চতুর্দশ পর্ব

মান্না-বিভ্রাট
বেহেশতে মোল্লার মাজার আর সাধুবাবার আখড়া যে এলাকাটায় গড়ে উঠেছে; সেটাই হয়েছে মাথাব্যথার জায়গা। দেবুদা ওটার নাম দিয়েছে গোবরডাঙ্গা। ওখান থেকেই ফতোয়ার গোবর ছোঁড়ে মোল্লা-পুরুত। যেমন সেদিন একখানা বই সম্পর্কে মোল্লা ফতোয়া দিয়ে দিলো, এতে মহানবীর মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়েছে;এই বই নিষিদ্ধ হোক। ওদিকে সাধুবাবা ঘোষণা দিলো, ভ্যালেনটাইন ডে'তে কোনপ্রেমিক- প্রেমিকাকে রাস্তায় দেখা গেলে আশ্রমে নিয়ে এসো বিয়ে দিয়ে দেবো।
দেবুদাকে গান্ধীজী বলে দিয়েছেন, আপাততঃ মোল্লা-পুরুতের পিছে লাগতে যেও না। স্টে এ-পলিটিক্যাল। পুলিশ তোমার দিকে চোখ রাখছে। আপাততঃ সফট মুভমেন্ট করো।
আনা খবর দেয়, মক্কার খতিব চার্চ গুঁড়িয়ে দিতে আহবান জানিয়েছে; এতো ক্রুসেড! নাকী তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের রেসিপি!
দেবুদা আনাকে অনুরোধ করে, প্লিজ সফট খবর ছাড়া আমাকে দিবানা। ডাঃ গান্ধী প্রেসক্রাইব করেছেন সফট নিউজ খেতে, সফট বিষয় ভাবতে। সফট মুভমেন্ট করতে।
আনা হেসে বলে, চলো সফট মুভমেন্ট করে আসি।
দেবুদা আনার সঙ্গে হাঁটে, একবার জিজ্ঞেস করে, চুনিদাকে ডেকে নেবো নাকি।
আনা হাসতে হাসতে বলে,সফট মুভমেন্টে চুনিদাকে লাগবে ক্যানো!
ব্যাগ থেকে একটা সফট ড্রিংকসের ক্যান বের করে দেয়। দেবুদা জীবনে এই প্রথম সফট ড্রিংকসের মুখোমুখি। অনেক দিনপর ঝির ঝির করে নানা রঙের বৃষ্টি পড়ছে। আনা ব্যাগ থেকে একটা ছাতা বের করে খুলে দেয় দেবুদাকে। নিজে বৃষ্টিতে ভিজছে। সাদা রঙের ড্রেসটা এক একবার একেক রঙের বৃষ্টির ছটায় রঙ পাল্টাছে। অনেক দিন পর জীবন খুঁজে পাচ্ছে দেবুদা। বুঝতে পারে অযথা সেমিনার- সিম্পোজিয়াম- র‍্যালী করে জীবনের মহার্ঘ সময় নষ্ট করে লাভ নেই। জীবনের এই ছোট ছোট ভালোলাগার সফট আন্দোলনই ভালো। প্রতিজ্ঞা করে,
জীবনে আর খবর কাগজ পড়বো না;
অযথা মাথা গরম করবো না।
শ্লোগানটা খুব পছন্দ হয় আনার। পাশে একটা শিশু পার্কে সি-স’তে বসে। দেবুদাকে ভারসাম্য রাখতে অনিচ্ছায় সি-স একপ্রান্তে বসতে হয়। আনা হাসতে হাসতে বলে, এটাই সফট মুভমেন্ট। অর্থাৎ সুখে থাকতে চাইলে মোল্লা-পুরুত বিরোধী আন্দোলন নয়; ষড়যন্ত্রে জেলে যাওয়া নয়। দুঃশ্চিন্তাহীন নতুন জীবন। ঘুরো-ফিরো-খাও-জীবনানন্ দে থাকো। এটা জগতের নিয়ম-বেহেশতেরও।
