১৪ই ফেব্রুয়ারী হর্ণ বাজায় না কি?

রঙ্গীত মিত্র


আসলে কিছু কি ছিলো ? ছিলো না হয়তো। আমাকে ফিরে যেতে হচ্ছে আরো পিছনের দিকে... ১৯৯৮- ৯৯ সাল। আমাদের বাড়িটা তখনো দোতলা হয়নি। বাড়িতে আসেনি টেলিফোন। আমাদের ছোট একটা ভিডিওকনের কালার টিভি ছিলো। আর ছাদে ছিলো অ্যান্টেনা। আমারা দুটো চ্যানেল দিয়ে কাটিয়ে দিয়েছি,কত বছর । মনে আছে ঝড় হলে বাড়ির ভিতরের নারকেল গাছটা নড়ে উঠতো। বাবার বই- এর র্যা।ক থেকে কবিতার সাথে আলাপ। কখনো আবার আলমারি থেকে প্যানাসনিকের টেপরেকর্ডারটা নিয়ে গান শোনা... কিন্তু তখনো আমার কাছে প্রেমটা যে কি জিনিস বুঝিনি। কারণ বোধহয় বয়েজ স্কুল। মেয়েদের সাথে পরিচয় হয়নি বলার থেকে শরীরী আগ্রহ বেড়ে ওঠেনি। যদিও আমার বন্ধুদের দেবদাসকরণ দেখে খারাপ লাগত । আর তখন থেকে হিন্দিগানের সাথে আমার দূরত্ব।

গান,কবিতা ইত্যাদি অনেক স্মৃতিগাছ নিয়ে জেগে আছে আমার জীবন। কিন্তু ওই বয়সে আমার কাছে প্রেমটা সেরকম হয়নি। যদিও আমার পাড়ায় আমি একাই ছেলে ছিলাম বলে , আমারই সমবয়সি দুই বান্ধবী পেয়েছিলাম। কিন্তু তারাও আমার হাল দেখে বুঝেছিলো এ মাল কাজের নয়। এইভাবে মাধ্যমিক পরীক্ষা দিলাম। তার দীর্ঘছুটি আমার কাছে বাংলাগান নিয়ে এলো, বাংলাকবিতা নিয়ে এলো। আমি একদম আধুনিক কবিদের কবিতার পড়তে থাকি... নব্বই দশকের কবিতা... নব্বই দশকের গান আমাকে অন্য গোলার্ধে নিয়ে আসে। আমি কেন জানি না অনুভব করতে থাকি আমাদের বন্ধুদের এই প্রেমে পড়ে যাওয়া আবার প্রেম কেটে যাওয়া যন্ত্রনা... কালীপূজোর রাতে দেখতাম সবাই মদ খেয়ে বাওয়াল করছে... ওটা আমার জীবন নয়। তবে স্বরসতী পুজো করতাম। পরে পড়ার চাপে আমরা কেমন আলাদা হয়ে গেলাম। আর আমার পাড়াটাও বদলে গেলো...।

