ভি-ডে

প্রকল্প ভট্টাচার্য


শনিবার সকালটা খুব ফুরফুরে থাকি, কারণটা হলো পরদিন রবিবার। তাছাড়া কেমন যেন একটা আনন্দও হয়। ব্যাঙ্ক সহ অনেক অফিস খোলা, আর আমার ছুটি! খুশীর চোটে ভোরবেলাই উঠে পড়ে চললাম বাজারে। গিয়েই প্রথম চমক।
দেখি আলুর দোকানে নোটিশ, ‘ভি- ডে স্পেশাল অফার!’
পরিচিত দোকানদার, ভাবলাম বানান ভুল করেছে। বললাম, ‘ইয়ে, দাদা, নোটিশে ওটা বোধহয় ‘ভিজে’ হবে... ভিজে আলুর ওজন বেশী তাই দাম কমাচ্ছেন হয়তো...’
আমাদের ইস্কুলে একজন অঙ্কের শিক্ষক ছিলেন, নন্দবাবু। তাঁর পড়ানো আমরা কিছুই বুঝতাম না। আর অঙ্ক ভুল করলে তিনি আমাদের দিকে এক বিশেষ দৃষ্টিতে তাকাতেন। কিছুটা অনুকম্পা, কিছুটা হতাশা, বাকিটা বিস্ময়। এমন ভুলও মানুষ করে! অবিকল সেই দৃষ্টিতে আলুওয়ালা আমার দিকে তাকালো।
-‘না দাদা, ঠিকই আছে। ওটা ভি- ডে, ভ্যালেন্টাইন’
খেয়াল ছিল কিন্তু, একটা ‘দিবস’ নিয়ে এ হেন বাড়াবাড়ি আশা করি নি।
স্বয়ং সন্ত ভ্যালেন্টাইনও শুনলে নির্ঘাত অজ্ঞান হয়ে যেতেন। প্রেমের স্বাদ শেষে আলুতে মেটাতে হবে!
সকালে খবরের কাগজ ভর্তি দেখেছি নানান ছাড় এবং সুযোগ, এই ভ্যালেন্টাইনের নামে। আজ নাকি প্রেমিকার হাতে হীরে দিয়ে ‘তু হি রে, তু হি রে, তেরে বিনা ম্যায় ক্যায়সে জিউঁ’ গাইতে হয়! সত্যি, বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি! ভাগ্যক্রমে আমার পত্নীদেবীও এইসব দেখনদারী দিবস পালনে বিশ্বাসী নন, তাই অতিরিক্ত কিছু দাবীও করেননি কোনোদিন।
আর একটু এগিয়ে দেখি বেগুনওয়ালা জোড়া বেগুনগুলো আলাদা করে সাজিয়েছে। আমায় দেখে বলল, “হাটশেপ চল্লিশ! হাটশেপ চল্লিশ!” কী কাণ্ড! গুরুদেব কি কোনো এক ফেব্রুয়ারির চোদ্দ তারিখেই লিখেছিলেন ‘হাট বসেছে শুক্রবারে’! নাঃ, আলু বেগুনেই এই অবস্থা তাহলে ফুলকপি টোম্যাটো তে না জানি কী অবস্থা হবে! যেমন দাম চড়ছে, তেমন ব্যবসায়ী কায়দা!
ঢুকলাম মাছের বাজারে। সেখানেও নিস্তার নেই। ‘জোড়া ইলিশ হাজার টাকা!’
মিনমিন করে বললাম, ‘কাতলা আছে?’
-‘আছে দাদা, ভ্যালেন্টা কাতলা। এই দলু, দাদাকে ভ্যালেন্টা দে তো!’
সর্বনাশ! মানে মানে কেটে পড়লাম। প্রায় খালি বাজারের ব্যাগ নিয়েই বাড়িমুখো হাঁটছি, দেখা হল প্রতিবেশী শঙ্করবাবুর সঙ্গে। উনিই বললেন, “নাঃ, কালে কালে কী যে হচ্ছে! ভ্যালেন্টাইনের দৌলতে প্রাণ যায়!”
-“যা বলেছেন। আমাদের সময়ে ভালবাসার কি কোনও বিশেষ দিন ছিল?”
-“কোথায়! প্রতিদিনই কলেজ ফেরত লুকিয়ে লুকিয়ে... নয়তো টিউশন সেন্টারে... আহা!”
রাস্তায় দেখলাম একদল ছেলেমেয়ে বিরোধী মিছিল বার করেছে। জোড়ায় জোড়ায় ঘোরা তাদের জন্মগত অধিকার। হাতে প্ল্যাকার্ড, ‘তোমার আইন আমার আইন, ভ্যালেন্টাইন ভ্যালেন্টাইন!’ ‘বাঁধব জোড়া, ভাঙ্গবি কে! উঠছে আওয়াজ সব দিকে!’
একজনে বললাম, ‘ভাই, তোমার সঙ্গে কি তোমার প্রেমিকা?’
-‘না দাদা, প্রেমিকা কে বাড়ি থেকে ছাড়েনি। এ হল পাড়ার মেয়ে। আজ এরও বয়ফ্রেণ্ডের আজ অফিস, আসতে পারেনি, তাই আমার সঙ্গে বেরিয়েছে।’
-‘ওহো, বুঝলাম। তার মানে জোট বাঁধলেই হোল। নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক যাই থাক, তাই তো?’
-‘আবার কি! কল ক্যা হোগা কিসকো পতা!’
ভাল রে ভাল। আজ জুটেছে, কাল কি হবে! কালের ঘরে শনি। সত্যিই তো, কটা দিনই বা বাঁচব, তার মধ্যে এইসব হুজুগের বাহানাতেও যদি কিছু আনন্দ পাওয়া যায়, মন্দ কী!
আমার তো আবার প্রেমিকা নেই। ছিল একজন, কিন্তু বিয়ের পর তিনি আমার পত্নী হয়ে গেছেন। ইচ্ছে হল, আজ তেনাকে একটু সারপ্রাইজ দিই!
বাড়ি পৌঁছে গলায় যতোটা সম্ভব আদর ঢেলে ডাক দিলাম, ‘ইয়ে, শুনছ?’
আঁচলে হাত মুছতে মুছতে কপালে ঘাম নিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরোলেন আমার ভ্যালেন্টাইন। ‘এত দেরী করলে বাজারে! কী মাছ...’ কথাটা শেষ হল না, আমার দিকে তাকিয়ে হাঁ করে স্থির হয়ে গেলেন।
আমি তখন আমার হাতের লাল রঙের হার্টশেপ বেলুনটা আর চকোলেটের বাক্স ওনার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললাম, ‘হ্যাপি ভ্যালেন্টাইন্স ডে, সুইটহার্ট!’
ফর্সা গালদুটো প্রথমে গোলাপী হল, তারপর রীতিমতো লাল। মাথা নীচু। সেই আমার প্রপোজ করবার দিনের মতো খুব আস্তে, খুব লাজুক স্বরে বললেন, ‘সেম টু ইয়ু, মাই ডিয়ার!’
ডায়মণ্ড রিং নয়, শাড়ী গয়না সিনেমা হাত ধরে বেড়ানো, কোনোটাই নয়। ভালবাসার এই মুহুর্তগুলোই তো আমাদের বাঁচিয়ে রাখে!
হ্যাপি ভ্যালেন্টাইন্স ডে!!


আপনার মতামত জানান