সবজেটে গ্রিন ক্যাম্পাস/কৌস্তভ ভট্টাচার্য

তৃতীয় পর্ব
(৪)
ভূগোলের বইতে আহ্নিক গতির চ্যাপটারে বিকেল আর সন্ধের মধ্যে একটা সময় বলা হয়। গোধূলি – যখন সূর্যের অস্তিত্ত্ব থাকেনা, এদিকে সন্ধেটাও আসবো আসবো করে মুখের মেকআপে ফাইনাল টাচআপ লাগায়, লিপস্টিকের শেড ডিসাইড করে।
শহর কোলকাতার মহানাগরিক গিমিক থেকে দূরে, স্বেদ-রক্ত-ক্লেশ থেকে দূরে, মূহুর্ত প্রেম ও মূহুর্ত বিচ্ছেদ থেকে দূরে – সল্টলেক – প্রাক ও মধ্য নব্বইয়ের দশকেও কয়েকটা ব্লক আর আইল্যান্ডের চারপাশে ঘুমিয়ে থাকতো।
নব্বইয়ের শেষদিকে পৃথিবীর ঘুম ভাঙলো – দুঃস্বপ্নে।
কোনো হঠাৎ জিনিয়াস – যখন কম্পিউটারের আদি সংস্করণগুলোর বোধন ঘটাচ্ছিলেন – তখন ডেটফিল্ডকে দু’সংখ্যার বেশি বছর ধরার জায়গা দেননি। সম্ভবতঃ ভদ্রলোক বিংশ শতাব্দীর মোহে আচ্ছন্ন ছিলেন – ভেবেছিলেন বিংশ শতাব্দী অবিনশ্বর, কারণ ইহা বিজ্ঞান।
এমনো হতে পারে – যে ভদ্রলোকের বাড়ি যাবার তাড়া ছিলো।
পৃথিবীর প্রায় সমস্ত অর্গানাইজেশান অনেক দেরীতে বুঝলো – ভুল হয়ে গেছে বিলকুল। এই দু’সংখ্যার বছর উনিশশো নিরানব্বই অবধি কেতায় দৌড়বে। কিন্তু নিরানব্বইয়ের একত্রিশে ডিসেম্বর রাত বারোটা বাজলেই – কম্পিউটারহীন অপেক্ষাকৃত সুখী বিশ্বের সাথে আর সহস্রাব্দপালন করতে পারবেনা। কারণ কম্পিউটারের ঘড়িতে তখন বছর দেখাবে ‘00’ –উনিশশো খ্রিষ্টাব্দ।
ওয়াই-টু-কে বলে পঙ্গপালের আশু সম্ভাবনায় শিরদাঁড়া খাড়া করে শার্টের হাতা গুটিয়ে কাজ করতে বসলো পৃথিবীর যাবতীয় কম্পিউটার প্রোগ্রামার। কিন্তু এই পর্যায়ের বাগ ফিক্সিং অ্যাকটিভিটির জন্য দরকারী জনসংখ্যা তখনো নিতান্ত অপ্রতুল।
ইতিমধ্যে দেয়াল ধরে ধরে দাঁড়াবার চেষ্টা করছিলো তৃতীয় বিশ্বের এক আসমুদ্রহিমাচল অর্থনীতি।
একানব্বইয়ের বাজেটে নরসিংহ-মনমোহন জুটির হাত ধরে সাবেকিয়ানা তথা লাইসেন্স রাজের শৃঙ্খলায় ইতি টেনে – ভারত তখন সদ্য জাগ্রত ফ্রি ইকোনমি।
ব্যাঙ্কের চাকরি, রেলের চাকরি, হেভি ইন্ডাস্ট্রির ভিড়ে – তখন একটা নতুন শব্দ আস্তে আস্তে গুনগুন করছে – ইনফর্মেশন টেকনোলজি। যেকোনো হেভি ইন্ডাস্ট্রির চেয়ে বেটার প্যাকেজ নিয়ে তখন এঞ্জিনিয়ারিং স্টুডেন্টদের কাছে সেটা একটা নতুন খুড়োর কল।
কিন্তু সুবিধে হচ্ছিলো না ঠিক। ধীরেসুস্থে বছর দশ-পনেরো কাটিয়ে দিলেও তখনো ভারতীয় সফটওয়্যার এঞ্জিনিয়াররা বাকি পনেরো আনা কম্পিউটার প্রোগ্রামিং বিশ্বের কাছে, অর্থাৎ ওয়েস্ট ইজ ওয়েস্টের চোখে – সাইবার কুলির দল।
ওয়াই-টু-কে এলো অজানা পৌষের উন্মেষ নিয়ে। সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রি আরও দুটো নতুন শব্দ শিখলো – আউটসোর্সিং বা অফশোরিং – যা সমস্ত ননস্ট্র্যাটেজিক কাজ কারবার – সাগরপাড়ে পাঠিয়ে দাও – ভারত করে দেখাক।
