“হ্যাপি ভ্যালেন্টাইন’স ডে”

কৌশিক রায়


“ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত “- এর মতই প্রেমিক/ প্রেমিকা থাকুক না থাকুক আজ ভ্যালেন্টাইন’স ডে । কোলকাতা থেকে হাজার কিমি দূরে বসে দিনটার উষ্ণতা যেন কয়েকদিন আগে থেকেই অনুভব করতে শুরু করেছি । এইতো কালকেই একটি মেয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করেই ফেলল-“ তোমাদের বাঙালীদের তো দুটো ভ্যালেন্টাইন’স ডে, তাই না?” আমি হেসে জবাব দিয়েছিলাম- “হ্যাঁ তো...” । গত কদিন ধরেই দেখছি সুপ্ত ভালোবাসার ভ্রূণগুলো আস্তে আস্তে ভূমিষ্ঠ হচ্ছে । জানিনা, এ সমস্ত ভূমিষ্ঠ ভালোবাসা ক্ষণস্থায়ী কিনা, কিন্তু হৃদয়ের টান কবেই বা বাস্তবের ভ্রূকুটি গ্রাহ্য করেছে!
কোলকাতায় শুনছি এখন নাকি বিয়ের মরশুম । আর ফেব্রুয়ারীতে বিয়ে করা এখন একটা ট্রেন্ডও বটে । কে জানে আজ যে মেয়েটির বিয়ে হচ্ছে হয়তো সেও একদিন কারো প্রেমিকা ছিলো। কে বলতে পারে চোখের কোণে চিকচিক করে ওঠা হীরক সম অশ্রুকণাটি সেই নামহীন হারিয়ে যাওয়া প্রেমিকের জন্য নয় ! হয়তো সেও একদিন বিশ্বাস করতো সব বাধা পেরিয়ে তার ভালোবাসা একদিন রুপ পাবে। হয়তো সে তার পুরানো মেকআপ বক্স খুলে খুঁজে পেতে চাইছে সেই পুরানো চিঠিগুলো, তারপরই তার মনে পড়ে যাচ্ছে যে ওগুলো অনেকদিন আগেই সে ফেলে দিয়েছিলো রাগে আর আভিমানে । তাহলে কিসের টানে কে জানে কেন সে আবার আতীত ছুঁয়ে দেখতে চাইছে। হয়তো নতুন জীবন শুরু করার আগে অতীতকে শেষবারের মতো বিদায় জানাতে এসেছিলো সে । রুমালে চোখ মুছতে মুছতে মনে পড়ে যাচ্ছে তার প্রেমিকের কাঁধে মাথা রেখে করা হাজারটা শপথ । পরপর অনেকগুলো ‘প্রমিস ডে’ একসাথে অনেক প্রমিস করেছিলো , কিন্তু কি জানি কেন, দুজনেই তা ভেঙ্গে দিলো। না, “স্মৃতি সততই সুখের” হয় না সবসময় , বোধহয় কখনও কখনও দুঃখেরও বটে। এমনই কোনো ভ্যালেন্টাইন’স ডে তে হয়তো তাদের কথা ছিলো বিয়ের পর তারা কোনো সমুদ্র সৈকতে পাশাপাশি বসে কাটিয়ে দেবে সারাটা জীবন । সেসব সত্যি না হলেও সমুদ্রের নোনাজলটা চোখের কোণ বেয়ে মিশে যেতে চাইছে দিগন্তের শেষ সীমায়। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই নাকি সে সাতজন্মের বাঁধনে বাঁধা পড়বে কোনো অজ্ঞাত পুরুষের সাথে। আজ সে কি অনুভব করছে - হৃদয়ের বন্ধন সাতজন্মের থেকেও বেশী দৃঢ় !
