মাসকাওয়াথ আহসান

হ্যাপি বার্থ ডে টু বঙ্গবন্ধু


বেহেশতে দেবদাসের আপাততঃ সফট কর্মসূচী ছাড়া অন্য কিছুতে জড়িত হবার সুযোগ নেই। ফলে বেহেশতে শেকড় গেঁড়ে বসা দুই মোল্লা-পুরুতের বিরুদ্ধে সে কিছুই করতে পারছে না। ওদের বাড় বেড়েছে। পুরুত বলে দিয়েছে, বেহেশতে গোরু জবাই করা যাবে না। আর মোল্লার দাবী, বেশ কিছু একই ডিজাইনের মসজিদ তৈরী করতে হবে।
বাংলাদেশ থেকে অভিজিত রায় নামে একজন বিজ্ঞানী বেহেশতে এসেছেন; তাকে নিয়ে প্রেস ক্লাবে সেমিনার করার ইচ্ছা।লেখালেখির কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে; এর প্রতিবাদ হওয়া জরুরী। কিন্তু বেহেশতের মোল্লা কিছু উগ্র সমর্থক বানিয়েছে। তারা দেবদাসকে এস এম এস করেছে, একবার মইরা শখ মেটে নাই; আবার মারুম; পীর সাহেব বলছে এইবার দোজখের আজাবে পড়বি তুই।
পুরুতের উগ্র সমর্থকরা দেবদাসকে ফেসবুকে ইনবক্সে করেছে, নাস্তিক নিয়ে মাতামাতি করলে ত্রিশূল ঢুকিয়ে দোবো।
দেবুদা গান্ধীজীকে ফোন করে, বাপুজী অভিজিতকে নিয়ে সেমিনার করতে চাই।
গান্ধীজী বুঝিয়ে বলেন,আমিও তো অভিজিতের মতই মরেছিলাম; কষ্টের জায়গাটা বুঝি। কিন্তু দেবু তুমি এরি মাঝে বেহেশতে এতো শত্রু বানিয়েছো; তোমার নিরাপত্তা দেয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
দেবুদা হতাশ হয়ে বলে,এইটা একটা কথা বললেন বাপু!
গান্ধীজী বলেন, এক কাজ করো কবিগুরুকে ফোন করো; শান্তি নিকেতনে অভিজিতকে নিয়ে আমরা বসতে পারি।আইনস্টাইনকেও ডাকতে পারো। অভিজিত একটা কথা বলার লোক পাবে। আমরা তো সারাক্ষণ বিমূর্ত ভাবালুতার কথা বলে বোর করে দেবো ওকে।
দেবুদা জিভ কাটে,আইনস্টাইনদার জন্মদিন গেলো; উইশ করতেই ভুলে গেছি।
গান্ধী খিল খিল করে হাসেন, ব্রেণোলিয়া খেলেই পারো।
দেবদাসের মনে পড়ে, বাপু আজ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন।
গান্ধী বলেন, আমি উইশ করেছিলাম। বললাম আসবো কীনা! ও বললে, বাড়ীটাকে এমনিই কিছু অযাচিত ভক্ত মাজার বানিয়ে ফেলেছে। ফুল-টুল এনে ভেউ করে কাঁদবে; তাই জন্মদিনে কোন আনুষ্ঠানিকতা করছিনা।লোকটার গাটস আছে যাই বলো। ভক্তির কাঙ্গাল নয়।
দেবুদা বলে, দেখি কী করা যায় বাপু। এই লোকের জন্মদিন মিস করা ঠিক হবে না।
দেবুদা কবিগুরুকে ফোন করে বলে, বঙ্গবন্ধুর বার্থডে’র একটা পার্টি দেয়া দরকার। আপনি কী ভেন্যুটা দেবেন।
কবিগুরু বলেন, তুমি চাইলে আমি নিজেকেই দিয়ে দেবো; হয়ে যাক তবে।
দেবুদা বলে, কবি গুরু আপনি যদি আইনস্টাইন, জামাল নজরুল ইসলামকে একটু ডাকতেন; অভিজিত আসছে;বিজ্ঞানের কিছু লোক থাকা দরকার।
কবিগুরু বলেন, এগুলো আমার হাতে ছেড়ে দাও। ডাইউইনকেও ডেকে নেয়া যাবে। তুমি বঙ্গবন্ধুকে কনফার্ম করো।শোনো অভিজিতের মৃত্যু আমার সন্তানের মৃত্যুর মতই বেদনাদায়ক; কিন্তু হেভেনে ওর রিসেপশানটা বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনের পার্টির সঙ্গে জুড়ে দেয়াটাই প্রমাণ করবে, সত্য অনুসন্ধানীরা শোকের কাছে পরাভূত হয়না।
দেবুদা বলে, ওকে বস। আমি তাহলে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সাঁঝে আসছি।
দেবুদা রাশান বান্ধবী আনাকে বলে, দেখো আজ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন। কিন্তু উনি কোন পার্টি করতে রাজিনা; খুব বিরক্ত অতিভক্তদের কোলাহলে। একটু হেলপ করবা!
