সবজেটে গ্রিন ক্যাম্পাস/কৌস্তভ ভট্টাচার্য

চতুর্থ পর্ব
(৫)
সেন্ট পলস ক্যাথিড্রালের পজিশনিংটা ভারী অদ্ভুত না?
কোলকাতার সবচেয়ে বড়ো চার্চের একপাশে বিড়লা প্ল্যানেটরিয়াম আর একপাশে অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস। একটু থিতিয়ে ভাবলে বলা যায় – একপাশে বিজ্ঞান আর একপাশে শিল্প ধারণ করে – ক্রশবিদ্ধ যিশু অনন্ত অপেক্ষায় – ধর্মের ঘেরাটোপে।
ভারতবর্ষেই সম্ভব।
সেদিন একটা সাধারণ দিনই মনে হচ্ছিলো। লোকেদের ভিড়ভাট্টা বেশি ছিলোনা – তাই কিছু হাতে গোণা ধর্মপ্রাণের জন্য পিছনের তিন চারটে বেঞ্চ ছেড়ে দিয়ে – বাকিটা ‘প্রবেশ নিষেধ’ ব্যারিকেডের ঘেরাটোপে আগলে রাখা ছিলো।
সেই ঘেরাটোপের ভিতরে দাঁড়িয়েই দোলনা যিশুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলো – থির বিজুরির সম্ভ্রবসহ।
সেদিন কোনো কয়্যার ছিলোনা – মাস গ্যাদারিং ছিলোনা – কোনো রকম সেরিমনি ছিলোনা গির্জাটায়। পুরো অ্যাম্বিয়েন্সটা জুড়ে কিছু নিশ্চুপ মানুষের ধর্মীয় আত্মসমর্পণ ছিলো খালি।
পরাভূতা হতে বাকি ছিলো একা দোলনা – বাকি সব হ্যালোজেনগুলো এই ভরদুপুরবেলা নেভানো থাকলেও যিশুর ওপর দুদিক থেকে দুটো হ্যালোজেন লাইট পড়ে – একটা লার্জার দ্যান লাইফ অনুভূতি দিচ্ছিলো।
তখনই দোলনা ঋতায়ণকে যিশুর মূর্তির ডানদিকে রাখা কনফেশন বক্সটার ভিতর থেকে বেরিয়ে আসতে দেখলো – ওর পরণে পাদ্রির পোশাক ছিলো কিন্তু বাঁহাতে ধরা ছিলো একটা অ্যাকোয়াস্টিক স্প্যানিশ সিগনেচার গিটার। আর একহাতে বাইবেল বাইবেল দেখতে একটা বই।
দোলনা ঋতায়ণকে ফেস করতে চাইছিলো না – কিন্তু চলে যেতেও পারছিলোনা সামহাউ।
ঋতায়ণ দোলনার কাছে এসে ওকে বাইবেলটা দিলো। দিয়ে গিটারটা বাজাতে শুরু করলো – টিউনটা চেনাই – গডফাদারের থিম ট্র্যাক।
দোলনা বাইবেলটা খুললো – দেখলো বাইবেলের পাতাগুলো আসলে ঋতায়ণকে লেখা ওর চিঠিগুলো – প্রত্যেকটার মাঝখানটা সিগারেটের ছ্যাঁকা দিয়ে গোল করে পোড়ানো।
দোলনা ঋতায়ণের দিকে তাকালো – দেখলো ওর মাথায় একটা কাঁটার মুকুট। হঠাৎ করে যিশুর ওপরে পড়া হ্যালোজেন দুটো নিভে গেল।
দোলনার ঘুমটা ভেঙে গেল।
ঋতায়ণ কোলকাতাতে এসেছে অনেক বড়ো বয়েসে। ভালো করে বাঙলা পড়তে পারেনা এখনো – ‘প্রণমি’কে ‘প্রণামী’ পড়ে। ঘাটশিলায় বড়ো হয়েছে। উড়িষ্যায় এঞ্জিনিয়ারিং। তারপর চাকরিসূত্রে কোলকাতায় নোঙর গাঁথা।
ঋতায়ণ ক্লাসিক্যাল গান শিখেছে প্রায় জন্মের পর থেকেই। হিন্দুস্তানী ক্লাসিক্যাল।
