সবজেটে গ্রীন ক্যাম্পাস

ষষ্ঠ পর্ব
(৮)
বিলাসের জানা ছিলোনা – জানার কথাও নয়, যে বাড়মের জায়গাটা বাঙালিদের কাছে – অ্যাটলিস্ট সিনেমাপ্রেমী বাঙালিদের খুব একটা অপরিচিত নয়।
সত্যজিৎ রায়ের ছবিকে নিয়ে আরবান বাঙালির যে একটা ‘সর্বাত্মক সর্বব্যাপী’ মার্কা গর্ব আছে, আসল কেসটা আদৈ সেরকম নয়। লেখক নিজে বহু সেকেন্ড এবং থার্ড জেনারেশান বাঙালিকে দেখেছে যারা সাকুল্যে চারটি ছবি ছাড়া সত্যজিৎ রায়ের কোনো ছবিই দেখেনি – আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে এদের যারা ফার্স্ট জেনারেশান, অর্থাৎ যারা সত্যজিৎ রায়ের ছবি বানাবার সময় এই বাঙলার মাটিতেই চতুরাশ্রমে চাতুর্য্য দেখাচ্ছিলেন, তাদের অনেকেও এই চারটি ছবির বাইরে কোনো সত্যজিৎ রায়ের ছবি দেখেননি।
ব্যাপারটা কি দাঁড়ালো? দাঁড়ালো এই যে আইকন মানে অনেকক্ষেত্রেই কোনো চৌমাথার গ্রিল ঘেরা স্ট্যাচু, তাঁরা কেন আইকন এসব জেনে কে আর বড়লোক হয়েছে? এ তো আর কোনো রিটেল জায়ান্টের বাৎসরিক সেল নয় যে খবর রাখলে দশ থেকে পঞ্চাশ পার্সেন্ট পর্যন্ত ডিসকাউন্ট পাওয়া যাবে।
সে যাই হোক যে চারটি ছবি পশ্চিমবঙ্গবাসীর সিলেবাসে বোল্ড-আন্ডারলাইন্ড ফন্টে ড্যাবড্যাব করছে – মানে যেগুলো দেখতেই হবে – মানে নো বাঁচোয়া – যেরকম স্কুলে ঢুকলে সহজপাঠ পড়তেই হবে সেরকম ব্যাপার – সেই ছবিগুলো হলো –
o সোনার কেল্লা
o জয়বাবা ফেলুনাথ
o গুপি গাইন ও বাঘা বাইন
o হীরক রাজার দেশে
ক্লিয়ার কাট কনক্লুশান – বাঙালি শিশুপাঠ্য বস্তুর সাথেই নিজেকে বেশি আইডেন্টিফাই করে। কে যেন বলেছিলেন ‘রেখেছো বাঙালি করে’ ইত্যাদি – যাগগে।
যে কারণে এই বাঙালির সত্যজিৎচর্চার প্রসঙ্গ উত্থাপন – ‘সোনার কেল্লা’তে নকল ডক্টর হাজরা ওরফে ভবানন্দ যখন মুকুলকে নিয়ে জয়সলমীরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন – যাবার আগে ফেলুদাকে বিপথে পথিক করতে বাড়মের নামটা ছেড়ে যান – মন্দার বোসের কাছে। মন্দার বোসরূপী কামু মুখোপাধ্যায়ের কাছে সেই সংবাদ শুনে কিয়ৎক্ষণ হতবুদ্ধি ফেলুদারূপী সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বিড়বিড় করে “বাড়মের বাড়মের” বলা সব ফেলুভক্তই শ্রুতিতে ধরে রেখেছে বোধ হয়।
একটু ট্যুরিস্ট ইনফর্মেশন - আজ থেকে কুড়ি-পঁচিশ বছর আগে বাড়মেরে কোনো হোটেল অবধি ছিলোনা – শুধুমাত্র কয়েকটা ধরমশালা ছিলো রাত কাটাবার জন্য। বাড়মের আসলে পশ্চিম রাজস্থানের একটা জেলা – তারই ডিস্ট্রিক্ট হেডকোয়ার্টার হলো বাড়মের টাউন – তেরোশো শতাব্দীতে বাড়মের শাসক বাড় রাও পানওয়ার জায়গাটার গোড়াপত্তন করেন (বোধহয় বাড় খেয়ে)। তো সেই বাড়ের নামেই বাড়মের– যার অর্থ হলো “বাড় রাজার শৈলদূর্গ”। বাড়মেরে জেলার একটা বড়ো অংশ শুদ্ধ উপমহাদেশীয় মরুভূমি থর ডেজার্টের মধ্যে পড়ে। এখান থেকে ট্রেনে মুনাবাও গিয়ে পাকিস্তান বর্ডারও দেখে আসা যায় যদি বিএসএফের মুড ভালো থাকে। ওপারেই পাকিস্তানি হায়দ্রাবাদ।বাড়মের ইকোনমি যদিও অ্যাদ্দিন বেশ ঘুমন্ত ছিলো – মূলতঃ কাঠের আসবাব আর হ্যান্ড ব্লক প্রিন্টিংয়ের জন্যই যা নামডাক ছিলো। পাঠক আপনি যদি আঁতলামোর লাইনে আরেকটু বেশি অগ্রসর হয়ে থাকেন তাহলে এটাও জানিয়ে রাখি লোকসঙ্গীত আর লোকনৃত্যের জন্য বাড়মের জেলা বেশ পরিচিত। বীররসে নিমজ্জিত ভোপাদের গান কিম্বা মুসলিম ঢোলিদের ড্রামবাদ্য সবই বাড়মেরের অবদান।