সি-স খেলার সময় দেবুদা বলে, আনা মধ্যপন্থা বলে কিছু নেই। হয় তোমাকে সাম্যবাদী আদর্শের হতে হবে বা কাম্যবাদী আদর্শের হতে হবে। কিছু সাম্য-কিছু কাম্য মিলিয়ে এই যে ভারসাম্য রক্ষাকারী মধ্যপন্থা; এদিয়ে কিন্তু কোন বিপ্লব হয়নি; পরিবর্তন আসেনি কোথাও।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপান-জার্মানীর ঘুরে দাঁড়ানোর দিকে তাকাও। নাতসীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখিয়ে আজ তারা সভ্যতায় স্নাত। জাপান সেনা বাহিনীর প্রয়োজন নেই বলে শুরু করলো উন্নয়নের সবুজ যাত্রা। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া,থাইল্যান্ড, চীন এই দেশগুলো কোনটাই ভারসাম্যের খেলা খেলেনি। সোজা পথে হেঁটেছে। এমনকি ভারতও আশির-নব্বুইয়ের দশকে খুব ভালো করেছে যতদিন রাশিয়ার সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিলো। আর এমেরিকাতে দেখো, নামে দুটো দল; ফান্ডিং আসে একই জায়গা থেকে। টনি ব্লেয়ারের হাত ধরে বৃটেনও ঐ পথে গেছে; এখন এমেরিকার ভারসাম্যের খেলাটা রপ্ত করেছে। এই মধ্যপন্থা কোন কাজের নয়।
আনা মুচকি হাসে, দিলেতো সফট আন্দোলনের স্পিরিটটা নষ্ট করে।
অমনি হালকা বরফ পড়তে শুরু করে। নীল বরফ। বেহেশতে যখন নীল বরফ পড়ে, ধরে নেয়া হয় মর্ত্যে কোন খারাপ ঘটনা ঘটেছে। দেবুদা কিছু একটা বলতে চায়; আনা নিষেধ করে।
--দেবু গান্ধীজী তোমাকে সফট আন্দোলনে থাকতে বলেছেন। পৃথিবী নিয়ে ভেবোনা। মানুষ নিজের ভাগ্য নিজেই তৈরী করে। নিজের দোষে কষ্ট পায়। অন্যের ব্যাপারে সেনসিটিভিটি দেখাতে গিয়ে; নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে গিয়ে ঝামেলা তো কম পোহালে না। কটা দিন একটু ক্ষান্ত দেও। সফট আন্দোলনে থাকো।
হঠাত ফোন আসে। আনা রিসিভ করতে নিষেধ করে।
দেবুদা দেখে কিংবদন্তীর সংগীত শিল্পী মান্না দে’র ফোন।
--এই ফোনটা নিতে হবে আনা।
আনা মন খারাপ করে গিয়ে একটা বেঞ্চিতে বসে। দেবুদা ফোনে কথা বলতে বলতে আনা থেকে নিরাপদ দূরত্বে বন বন করে ঘুরতে থাকে।
--মান্না দা কী হয়েছে!আছেন কেমন!
--দেবু সব্বোনেশে ব্যাপার। এপর্যন্ত মান্না নামটা আমার দখলে ছিলো। ঢাকায় একজন নায়ক ছিলেন মান্না।সজ্জন ব্যক্তি। কোন অসুবিধা হয়নি। কিন্তু নতুন এক মান্নার নামে সয়লাব হয়ে গেছে তোমাদের কী যেন বলে ঐফেসবুকে-মিডিয়া। সেও নাকি ‘গান’ বিষয়ক কী একটা বিতর্কিত কথা বলেছে। কোত্থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসেছে এই মান্না; আবার ‘গান’ এর কথা বলছে। একটু খোঁজ নেবে ভ্রাতঃ!