গিটার বাজায় প্রায় তেরো বছর। আর গিটারটা প্রায় নিজে নিজেই শিখেছিলো।
ঋতায়ণের ওপর ওদের ট্রেনিং ব্যাচের মোটামুটি সব মেয়ের হাল্কা থেকে ভারী ক্রাশের তারতম্য ছিলো। দোলনা ছাড়া – তাই বোধহয় ওদের বন্ধুত্বটাই সবার আগে হয়। ইংলিশে একটা ভালো শব্দ আছে – বাডি ফিলিং – এর চেয়ে ভালোভাবে ওদের রিলেশনটা ড্রেসক্রাইব করা সম্ভব নয়।
একসাথে বইমেলা যেতো দু’জন, একসাথে খালাশিটোলাও গেছিলো – কিন্তু দোলনাকে দেখে চারদিকের লোক মারাত্মক অস্বস্তিতে পড়ে যাওয়ায় – বেশিক্ষণ বসা হয়নি।
এরকমই একটা সিনেমা দেখতে গেছিলো দু’জনে – সিনেমাটা মোটামুটি আধুনিক রামলীলা জাতীয় ছিলো – ভীষণ ইন্টারেস্টিং যাকে বলে।
দু’জনে এতো ইন্টারেস্ট পেয়ে গেছিলো যে হাফটাইমের জাস্ট আগে ডিসকভার করলো যে ওরা দু’জন একে অন্যকে স্মুচ করে ফেলেছে।
ঋতায়ণ কিম্বা দোলনা কেউই ন্যাকার লাইনে বেশিদূর এগোয়নি – তাই একটা লিপলক মানেই যে প্রেম হয়ে গেছে – এরকম একটা মধ্যযুগীয় পার্থিব এবং বিংশ শতাব্দীসুলভ বাঙালি প্রেজুডিস দু’জনের কারোরই ছিলোনা।
তবুও দু’দিন বাদে ঋতায়ণ দোলনাকে এস-এম-এস করেছিলো – ‘ভাবছি তোকে বিয়ে করলে খারাপ হয়না’।
দোলনা দেড় দিন বাদে রিপ্লাই দিয়েছিলো – ‘কর না’।
প্রায় আড়াই বছর চলেছিলো ব্যাপারটা – মাঝেসাঝেই দু’জন মিলে অফিস কাটিয়ে এদিক সেদিক ঘুরতে চলে যেতো – সেটা দক্ষিণেশ্বরও হতো আবার সোনাগাছিও দেখতে গেছিলো একবার – নেহাৎ কৌতূহলবশতঃ।
ঋতায়ণ দোলনার এম-বি-এ করতে যাওয়াটাকে মানতে পারেনি।
দোলনা শেষ চিঠিতে লিখেছিলো –
“জানিস – বিয়ে ব্যাপারটা পৃথিবীতে শুরু হয় কিভাবে? মহাভারতে আছে – অগ্নি আর স্বাহার গল্প। অগ্নি ছিলেন পুরুষ এবং স্বাভাবিক নিয়মেই বহুগামী।
স্বাহা ছিলেন অগ্নির প্রণয়প্রার্থিনী – বারবার অগ্নিকে এক নারী প্রীতিতে ফেরাবার চেষ্টা করতেন। এই করতে করতে অনেক কিছু ঘটে এবং শেষমেষ স্বাহা হারিয়ে যান, অগ্নিপুত্র আগ্নেয়কে গর্ভে নিয়ে। তারপর থেকেই অগ্নি-স্বাহা ফ্রেজটার সূচনা।বহুগামিতার ইতি এবং বিয়ের ক্লেম টু ফেম।
আসলে আমরা সবাই মহাভারত থেকে বেরিয়ে ভাবতে চাইলেও গল্পটা বেশিদূর গড়ায় না তাইনা?
আমি তোকে অন্য মেয়েতে আসক্ত এ’রম ব্লেম করছিনা। কিন্তু সব পুরুষই অগ্নির মতো মদগর্বী না জায়গায় জায়গায়? সেটা কখনো মেল ইগোর অহঙ্কার – কখনো মেল অরগ্যানের।
আর আমরা মেয়েরা যতোই সিগারেট খাই, যতোই নাইট আউট করি – যতোই সীমাহীন হবার চেষ্টা করি – স্বাহা থেকে আর বেরোতে পারছি কই? নইলে তোকে এই চিঠিটা লিখতাম না”।
...