কিন্তু ইকোনমি দেবী মুখ তুলে চাইছেন বলে ধারণা হচ্ছে। ২০০৯ সালে বাড়মের জেলায় একটা বড়োসড়ো অয়েল বেসিন খুঁজে পাওয়া গেছে, শেষ বাইশ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো ডিসকভারি। দেশী ও-এন-জি-সি এবং ব্রিটিশ কেয়ার্ন এনার্জি এখানে বেশ গুছিয়ে তেলা মাথায় তেল দেবার বন্দোবস্ত করে ফেলেছে।
তবে বেল পাকলে আদ্যন্তে কাকের অ্যাকচুয়ালি তো কিছুই না। তো বিলাস এতো ইতিহাস ভূগোল বোঝবার আগেই ঠাঁইনাড়া।প্লাস টু-র পরই মুম্বইতে মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং – চাকরি – পিনাকলের ব্যাস্ত কর্মজীবনে বাড়মেরের সাথে ওর হোমকামিং কানেকশান বলতে বছরে একবার দিওয়ালি একবার হোলি।
পিনাকলে ঢুকে বিলাসের একটু কালচার শক হয়েছিলো। নেহাৎ টাউন শহরের মন – সে যতোই মুম্বইয়ের কয়েক পোঁচ পড়লেও বেসিক মধ্যবিত্ততাটা বেশি টোল খায়নি – দোলনাপূর্ব দিনগুলোয়। তাই চারপাশে হটপ্যান্টে অপ্সরীরা আর বয়েজ হস্টেলের বাথরুম থেকে রাতবিরেতে মেয়েদের বেরিয়ে আসা দেখতে ওর বিশেষ ভালো লাগতো না। স্বাধীনতা অবশ্যকাম্য ঠিকই – কিন্তু ও জিনিস সবার ধাতে সয়না।
প্রফেসর জননী গণেশন হিন্দোলের দেবী ছিলেন। বয়েস পঞ্চাশের কাছাকাছি হবে ভদ্রমহিলার – কিন্তু কোন জাদুবলে পিনাকলের বাঘা বাঘা মক্ষীরাণীকে বাদ দিয়ে ছেলেরা ওনাকে দেখতো। ওয়েস্টার্ন পোশাকে যথেষ্ট স্বচ্ছন্দা ছিলেন ভদ্রমহিলা – ফেসবুকে জিন্স-টিশার্টে অশ্বারূড়া ওঁনাকে ফোটো অ্যালবাম খুঁড়ে বের করেছে – বলতে নেই অনেক ছাত্রই। কিন্তু কলেজে চিরকাল শাড়ি পড়ে আসতেন – টানটান প্লিট থাকতো সবসময় – এবং তারই মধ্যে অসম্ভব এনার্জি নিয়ে দেড়শো জনের ক্লাস পরিচালনা করে যেতেন বারবার সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে আর নেমে।
যে সাবজেক্টটা পড়াতেন তার নাম বিজনেস কমিউনিকেশান – কথা বলা শিল্প। পেশাদার পরিবেশে নিজেকে কিভাবে নিজেদের সাজানো গোজানো গাছ বানিয়ে ফেলতে হয় তার শাস্ত্র।
সেই কোর্সের একটা অবশ্যম্ভাবী বাঁশ ছিলো – দু’মিনিটের একটা ভাষণ দেওয়া। যেকোনো সাবজেক্টে – যেকোনো আঙ্গিকে।
একজন বুভুক্ষু তো মহাকাব্যই লিখে ফেললো –
I try so hard and man I do try
But everyday lunch all I get is a veg fry
Mutton is scarce and it’s a tough search
So sometimes at Nirmala, I ask for a bit too much
Sambar is plenty and Rasam is thick
But all I want is a chicken drumstick
Half boiled potatoes in a stainless pot
My dear canine, I miss you a lot.