--মান্নাদা আমি তো আউটঅফ টাচ।এখন আমি সফট মুভমেন্টে আছি। আমার প্রিয় শ্লোগান,
জীবনে আর খবর কাগজ পড়বোনা;
অযথা মাথা গরম করবো না।
আপনি দাদা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে পারেন। আপনার গানের কপিরাইট এবং সুনাম বাঁচানোর লোক উনি ছাড়া আর কেউ নেই। বাকী সবাই প্রশমনবাদী। এসকেপিস্ট। এই আমার মতো। একটা ফোন করে চলে যান।
--গান্ধীজীকে কী ব্যাপারটা বলে দেখবো আগে?
--ঐ ভুল করবেন না মান্নাদা। তাহলে আপনাকেও উনি সফট আন্দোলনে পাঠিয়ে দেবেন।
--ঠিক আছে তবে বঙ্গবন্ধুর বাড়ীতেই যাই। দুটো গানও শুনিয়ে আসবো।
--থিমেটিক গান গাইবেন দাদা, আমি শ্রী শ্রী ভজহরি মান্না।
মান্না দে হেসে ফেলেন।দেবুদা ফোন সুইচ অফ করে আনার মান ভাঙ্গাতে যায়। কারণ সংস্কৃতি জগতের যে কোন লোক বিপদে পড়লে দেবুদাকে সেমিনার করতে বলে অথবা র‍্যালি। এক্ষুণি হয়তো নায়ক মান্না ভাই ফোন করে এই ইস্যুটা তুলবেন। গান্ধীজীর কথা শিরোধার্য। উনাদের ঝামেলা উনারাই মিটান।আনার মানভঞ্জন এখন গুরুত্বপূর্ণ। আসলে অযথা পার্বতী-চন্দ্রমুখীর দোষ নাই। গোটা পৃথিবীর নারীই চট করে গাল ফুলিয়ে ফেলে। এরা কখনো মানসিকভাবে বড় হয়না। এই বয়েসে যার শিশু পার্কে আসতে ইচ্ছা হয়; সে শিশু ছাড়া আর কী। ঐ কবিতাটা পিতা দিয়ে লিখে ভুল করেছিলেন কবি; ঐটা মাতা দিয়ে লেখা উচিত ছিলো।
ঘুমিয়ে আছে শিশুর মাতা,সব শিশুরই অন্তরে।
মান্না দে বঙ্গবন্ধুর বাড়ীতে পৌঁছালে গৃহকর্মী মুশতাক তাকে রিসিভ করে নিয়ে যায়।
মুশতাক বলে, মিটিংচলতেছে, গান্ধীজীও আসছেন; ঘটনা গম্ভীর। আলোচনায় ঘুরে ফিরে মুশতাক নামটা আসছে; ভয় পাই; আমার ডেপুটেশান বাতিল করে দোজখে পাঠিয়ে না দেয়। মান্নাদা একটু দেখবেন।
তাজউদ্দীন মান্না দে'কে বলেন, দাদা প্লিজ যা ঘটেছে তাতে মন খারাপ করবেন না। আপনার নাম নিয়ে যা ঘটেছে; তা নিয়ে আমরা সত্যিই লজ্জিত। নায়ক মান্না অশ্রুসিক্ত চোখে বসে। উঠে দাঁড়ান। মান্না দে উনার পাশেই বসেন।
বঙ্গবন্ধু বলেন, মান্না ভাতৃদ্বয় আপনারা দুজনেই শিল্পী। আপনাদের নামের কেউ অন্যায় করলেই নামটার ক্ষতি হয়না। মুজিব নামের কত লোক বুড়ো বয়েসে তরুণী বিয়ে করে; ওসব কোন রোগ তো আমার ছিলোনা। তো আমি কী এখন হাপুস নয়নে কাঁদবো!