ঘুমটা ভেঙে যাওয়ার পর পরই রীতেশের এস-এম-এসটা ঢুকলো দোলনার মোবাইলে।
‘এই বৃন্দা মেয়েটার মা নিশ্চয় হে হবার আগে মেক আপ জলে গুলে খেতো – নইলে এতো সকালে এই স্কিন?’
রীতেশ থাপার – মেয়ে দেখায় পথিকৃৎ হয়ে যাবে কিছুদিন পরেই। ফিলহাল একটা ছোট্টো উদাহরণ দিয়ে শেষ করা যাক।
রীতেশ সারারাত পড়াশুনো করে – ব্রেকফাস্টটা করে তারপর শুতে যেতো।
কারণ ওই সময় গার্লস হস্টেলের মেয়েরা মোটামুটি রাতে যা পরে ঘুমিয়েছিলো – ট্র্যাকস, হটপ্যান্ট ইত্যাদি পরেই ক্যান্টিনে চলে আসতো – নো মেক আপ লুকে।
এইসময় যে মেয়েকে ভালো দেখতে সেই প্রকৃত ডানাকাটা – আর যারা এইসময়ও মেকআপ করে আসতো সে হতভাগ্যাদের রীতেশ নিজের লিস্ট থেকে বাদই দিয়ে দিতো।
বৃন্দা ত্রিবেদী ব্যাচটার একটা হট প্রপার্টি – সে কোনদিন কী রঙের টাওয়েল পরে বাথরুম থেকে বেরিয়েছে তার ছবিসহ বিবরণ দিতে দোলনাসহ অনেক মেয়ের মোবাইলেই বয়েস হস্টেল থেকে টাইম এন্ড এগেন আর্জি-অনুরোধ-উপরোধ এটসেট্রা এটসেট্রা ডেলিভার হতো।
দোলনা আর ঋতায়ণের লুকিয়ে রাখা চিঠিগুলো আরেকবার পড়ার ইচ্ছেটা আপনমনে হেসে ঢোঁক গিলে ফেললো।
(৬)
‘চেন্নাইয়ে মোটামুটি তিনটে ওয়েদার – হট, হটার, হটেস্ট। তার মধ্যেও দেখবে ডিসেম্বরের দিকটায় কিছু লস্ট সোলস মাঙ্কি ক্যাপ, মাফলার জাতীয় পুরোনো নস্টালজিয়া খুঁজে পেতে বের করছে’।
প্রফেসর লক্ষণ রামাচন্দ্রন পিনাকলের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর। ইনঅগরাল স্পিচটা উনিই দিচ্ছিলেন – তিনশো নতুন মুখকে।
কাল এসে পৌঁছোবার পর – স্মরণের আলাপ বেশি লোকজনের সাথে হয়নি। যাদের সাথে হয়েছে তাদের সাথে অলরেডি কোলকাতায় জিডি(গ্রুপ ডিসকাশন)-পিআই (পার্সোনাল ইন্টারভিউ) চলতে চলতেই হয়ে গেছিলো।
বিনয় গুপ্তা ছত্রিশগড়ের ছেলে – ভুবনেশ্বরে চাকরি করতো – স্মরণেরই সমবয়স্ক। ভুবনেশ্বর থেকে কোলকাতা কাছে হয় বলে কোলকাতাতেই জিডি-পিআই লোকেশন নিয়েছিলো। জিডির সময় দু’জন সবচেয়ে চুপচাপ ছিলো – স্মরণ আর বিনয়।
বিনয়ের রেজাল্ট অবশ্য বরাবরই মারকাটারি – ছত্রিশগড়ের রামপুরী বলে একটা আধা শহর থেকে এসে এঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্টেট ইউনিভার্সিটির গোল্ড মেডেলিস্ট হয়েছিলো।
ফিলহাল ও জি-ওয়ান-এইচয়ের বাসিন্দা অর্থাৎ স্মরণের ডিরেক্ট প্রতিবেশী। সেই জি-ওয়ান-এইচ যেখান থেকে দোলনা তার দলবল নিয়ে চকোলেট বোমাগুলোর হিরোশিমা-নাগাসাকি করেছিলো।