দেবুদা চুনিলালের ট্যাক্সিতে করে আনাকে নিয়ে রওনা দেয়; পথে ডর্ম থেকে তুলে নেয় অভিজিতকে।
অভিজিত বুদ্ধি দেয়,উনাকে এখন বার্থ ডে পার্টির কথা বলার দরকার কী! আমার রিসেপশান বলে নিয়ে গিয়ে বার্থডে পার্টির সারপ্রাইজটাও দেয়া যাবে।
দেবুদা উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে, এতো বুদ্ধি নিয়ে তুমি বুদ্ধুদের সঙ্গে মিশতা কীভাবে! ভালোই করছো এইখানে আসছো;এখানে আইনস্টাইন-ডারউইনদের সঙ্গে আড্ডা দিবা।
বঙ্গবন্ধুর গৃহকর্মী মুশতাক পাকিস্তানী পুলিশ স্টাইলে গেটে দাঁড়িয়ে; আজ একটা কাজ পেয়েছে; অতিভক্তদের বাসায় ঢুকতে না দেয়া। কারণ সে নিজেও ক্ষতিকর অতিভক্ত ছিলো; ফলে অতিভক্ত চেনা তার পক্ষে সহজ।
মুশতাক বলে, সরি দেবুদা আজ প্রবেশ নিষেধ।
দেবুদা বলে, আমার সঙ্গে অভিজিত; আপনার জিনের লোকেরা তাকে হত্যা করেছে। দেখাতো করতে হবে!
মুশতাক বলে, উনি নাশটেক,বঙ্গবন্ধুর বাসায় ঢুকলে আওয়ামী লীগের ভোট কমে যাবে।
আনা বলে, আপনি কেমন মুসলমান, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলেন!
দেবুদা বলে, আর বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের জাতির জনক; তার সঙ্গে কোন ভোট বা দলীয় রাজনীতির সম্পর্ক নাই।তার বাসায় যে কোন মানুষ আসতে পারেন। আপনি কে এতো প্রশ্ন তোলার!
দেবুদা ফোনটা বের করে বঙ্গবন্ধুকে ফোন করতে উদ্যত হলে; মুশতাক ভয় পেয়ে বলে, ঠিক আছে আসেন।
বঙ্গবন্ধু অভিজিতকে দেখে চিনতে পারেন।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন,পাপ-পূণ্যের বিচারের ভার সৃষ্টিকর্তার। আমার বিশ্বাস অনুযায়ী সৃষ্টিকর্তা ছাড়া আর কারো অধিকার নাই কাউকে নাস্তিক হিসেবে শাস্তি দেবার।
অভিজিত বলে, অনেক চেষ্টা করে দেখেছি; বিতর্ক করার ইচ্ছা কারো নেই; সবাই চাপাতি নিয়ে তেড়ে আসে।
বঙ্গবন্ধু বলেন, আমার সঙ্গে কেউ কোন রাজনৈতিক বিতর্ক করেনি। গুলি করে হত্যা করেছে। আমরা একই অন্ধকার-হিংস্র চিন্তার শিকার হয়েছি।
আনা বলে, শান্তি নিকেতনে অভিজিতকে একটা রিসেপশান দেয়া হচ্ছে আজ সন্ধ্যায়। সবাই থাকছেন; আপনি না এলেই নয়।
বঙ্গবন্ধু সহাস্যে বলেন,এটা আমাকে ফোন করে বললেই চলে আসতাম।
দেবুদা বলেন, মুশতাক বলছিলেন, অভিজিত আপনার বাসায় এলে নাকি আওয়ামী লীগের ক্ষতি হবে।
বঙ্গবন্ধু হো হো করে হেসে বলেন, তা ঠিক মুশতাকের চেয়ে আওয়ামী লীগের বড় শুভাকাংক্ষী আর কে আছে!