গান্ধীজী খিল খিল করে হাসেন।
মুশতাক মান্না দের জন্য এককাপ চা নিয়ে আসে। অন্যদের এক রাউন্ড চা হয়ে গ্যাছে।
মান্না দে কথাটা পাড়েন,বঙ্গবন্ধু এই গজিয়ে ওঠা মান্না কী গান নিয়ে কিছু বলেছে!
বঙ্গবন্ধু বলেন, ওতো গায়ক নয়। গানের কথা বলবে কেন!
তাজউদ্দীন বলেন, হ্যা গানের কথা সে বলেছে তবে এ গান সে গান নয়।
মান্না দেতো অবাক, এ গান কোন গান তাজ ভাই!
--এটা বন্দুকের ব্যাপার দাদা। গোপন টেলিকথন ফাঁস হয়েছে। এই ক্যু-মান্না ক্ষমতায় যাবার জন্য ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে গন্ডগোল বাধিয়ে দু-তিনটে ছাত্রের লাশ ফেলে দিয়ে সেনাবাহিনীকে হস্তক্ষেপে বাধ্য করার ফন্দি এঁটেছে।
--বলেন কী ভাই; এতো ডেঞ্জারাস লোক।
মুশতাক সন্তর্পণে ঘর থেকে বেরিয়ে দরজায় কান পাতে। বুকের ভেতরে দু’আনা পাঁচ আনা।
গান্ধীজি বলেন, মুজিব আমার অভিযোগটার কী করলে! এই যে খালেদা জিয়ার অবরোধে শ'খানেক মানুষ পুড়ে মরলো; কত মানুষ বার্ণ ইউনিটে জীবন্মৃত। সম্পদের কত ক্ষয়ক্ষতি- জ্বালাও-পোড়াও। আর ওরা কীনা বলে এটা গান্ধীবাদী আন্দোলন। এখন মনে হচ্ছে রবীন্দ্র সংগীতের ওপর কপিরাইট উঠে যাবার কারণে রোদ্দুর রায় রবীন্দ্র সংগীতের যেরকম বারোটা বাজিয়েছে; গান্ধীবাদেরও একি হাল হয়েছে। বুঝি না এসব বুদ্ধি আসে কার মাথা থেকে!
তাজউদ্দীন বলেন, শফিক রেহমান বলে এক লোক আছে; এক নাস্তিক দার্শনিকের ছেলে; ইসলামের ঠিকাদার হয়েছে; সে গান্ধীবাদের রোদ্দুর রায় ভার্সান গেয়ে; এরপর এই ক্ষমতা দখলের সহিংস আন্দোলনের সন্ত্রাসীদের নাম দিয়েছে মুক্তিযোদ্ধা। এখন সে খালেদাকে অন সান সুচি নামকরণ করে;অন সান সুচির কপিরাইট ভঙ্গ করতে চলেছে সুচি বেচারার জীবদ্দশায়।
বঙ্গবন্ধু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, লঞ্চডুবিতে আবার ১০০ জন মারা গেছে; কারো কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। আমার মনে হচ্ছে, এখন বাংলাদেশে প্রতি দশজনে তিনজন মুশতাক, একজন তাজউদ্দীন আর তাজউদ্দীনের মতো আলোর মানুষেরা সংখ্যাগরিষ্ট মুশতাকদের ষড়যন্ত্রের কারণে বাকী ছয়জন নির্দোষ মানুষের জন্য কিছু করতে পারছে না; যারা পেট্রোল বোমায় পুড়ছে, ইউনিভার্সিটিতে লাশ হবার আশংকায় পড়ছে, লঞ্চডুবিতে মরছে।

টিভি স্ক্রলে ভেসে ওঠে, মান্না গ্রেফতার। ব্রেকিং নিউজ।
মান্না নাটকের অবসানে একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন মান্না দে আর নায়ক মান্না।

আপনার মতামত জানান