সুতনু সেন – স্মরণের পিনাকলে এসে খুঁজে পাওয়া প্রথম বাঙালি চেনামুখ। সুতনু অ্যাকাডেমিকালি স্মরণের চেয়ে এক বছরের সিনিয়র ছিলো – ম্যাচিওরিটি লেভেল ধরলে সেটা হয়তো সাত-আট হয়ে দাঁড়াতো। মাথায় টাক পড়ে যাওয়ায় ছেলেটাকে বেশ বয়স্ক দেখাতো।
যেদিন স্মরণরা পৌঁছলো সেদিন বিকেলে ক্যান্টিনে খেতে যাবার সময় – সুতনুকে স্পট করে স্মরণ – নিজেই গিয়ে আলাপ করে ফেলে –আসলে স্মরণের মা শিখিয়ে দিয়েছিলো যতো পারবি বাঙালি ন্যাওটা থাকবি। আর পাঁচ-সাত মিনিটের মধ্যেই সুতনু নিজের প্রাপ্তমনস্কতার একটা প্রমাণ দিয়ে ফেললো।
প্রথম দিন ওখানে একটাই মোবাইল ফোন কোম্পানি টেম্পোরারি কিয়স্ক খুলেছিলো – নতুন কানেকশন দেবার জন্য। সবাই সেখান থেকেই নিচ্ছিলো। স্মরণও তাই গেলো। গিয়ে দেখলো সবকটাই পোস্টপেড কানেকশন এবং মাসিক দক্ষিণা হাজার বারোশোর কম নয়।
সুতনু প্রায় আড়াই মিনিটের মধ্যেই স্মরণকে কনভিন্সড করে ফেললো – মামাল্লাপুরম থেকে প্রিপেড নেওয়া অনেক ভালো অপশন – ও নিজেও তাই নেবে ডিসাইড করে ফেলেছে।
তবে কিনা - স্মরণের কর্মবীর হিসেবে মার্কেটে বেশি খ্যাতি নেই। নড়তে চড়তে খুব দরকার না পড়লে আঠেরো থেকে সাতাশ মাসের মধ্যে কিছু একটা নেয় স্মরণ। তাই ওইসব সদুপদেশ না শুনে পোস্টপেড কানেকশনই নিয়ে নিলো একটা – অ্যাকটিভ হবার সাথে সাথে দুটো ফোন গেলো একটা মায়ের কাছে – আরেকটা রুচিরার ফোনে।
পরের দিন – এক বছরের চোখে সুরমা - বগলে ডিওড্র্যান্ট - কারো ফিকে ওড়না - কারো বোতাম ভাঙা টি-শার্ট নিয়ে তিনশো মানুষী প্রাণের একসাথে উদ্দাম ডাইন আউট – হঠাৎ প্রেমে পড়া অথবা উঠে দাঁড়ানো –মিহি সন্ধে আর শ্রান্ত দুপুরে লুকিয়ে দু’পেগ মেরে দেওয়া আর এসবের মাঝে সাময়িক লেখাপড়া করার শুরু – পরের দিন।
পিনাকলে ক্লাসরুমগুলো ছিলো শৃঙ্গের নামে – কেন এই তেনজিঙি ছেনালি? জানা নেই। সম্ভবতঃ সবুজ শিং বিশিষ্ট সদ্য এম-বি-এদের মোটিভেশানাল টনিক গেলাতে।
মাউন্ট এভারেস্ট আর কে-টু ক্লাসরুমদুটো ছিলো পেল্লায়। একই সাথে তিনশো জনের বসার সিট – দরকারে সেটা তিনশো জনতার জন্য একসাথে খুলে দেওয়া হতো দুটো।
আবার দরকারে – মাঝে একটা পোর্টেবেল পার্টিশন দেওয়া যেতো যাদে দেড়শো দেড়শোয় দ্বিধাবিভক্ত হতে পারতো একই সময়ের দুটো ক্লাস।
