খোলামকুচি, প্রেম ও ইয়ে

সরোজ দরবার


খোলামকুচি দিয়ে এ লেখা শুরু হওয়ার কথা ছিল না, এই আপকামিং বসন্তে অবধারিত শুরুবাত ছিল ‘একটি মেয়ে’ দিয়ে, কিংবা নিদেনপক্ষে ছেলেটি ও মেয়েটি দিয়ে। কিন্তু লেখার গোঁ। সে খোলামকুচি দিয়েই শুরু হবে। হয়েও গেল। আর হবে নাইবা কেন, ভরা বাসে অন্তত কতবার যে ব্যাঙ্কবাবু, ছেলেটি আর মেয়েটিকে এই শব্দটা শুনিয়েছে। আর মধ্যে মধ্যে খালি ইয়ে যোগ করেছে। ব্যাঙ্কবাবু আর ছেলেটি-মেয়েটির কোনও পরিচয় লেখার জানা নেই, পাতানো কোনও সম্পক্কও তাদের মধ্যে আছে বলে জানা নেই, কিন্তু আবার একটা আছেও বটে। এক টাইমের বাসযাত্রার রিলেশন। সিট নিয়ে কিংবা পাঁজরায় কনুই লাগা নিয়ে বেসময়ের উটকো কেউ একটু ট্যাঁ- ফো করে দেখুক না কেন, এমন অধিকারবোধ প্রবল হয়ে উঠবে যে, কোয়ালিশন গভর্নমেন্টও লজ্জা পেয়ে যেত বাধ্য। মোদ্দা কথা, ওরা সকলে মিলে চলতি বাসের এক ব্যবস্থা। যাকগে ধান ভানতে শীবের গীত গেয়ে লাভ নেই, কাজের কথা হল, ছেলেটা একটু গলায় তেরছা শ্লেষ ঢেলে বলেছিল, হাগ ডে তো গেল কাকা (বলা বাহুল্য এ সম্পর্কের কাকা- জ্যাঠা নয়), কিস ডে তে কি করবে? ‘কাকা’ ততোধিক তেরছা গলায় বলল, কী আর করব, কিস মিস করব। তারপর বলল, তোমরা তো ওই মানে ইয়ে করেই কাটাবে। আমাদের কি আর...। হতাশা এমন একটা টোন নিল যে, প্রবল পরাক্রমে তিন দশকের বেশি সরকার চালানোর পর এক রাজনৈতিক দল প্রায় লোকহীন হয়ে যেতেও যেতেও বুঝি চরম হতাশ হয়েও এমন টোন পায়নি। কিন্তু এ কথা বলে ‘কাকা’ খেয়াল করেনি, কাকার পাশের সিটের চোখে পড়ল, মেয়েটির কর্ণমূল রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। কেননা ‘কাকা’ জানত না যে, ছেলেটা মেয়েটা প্রেমিক- প্রেমিকা নয়, তবে দুজনেরই মনে একটু একটু ইয়ে আছে। প্রতিদিন একসঙ্গে দেখার অভ্যাসে ‘কাকা’ এই ধারণা করে নিয়েছিল মাত্র।
তো এই ‘কাকা’র ধারণাতেই আজকাল সব খোলামকুচি হয়ে গেছে। মানে ইয়ে প্রেম আর কী! ছেলেটা হাঁই হাঁই করে উঠল। বললেই হবে, উত্তম- সুচিত্রা হলে প্রেম আর রণবীর- দীপিকা হলে নয় কেন? বাংলা নামও ছেলেটার মনে পড়ছিল, কিন্তু ঠিক বলতে ইচ্ছে করছিল না, কীসে আর কীসে তামা- সীসে ইত্যাদির আগমন গোড়াতেই আটকে দিল সে। কিন্তু ‘কাকা’কে আটকায় সাধ্য কার। ‘কাকা’ বলল, আরে