ভারত করে দেখালো।
স্মরণ যখন আইটি ইন্ডাস্ট্রির চৌকাঠ পেরিয়েছে – ততদিনে অবশ্য এই দেশ বেশ পাকাপোক্ত মহিমায় অধিষ্ঠিত প্রথম বিশ্বের চোখে – কর্মক্ষমতা সম্বন্ধে আশ্বাস বেড়েছে – ডেটা সিকিউরিটি নিয়ে বিশ্বাস বেড়েছে।
কোলকাতাটাও পাল্টেছে। এককালীন কম্পিউটার বিরোধের গন্ধ গা থেকে মুছে ফেলে – সরকারী বদান্যতায় তখন সল্টলেকের ঘুম কাটিয়ে তৈরী হয়ে গেছে একটা নতুন কোলকাতা – সেক্টর ফাইভ।
দু’হাজার নয় অবশ্য গল্পটায় একটা স্বল্পবিরতি লাগিয়ে দিয়ে গেলো। দেখা গেলো পৃথিবীর সমস্ত এমবিএ-র ব্লু-আইড জব ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কিংয়ের একটা বড়ো অংশ – আসলে ধোঁকার টাঁটি। লেম্যান ব্রাদার্স সাধারণ কারখানার মতো অগৌরবে বলা চলে লক-আউটই হলো। ধসে পড়ার আরো খবর আসতে থাকলো এদিক ওদিক থেকে।
আইটি ইন্ডাস্ট্রিটা যেহেতু প্রায় পুরোটাই ওয়েস্টার্ন – আরও স্পেসিফিক্যালি বললে আমেরিকান ইকোনমি ড্রিভেন – এই জ্বলন্ত রিসেশনের আঙড়া এড়াতে পারলো না তাই। বিশ্বায়নের যথার্থতা নিয়ে ভাঁজ পড়লো কিছু কিছু কপালে।
এইসব মায়া কাটিয়ে স্মরণ যখন চেন্নাইগামী প্লেনটা ধরে ফেললো সেক্টর ফাইভ থেকে অনতিদূরে দমদম এয়ারপোর্ট থেকে – ততদিনে গঙ্গা-ভলগা-টেমস-মিসিসি পি দিয়ে আরো বছর দুয়েকের জল গড়িয়ে গেছে। শুকনো ইকোনমিগুলোর মুখে তখন একটু একটু লাল রং লাগছে।
লাল রংটা একটা কমলা হলুদ শেডের সাথে মিশে চেন্নাইয়ের আকাশে একটা ইস্টবেঙ্গল ইস্টবেঙ্গল মায়া তৈরী করছিলো – যখন স্মরণের প্লেনের পিছনের দুটো চাকা চেন্নাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়েটা ছুঁলো। সময়টা তখন – গোধূলি।
স্মরণ মেনফ্রেমের কালো স্ক্রিণ থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে – ওদের অফিসের উত্তাপহীন জানলাগুলো দিয়ে প্রায় বছর দুয়েক গোধূলি দেখেনি।
সেই কনে-দেখা-আলোতে স্মরণ পুরোনো বন্ধুর সাথে মিট করলো – চেন্নাই এয়ারপোর্টে। বিতান স্মরণের এঞ্জিনিয়ারিং কলেজের বন্ধু। এম-বি-এটা কলেজের পরপরই সেরে ফেলেছে – স্মরণের মতো বছর তিনেক না ঝুলিয়ে।
বিতান ফিনান্সে এম-বি-এ করে আপাততঃ একটা ক্রেডিট রেটিং সংস্থার কোল আলো করে বসে আছে চেন্নাইতে।
স্মরণ সেদিন রাতটা বিতানের ভাড়াবাড়িতেই কাটাবে ঠিক ছিলো। চেন্নাই এয়ারপোর্টটায় একটা আশির দশক যেন থমকে দাঁড়িয়ে গেছে। একটা এয়ারপোর্টের ডিপারচার লাউঞ্জের মাথায় অ্যাসবেস্টার্সের ছাউনি – এটা এই প্রবল প্রতাপ উঠতি সুপারপাওয়ারের অন্যতম মেগাসিটির বুকে নিতান্তই –‘এহে একি’ মার্কা কেস।
