করে থাকিস। মাকে জ্বালাস না। আর ফেসবুক মোবাইল সব তো রইলই।
রুচিরাঃ বাড়ি যা।
স্মরণঃ একটু পরে যাই?
রুচিরাঃ এক্ষুণি যা – নইলে এবার আমি কেঁদে ফেলবো।

(পরবর্তী অধ্যায় পরের রবিবার)

আপনার মতামত জানান