এবং যথোচিত করতালিতে সে বুঝলো তার ব্যাথায় ব্যাথীর সংখ্যা নেহাৎ কম নেই।
বৃন্দা ত্রিবেদী ইতিমধ্যে একটি ঘটনা ঘটালেন।
একদা এক শ্বেতশুভ্র সকালে যখন সাড়ে তেতাল্লিশ ডিগ্রি আউটসাইড টেম্পারেচারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ষোলো ডিগ্রির এসিতে সারারাত যাপন করে পিনাকল সবে ঘুম থেকে উঠেছে – তখনই সবার মেইলবক্সে একটা মেইন এলো – সেন্ডার আইডি? Vrinda.trivedi@Pinnacle.edu.in।
হাই,
আশা করি আমায় সবাই চেনো। অ্যাটলিস্ট গার্লস হস্টেলে। আজ সকালে আমার একটা বিশাল ক্ষতি হয়ে গেছে – সকালে চান করতে গেছিলাম – তারপর বেরোবার সময় আমার ফেরারী শাওয়ার জেলটা নিয়ে যেতে ভুলে গেছিলাম। যখন মনে পড়লো ফিরে গিয়ে আর দেখতে পেলাম না। প্লিজ – গার্লস হস্টেলের সেকেন্ড ফ্লোরের ব্লক থ্রির সবাই জানে আমি আমার ফেরারি শাওয়ার জেলটার সাথে কতো ক্লোজ। কেউ খুঁজে পেলে প্লিজ প্লিজ প্লিজ আমায় বোলো।
~বৃন্দা
মেয়েটার কপাল খারাপ। পরদিনই সেন্থিল কেশভণের দু’মিনিটের ক্লেইম টু ফেইম ছিলো। সেন্থিল ছেলেটা চামড়ার দিক দিয়ে বিষ কালো আর মনের দিক দিয়ে বিষ খচ্চর। তো তামিলরা এম্নিতে চুপচাপ থাকে – মুখ খুললে কি হতে পারে তার একটা পথিকৃৎ হয়ে গেলো ভাষণটা।
পিনাকল জয়েন করার পর অনেকেরই অনেক কিছু হারাচ্ছে। কেউ কেউ রাত বারোটার সময় বয়েজ হস্টেলে ডিসকভার করছে যে সে নিজের ঘরের চাবিটা কোথায় রেখে এসেছে মনে করতে পারছেনা। অ্যাসাইনমেন্ট সাবমিশনের সময় তো এক্সেল আর ওয়ার্ড ডক গুলো নিত্যনৈমিত্তিক হারিয়েই যাচ্ছে। এর মাঝে কেউ একজন ফেরারি শাওয়ার জেল হারালো। চান করার সাবান হারানোও যে হারানো প্রাপ্তি নিরুদ্দেশে আসতে পারে – যিনি সাবান আবিষ্কারক তিনিও বোধহয় ভেবে দেখেননি সেটা কোনো সুখস্বপ্নে। তবে মেইল করাই যেতে পারে – কারণ আমি কিছুটা ব্যাকগ্রাউন্ড রিসার্চ করলাম মেইলটা পাবার পর – দেখলাম বস্তুটির দাম উনিশ – ডলার। ওয়েল আমি লিরিল সাবান ইউজ করি – উনিশ টাকার চেয়েও কম দাম। তবে এটা শুনে আমার বন্ধু সত্যনারায়ণ বললো – এই জন্যই তুমি এরকম আর ও ওরকম।
বিলাসের ভাষণটা ছিলো শেষ দিনে। বিলাসের ইংলিশটা বলতে নেই বরাবরই একটু কমজোরি। অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও একটা রাজস্থানি অ্যাকসেন্ট আর ভোকাব্যুলারির স্বল্পতা মাঝেমধ্যেই বেরিয়ে পড়ে। মোহিতের সাথে এসেই ওর আলাপ হয়ে গিয়েছিলো প্রথমে – তাই দু’জনে মিলে বিলাসের জন্য একটা স্পিচ দাঁড় করিয়ে দিলো ঘষেমেজে।