স্মরণ এয়ারপোর্টের থেকে বাইরে এসেই এক ঝলক কোলকাতা পেয়ে গেলো সদ্য প্রবাসী চোখে। চেন্নাইতেও অ্যাম্বাস্যাডার ট্যাক্সি চলে।
বিতান যেখানে থাকতো – সে জায়গাটার নাম টি-নগর – পুরো নামটা না লিখতে পারা প্রকট করে দেয় লেখক আদপে কতোটা অশিক্ষিত – কিন্তু কিছু করার নেই বস।
এপ্রিলের তরুণ গ্রীষ্মে চেন্নাই তখন একটা টিপিক্যাল সন্ধে অবকাশ পাচ্ছে। বড়ো বড়ো ফ্লাইওভারগুলো দিয়ে নেমে আসছে দক্ষিণ ভারত – ঘিঞ্জি গলিতে – স্থানে অস্থানে মন্দিরের প্রাচুর্যে – বড়ো বড়ো লার্জার দ্যান লাইফ কাট আউটের হিরোদের সোচ্চার উপস্থিতিতে – দ্য ফার্স্ট ইম্প্রেশন অফ চেন্নাই – স্মরণের মনে হচ্ছিলো – সামথিং ভেরি ডিসসিমিলার ফ্রম কোলকাতা – সামথিং অফ ইটস ওন কাইন্ড।
টি-নগরে পৌঁছে প্রথম রাত্তিরেই চেন্নাই ডেলিকেসি ট্রাই করা একটু বেশি বোল্ড অ্যাডভেঞ্চার হয়ে যেতো। তাই চেনা পেটে চাইনিজই শ্রেয় মনে করে দু’জন রাস্তায় বেরোলো।
আর স্মরণ প্রথম কিছুটা চেন্নাই চিনলো। রাস্তায় বেরোবার আগে বিতান স্মরণকে দু’টো জিনিস শিখিয়ে নিয়ে বের করেছিলো – প্রথমতঃ চেন্নাইতে পা রেখেই প্রথম সন্ধেতে অটোতে যেন দরদাম করার ছেলেমানুষি না দেখায়। দ্বিতীয়তঃ মনে রাখতে হবে কিলোমিটার প্রতি দশ টাকা ভাড়ায় রফা হলে কেউ ঠকলো না। রেটটা মনে রাখবেন পাঠক – জীবনের ধন কিছুই যায়না ফেলা – তবে কালের নিয়মে ইনফ্লেশন অ্যাডজাস্টেড হয়ে সামান্য ইতরবিশেষ হতে পারে – অপরাধ নিয়েন না।
জনৈক অটোচালকের সাথে কথাবার্তা যা হলো সেটা মোটামুটি এরকম-
বিতানঃ টিনগর মেনল্যান্ড চায়না।
অটোচালকঃ হান্ড্রেড টোয়েন্টি স্যার।
বিতানঃ হোয়াট আন্না। সেভেন এইট কিলোমিটারস অনলি।সেভেন্টি ম্যাক্সিমাম।
অটোচালকঃ টেন রুপিজ এক্সট্রা স্যার।
বিতানঃ হোয়াই? কিউ?
অটোচালকঃ ইউ টার্ন লেনা পড়েগা স্যার।
পৃথিবীতে আর কোথাও ইউ টার্ন নিতে দশ টাকা লাগলে আমায় একটু জানাবেন প্লিজ?
সেদিনকার মেনল্যান্ডের চর্বচোষ্য হজম হতে না হতেই পরেরদিনের সকালটা চলে এলো। পিনাকলের দেওয়া অ্যাড্রেসের রিসর্টে পৌঁছে প্রথম বিষাক্ত খোরাক হলো এই দ্বিতীয় কলেজ লাইফের। স্মরণ ছাড়া আর বাকি সবাই ক্যাজুয়াল পরে এসেছে – স্মরণ টাইটা পরবো পরবো করেও পরেনি। ভাগ্যিস।
পিনাকলের বাস এসেছিলো ওদের নিয়ে যেতে। ইস্ট কোস্ট রোডে বাসটা উঠে খানিকদূর এগোতেই – বাঁদিকের জানলা থেকে স্বাধীনতা দেখতে পেলো স্মরণ – খুব কাব্যিকতা মাখামাখি করে ভাবলে – সেই স্বাধীনতাতে বাঙলাও রয়ে গেছে এক কোণে – বে অফ বেঙ্গল।
মহাবলীপুরমের কাছে এসে পিনাকলের নাম লেখা একটা ট্রাফিক ব্যারিকেড চোখে পড়লো – ডিরেকশন লেখা আছে তাতেই।
অতপরঃ জি-ওয়ান-জি। স্মরণ যেখানে র্যাফকস্যাকটা প্রথমবার নামালো।
(এরপর পরবর্তী রবিবারে)

আপনার মতামত জানান