যৌনতা সম্বন্ধে আমার ধারণা কিন্তু ওই ক্লাস টেনের পরীক্ষার পরের ছুটিতে কম্পিউটার ক্লাসে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে বুঝেছিলাম একটি ছেলের তুলনায় একটি মেয়ে খুব ভালো বন্ধু হতে পারে। আর আমি আমার এই ২৯ বছরের জীবনে বুঝেছি বান্ধবীদের গুরুত্ব। সৌমি আমাদের প্রতিবেশি। আমার মতোই মাধ্যমিক পাশ করে,আমার সাথে একই জায়গায় (যাদবপুর) কম্পিউটার শিখতো। আমরা এক সাথে বাড়ি ফিরতাম। যেহেতু পাড়ার লোক আমাকে ভালোছেলে বলে চেনে , তাই আমি নিরাপদ ...। তখন সবে সাইবার ক্যাফে গজিয়ে উঠছে। আমরা দুজনে কম্পিউটার সার্চ করতে গিয়ে রেডিফ,ইয়াহুর সাথে আর এক অজানা পৃথিবী,যৌনতার পৃথিবী আবিস্কার করলাম। প্রথমে লজ্জা পেয়ে,পরে অভ্যেস হয়ে গেছিলো। শুধু আমরা নই,অনেকেই সাইবার ক্যাফে যেতো।
সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখার সাহস ছিলো না। আর আমরা মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে মেয়ে । যদি কিছু কেস খাই। কারণ ওইসব সিনেমা হলের পরিবেশ ভালো নয়। আমার এক বন্ধু আমাকে খুব ভয় দেখিয়েছিলো। একদিন সৌমি আর আমি ঠিক করলাম, ম্যাগাজিন কিনে দেখবো। কিন্তু আমার বাড়িতে রাখা যাবে না।আমার মা দেখলে... ঠিক হলো সৌমির বাড়ি রাখা হবে। কারণ ওর বাবা মা দুদিন থাকবে না। দাদু দিদার সাথে ওরা তখন আমাদের পাশের বাড়ির বাসিন্দা। ওরা দোতলায় থাকতো। আর ওর দাদু দিদা একতলায় । আমি সৌমিকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, “রাখবি কোথায়? ” ; সৌমি বলেছিলো , “ আমাদের বাড়ির একটা ঘরে , পুরোনো কাগজ স্তুপ করে রাখা হয়।প্রায় দুতিন মাসের কাগজ জমিয়ে বিক্রি করা হয়।ওখানে লুকিয়ে রাখবো । ” সেদিন খুব ভয় ভয় আমি একাই প্রায় ১৫০টাকা দিয়ে একটা ম্যাগাজিন কিনে আনলাম। আসলে আগে কয়েকদিন ঘুরে গেছি সেই বিশেষ ম্যাগাজিনের স্টলে। দেখেছি লোকজন কিভাবে ওইসব ম্যাগাজিন কেনে...

পরের দিন দুপুর বেলা

পরের দিন চোখমুখ উত্তেজনা নিয়ে সৌমির বাড়িতে চলে এসেছিলাম। ওর বাড়ি আমি ছোটোবেলা থেকেই যাই। এবং সৌমিও আমাদের বাড়িতে আসে। তাই সন্দেহ ব্যাপারটা ছিলোই না। আমি সৌমির ঘরে ঢুকে,মাটিতে বসলাম। সৌমি ম্যাগাজিনটা গোপন আস্তানা থেকে নিয়ে এসে ঘরের দরজা বন্ধ করলো। দরজা বন্ধ মানে ছিটকিনি বন্ধ করা... পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে আমাদের দুজনের চোখ ছানাবড়া। আমরা যেন নিজেদের দেখছি... এক সময়ে ম্যাগাজিনের পাতার নগ্নতা উঠে এলো। ক্লাস টেনের সদ্য গঠিত শরীর... বয়সের অল্প অল্প ছাপ। যেন শিল্পীর তুলির ছাপ পুরোপুরি পরেনি। অথবা পুরোপুরি একটা মূর্তিটা বানানো হয়নি। আন্ডার কনস্ট্র্যাকসান। তারপর উত্তেজনা কমার পর লজ্জা হলো। কিন্তু শরীরের পরিচয় বেড়ে যেতে থাকলো... কিন্তু তখনো আমি প্রেমকে পাইনি।

কলেজ জীবন

এর আগে ঘটকের কাজ করেছি। কিন্তু কলেজে ঢুকে দেখলাম সবাই প্রেম করছে। অথচ শালা আমার কিছুই হলো না। হুলিয়ে বাড়িতে কম্পিউটারে নেট করতে থাকলাম। রাতে অনলাইন চ্যাট করতে থাকলাম। সিডি ভাড়া করে নিয়ে আসতাম। আরে কি করবো? কলেজের মেয়েরা আমাকে পাত্তাই দিতো । তবে তখন থেকেই দেখেছি সেক্সটা সেরকম কিছু একটা বড় ব্যাপার নয়।
আমি ঠিক করেছিলাম কলেজের মেয়েদের সাথে কথা বলবো না। অন্য কলেজের মেয়েদের সাথে আলাপ হলো। বন্ধুত্ব হলো। ম্যাগাজিন হলো...আমাকে টানতে থাকলো লেখার পৃথিবী। এইসময় সুস্মিতা বলে একটি বন্ধু হলো। অন্য কলেজে সে আমার মতো একই বিষয় পড়ে। বন্ধুত্ব হলো কিন্তু প্রেম নয়। তার হাত ধরে আমার প্রথম নেশা করা। আমি তো মদ খাইনা। গাঁজা না না... কিন্তু একটি মেয়ে যখন একলা ফ্ল্যাটে ডাকে। তখন স্পেশাল শব্দে... ধোঁয়ার গেলাস চৌম্বকত্বের মতো টেনে নেয়। সেখানেই সেক্সের শুরু। যৌনতার খননের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসা মসৃণ ক্রিম... কখনো সুপক্ক ফলের স্বাদ নিরাপত্তা নামক ফুল থেকে মধু নিয়ে উড়ে যাওয়া চাঁদ... দেখে নেওয়া কিম্বা দেখিয়ে যাওয়া শরীরের ব্রহ্মাস্ত্র... ভাঁজের আমাজন কিম্বা আফ্রিকা... যেখানে আনন্দ এক এক একটা পাহাড়ের পিক... সেখানে বরফ চূড়া... ঠোঁটে কামড়...এইসব চলেছিলো,তবু প্রেম নেই। বান্ধবীর সংখ্যা বাড়লো... এর মধ্যে একজনের সাথে প্রেম করে দেখা করতে গিয়ে দেখলাম সে খুব বাজে দেখতে... কাটিয়ে দিলাম বহু কষ্ট করে... সে মেয়েটি আমার সাথে শোবে বলেছিলো। তারপর একটি ক্লাস ১২- এর মেয়ের সাথে একবছর ফোনে প্রেম। সে প্রেম একদিন কাটিয়ে সে ডাক্তারি পড়তে গেলো। আমি কষ্ট নিয়ে চাকরি করতে গেলাম।


