বহুমুখী উপেন্দ্রকিশোর

দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
পূর্বকথা

শ পাঁচেক বছর আগেকার কথা। বিহার থেকে এসে নদীয়ার চাকদহ গ্রামে বাসা নিল একটি কায়স্থ পরিবার। পদবী ছিল ‘দেও’ যা বাংলায় এসে হয়ে যায় ‘দেব’। সাধারণ বাঙালি কায়স্থদের মতন শাক্ত হবার বদলে এঁরা ছিলেন বৈষ্ণব। ষোড়শ শতকে এই পরিবারের সদস্য, সুপুরুষ, তীক্ষ্ণধী রামসুন্দর দেব ভাগ্যাণ্বেষণে ঘুরতে ঘুরতে পুব বাংলায় এসে নজরে পড়ে যান যশোদলের রাজার। অতএব রাজার জামাই হয়ে যশোদলে বাস। কয়েক পুরুষ বাদে বাস উঠিয়ে এই পরিবার চলে এল ব্রহ্মপুত্রের ধারে মসুয়া গ্রামে। ততদিনে মুঘল রাজসরকারে কাজ করবার সুবাদে পাওয়া রায় উপাধিকেই পদবি করে নিয়েছেন তাঁরা। গড়ে তুলেছেন জমিদারী।
মসুয়ার সেই অভিজাত পরিবারে সারস্বত সাধনা এসে বাসা করল লোকনাথ রায়ের আমলে। বহুভাষাবিদ এই সাধক পন্ডিতের পুত্র কালীনাথও ছিলেন লোকনাথের মতই বহুভাষাবিদ পন্ডিত। পন্ডিতের আলোচনাসভার বিচারক হওয়া থেকে শুরু করে আরবি ফরমানের অর্থভেদ, সবকিছুতেই বিশেষজ্ঞ হিসেবে ডাক পড়ত কালীনাথ রায়ের।
কালীনাথের পাঁচ ছেলে। সারদারঞ্জন, কামদারঞ্জন, মুক্তিদারঞ্জন, কুলদারঞ্জন, প্রমদারঞ্জন। এই দ্বিতীয় পুত্রটিকে পাঁচ বছর বয়সে রায়বংশের আরেক শাখার প্রসিদ্ধ উকিল ও জমিদার হরিকিশোর রায়চৌধুরি দত্তক নিয়ে নাম বদলে রাখেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। এর কয়েক বছর পরে হরিকিশোরের নিজের একটি ছেলে হয়। ইনি নরেন্দ্রকিশোর।


গড়ে ওঠার দিনগুলি

ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকার দিকে ঝোঁক ছিল উপেন্দ্রকিশোরের। তবে পড়াশোনাটাকেও অবহেলা করেন নি। ১৮৭৯ সালে বৃত্তিসহ এন্ট্রান্স পরীক্ষায় পাশ করে ময়মনসিংহ থেকে কলকাতায় প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়তে এলেন তিনি। সেখানে কিছুদিন কাটিয়ে তারপর ১৮৮৪ সালে স্নাতক হলেন মেট্রোপলিটন কলেজ (এখনকার বিদ্যাসাগর কলেজ) থেকে।
সাহিত্যের আঙিনায় পা পড়েছিল তার আগেই, ১৮৮৩ সালে, শিক্ষক প্রমদাচরণ সেনের ‘সখা’ পত্রিকায় ‘মাছি’ নামে একটা লেখার মধ্যে দিয়ে। সেই একই বছরে সখা পত্রিকায় আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা চালালেন উপেন্দ্রকিশোর। ছোটদের সাহিত্যে প্রথম চলিত ভাষার প্রয়োগ করে লিখলেন “নিয়ম ও অনিয়ম নামের এক অনুবাদ প্রবন্ধ।
এই সময়েই উপেন্দ্রকিশোরের জীবনে আরো একটি গভীর পরিবর্তন আসে। তিনি ব্রাহ্মধর্ম অবলম্বন করে সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজে যোগ দেন। এর ফলে পরিবারের অনেকেই তাঁর সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করলেও পালকপিতার পরিবারের সঙ্গে কোন বিচ্ছেদ ঘটেনি তাঁর। হরিকিশোর তাঁর সমস্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারী উপেন্দ্রকিশোরকেই করে গেলেন। উপেন্দ্রকিশোর অবশ্য তাঁর ভাই নরেন্দ্রকিশোরকে বঞ্চিত করেননি। ময়মনসিংহের সমস্ত সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ ভাইয়ের হাতে ছেড়ে দিয়ে নরেন্দ্রকিশোর যে ভাগ তাঁকে দিতেন তাই নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতেন।
১৮৮৬ সালে ব্রাহ্মসমাজের আর এক বিখ্যাত মানুষ দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের কন্যা বিধুমুখীকে বিয়ে করে কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিটের লাহাদের বাড়ির কয়েকটা ঘর ভাড়া নিয়ে শুরু হল সংসারজীবন। একে একে জন্ম নিল সুখলতা, সুকুমার, পুণ্যলতা সুবিনয়, শান্তিলতা ও সুবিমল।
. সেসময় বাংলা শিশুসাহিত্যের জগতে একে একে আবির্ভূত হচ্ছে সখা, সাথী, মুকুল এবং বালকের মত পত্রিকাগুলো। ভরা সংসার চালাবার পাশাপাশি এইসব পত্রিকায় তাঁর লেখার দিগন্ত, নানা বিচিত্র বিষয়ের তথ্যমূলক লেখার গন্ডি ছেড়ে ক্রমশই প্রসারিত হচ্ছিল অলংকৃত গল্পে, কবিতায়। আর এইভাবেই শিশুসাহিত্যের জগতে উজ্জ্বল এক নক্ষত্রের জন্ম দেখছিল বাংলা।


