প্যাসেজ টু হেভেন/ মাসকাওয়াথ আহসান

কলাগাছের ভেলায় লখিন্দর
দেবদাসকে কোনমতে জামিন করিয়ে আনে তার রাশান বান্ধবী আনা। আনহ্যাপী চন্দ্রমুখী এক মোল্লার প্ররোচনায় পিংক নেকাব পরে দেবদাসের চরিত্রহনন করে চলেছে মিডিয়ায়। অবশ্য বাংলাদেশে বিএনপির সহিংস অবরোধের খবর শিরোনাম হবার পর আনহ্যাপী হ্যারাসমেন্ট কেসটা মিডিয়ায় প্রায় চাপা পড়ে গেছে।

ওদিকে বেহেশতে নবাগত মোল্লাটি ইসলামিক স্টেট প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছে। দোজখ থেকে তাকে সমর্থন জানিয়েছে হিটলার ও মওদুদী। বেহেশতের পুলিশ মোল্লাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে, বেশী ফাল দিলে চ্যাংদোলা করে দোজখে রেখে আসা হবে। কিন্তু ইতিমধ্যেই বেহেশতে বেশ কিছু খাদেম জুটিয়ে ফেলেছে মোল্লা। বিশেষ করে যেসব অসুখী নারী বেহেশতে এসেও সেই মর্ত্যের বোরিং জব্বার বা কুব্বাতের বাপ হাবি পেয়েছে; তারা মোল্লার ভক্ত হয়ে উঠেছে। জীবনের বিরাট শূণ্যতা ভরাট করতে মোল্লা কিছু বয়ান দেয়। মোল্লা বয়ান দিলে পোলাও খাওয়াতে হয়; তাই
পোলাও রেঁধে নিয়ে আসে হনুফা বেগমেরা।

ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো এক ঘড়া জল মোল্লাকে দিয়ে ফুঁ দিয়ে এনে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে খাওয়ায় স্কচে মিশিয়ে। যদি উনি বিয়ে করতে রাজী হন এই আশায়। লায়লা-জুলিয়েটও মোল্লার ফুঁ দেয়া পানি মজনু-রোমিওকে খাওয়ায়; যদি এতে তাদের সংসারে মন বসে; পরনারীতে ছোঁকছোঁকানিটা কমে।

দেবদাস দুঃশ্চিন্তায় পড়ে যায়। নিজে থার্ড ফোর্স দাঁড় করাতে না পারলেও মোল্লার ফোর্থ ফোর্স হয়ে গেল কী অনায়াসে! কী ধর্ম আফিম নেশা! আনা বোঝায়, এটা সাময়িক ব্যাপার। মোল্লার
দাপট কমে আসবে।

কিন্তু মোল্লার পিছে এসে প্রচ্ছন্নভাবে দাঁড়ায় কাম্যবাদী দলের অনেকেই। জিন্নাহ এবং নেহেরু গলফ খেলার ফাঁকে ফাঁকে আলাপ করে।

--মি নেহেরু মোল্লাটাকেতো মডারেট মনে হয়।

--মি জিন্নাহ একটা মডারেট পুরুত এনে ছেড়ে দিই কী বলেন!

জিয়াউর রহমান ঠোঁটে একটু রামজল স্পর্শ করে বলেন, লেটস মেক পলিটিকস ডিফিকাল্ট ফর দেম।

হঠাত জিয়ার ফোন বেজে ওঠে। বঙ্গবন্ধুর বাসা থেকে ফোন এসেছে। জিয়া ঘাবড়ে যান। খালেদার অবরোধ নিয়ে বকাঝকা করবে না তো!

জিয়া তড়িঘড়ি বঙ্গবন্ধুর বাসায় আসেন। গেট খুলে দেয় গৃহকর্মী মুশতাক।

--তাড়াতাড়ি যান; লিডার খুব ক্ষেপে আছেন।

জিয়া তড়িঘড়ি করে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে দেখেন বঙ্গবন্ধু খাচ্ছেন। জিয়াকেও খেতে প্লেট এগিয়ে দেন বঙ্গবন্ধু। জিয়া ইতস্ততঃ করে খেতে বসে যান। টেবিলে মাছ, শাক, ডাল, ভাত। জিয়া মনে মনে ভাবেন, একটু গোশত হলে ভাল হতো। খেতে খেতে মাছের মধ্যে গোশতের টেস্ট পান। প্রথমে ভালই লাগে। পোড়া মাংসের গন্ধ; কিন্তু একটু কাঁচা, মশলা পড়েনি ঠিকমতো। মাছের
চোখের দিকে তাকিয়ে মনে হয় যেন মানুষের চোখ। চমকে ওঠেন জিয়া। মানুষের চোখটি থেকে অশ্রুরক্ত গড়িয়ে পড়ছে।

বঙ্গবন্ধু বলেন, জিয়া খালেদা এই যে মানুষ হত্যা করছে; ওর কী পরকালের এতোটুকু ভয় নেই!