ব্যাপারটার মধ্যে একটা ইয়ে আছে, অমন হুসহাস হাগ- কিস হয়ে গেলেই হল! অথচ হচ্ছেটা যে কোথায়! মেয়েটা ভাবে, মুখে বলে, তো ‘ইয়ে’টা একটু বুঝিয়েই বলুন। ব্যাঙ্ক বাবু ‘কাকা’ এবার ঝাঁপি খুলে বসল। ঝাঁপি থেকে যা বেরোল মোটামুটি চেনা সিকি আধুলিই। ওই উত্তমবাবুর স্কুটার রেখে হাতা গুটিয়ে মুখে বাদাম ফেলতে ফেলতে কলেজে ঢোকার স্টাইল ঠিকঠাক রপ্ত করতে পারলেই নাকি প্রমীলাবাহিনি বশীভূত হবেন- এই টিপস ‘কাকা’র অভিজ্ঞ দাদারা দিয়েছিল। তা করতে গিয়েই আবার নাকি হিতে বিপরীত। কেননা ‘কাকা’র যার উপর ইয়ে ছিল তিনি ‘নায়ক’-এর শর্মিলা ঠাকুর টাইপস ছিলেন। ‘কাকা’ স্টাইল মারতে গিয়ে কেস খেয়ে লাট। তবে কেসের আরও বাকি ছিল। সে তো মেসের দোতালায় মহিলা দেখে উলটো আয়নায় জহর রায়ের গোঁফ ছেঁটে ফেলার যুগ। স্বয়ং উত্তমকুমারও কি না পর্দায় প্রেম নিবেদন করতে গিয়ে সুচিত্রাসমীপে হাতে হাত ঘষে গাছের পাতা ছিঁড়ত, আর সেখানে কোথায় ‘কাকা’। সেও বেচারা প্রথমবার বলতে গিয়ে নাকি তুতলে ফুতলে একাক্কার কাণ্ড বাধিয়েছিল। এতটা সময় নিয়ে নিয়েছিল যে ফটকেদার চোখে পড়ে গেল। রিপোর্ট গেল তেনার বাবার কাছে। খানাতল্লাশি করে একখানা চিঠিও পাওয়া গিয়েছিল। সে নাকি আবার লিখে দিয়েছিল ‘কাকা’র কোন এক সাহিত্যপ্রেমী বন্ধু। তারপরই তো তিনি নজরবন্দি, আর কাকা পেয়ার কিয়া তো ডরনা ক্যায়া। ছেলেটার শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল যেন প্রভাত মুখুজ্জের না পড়া কোনও গল্প। ও হ্যাঁ, কারা যেন বলে এই প্রজন্ম আবার বইটই পড়ে না। সে পড়ে তবে, কবিতা পড়ে না, ওগুলো মেয়েটা পড়ে।‘কাকা’র মতে সেইসব দিনে যে ইয়েটা ছিল এখন আর সেই ইয়েটা নেই। কিন্তু কেকের উপর ক্রিমটা তো তখনও পড়েনি। ঘটনা হল, ‘কাকা’র এ কাহিনির নায়িকা কিন্তু ‘কাকা’র জীবনে আসলে বিলীয়মান রঙ। ‘কাকা’র ঘরণী অন্য কেউ। কিন্তু সেই ভয় ভয়, সেই ধরা পড়া, সেই বিলীয়মান রঙে ‘কাকা’কথিত ইয়েটা আছে। মেয়েটা বলল, এখন আর ‘ইয়ে’টা তাহলে একদমই চোখে টোখে পড়ে না। ‘কাকা’র জবাব, চোখে পড়ে তো, ভিক্টোরিয়ার পাশ দিয়ে গেলে, ঝোপেঝাড়ে চোখে পড়ে সব খোলামকুচির মতো পড়ে আছে। ঝোপও নাকি আবার প্রেম করার জায়গা হল... ছো ছো... খিক খিক করে হেসে ‘কাকা’ বলে, ঝোপেঝাড়ে তারা তো ইয়ে করত ছোটবেলায়।