গানের ভুবনে

শিশুসাহিত্যের পাশাপাশি সাহিত্যের আরেকটি দুরধিগম্য ধারাতেও তখন পা ফেলেছেন তিনি। গাইতে বাজাতে পারদর্শী ছিলেন চিরকালই। ভালো সুরকারও ছিলেন। গভীর দক্ষতা আর ভালোবাসা ছিল বেহালাতে। মেয়ে পুণ্যলতার লেখা থেকে জানা যায় শেষ দিনগুলোতেও নাকি সব কষ্ট, সব দুঃখ ভুলে থাকতেন ওই বেহালার সুরেই। ব্রাহ্মধর্ম অবলম্বন করবার পর বেশ কিছু অসাধারণ ব্রাহ্মসঙ্গীত লিখেছিলেন। “কে ঘুচাবে হায় প্রাণের কালিমা রাশি”, “জয় দীন-দয়াময় নিখিল ভুবন পতি”, “বল দেখি ভাই এমন করে ভুবন কেবা গড়িল রে”,“জাগো পুরবাসী ভাগবত প্রেমপিয়াসি” ইত্যাদি বহু বহুল প্রচলিত ব্রাহ্মসঙ্গীত বের হয়েছিল তাঁর কলম থেকে।
গীতরচনার পাশাপাশি সমকালীন বিভিন্ন পত্রপত্রিকাতে সঙ্গীতবিষয়ক নিবন্ধ লেখা চলছিল তাঁর। ইংরিজিতে অনুবাদও করেছিলেন গুটিকয় রবীন্দ্রসঙ্গীত। বিয়ের দু বছর পর, ১৮৮৮ সালে বের হল তাঁর প্রথম বই, “শিক্ষক ব্যাতিরেকে হারমোনিয়াম শিক্ষা।” প্রকাশক, ভারতীয় হাতে বেলো করা হারমোনিয়ামের আবিষ্কর্তা দ্বারকানাথ ঘোষের ১৮৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত বাদ্যযন্ত্র প্রস্তুতকারক সংস্থা ডোয়ার্কিন অ্যান্ড সন্স। (প্রসঙ্গত, আজও চালু এই প্রতিষ্ঠানের নামকরণটি উপেন্দ্রকিশোরেরই করা।) সঙ্গীতবিষয়ে তাঁর দ্বিতীয় বইটি ওই একই জায়গা থেকে প্রকাশিত হয় ১৯০৪ সালে। এটি ছিল বেহালা শিক্ষার বই।
এ ছাড়াও এদেশি সঙ্গীতবিদ্যার উৎস নিয়ে তাঁর আর একটা অসাধারণ কাজ হল “ভারতীয় সঙ্গীত।”(উল্লেখ্য, ‘সূত্রধর’ থেকে এ বইটা পুণঃপ্রকাশিত হয়েছে গতবছর জুলাই মাসে। উৎসাহী পাঠক সংগ্রহ করতে পারেন। এই নতুন সংস্করণে মূল বইটির সঙ্গে “সঙ্গীত ও চিত্রবিদ্যা” নামে উপেন্দ্রকিশোরের আরেকটি বিদগ্ধ প্রবন্ধও যোগ করা হয়েছে। রয়েছে তাঁর লেখা জাগো পুরবাসী গানটির একটা সিডি।)