জিয়া বলেন, স্যার এর প্রবলেমের কথা আমি ৭২ সালেই জানিয়েছিলাম। আপনিই স্যার এই সমস্যা আমার ঘাড়ে গছিয়ে দিয়েছিলেন!

বঙ্গবন্ধু বকা দেন, প্রথম ট্যালেন্ট হান্টিং-তো তুমিই করেছিলে নাকি!

জিয়া বলেন, স্যার ইউটিউব খুলে দেখুন তার ঝগড়া করার ক্ষমতা। আমাকেও কথায় কথায় চুপ করো বেয়াদব বলতো।ইচ্ছা হতো আমিও একটু বকে দিই; কিন্তু সেতো আপনার ভয় দেখিয়ে আমাকে চুপ করিয়ে দিতো।

বঙ্গবন্ধু বলেন, কিন্তু এখন কী করা যায়; তোমার ছেলেটাও হয়েছে আরেক!

জিয়া নিঃস্পৃহ ভঙ্গীতে বলেন, নানার দিকে গিয়েছে স্যার; টাকা-পয়সাটা বেশী বোঝে। স্যার আমার শরীরটা হঠাত খুব খারাপ লাগছে।

বঙ্গবন্ধু চিন্তিত হয়ে বলেন, তুমি বিশ্রাম নিতে পারো; আরেকদিন কথা হবে।

জিয়া কোনমতে নিজের বাসায় ফিরে আসেন। বাসায় ঢুকতেই পোড়া মাংসের গন্ধ ধক করে নাকে এসে লাগে। সোফার ওপর বসে একটি পোড়া মানুষ। কার্পেটের ওপর শুয়ে মা ও শিশুর দগ্ধ শরীর।

পোড়া মানুষটি বলে, স্যার আমি বগুড়ার ছইল; ভোট ধানের শীষেই দিছি বরাবর; কিন্তু পেট্রোল বোমাতো মার্কা চেনে না। পোড়া মানুষটির চোখ দুটো বেরিয়ে আসতে চাইছে ক্ষোভে।

পুড়ে যাওয়া মা আর্তচিতকার করে, যারা বোমা দিয়া মানুষ মারে; আল্লাহ তাগো নির্বংশ করবো।

জিয়ার অকস্মাত উনার নাতনীদের মুখগুলো মনে পড়ে পোড়া শিশুটিকে দেখে।

চুনিলাল দেবুদাকে ফোন করে, কোত্থেকে এক পুরুত এসে হাজির হয়েছে; মোল্লার লালসালু ওড়ানো আস্তানার উল্টাদিকে গেরুয়া পতাকা উড়িয়ে ত্রিশূল নিয়ে বসে গেছে। তারও ভক্ত জুটেছে।
পার্বতীও সেখানে গিয়ে একঘড়া দুধ ঢেলে এসেছে।

দেবুদা থার্ড ফোর্সের সমর্থকদের ফোন করে। কেউই ফোন ধরে না। উত্তম কুমার ফোন ধরেন। দেবুদা মোল্লা- পুরুতের কান্ডের ব্যাপারটা বলে।
উত্তম বলেন, এই যন্ত্রণাগুলো এখানেও পৌঁছে গেছে। এখন কী করবে!

দেবুদা আক্ষেপের সুরে বলে, যে কোন সমস্যা হলেই গান্ধীজীর হয় জ্বর হয়; না হয় উনি মৌনব্রত পালন করেন। এখন কী করে এই মোল্লা-পুরুত বেহেশত থেকে তাড়ানো যায়।

উত্তম কুমার বুদ্ধি দেন একটু হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে পরামর্শ করতে।

দেবুদা হুমায়ূন আহমেদকে ফোন করতেই উনি ধরে বলেন, যেসব যন্ত্রণা চোখের সামনে দেখতেই চাইনা জন্য তড়িঘড়ি বেহেশতে এলাম; সেসব যন্ত্রণা এসে হাজির হচ্ছে। এগুলো ক্ষ্যাদান।কোলে নিয়া বইসা থাকার মানে হয়না।নইলে কিছুদিনের মধ্যে একটা মিলিট্যান্ট ফোর্স হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।

আনা দেবুদাকে বোঝায়; দেবু তোমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের লোকের মধ্যে এতো জটিলতা; এই প্যাঁচ খোলা কঠিন। হেভেনে দেখো গোটা পৃথিবীর লোক আছে; কারো কোন সমস্যা নেই; তোমাদের সব নিত্য-নতুন সমস্যা। আই এম ফেড-আপ।

দেবুদা আনার সবুজ চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, কী হয়েছে আনা!