চাকরির সময়

চাকরির অনেকগুলো দিন আমি প্রেমিকা খুঁজে গেছি। দেখিছি সবই এখানে পরকীয়া। আমি বুঝেছি আমার বন্ধু বান্ধবীরা কিভাবে মুখোশ পরে ঘুরে বেড়ায় । আমি একটা পরকীয়া সম্পর্কে ঢুকে গেলাম। ভদ্রমহিলা আমাকে ফোন- সেক্স শেখালেন... একদিন সোজা বাড়িতে ডেকে নিলেন। (তার আগে তার স্বামী সম্বন্ধে অনেক বাজে কথা বলেছেন। যদিও এটা আমার সেকেন্ড অ্যাটেমপ্ট। আগের বার যে মহিলাটির সাথে কথা বলছিলাম,তার বর একদিন ফোনে আমাকে হেবি হুমকি দেন... যাই হোক এইবার সেই কেস হয়নি। )
আমার কাছে সব কিছু যান্ত্রিক বলে মনে হতো। মোনালী শাড়ি ছেড়ে জিন্সে চলে এলো। কিন্তু কয়েক মাস পর আর টিঁকলো না। ওকে ওর বরের সাথে দুবাই চলে যেতে হতো। তারপর আমি সত্যিই প্রেমে পড়লাম। যদিও মধ্যরাতে মহিলাদের সাথে কথা বলতে আমার খুব ভালো লাগে। আমার এক দাদা আমাকে মেয়ে দেখতে শিখিয়েছিলো... প্রথমে মেয়েটির পা,তারপর কোমর,শেষে বুক... এইভাবে বেড়ে ওঠা আমার মনের স্তরে প্রেম হলো। সেই প্রেমের বয়স এখন পাঁচ হয়ে গেছে। শরীর আসেনি। প্রেম এসেছে। যদিও সম্পর্কে অনেক কম্প্রোমাইজ । তবু আমরা দুজন লড়ে যাচ্ছি। প্রেমিকার বাড়িতে অভাব। আমার এখন চাকরি নেই। বিয়ের চাপ। লেখা লিখি আর চারপাশের বাজের মানুষ ... বিচ্ছেদ লিখে যাওয়া গুনগান... বমি করা পাগোল কুকুর...আর ধর্ষন... খুন ... মধ্যমেধা আর হঠাত বলিউডি নকলে মেরে ফ্যালা আন্তর্জাতিকতা তবু তারা খোলস পরে ঘুরে বেড়ায়। তাদের শরীর যেন বাংলা রক। তবু আমি লড়ে যাই। সজীবতার জন্যে লড়ে যাই। কাল আমার ক্যাম্পাসিং তবু এই গদ্যতে লিখে যাই আরোপিত কিছু হয়না। আর চাপিয়ে দেওয়া কিছু আমি মানি না। সবার জন্যে সমান কিছু হয়না। ভালোবাসা ঈশ্বরের দান...অন্যরকম কিছু... যার জন্যে আমার মতো তারকাটা হতে হবে...ওপেন মাইন্ডেড হতে হবে...


অলংকরণ- নীলাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

আপনার মতামত জানান