নতুন পথে

সেটা ১৮৯৭ সাল। সিটি বুক সোসাইটি থেকে ‘ছেলেদের রামায়ণ’ নামে উপেন্দ্রকিশোরের লেখা ও অলংকরণ করা একটা সচিত্র বই প্রকাশিত হল। সে সময় ছাপায় ছবি আনবার জন্যে কাঠের ব্লকের গায়ে ছবি অনুযায়ী দাগ কেটে ব্লক তৈরির কাজ করা হত। সেটা অনেকটাই নির্ভরশীল হত দাগগুলো কাটছেন যে কারিগর তাঁর দক্ষতার ওপরে। সেখানটা এদিক ওদিক হয়ে গেলেই ছবি বিগড়ে যাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক ছিল। ছেলেদের রামায়ণের ক্ষেত্রেও দেখা গেল সেই ব্যাপারটাই ঘটে গেছে। ফলে গোটা প্রথম সংস্করণটাই একেবারে বিগড়ে গেল বইটার।
ছাপাখানা থেকে বই বের হয়ে আসবার পর তার মান দেখে এ দুঃখ আমাদের অনেকেরই কখনো না কখনো হয়েছে। ছাপাইওয়ালাকে দুটো গাল দিয়ে আর মাঝেমধ্যে সাহসী হয়ে তার পাওনাগন্ডা নিয়ে বিবাদ করেই আমরা সে দুঃখের প্রতিকার করেছি। কিন্তু এ মানুষ সেই ধাতুতে তৈরি নন। বইয়ের ছবির দশা দেখে তিনি ঠিক করলেন পদ্ধতিটাই বদলে ফেলতে হবে।
সে দশকের শুরুর দিক থেকেই পশ্চিমে একটা নতুন আবিষ্কৃত চিত্রমুদ্রণ পদ্ধতির বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু হচ্ছিল। এখানে হাতে ব্লক তৈরি করবার বদলে একটা অলংকরণের ছবি তোলা হত একটা ছোট ছোট ফুটোওয়ালা স্ক্রিনের সাহায্যে। ফলে ছবিটা কতগুলো ছোট ছোট বিভিন্ন মাপের কালো ফোঁটায় ভেঙে যেত। এরপর সেই কালো ফোঁটার নকশাটাকে ব্লক-এ বদলে দিয়ে তার সাহায্যে ছবিটা ছাপা হলে তাতে সেই ফোঁটাগুলো মিলেমিশে আসল ছবিটাকেই দেখিয়ে দিত। যেহেতু ক্যামেরা দিয়ে তৈরি তার ফলে আর খোদাইওয়ালার মর্জিমতন ছবি বিকৃতির দুর্যোগ থাকত না। তাছাড়া, এই পদ্ধতিতে ছবির টোন বা আলোকালোর বিভিন্ন ঘনত্বও ধরা পড়ত নিখুঁতভাবে। ফলে ছবি অনেকটাই বাস্তবসম্মত হত। ছাপা যেত ফটোগ্রাফও।
উপেন্দ্রকিশোরের তখন বেশ কিছুদিন হল নজর পড়েছে ফটোগ্রাফি আর মুদ্রণের মধ্যে সেতুবন্ধনকারী সেই হাফটোন মুদ্রণ পদ্ধতির দিকে। কিছু পড়াশোনাও শুরু করেছেন সেই নিয়ে। ছেলেদের রামায়ণের এই গন্ডগোলটা ঘটবার পর তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলেন যে এইবারে এই নতুন পদ্ধতিটাকেই বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগাতে হবে এদেশে। কিন্তু মুশকিল হল, গোটা দক্ষিণ এশিয়াতেই তখন এ পদ্ধতিতে কেউ মুদ্রণ করেন না। কলকাতার থ্যাকার অ্যান্ড স্পিংকস নামে এক সংস্থা বেজায় চড়া দামে হাফটোন প্রিন্টের অর্ডার নিয়ে বিলেত থেকে তা ছাপিয়ে আনাত।
আমার পরিচিত বাঙলা ভাষার যত বই লিখিয়ে আর ছোট পত্রিকার প্রকাশক আছেন তাঁরা “প্রায়” সকলেই প্রযুক্তির সংকটের এইধরনের কোন উদাহরণের মুখোমুখি হলে বলবেন, “ধুস্‌, এ দেশটার কিস্যু হবে না। ইউরোপ আমেরিকার ব্যাপারটাই আলাদা।” এই বলে তাঁরা ফের সেই পুরোনো গর্তেই ফিরবেন সুড়সুড় করে। নতুনটার সঙ্গে ভাবসাব করতে বললে খেঁকিয়ে উঠে বলবেন “আমরা ক্রিয়েটিভ কাজ করব না এইসব ফালতু টেকনিকাল ঝামেলা ফেস করব, অ্যাঁ?”(একদম বাস্তব অভিজ্ঞতা। দীর্ঘদিন ধরে তিনশো কপির টালা টু টালিগঞ্জ কাগুজে লিটল ম্যাগ স্রষ্টাদের, তাঁদের সৃষ্টি ওয়েবে তুলে এনে বৃহত্তর পাঠকের কাছে পৌঁছে দেবার অনুরোধ করে এই দাঁতখিঁচুনি সইছি।)
এইখানেই উপেন্দ্রকিশোর কিঞ্চিত বিপরীত মানসিকতার প্রমাণ দেখালেন। হাফটোন পদ্ধতি নিয়ে কিছুকাল যাবতই তাঁর পড়াশোনা চলছিল। এইবার পৈত্রিক জমিজিরেতে তাঁর অংশের অনেকখানি বেচে দিয়ে সেই টাকায় বিলেতের পেনরোজ কম্পানি থেকে বইপত্র, রাসায়নিক, ক্যামেরা, যন্ত্রপাতি আনিয়ে নিয়ে শুরু হল হাফটোন পদ্ধতিকে ভালো করে জেনে বুঝে নিয়ে তার উন্নতিসাধনের চেষ্টা। বাড়ি বদলে উঠে এলেন শিবনারায়ণ দাস লেন-এর অপেক্ষাকৃত বড় একটা বাড়িতে। সেখানে নতুন সব যন্ত্রপাতি বসিয়ে শুরু হল তাঁর মুদ্রণসংস্থা ইউ রে আর্টিস্ট-এর জয়যাত্রা। ছাপাখানার পাশাপাশি সেখানে একটা ঘরে গড়ে তুললেন হাফটোন নিয়ে তাঁর স্টুডিও তথা গবেষণাগার। একটা স্নানঘর বদলে গেল তাঁর ডার্ক রুম-এ।
শুরুতে কেবলমাত্র কিছু ব্রোমাইড এনলার্জমেন্ট আর সীমিত ক্ষমতার হাফটোন ব্লকের কাজ হত সেখানে। কিছুদিনের মধ্যেই দেখা গেল, নিজস্ব পদ্ধতিতে সাত রকম ডিটেইলযুক্ত হাফটোন ব্লকে ছবি ছাপাইয়ের বিজ্ঞাপন দিতে শুরু করেছেন তরুণ উদ্ভাবক। ৭৫ থেকে শুরু করে ২৬৬ লাইনের হাফটোন ব্লক—যার যেমন পকেটের জোর তিনি তেমন মানের ব্লক নিয়ে নিন ইউ রায় আর্টিস্টের থেকে। মাঝারি মানের ১৩৩ লাইনের ব্লকের দাম মাত্রই ১ টাকা প্রতি বর্গ ইঞ্চি।
ছাপাখানার ব্যবসার পাশাপাশি, সেই ১৮৯৭ থেকেই ব্রিটেনের গ্রাফিক আর্টের বিখ্যাত জার্নাল পেনরোজ অ্যানুয়ালে একের পর এক প্রবন্ধে প্রকাশিত হতে শুরু করল হাফটোন মুদ্রণপদ্ধতি নিয়ে তাঁর মৌলিক গবেষণার ফলাফল। ১৯১১ সালের মধ্যে নটা গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় তাঁর এই আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জার্নালে। প্রবন্ধগুলোর নাম এইখানে তুলে দিলাম। একবার ভেবে দেখুন, এগুলো লিখেছিলেন যিনি তিনিই কিন্তু আবার টুনটুনির বইও লিখেছিলেন একইরকম স্বচ্ছন্দভাবে।
ফোকাসিং দ্য স্ক্রিন—১৮৯৭
দা থিওরি অব হাফটোন ডট—১৮৯৮
দা হাফটোন থিওরি গ্রাফিক্যালি এক্সপ্লেইনড—১৮৯৯
অটোম্যাটিক অ্যাডজাস্টমেন্ট অব দা হাফটোন স্ক্রিন (১৯০১)
ডিফ্র্যাকশান ইন হাফটোন (১৯০২-০৩)
মোর অ্যাবাউট হাফটোন থিওরি(১৯০৩-০৪)
দা সিক্সটি ডিগ্রি ক্রস লাইন স্ক্রিন (১৯০৫-০৬)
মালটিপল স্টপস্‌ (১৯১১-১২)