ছেলেটা আর মেয়েটা আসলে এক অফিসেই কাজ করে, এক টাইমেই অফিসে যায়, একই সঙ্গে তাই বাসে ওঠে। এতগুলো কাকতালীয় ঘটনা ঘটে, রোজ ঘটে বলেই ‘কাকা’ তাদেরও খোলামকুচির দলে ফেলে দিয়েছে। কিন্তু যে ঘটনা ঘটার কথা সে আর কিছুতেই ঘটে না। ‘ইয়ে’ এখানেও আছে, এখনও। নজরে আসে না। নজরে আসে এই এলেবেলে ব্যাপারগুলো। এই সেদিন অবধি তো ‘সিমরন’ প্রেমে হাবুডুবু খেয়েও ‘বাউজি’ না বলা ইস্তক ‘রাহুল’ -এর কাছে চলে যায়নি, ট্রেন তো প্রায় স্পিড নিএয়ি নিচ্ছিল, এমন সময় আদিত্য চোপড়া এসে বাঁচিয়ে দিল। সিমরন হিন্দি সিনেমার বিশ্বায়ন উত্তর অতখানি স্বাধীনতা নিয়ে পারল না, আর আমাদের এই মেয়েটি কী করে যাবে। এখানে অবশ্য বাউজি নয়, একটা রিলিজিয়াস টুইস্ট আছে, সহজে অনুমেয়, অন্তত লেখার পক্ষে তা জানা অসম্ভব নয়। কেন সম্ভব সে শুধু জানে শ্যামলাল, কিন্তু ‘কাকা’ জানে এই যুগলকে ধরেই জেনারেশনটাকে কুপোকাৎ করে দেওয়া যাবে। অতএব, মনে মনে ভালো করে ভেঁজে নিয়ে, তিনি শুরু করলেন, আজকাল তো সেই মন আনচান ব্যাপারটাই নেই। তার টিউশন ফেরত পথে একলা দাঁড়িয়ে থাকা, সে না এলে সেই যে একখান ডাঙায় ওঠা কইয়ের মতো ছটপটে ভাব-সে সব আর কোথায় হে! দেখা-সাক্ষাৎ হওয়াটা খোলামকুচি হয়ে গেছে, ‘কাকা’র চোখে। ছেলে মনে মনে ভাবে, হায় কই, গলা কাটা মুরগীর ছটফটানোটা কি তুমি দেখেছিলে? এই বাসস্ট্যান্ডে আসার আগে ‘রিচড?’ টেক্সট না এলে যে হুলুস্থূলু পড়ে শিরায় উপশিরায়, ‘কাকা’ হে, তুমি তার কতটুকু জানো? তবু ‘কাকা’র স্টক এখনও শেষ হয়নি। বলছে, ওই যে তোমাদের আছে না এক মুখবুক... না অন্যভাবে নিও না... ফেসবুক ফেসবুক... ওখানে তো সবই খুল্লমখুল্লা। হতেই পারে যে ছিল তোমার স্বপণচারিণী তাকে চিনতে পারোনি, তুমি ছুটে গেছ সোনার হরিণীর দিকে, কিন্তু সে ছুটে যাওয়ার ভিতরেও তো একটা মায়া আছে। এখন তো সবাই ওই মুখবুক দেখেই বুঝে যায় কোথায় খাপ খুলতে হবে কোথায় নয়। সাসপেন্সটাই নেই... যেন ভালোলাগা- মন্দলাগা সব খোলামকুচি হয়ে পড়ে আছে। বোঝো, এই যে দিবসরজনী সে যে এক আশায় আশায় থাকে, মেয়েটা ভাবে, মনে হয় এই বুঝি এল সেই সময়, আর সময় বালি হয়ে কেবলই গলে যায় উলটোদিকে, পরের দিন আবার সে আশায় আশায় বালিঘড়ি সোজা করে দেয়... এসবের মধ্যে সাসপেন্স নেই!