ইনঅগরাল ভাষণ মেটার পর – প্রফেসর চন্দ্রা ওরফে চন্দ্রকান্ত রাজাগোপালান আবির্ভূত হলেন।প্রফেসর রাজাগোপালান – এইচ-আরে বেশ স্বনামধন্য একজন পার্সোনালিটি। ওনার ব্র্যান্ড অফ পড়ানোটাও বেশ ইউনিক। ভদ্রলোক হিন্দু দর্শনকে – ম্যানেজমেন্টের সাথে কম্বাইন করার চেষ্টা করেন।
স্বামী বিবেকানন্দ শিকাগোতে মহাকীর্তিটি ঘটাবার আগে – এদেশে যে ভারতভ্রমণটি সেরেছিলেন – তাতে তামিলনাড়ু বেশ উল্লেখ করার দাবি রাখতে পারে এ’রম একটা জায়গা। কন্যাকুমারিকাতুতো বিবেকানন্দ রক তো মোটামুটি আপামর ট্যুরিস্টসাধারণের কাছে অবশ্য দ্রষ্টব্য বুকমার্ক। জায়গাটা ভারী সুন্দর।
তো সেই স্বামী বিবেকানন্দ প্রফেসর রাজাগোপালানের লাইফ আইডল এবং তার সাথে ভগবদগীতাও। তাই জ্ঞানযোগ, ভক্তিযোগ, কর্মযোগ ঘেঁটেঘুঁটে উনি কোর্স স্ট্রাকচার ডিজাইন করেছেন।
পিনাকলে একটা কম্পালসারি কোর্স হলো কর্মযোগ বা ভালো বাংলায় বললে কর্মাইয়োগা। ফার্স্টটার্মে গরু, মোষ, ল্যাদখোর, নাস্তিক যাই হওনা কেন – না করে উপায় নেই। সেকেন্ড টার্ম থেকে ব্যাপারটা অপশনাল হয়ে যাবে। তখন কেউ দয়ার সাগর লাইনে প্রগ্রেস করতে চাইলে সাবজেক্টটা কন্টিনিউ করতে পারে।
কেসটা মোটামুটি এরকম – পিনাকলের চারপাশে সাতটা হতদরিদ্র গ্রাম রয়েছে –মানামাই,নাল্লুর, কুন্নাতুর, নেইকুপ্পি, কাদাম্বরী, এচুর (এঁচোড় পড়বেন না), পাত্তিকাড়ু।
তো সামগ্রিকভাবে এই গ্রাম গুলোর ‘উন্নয়ন’ এবং ম্যানেজমেন্টায়িত যুবক-যুবতীদের রিয়্যাল লাইফ ম্যানেজমেন্ট স্কিলের শিক্ষা দেবার তাগিদে এই কর্মযোগের উদ্ভব। তিনশো জনকে সাতটা গ্রুপে ভাগ করে দেওয়া হবে। প্রত্যেকটি গ্রুপ এক একটি গ্রামে যাবে – এবং তাদের দৈনন্দিন আচার-বিচার-সমস্যা স্টাডি করবে এবং শেষমেষ নিজেদের দিক থেকে একটা সমাধান বের করার চেষ্টা করবে। এর সাথে সাথে থিওরেটিকাল লেখাপড়াও চলবে – স্বামী বিবেকানন্দের ইংলিশ অনুবাদ থেকে।
ব্যাপারটায় বলতে নেই নড়তে-চড়তে ছত্রিশ মাস স্মরণের বেশ ঝাঁট জ্বলছিলো। রাজাগোপালান লোকটাকেও বিশেষ সুবিধের লাগেনি – সুস্থ শরীর ব্যাস্ত করার বন্দোবস্ত যারা করেন – তাদের কোনোকালেই লাগেনা।
সেদিনের শেষ বক্তা – সুরয কুমার ভোল – একদা ভুবনেশ্বরের মুখ আলো করে জন্মেছিলেন – বর্তমানে মার্কেটিং অতিরথ এবং পিজিপিএম প্রোগ্রাম ডিরেক্টর। এর আগে আই-আই-এম কোজিকোড়ের ঘর আলো করে বসেছিলেন। সেখান থেকে প্রফেসর অরভিন্দন প্রায় পুষ্পকে হরণ করেছেন বলেই কানাঘুষো শোনা যায়।