হাফটোন প্রযুক্তিতে উপেন্দ্রকিশোরের প্রধান অবদান দুটো। আবিষ্কার করেন হাফটোন ক্যামেরার জন্য অটোমেটিক স্ক্রিন অ্যাডজাস্টমেন্ট ইন্ডিকেটর, যার সাহায্যে হাফটোন ক্যামেরার ফোকাসিং-এর জন্যে পর্দার সঠিক অবস্থানটা যান্ত্রিক নির্ভুলতায় নির্ধারিত হয়ে যেত। সংশ্লিষ্ট গবেষণাপত্রটি বের হয় পেনরোজ পত্রিকার ১৯০১ সালের সংস্করণে। সে যন্ত্র তাঁর পদ্ধতি মেনে বাণিজ্যিকভাবে তৈরি শুরু হল ব্রিটেনে। “পেনরোজ” তার ১৯০৪-০৫ সংখ্যার সম্পাদকীয়তে, হাফটোনের জন্য নিখুঁত নেগেটিভ তৈরি করবার ক্ষেত্রে তাঁর আবিষ্কারের মৌলিক গুরুত্বকে সশ্রদ্ধে স্বীকারও করে নিল। ইতিমধ্যে ১৯০২ সালে তিনি তৈরি করেছেন রে’জ টিন্ট প্রসেস। ১৯০৩ সাল থেকেই সেই পদ্ধতি অবলম্বন করে ম্যাগাজিনে হাফটোন রঙিন ছবি ছাপাইয়ের কাজ শুরু হয়ে গেছে। রঙিন হাফটোন ছাপার এই পদ্ধতিটা তখন ব্রিটেনের বেশ কিছু প্রযুক্তি শিক্ষালয়ে ব্যবহৃতও হতে শুরু করেছে।
ঘরে বাইরে দু জায়গাতেই স্বীকৃতি পেয়েছিল তাঁর এইসমস্ত অসাধারণ বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন। রবীন্দ্রনাথ ১৮৯৮ সালে ভারতী পত্রিকায় সাহিত্যিক উপেন্দ্রকিশোরের এই নতুন পরিচয়টি সগর্বে ঘোষণা করে বলেন, “অনেকেই হয়তো জানেন না হাফটোন লিপি সম্বন্ধে উপেন্দ্রবাবুর নিজের আবিষ্কৃত বিশেষ সংস্কৃত পদ্ধতি বিলাতের শিল্পীসমাজে খ্যাতিলাভ করিয়াছে---------সর্বপ্রকার পরামর্শ ও সহায়তার অভাব সত্ত্বেও এই নূতন শিল্পবিদ্যা আয়ত্ত এবং তাহাকে সংস্কৃত করিতে যে পরিমাণ অধ্যবসায় ও মানসিক ক্ষমতার প্রয়োজন তাহা অব্যবসায়ীর পক্ষে মনে আনাই কঠিন।”
লন্ডনের প্রসেস ওয়ার্ক অ্যান্ড ইলেক্ট্রোটাইপিং নামের জার্নালে দেখছি, “কলকাতার উপেন্দ্রকিশোর রায় গবেষণার মৌলিকত্বে ইউরোপ ও আমেরিকার গবেষকদের থেকে অনেক এগিয়ে আছেন। এ জাতের কাজের প্রধান কর্মকেন্দ্রগুলোর থেকে এত দূরে বসে এমন সাফল্য অত্যন্ত আশ্চর্যের ব্যাপার।” একই প্রতিধ্বনি শোনা গেল বাংলার জনশিক্ষা দফতরের প্রধানের মুখেও। এদেশি স্কুলের বইগুলোকে অলংকরণের ব্যাপারে আলোচনা করতে গিয়ে উপেন্দ্রকিশোরের ছাপাই পদ্ধতি নিয়ে তাঁর মন্তব্য, “বাংলায় এত ভালো ছবি ছাপা হয় সে কথা আমার কল্পনাতেও আসে নি।”