দিনের প্রায় শেষে বিলাস যখন গোটা ক্লাসের সামনে এসে দাঁড়ালো ততক্ষণে ফেরারি শাওয়ার জেল সহ বিভিন্ন খিল্লির ওভারডোজে জনমানস ক্লান্ত। বিলাসের অ্যাপিয়ারেন্সেও এমন কিছু ছিলোনা যে ও আলাদা করে চোখে পড়বে।
সেই দেড়শো জোড়া (একশো উনপঞ্চাশজন স্টুডেন্টস আর একজন প্রফেসর জননী) ঝিমোনো চোখকে সাক্ষী রেখেই বিলাস বলতে শুরু করলো –
আমাদের মধ্যে অনেকেই ক্যাম্পাসের সুযোগসুবিধেয় বিশেষ খুশি নয়।
অনেকেরই মত – এতো টাকা দিয়ে নিরামিষ খাবার খাওয়া, শেয়ারড ওয়াশরুম ব্যবহার করা, প্রতি বাথরুমে একটা মাত্র ওয়াশিং মেশিন রাখা নেহাৎ কিপটেমো।
তবে আমি রিসেন্টলি জানতে পারলাম এটা একটা গ্রিণ ক্যাম্পাস – আমি অ্যাডমিশান ব্রোশিওরটা এর আগে ঠিক গুছিয়ে পড়িনি সেখানেও দেখলাম ব্যাপারটার উল্লেখ আছে।
গ্রিণ ক্যাম্পাস বলে কিনা জানিনা – দেখলাম এই ক্যাম্পাসে যতো গাছ পালা ইত্যাদি লাগানো আছে – তার পালন হয় রিসাইকল্ড জলে, আমাদের নিত্যব্যবহার্য জলটাকে রিসাইকল্ড করেই এই গ্রিণ ক্যাম্পাসের যতো রকম শ্যামলীমা।
জল – আমি দেশের যে অঞ্চলটা থেকে এসেছি সেই জায়গায় ওয়ার্ডটার গুরুত্বটা বোঝা দরকার।
রাজস্থানের বাড়মেরে গ্রীষ্মে চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ আর শীতে শূণ্য ডিগ্রি তাপমাত্রা স্বাভাবিক ব্যাপার। মরুভূমি আদ্ধেক জেলাটা খেয়ে নেওয়ায় জলটাও এতো আরামে পাওয়া যায়না। যাদের একটু পয়সা পাতি কম তারা নিজেদের বাড়ির ভেতরে শুকনো মাটিতে গ্রীষ্মকালে গর্ত অবধি খোঁড়ে – সেটায় যে কাদামাটি মাখা জল খায় – তাকেই ন্যাকড়া জাতীয় ফিল্টার দিয়ে পাচারফ সবকিছু এমনকি তৃষ্ণানিবারণেও ব্যবহার করতে হয়।
ওয়াটার কনসার্ভেশান, ওয়াটার ট্রিটমেন্ট ইত্যাদি নিয়ে আমার বিশেষ জ্ঞানগম্যি নেই – শুধু এটুকুই বলতে পারি, সংরক্ষণের গুরুত্ব আমরা ততক্ষণ বুঝিনা যতোক্ষণ না অন্য কারো সংরক্ষণ আমার জীবন বাঁচিয়ে দেয়। এখানে বাঁচানো প্রত্যেক গ্লাস জলের জায়গায় বাড়মের যদি কোনোভাবে একটু বেশি জল পায় – তা’লে সেটা একটি বি-স্কুল স্থাপন করার চেয়ে কম মর্যাদার কাজ হবেনা প্রফেসর অরভিন্দনের জন্য।
আমার মনে হয়েছে যা সুযোগসুবিধে দেওয়া হয়েছে তা আসলে অসাধারণ – কষ্ট করে থাকা কাকে বলে সেটা জানতে গেলে একবার কর্মাইয়োগার কোনো একটা গ্রামে রাত কাটালেই হবে।
বিশেষ হাততালি পায়নি বিলাস – ক্লাসের প্রায় শেষদিকে এতো ভাবগম্ভীর টপিক না চুজ করলেই ভালো করতো বোধহয়।
কিন্তু তাই কি?
সেদিন রাত্তির আড়াইটের সময় একটা অ্যাসাইনমেন্টে কাজ করতে করতে বিলাসের মোবাইলে একটা এস-এম-এস ঢুকলো ‘ভেরি ওয়েল সেইড বিলাস’। দোলনার এস-এম-এস।
(ক্রমশ)

আপনার মতামত জানান