--আর কী হবে চন্দ্রমুখী এবিউসিভ এসএমএস পাঠাচ্ছে। পার্বতীও ফেসবুকে গালি দিয়ে স্ট্যাটাস দিয়েছে। ওরা গালি ছাড়া কথা বলতে পারেনা কেন দেবু!

--দেখো আনা আমরা আধুনিক সভ্যতা ছুঁতে তোমাদের চেয়ে কমপক্ষে একশো বছর পিছিয়ে। তাওতো এরা অনেক ভালো; দোজখে যে নমুনাগুলো আছে ওরা এক একটি চলিষ্ণু খিস্তিকল্পদ্রুম।

তাজউদ্দীন লীথি নদীতে ভেসে আসা একটি কলাগাছের ভেলা থেকে বেহুলা আর তার বোমায় দগ্ধ লখিন্দরকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাসায় নিয়ে আসেন এম্বুলেন্সে করে। দগ্ধ লখিন্দরকে দেখে বঙ্গবন্ধু
অশ্রু আটকাতে পারেন না।

--কী হলো তাজ; এইজন্য কী এতো কষ্ট করে দেশ স্বাধীন করেছিলাম!

--মুজিব ভাই সমস্যা হচ্ছে পাকিস্তানের বর্বরতাটা রয়ে গেছে বাংলাদেশে। দেখুন না সরস্বতী প্রতিমা ভাঙ্গছে-হিন্দুদের দেশছাড়া করছে-আদিবাসীদের উচ্ছেদের চেষ্টা করছে; এখন তালেবানদের
মত মানুষ পুড়িয়ে মারছে।

--আওয়ামী লীগ সরকার কী করছে তাজ!

--কে কত বড় মুসলমান তা প্রমাণের চেষ্টা করছে; এজতেমা নিয়ে আবেগ দেখিয়ে ধর্মপ্রাণ ভোটারদের মন জেতার চেষ্টা করছে; সেই সুযোগে সাড়ে তিনশো মত আই এস জঙ্গী বাংলাদেশে ঢুকেছে; আর ইসলামী ব্যাংক হয়েছে জাতীয় স্পন্সর।

মুশতাক বলে, বাংলাদেশে ধর্মের আবেগ খুব বিক্রি হয়; আমি নিজেই সেরদরে বিক্রি করেছিলামতো তাই জানি।

বঙ্গবন্ধু খুব চিন্তিত হয়ে পড়েন।

--ভোটারদেরও তাহলে সমস্যা আছে; এরা শিক্ষিত হয়নি। তাই কুসংস্কার বেচে ভোট পেতে হয়। আদর্শের কোন দাম হয়তো তাদের মাঝে নেই।যার যার ধর্ম নিয়ে সুখে থাকো; এতো ধর্ম বেচাবেচির কী আছে! এতে তো গুণাহ হয়।

--মুজিব ভাই ইদানীং বাংলাদেশের আদালত পাকিস্তানের আদালতের মত ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের মামলায় লোকজনকে গ্রেফতার করছে।

--অথচ ভারতের আদালত পিকে ফিল্মের বিরুদ্ধে অনুভূতিতে আঘাত হানার মামলা প্রত্যাখ্যান করে বললো, আপনার দেখতে ইচ্ছা না হলে এ ছবি দেখবেন না।

--বাংলাদেশে হলে এতোক্ষণ পিকের পরিচালক-প্রযোজক সব গ্রেফতার হতো; পাকিস্তানে হলে তাদের পুড়িয়ে মারতো।

বঙ্গবন্ধু বেহুলাকে জিজ্ঞেস করেন, তোমরা কী কোন রাজনীতি করতে মা!

বেহুলা কাঁদে, নাতো বাবা। তবে ২০০১ সালে ধানের শীষে ভোট দিয়েছিলাম। পতিদেবতা বললো, আমাদের দুটো ভোট দিলে ওরা দুহাজার টাকা দেবে। টাকাটা খুব দরকার ছিলো বাবা।

তাজউদ্দীন জিজ্ঞেস করেন, ২০০৮ সালে কাকে ভোট দিলে!

বেহুলা বলে, পতিদেবতা বললো; বিএনপি গ্রেণেড ট্রেণেড মারে; তাই এবার আওয়ামী লীগকে ভোট দেবো। আমি একটা শাড়ী আর পতিদেবতা একটা সোয়েটার পেয়েছিলো নৌকার লোকদের কাছ থেকে।

বঙ্গবন্ধু বলেন, মা বেহুলা টাকা-শাড়ী-লুঙ্গী নিয়ে যতদিন মার্কাওয়ালা কলাগাছকে ভোট দেবে; ততদিন কলাগাছের ভেলায় লখিন্দরের মৃতদেহ নিয়ে তোমাকে অকূল সমুদ্রে ভাসতে হবে।মানুষ দেখে ভোট দিতে হয়; যে মানুষ সুখে-দুঃখে পাশে থাকবে।

আপনার মতামত জানান