সাহিত্যিক উপেন্দ্রকিশোর

কিছুকাল যাবত ‘মুকুল’ পত্রিকায় প্রাচীন পৃথিবী ও প্রাগৈতিহাসিক জীবজন্তুদের নিয়ে ছোটদের জন্য আকর্ষণীয় সব লেখা বের হচ্ছিল উপেন্দ্রকিশোরের। সেগুলোকে একত্রে সংকলন করে ১৯০৩ সালে প্রথম এ জাতীয় বাংলা বইটি প্রকাশিত হল। নাম “সেকালের কথা।”
১৮৯৭ সালের সেই ব্যর্থ বই ‘ছেলেদের রামায়ণ’ নবকলেবরে পুণঃপ্রকাশিত হল ১৯০৭ সালে। এবারে তার ছবি ছাপাইয়ের কাজে আর কোন ত্রুটি ছিল না। মুদ্রণের সে ত্রুটি ততদিনে দূর হয়ে গেছে উপেন্দ্রকিশোরেরই গবেষণায়। এ বইয়ের পান্ডুলিপি আর প্রুফ সংশোধন করেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। বইয়ের ভূমিকাতে উপেন্দ্রকিশোর তা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্বীকার করে নিয়েছিলেন। ১৯০৮ সালে বের হল ‘ছেলেদের মহাভারত’। ১৯০৯ সালে বের হল মহাভারত নিয়ে নিজস্ব ঢঙ-এ গল্পাকারে ‘মহাভারতের গল্প’। ছেলেদের রামায়ণ আর ছেলেদের মহাভারতের জনপ্রিয়তা শতবর্ষ পার করে আজও অব্যাহত রয়ে গেছে।
এই অবধি প্রাচীন ভারত ও পৃথিবীর দিকেই মুখ ফেরানো ছিল সৃজনশীল লেখকের। ১৯১০ সালে এসে লেখার গতিমুখ বদলে গিয়ে দৃষ্টি ফেরালেন তিনি জীবন্ত অতীতের দিকে। গ্রামবাংলার মা ঠাকুমাদের মুখে মুখে প্রচলিত বেশ কিছু গল্প একত্রে সংগ্রহ করে লেখা হল তাঁর শ্রেষ্ঠতম সাহিত্যকীর্তি, চিরকালীন গ্রামবাংলার পটভূমিতে সাজানো অনবদ্য সংগ্রহ “টুনটুনির বই।” অসাধারণ গল্পকথন আর ততোধিক সুন্দর ছবিতে সাজানো এ বই প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর নিজস্ব প্রকাশনা থেকে। সে ছাপাখানার তখন নাম বদলে গেছে। ১৯১০ সালে ছেলে সুকুমার সঙ্গে যোগ দিতে তার নাম বদলে হয়েছে ইউ রায় অ্যান্ড সন্স। কাজের পরিধি বেড়েছে বহুগুণ। সাদাকালো ও রঙিন হাফটোনের মৌলিক ডিজাইন তৈরি করছেন তাঁরা তখন বই, পত্রিকা, ক্যাটালগ লেটারহেড, এইসমস্ত যাবতীয় মুদ্রণবিষয়ক ক্ষেত্রেই। ১৯১১ সালে এই ইউ রায় অ্যান্ড সন্স থেকে বের হল কবিতা আকারে “ছোট্ট রামায়ণ”।
পাশাপাশি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় চলছিল অজস্র গল্প, প্রবন্ধ রচনার কাজ, পুরাণ, বিজ্ঞান, ইতিহাস, জীবনী। আবিষ্কারের কথা, দুঃসাহসিক অভিযানের গল্প, মৌলিক গল্প, কবিতা—সহজ সরল কৌতুকদীপ্ত ভাষায় তাদের কাছে বৃহত্তর দুনিয়ার নানা দিকের খবর তুলে ধরছিলেন ঋষিপ্রতীম মানুষটি।