যে পুরুষটি বিবাহ বাসরে অপেক্ষা করছে কনের জন্য, হয়তো সেও কোনো একদিন কোনো নারীর প্রেমিক ছিলো। বিবাহ বাসরে হাজার হাসি ঠাট্টার আড়ালে হয়তো লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে তার ব্যর্থ শপথ গুলো। কোনো চুম্বন দিবসে হয়তো সেও “বিদ্রোহ আর চুমুর দিব্যি” দিয়ে শুধু সেই মেয়েটিকেই চেয়েছিলো, হাতে হাত রেখে কোলকাতার অলি গলিতে ঠোঁটে ঠোঁট রেখে ব্যারিকেট করেছিলো কোনো নামহীন প্রেমের কবিতায়। ফেলে আসা কোনো ইভিনিং শোয়ের গোলাপী রঙের টিকিটটা হয়তো মনের মধ্যে সে এখনও হাতড়ে খুঁজে পেতে চাইছে। হয়তো সে কথা দিয়েছিলো বিয়ের পর তারা একসাথে মানালীর কোনো ছোট্ট হোটেলে পাশাপাশি বসে একে অন্যের সাথে মিশে যাবে। ফেলে আসা কোনো পোড়া ডাইরির পাতায় রয়ে গেছে হাজারটা ব্যাভিচারী প্রেমের কাব্য। কলেজের ক্লাস পালিয়ে লেকের পাশে কাঁধে তার প্রেমিকার মাথা নিয়ে সেসব কবিতার ব্যবচ্ছেদ, আর গোধূলির চুরি যাওয়া আলোয় সম্মোহিত ভালোবাসা যেন আরো গাঢ় হয়ে উঠত। হয়তো কোনো একদিন সমরেশ মজুমদারের মতো সেও বিশ্বাস করত তার প্রেমিকার ব্লাউজের নিচে শুধু স্তন নয়, আছে আস্ত একখানা হৃদয়। আজও সে একই কথা বিশ্বাস করে কি?
আসলে সময়ের সাথে সাথে ওরা সবাই আস্তে আস্তে সব মেনে নিয়ে খুশি হতে বা সুখী হতে শিখে নিয়েছে। কোনো না কোনো সময় তাদেরও প্রেম হয়েছিলো , কখনও মুখ ফুটে কেউ বলতে পেরেছিলো, কখনও বলা হয়ে ওঠেই নি, আর কখনও অনেক প্রতিজ্ঞার পরও সেগুলো তারা রেখে উঠতে পারেনি। তারপর এক নিঃশ্বাসে লিখে ফেলা হাজার খানা কবিতায় চুপিচুপি আবার তাকেই ফিরে পেতে চায়। ব্যর্থ প্রেমের যন্ত্রণায় হঠাৎ করেই যে ছেলেটি ভেবে নিয়েছিলো জীবন এখানেই শেষ, জীবন তার জন্যও থেমে থাকেনি; যে মেয়েটি হাতের শিরা কাটবে ভেবেছিলো, সাহসের অভাবে তারও আর শিরা কাটা হয়নি। ছেলেটা হয়তো ছাদের কার্নিসে গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো কিন্তু তারপর আর সংহার কাব্য লিখতে পারেনি সে। মেয়েটিও হয়তো অনেকগুলো ঘুমের ট্যাবলেট হাত পর্যন্ত পৌঁছেছিলো কিন্তু আর শেষ পর্যন্ত পাকস্থলীতে পৌঁছায়নি। হয়তো আরো অনেকদিন তারা দরজা বন্ধ করে বালিশ ভিজিয়েছিলো, কিন্তু তারপরও জীবন মানে পড়ে থাকে আরো আনেক কিছু। সব কিছু প্রকৃতির নিয়মেই যেমন শুরু হয় তেমনই শেষও হয়। কখনও ওরা খুব সহজে মেনে নিয়েছে, কখনও হয়ত মেনে নিতে পারেনি। স্মৃতি চিহ্নের ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই এক সময় মাথা তুলে দাঁড়ায় ছোট্ট অর্ধ-স্ফুট শ্বেত কোরক। আজ বিয়ের পর মধ্যরাতে সবাই যখন ঘুমে অচেতন , তখন কি ছেলেটি মেয়েটিকে বলবে- “ হ্যাপি ভ্যালেন্টাইন’স ডে!!” ? কি জানি!


অলংকরণ এবং কবিতা- নীলাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

আপনার মতামত জানান