এ সবই ছিল এখনকার বাসের মুখোমুখি চার সিটের গল্প। তিন সিটে ওরা তিনজন, আর এক সিটে ঘাপটি মেরে বসেছিল লেখা। আসলে তো এ কাহিনির কোনও কনক্লুশন নেই... তাই একসময় গন্তব্য এসে যায়। আগে হোক পরে হোক গন্তব্য ঠিক আসেই। কানের হেডফোনে এফএম বলে যায় ‘বসন্ত এসে গেছে’।
ফেরার পথে সিট পায় না ছেলেটা মেয়েটা। বাসের পিছনের সিটের মাঝের ফাঁকা জায়গাটায় ঘেষেঘেষি করে বসে।(কলম্বাসের দেশ আবিষ্কারের মতোই নিত্যযাত্রীরা এই নয়া সিট আবিষ্কার করে নিয়েছে।) ছেলেটার বাঁদিকে নয়, বরং উলটো জোড়ি হয়ে বসল তারা। গায়ে গা ঠেকে যায়, কারও কোনও আপত্তি থাকে না, থাকার কথাও ছিল না। ‘তেলেভাজা’ নিয়ে আগে চোঁয়া ঢেকুরের গল্প হত, এখন দুজনের মধ্যে একটু হাসাহাসির গল্প হল, কে না জানে ‘তেলেভাজা’ এখন কতখানি জাতে উঠে গেছে। তারপর বাইপাস থুড়ি বিশ্ববাংলা সরণি ধরে সাঁ সাঁ দৌড় লাগাল বাস। বেলেঘাটা-বাইপাস কানেক্টরে মুখে প্রথম ফোটা পলাশ গাছটা হুশ করে চলে গেল। আর মেয়েটার ঘুম ঘুম এল। ডানদিকে মাথাটা ঝোঁকাল সে, সিটের কোণায়, সে সিটে এক মুশকো মতো লোক বসে। তারপর তার জঘন্য লাগল, মনে হল পৃথিবী চুলোয় যাক, সমাজ অনুমোদন দিক বা না দিক, যে পারে সে খোলামখুচি বলুক, সে ছেলেটির কাঁধেই মাথা রাখবে। তারপর একসময়, কোন ঝাঁকুনি ছাড়াই, অজুহাত ব্যতিরেকেই মেয়েটি বামপন্থী হল। আহ ভ্যালেন্টাইন্স ডে... এই বাজারেও তো কেউ বামপন্থী হল। আর তুমি শুধু ১৪ গেরোয় আটকা থাকবে... কোন দুঃখে হে... যেখানে যেখানে পলাশ ফোটে, যেখানে যেখানে কাঁধে মাথা এসে এভাবে ঠেকে যায় সেখানে সেখানে তুমি থাকবে, এভাবেই।
এই তুমুল ভালোলাগার দিনেই ছেলেটি একটা ফোন পেল।‘কাকা’র। ব্যাপার কি? উত্তর এল, ভায়া তোমাদের ওই ফোনে লাভ চিহ্ন কী করে দেওয়া যায় বলতো? প্রায় পাগলের মতো হেসে উঠল ছেলেটি। কাকে পাঠাবে, সেই শর্মিলা ঠাকুরকে নাকি? যে হাসি হেসে ‘কাকা’ উত্তর দিচ্ছে, সেই সলাজ হাসিমুখটা যেন দেখতেই পাচ্ছে ছেলেটা। ‘কাকা’ বলছে, ধুরর ভাই, বউকে একটা স্মার্ট ফোন কিনে দিয়েছি আজ, বুইলে। ভাবছি একটা লাভ মেসেজ পাঠিয়ে তোমাদের ভ্যালেন্টান্স ডে-র মধ্যেও আমরাও ঢুকে পড়ি? ওই বুড়ো বয়সের একটু উসুমকুসুম ইচ্ছে বুইলে কি না...কি তুমি জানো তো? পাঠাও তো ওসব নাকি?
ছেলেটা সেরকমই পাগলের মতো হাসতে হাসতে বলল, জানি, হান্ড্রেড পার্সেন্ট... লাভ... লেজার দ্যান থ্রি... বুঝলে, বুঝতে পারছ?... আর গ্রেটার দ্যান এভরিথিং... হাসছে সে, বলতে বলতে, পাগলের মতো হাসছে...
আহ! ভ্যালেন্টাইন্স ডে, তুমি কেন শুধু পার্টিতে, গিফটে, ডেটিংয়ে... কেনই বা শুধু রেডিও চ্যানেলের জগাখিচুড়ি ভাষার উল্লাসে... কে বলেছে তুমি ইয়ো ইয়ো হানি সিংয়ে... এমনকী চসার সাহেবের কবিতাতেও শুধু নও তুমি... তুমি আসলে সময়ের উঠোনে ছড়িয়ে থাকা এক দুর্লভ খোলামকুচি... এক না-বিলীয়মান রঙ... যে জানে সে জানে... না জেনে শুধু দুয়ো দেয় দুর্জনে... আহ ভ্যালেন্টাইন্স ডে, তুমি আসলে এক আশ্চর্য ইয়ে।

আপনার মতামত জানান