চিত্রশিল্পের জগতে

শুধু লেখক নয়, ভালো শিল্পীও ছিলেন উপেন্দ্রকিশোর। ছবি আঁকতেন ইউরোপীয় ঘরানায় তেলরং, জলরং বা কালিকলমে। শিলাইদহের কুঠিবাড়ির জন্যে তাঁর আঁকা ছবি নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ নিজে। তবে মৌলিক ছবি আঁকার থেকেও চিত্রশিল্পে তাঁর যে অবদানটা অনেক বড়োভাবে উল্লেখের দাবি রাখে তা হল লেখার অলংকরণ। নিজের লেখা ছেলেদের রামায়ণ, ছেলেদের মহাভারত, টুনটুনির বই ইত্যাদি তো বটেই, সেই সঙ্গে সঙ্গে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, সীতা দেবী, শান্তা দেবী ও রবীন্দ্রনাথহেন সেকালের অনেক বিশিষ্ট লেখকের লেখার সঙ্গেই অমর হয়ে রয়েছে তাঁর অনুপম অলংকরণ। এবং, অবশ্যই সন্দেশ। তবে তার কথায় খানিক পরে আসছি।
লেখা ও ছবি আঁকবার পাশাপাশি চলছিল তাঁর ছবি ছাপাইয়ের কাজও। সখা ও সাথী (এ পত্রিকাটি তৈরি হয় ১৮৯৪ সালে সখা এবং সাথী এই দুটি পত্রিকা জুড়ে গিয়ে।), মুকুল ইত্যাদি পত্রিকার অলংকরণের বহু ব্লকই তৈরি হত তাঁর ইউ রায় আর্টিস্টের কর্মশালাতে। ১৯০১ সালে থেকে শুরু করেছেন প্রবাসী পত্রিকার জন্য ‘ডুয়োটাইপ’ পদ্ধতিতে ছবি ছাপাইয়ের কাজ—ভারতে সেই প্রথম। ১৯০৭ সালে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় যখন ইংরিজিতে তাঁর জাতীয়তাবাদি সর্বভারতীয় পত্রিকা পত্রিকা মডার্ন রিভিউ চালু করলেন তখন তার অসাধারণ অলংকরণগুলো ছাপানো সম্ভব হয়েছিল উপেন্দ্রকিশোরের সৃষ্টি হাফটোন ব্লকের কল্যানে। ১৯১২ সালে যখন রবীন্দ্রনাথের জীবনস্মৃতি প্রকাশিত হল তখন তাতে গগন ঠাকুরের অসামান্য ছবিগুলোর হাফটোন ব্লকও তৈরি হয় উপেন্দ্রকিশোরের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ইউ রায় অ্যান্ড সন্স থেকেই।


সন্দেশ

১৯১৩ সালের গ্রীষ্মে সারস্বত সাধনার আর এক উঠোনে পা দিলেন উপেন্দ্রকিশোর। তাঁর সম্পাদনায় সেবছর গ্রীষ্মকালে ইউ রায় অ্যান্ড সন্স থেকে প্রকাশিত হল ছোটদের জন্য ঝকঝকে পত্রিকা ‘সন্দেশ।’ তিন পুরুষের সুনাম পেরিয়ে চতুর্থ পুরুষে এসেও যা নিজস্ব মহিমায় আজও উজ্জ্বল হয়ে আছে বাংলা শিশু সাহিত্যের আসরে। প্রচ্ছদ, অলংকরণ, অজস্র লেখা, সম্পাদনা মুদ্রণ—পত্রিকার জন্মলগ্ন থেকেই সন্দেশের সমস্ত এলাকাতেই তাঁর বিদগ্ধ সৃজনশীলতার সেই ছাপটা যে এঁকে দিয়ে গিয়েছিলেন তিনি, আজও তা ম্লান হল না বাঙালি পাঠকের চোখে। আজও এ পত্রিকার কোন একটা সংস্করণ হাতে পেলে তরুণতম থেকে বৃদ্ধতম বাঙালি পাঠকের চোখে শৈশবের অমল আলোটি জ্ব্বলে ওঠে ফের একবার।
১৯১৫ সালে গিরিডিতে ডায়াবেটিস রোগভোগে মৃত্যুর আগে অবধি সন্দেশের মোট বত্রিশটা সংখ্যার সম্পাদনা করে যেতে পেরেছিলেন উপেন্দ্রকিশোর। তৈরি করে গিয়েছিলেন সন্দেশ-এর মূল ভিৎটা। চেয়েছিলেন, এ পত্রিকা তার নির্মল সুস্বাদ উপাদান দিয়ে শিশুদের সঙ্গে সঙ্গে বড়োদেরও সমান আনন্দ দিক। সন্দেশের প্রথম সংখ্যায় এ বিষয়ে তাঁর এই কথাক’টি বিষয়টাকে পরিষ্কার করে দিয়েছিল— “ইহা পড়িয়া যদি সকলের ভালো লাগে আর কিছু উপকার হয় তবেই ইহার সন্দেশ' নাম সার্থক হইবে।” এই ‘সকলের’ শব্দটা এইখানে বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। এই সন্দেশেই ১৯১৪ সালে প্রকাশিত হয় উপেন্দ্রকিশোরের শেষ উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম গুপিগাইন বাঘা বাইন। সঙ্গে ছিল তাঁর নিজের করা অনুপম চিত্রণ।
১৯১৩ সালে ইউ রায় অ্যান্ড সন্স উঠে আসে ১০০ নম্বর গড়পার রোডের তেতলা বাড়িতে। তার সমস্ত নকশাও উপেন্দ্রকিশোরের নিজের হাতে করা। বাড়ির ছাদে ছিল উপেন্দ্রকিশোরের তারা দেখবার ঘর। নিচের তলায় প্রেস, দোতলায় ব্লক বানাবার আর টাইপসেটিঙের বন্দোবস্ত। বাড়ির পেছনদিকের মহলে পরিবারের বসবাস। এই গড়পাড়ের বাড়িতেই ছবি আঁকায় হাতেখড়ি সত্যজিত রায়ের। একটুকরো কাগজে কিছু একটা হিজিবিজি এঁকে নিয়ে প্রসেস ক্যামেরার মূল চালক রামদীনের কাছে গিয়ে শিশুটি দাবী করত, “এটা সন্দেশের জন্য।” উপেন্দ্রকিশোরের নিজের হাতে তৈরি ক্যামেরাম্যানটি একগাল হেসে শিশুটিকে কোলে তুলে নিয়ে দেখাত ক্যামেরার পর্দায় কেমন দেখায় তার ছবির উলটো প্রতিরূপটি। বালকটির মনে হয়ত সেই থেকেই বাসা বেঁধেছিল ক্যামেরার প্রতি এক অমোঘ আকর্ষণ! কে জানে! হয়ত সেই বীজটিই অংকুরিত হয়ে আমাদের উপহার দিয়েছে সত্যজিত রায়ের মতন প্রতিভাধর চলচ্চিত্রকারকে।