ভদ্রলোক যা বললেন সেটাকে অ্যাজ ইট ইজ কোট করে ফেলাই বুদ্ধিমানের লক্ষণ – আর লোকে যাই বলুক লেখকের সহস্তে নিজেকে নির্বোধ প্রমাণ করতে বয়ে গেছে –
‘পিনাকল ইন্ডিয়ার প্রথম প্ল্যাটিনাম গ্রিণ ক্যাম্পাস বি-স্কুল। যেহেতু তোমাদের সবারই ওয়ার্ক এক্সপিরিয়েন্স আছে তাই আশা করি এখানে কেউ এমন নেই যে গ্রিণ ক্যাম্পাস শব্দবন্ধটা এ জীবনে প্রথমবার শুনলো – এই ক্লাসরুমে।
গ্রিণ ক্যাম্পাসে কিছু নিয়মকানুন মেনে চলতে হয় – এখানে মদ-মাংস ঢোকানো শাস্ত্রে বারণ আছে। যদিও পিনাকলে বেশ কিছু সারমেয় ইতি উতি দেখা যায় প্রায়ই যারা মাংসের হাড় নিয়ে খেলা করে, এরকম ঘটনাও চক্ষুগোচর হয়েছে – তদন্ত চলিতেছে।
তদন্ত যারা করে তাদের নাম ড্যাক – ডি-এ-সি – ডিসিপ্লিনারি অ্যাকশন কমিটি। আগে নাম ছিলো ডিসকো। নামটা শুনে মিঠুন চক্রবর্তীর জন্য মন খারাপ করবার কারণ নেই – পুরো কথাটা ছিলো – ডিসিপ্লিনারি কমিটি।
বুঝতেই পারছো তোমাদের সিনিয়ররা এমন বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ ঘটিয়ে গেছেন – যে অ্যাকশনটা যোগ করতে হয়েছে। দায়ে ঠেকে।
তবে ভয় পেওনা – পিনাকল ঐতিহাসিক ভাবে স্টুডেন্ট ড্রিভেন ইন্সটিটিউট – শুধু স্টিয়ারিংটা এ’বছর থেকে আমরা নিজেদের হাতে রাখতে চাই। গিয়ার, ক্লাচ, অ্যাক্সিলারেটর, ব্রেক তোমাদের জিম্মাতেই রইলো।
শিগগিরিই তোমাদের স্টাডি গ্রুপে ভেঙে দেওয়া হবে। প্রথম তিনটে টার্ম কম্পালসারি সাবজেক্টসদের জন্য উৎসর্গীকৃত, তাই এই স্টাডি গ্রুপগুলোই চলবে।
এছাড়াও এদিক ওদিকে বিভিন্ন গ্রুপ স্টাডি হতে থাকবে সে আমি জানি – যার পর জ্ঞানের প্রাচুর্যে ঠান্ডা হতে হঠাৎ হঠাৎ বয়েজ হস্টেলে কিছু ছেলেকে রাত্তিরে চান করতে দেখা যাবে’।
এরপর ক্লাসে যে হাল্কা গুজগুজে আওয়াজটা উঠলো – যেটাকে হাসির গুঞ্জন বলেই ভুল করা চলে – সেটাকে কিছুটা সময় দিলেন প্রফেসর সুরয থিতিয়ে নিতে। তারপর বললেন –
‘আমি দেখেছি আমি যখনই সোজা কথা বলি, মেয়েরা বেশ সোজা মানেই বুঝে নেয়। ছেলেরা পাকদন্ডীটা ধরে; তারপর মেয়েগুলোও কিছুদিন পর ছেলেগুলোর পদাঙ্ক অনুসরণ করে।
এইভাবে চললে কথা বলে কি আর জীবনে সুখ থাকে? তোমরাই ভেবে দেখো’।
রিমলেস গ্লাসটা একটু ঠিক করে – মুখের হাল্কা হাসি যেটাকে সাধুভাষায় গ্রিন বলে সেটা ঝুলিয়ে রাখতে রাখতে সমাচার সমাপ্ত করলেন ভদ্রলোক।
(ক্রমশ)

আপনার মতামত জানান