কবিতাগুচ্ছ

দীপব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়
ব্যক্তিগত সংবাদ



এখন ভোর চারটে তেইশ। পূর্ণিমার চাঁদ মেখে এইমাত্র জানলায় বসল একফালি আজান। আমি দেখতে না পেলেও বুঝতে পারছি ভোরের মিষ্টি রঙ ছড়িয়ে পড়ছে সদর উঠোনে। আরেকটু পরে আমি ঘুমিয়ে পড়ব। যেভাবে রোজ, যেভাবে জীবন। কেন জানিনা, ঠিক এই সময়ই আমি দেখতে শুরু করি একটা ভোরের স্বপ্ন। আর বুঝতে পারি আসলে বহুদিন কোন ভোর দেখা হয়নি আমার।



যেভাবে রাত বড় হতে থাকে, একসময় রাতটাই দিন মনে হয়। আর সকালবেলা বাইপাসের বাসে উঠে আবিস্কার করে ফেলি একটা সাজানো বিছানা। পাশের মেয়েটিকে মনে হয় বহুদিন আগেকার, সেই আমার সুস্থসবল মা। তার কাঁধে মাথা রাখি। দৃশ্যমান শহর ভেজা ভেজা লাগে, হয়ত এখনই মা পায়েস রান্না করতে যাবে, সেই একটা গন্ধ।
এই সময় বাবা এসে আমায় অঙ্ক করতে দিত। কন্ডাক্টর এসে ভাড়া চায়। পকেটের খুচরোতে আঙুল নাড়ি।
অঙ্কে আমি বরাবর কাঁচা ।



প্রতিটা শব্দই দেখি পুরোন গন্ধমাখা। প্রতিটা বলে ফেলা স্মৃতিময়। আমি যতই বলতে শুরু করি আর মাঝপথে থেমে যাই, দেখি আমার পরিধি একটাই। খবরের কাগজের ধাধার মত এমুখ থেকে ও মুখে ছুটে বেড়াই, ছুটে ছুটে বেড়াই। প্রতিটা কথার শেষে ঝিমিয়ে পড়ি, যতক্ষণ না পরবর্তী সংবাদ এসে ঝাঁকিয়ে যাচ্ছে। এবং এক থেকে শুরু করে একে এসেই পৌঁছই আবার।

এবারের মত বোধহয় একা হওয়া হলনা আমার।


আশ্রয়

নতুন ঠিকানা খুঁজেছে আশ্রয়, সন্ধি বিচ্ছেদ শেষে তোমার আকাশ। তুমি তো নারী নও, ছিলেওনা কোনদিন।
তুমি এক অচেনা বিপ্লব, যার পতাকার নিচে আমি শহীদ হয়ে গেছি। সব মৃত্যুর কথা খবরে আসেনা। কিছু কিছু
মৃত্যু, যা আরো বেশী জন্মের পথে নিয়ে যায়। জন্ম, যা মৃত্যুর মতই শাশ্বত। আমিও চেয়েছি তেমনই। আশ্রয়
পেয়ে যাব আর কোনদিন।


বিকেল রঙের ঘুড়ি

যে দিন আমি ভুলে গেছি আর
ভালোবেসেছি, আমাদের প্রেমগুলি
সবুজ পাতার মত ভেসে ভেসে গেছে

যে দিন আমার চোখে মেঘ করে
নেই, বৃষ্টির ফোঁটাদের হাত নেড়ে
গেছি নিঃশব্দ ভঙ্গীমায়

আমার বিকেল রঙের সে ঘুড়ি
উড়ে যাক উড়ে যাক
                    আরো দূরে যাক



একটি কবিতা

রাত্রির গায়ে লেগে থাকে রঙ
ভোরের আশ্বাস নাকে আসে।

স্বপ্নের ভিতরে কোথাও জেগে থাকি

অনেক রাত্রির মত দেখি
আকাশের রঙ আলো হয়ে ওঠে

ক্ষয়

দুটি প্রদীপের আলোয় ঘিরে থাকে জন্মস্থান
কলস পূর্ণ হয়ে যায়।

এ জন্মের মত বয়ে গেছ কে কোথায়
এবারের উৎসবে রেশ পড়েনি তার
বেজেছে আমৃত্যু সানাই।

আলোদের ভীড়ে ভীড়ে কবেকার পথে
আলো হয়ে গেছ
মানুষের মুখে তার ছায়াটুকু পড়ে নেই আর।

মানুষ জন্ম বুঝি এই একে বলে?
এই চলে যাওয়া, ব্যাক্তিগত ক্ষয়!

মা

বহুদূর যেতে ইচ্ছা করে আমার
যতদূর যাইনি, ততদূর।
তোমার বিনিদ্র শীৎকার থেকে যে
ঘোটকীর আহ্বান ছুটে আসে
মনে হয় যেন কত জন্মের ডাক,
আহা
যেন আমার সুস্থসবল মা

আপনার মতামত জানান