উত্তরাধিকার

মহান মানুষদের একটা বড় সমস্যা হল, তাঁদের মহত্ত্বের চাপে প্রায়শই তাঁদের উত্তরপুরুষের প্রতিভা যায় শুকিয়ে। এদেশে জোড়াসাঁকো থেকে পোরবন্দর অবধি বিস্তীর্ণ ক্ষেত্রে বহু মহান পুরুষেরই জীবনে এই ট্র্যাজেডির সাক্ষি থেকেছি আমরা। ফলে তাঁদের মিশন ও আদর্শের আয়ু তাঁদের জীবৎকালের সমান হয়। সবল শাখাপ্রশাখা মেলে ভবিষ্যতের দিকে খুব বেশিদিন এগিয়ে চলে না।
আর এইখানেই উপেন্দ্রকিশোর অন্য বড়মানুষদের থেকে একটু আলাদা। খ্যাতি ও কর্মব্যস্ততার মধ্যগগণে থেকেও উপযুক্ত উত্তরাধিকারী গড়ে তোলার ব্যাপারে পরিপুর্ণ মনযোগী পিতা ছিলেন তিনি। মেয়েদের পড়বার জন্যে স্কুল বানিয়ে দিয়েছিলেন বাড়ির মধ্যে। বাবার কাছে জ্ঞানবিজ্ঞানের, পুরাণের গল্প শোনা, বাবার সাথে এগজিবিশান দেখতে গিয়ে মহাযত্নে সবকিছু বুঝে নেয়া, বেড়াতে যাওয়া, নিভৃত সন্ধ্যায় বাড়িতে বাবার বেহালার সুর শোনা, তাঁর কাছে ছবি আঁকতে শেখা, এই সমস্ত মধুর স্মৃতির ভান্ডারের সন্ধান মেলে তাঁর মেয়ে পুণ্যলতার আত্মজীবনীটিতে। ছেলে সুকুমারকে মুদ্রনশিল্পের প্রশিক্ষণ দিতে বিলেত পাঠিয়েছিলেন(১৯১১-১৩)। নিজের সৃজনশীল জীবনের প্রতিটা ধাপে বেড়ে ওঠা সন্তানদের পরম স্নেহে জড়িয়ে নিয়ে বেড়ে ওঠবার সুযোগ করে দিয়েছিলেন স্বাধীনভাবে। নিজের খ্যাতির চাপে কখনই তাদের বিব্রত হতে দেননি এতটুকু। আর তারপর তারা বড় হয়ে উঠলে নিজের সৃষ্টিকর্মের উত্তরাধিকার তাদের হাতে তুলে দিয়েছেন পরম মমতায়।
এর সুফল ভোগ করেছে দেশের পরবর্তী প্রজন্ম। সাফল্যের সঙ্গে বহুসংখ্যক প্রতিভার এক দীর্ঘস্থায়ী সঞ্চয় রেখে গেলেন তিনি, যাঁরা তাঁর দেখানো পথে এগিয়ে নিয়ে যাবেন বাংলা সৃজনশিল্পকে। নিজস্ব অবদানে গড়ে তুলবেন এমন সব স্বাধীন পরিচয় যাতে তাঁদের “উপেন্দ্রকিশোরের বংশধর” এই পরিচয় ভাঙিয়ে খাবার প্রয়োজন না হয়। তার বদলে যাতে একদিন তিনিই বেশি পরিচিত হয়ে উঠতে পারেন তাঁদের পূর্বজ হিসেবে।
নিজে হাতে লালন করেছিলেন সুকুমারের প্রতিভাকে। তার সমস্ত সৃজনশীল ক্ষ্যাপামোকে সযত্নে বাড়তে দিয়ে, ন’বছর বয়স থেকে তাকে সাহিত্যের আঙিনায় টেনে এনে, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে বিজ্ঞানসাধনায় ও প্রকাশনাশিল্পে নিজের উত্তরসূরী হিসেবে গড়ে তুলে, এবং সবশেষে মুদ্রণ ব্যবসা এবং সন্দেশের পরিচালনভার ধীরে ধীরে তার হাতে তুলে দিয়ে।
সুকুমার, সুখলতা, পুণ্যলতা, শান্তিলতা, সুবিমল, সুবিনয়, ভাইঝি লীলা এবং পরবর্তী প্রজন্মে এসে সত্যজিত রায়, নলিনী দাশ, এবং তারও পরে বর্তমান প্রজন্মের সন্দীপ রায়—ধারাটি ক্রমশ প্রবহমানই রয়ে চলেছে শিল্প, সাহিত্য, চলচ্চিত্রের নানান সৃজনশীল ধারায়। এঁদের অনেকেরই সাহিত্যজীবনেরও হাতেখড়ি তাঁদের ঘরের পত্রিকা উপেন্দ্রকিশোরের তৈরি সন্দেশের জমিতেই, এবং বংশানুক্রমে এঁদের প্রত্যেকেরই আনুগত্য বজায় থেকে গিয়েছে পারিবারিক ঐতিহ্য “সন্দেশ”এর প্রতি।


উত্তরকথনঃ কেন উপেন্দ্রকিশোর

উনিশ শতকের বাংলায় যে আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ঝড় উঠেছিল, সাহেবি সংস্কৃতির বৃত্তের নৈকট্যের দরুণ তার অভিঘাতটা সবচেয়ে বেশি সইতে হয়েছিল কলকাতার উচ্চশ্রেণীভূক্ত বাঙালি সম্প্রদায়কে। এর ফলে উদ্ভুত অস্তিত্ত্বের সুতীব্র সংকটকে সামাল দেবার চেষ্টায় কেউ মুখ ফিরিয়েছিলেন অতীতের ঐতিহ্যের দিকে, কেউ বা উন্মাদের মত ছুটে গিয়েছিলেন পাশ্চাত্যের সংস্কৃতিকে বিনাপ্রশ্নে আত্তীকরণ করবার উদ্দেশ্যে, আবার অনেকেই মুখ লুকিয়েছিলেন বস্তুবাদি অতিবিলাসের নরককুন্ড বাবু সংস্কৃতির পংকিল আশ্রয়ে। প্রতিভাধর মানুষেরা আবার এর মধ্যে যে পথেই ভেসে যান না কেন, তার মধ্যে থেকেও প্রতিভার স্ফূরণ ঘটিয়েছিলেন। সে সৃষ্টিকর্মে পড়েছিল তাঁদের বেছে নেয়া জীবনশৈলির ছাপ। তৈরি হয়েছিল মধুসূদন থেকে ঈশ্বরচন্দ্র অবধি প্রসারিত এক সুপ্রশস্ত, বিচিত্র বর্ণালী।
এই অতিবিলাসের আশ্রয় থেকে নিজেকে অন্য আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন দেবেন্দ্রনাথ, ভারতীয় ঐতিহ্য ও দর্শনের প্রাচীন ও শক্তিশালী রক্ষাকবচ পরে। তাঁর উত্তরাধিকারী জমিদার রবীন্দ্রনাথও নিজের সৃষ্টিকর্মের ভিত গড়েছিলেন সেই ঐতিহ্য ও দর্শনের দুর্গে নিজের অস্তিত্ত্বকে নিরাপদে রেখে। কালের সাংবাদিকের ভূমিকায় নেমে এক অদ্ভূত ঔদাস্যে নথীভুক্ত করে গিয়েছিলেন সমকালের দেশ,সমাজ,নীতির পাশাপাশি প্রবহমান চিরকালীন জীবনবোধকেও। জমিদারীর রজোগুণের ডাক কিংবা বৃটিশের নাইটহুড এই দুইকেই পরম ঔদাসিন্যে পথের পাশে ফেলে রেখে এগিয়ে গিয়েছিলেন নিজের দর্শনের পথে।
ব্রাহ্মধর্মে দিক্ষিত হলেও ঠাকুরপরিবারের দার্শনিক ঔদাসিন্যের রক্ষাকবচ উপেন্দ্রকিশোরের ছিল না। একদিকে সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের শেকড়ের বজ্র আকর্ষণ আর অন্যদিকে নবাগত পশ্চিমী ভাবধারার প্রতি আনুগত্য এই দুই বিপরীতমুখী টানাপোড়েণের মুখোমুখি হয়ে আত্মরক্ষার যে বিচিত্র পথটি জীবন তাঁর জন্য নির্দিষ্ট করে দিল তা ওপরে বলা প্রচলিত পথগুলির থেকে একেবারেই আলাদা। দেশকালরহিত বিজ্ঞানসাধনা ও অনাবিল আনন্দের শিশুসাহিত্য - সমাজজীবনের অস্তিত্ত্ববাদি টানাপোড়েণের থেকে বাঁচবার জন্য এই দুই নিরাপদ পথের অতিবিরল যাত্রীদের একজন হয়ে উঠলেন তিনি।
এক চরম অস্থির সময়ে জন্ম নেয়া জাঁ ক্রিস্তফ নানান বেদনাদায়ক ও তার পক্ষে অনুপযুক্ত পথে ঘুরে ঘুরে অবশেষে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল। তা হল, দেশকাল, সমসময় যে পথেই চলুক না কেন, তার নিজের জন্য নিয়তিনির্ধারিত পথ হল সুরসাধনা। সেই পথেই সভ্যতার সেবা করেছিল সে। অথবা আওয়ার লেডিজ জাগলারের সেই বাজিকরটি, প্রার্থনার বদলে যে তার নিজের একমাত্র দক্ষতা জাগলিং উপহার দিয়েছিল মা মেরিকে, ঠিক সেইভাবেই পরিবর্তনের হাওয়ায় উত্তাল এক সময়ের জাতক উপেন্দ্রকিশোর সেই দুটি পথেই সেবা করেছিলেন সভ্যতার যাকে তিনি চিনতে পেরেছিলেন নিজের নিয়তিনির্ধারিত পথ হিসেবে, অথবা বলা যায় যে পথের জন্য জীবন তাঁকে নির্বাচিত করেছিল।
এবং তার সুফল পেয়েছি আমরা সকলেই। রেনেসাঁর উত্তাল বন্যা সরে গেছে। সময়ের পলি ঢেকে দিয়েছে সেকালের বহু ইমারত, বহু ক্ষতকেই। কিন্তু তার মধ্যে আজও একই ঔজ্জ্বল্যে কালোত্তীর্ণ হয়ে ফুটে আছে টুনটুনির বই, গুপিগাইন বাঘাবাইন, এবং তার পাশাপাশি ফুটে আছেন উপেন্দ্রকিশোরের সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি — সুকুমার রায়।

আপনার মতামত জানান