কবিগুরু ওকাম্পোকে জানান পার্টির ব্যাপারটা। ওকাম্পো বলেন, অভিজিত তো আমার দেশের বাড়ী গিয়ে গবেষণা করে আপনার-আমার বন্ধুতার গ্রীষ্মের গল্প জেনে এসেছে; ওর সামনে আমি শাই ফিল করবো।
কবিগুরু বলেন, অভিজিতের আমাদের বন্ধুতা নিয়ে লেখা একটা লিটারেরি ওয়ার্ক। এতো আর চুলকানি রায়ের হলুদসাহিত্য বা বেডরুমের কাহিনী কইয়া দিমু টাইপের সস্তা লেখা নয়। বাঙ্গালীর মধ্যে পাশাপাশি খুব কনট্রাস্ট রুচির লোক পাওয়া যায়। অভিজিত নান্দনিক রুচির ছেলে।
সৈয়দ মুজতবা আলী যথারীতি ‘রসগোল্লা’ নিয়ে পৌঁছে যান শান্তি নিকেতনে। গেটের কাছে দেবুদা আর আনা দাঁড়িয়ে।সৈয়দ সাহেব দেবুদাকে বলেন, আনাকে দেখলেই নস্টালজিক হয়ে যাই। আমার ইউরোপ বাসের রোমান্টিক স্মৃতিগুলো তেড়ে আসে।
আনা লাজুক হাসি হাসে। অনুষ্ঠানের টেনশানে দেবুদার মাথা কাজ করছে না।
আনা বলে, মি আলী দেবুদা তার এক্টিভিজমের কারণে আজকাল এন্টি-রোমান্টিক হয়ে গেছে।
ডারউইনের পাশে বসে টুকটুক করে গল্প করছে অভিজিত। আইনস্টাইন ইবনে সিনাকে নিয়ে আসেন। বলেন, দ্যাখো অভিজিত উনি তোমার মতই আক্রান্ত হয়েছিলেন। আসেন বিজ্ঞানী সালাম ও জামাল নজরুল ইসলাম। সত্যেন বোস, জগদীশ চন্দ্র বসু কে নেই আজ!
বিজ্ঞানী সালাম বলেন,কাদিয়ানী হবার কারণে পাকিস্তানে আমার কবরের স্মৃতিফলক ভেঙ্গেছে নির্বোধেরা।
গান্ধী এসে বলেন,জিন্নাহকে ডেকেছিলাম, ও বললো পাকিস্তানের কাফের ক্যাক্টরী আমার সৃষ্টি; যেখানে কথায় কথায় মানুষকে কাফের বলে মেরে ফেলা হয়। ওই পাকিস্তান ভাইরাসের চুঁইয়ে পড়া অকুস্থল হয়েছে বাংলাদেশ, সেখানেও নাস্তিক আখ্যা দিয়ে হত্যা চলছে; কোন মুখে যাই অভিজিতের সামনে।
গান্ধীজী নেহেরুকেও ডেকেছিলেন।কিন্তু নেহেরুও অপারগতা প্রকাশ করেছেন আসতে। ভারতে ৭৪ বয়েসী খ্রীস্টান ধর্ম যাজিকাকে ধর্ষণের ঘটনাসহ এতো আদিম কার্যক্রম চলছে, এতোগুলো বিজ্ঞানীর মুখোমুখি হবার সাহস নেই তার।
বঙ্গবন্ধু এসে শান্তিনিকেতনে ঢুকতেই সবাই, হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ বঙ্গবন্ধু বলে সমস্বরে গান গেয়ে ওঠে।
বঙ্গবন্ধু দেবুদার দিকে তাকিয়ে বলেন, দাদা এটা ঠিক হইলো না।
গান্ধীজী চোখ টিপ দিয়ে বলেন, এই প্লটে আমারও কিছু হাত আছে।
ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো আজ নিজ হাতে কেক বানিয়েছেন; কুকিজ বেক করেছেন। কেক বানানো হয়েছে দুটো; একটা অভিজিতকে স্বাগত জানানোর জন্য আরেকটা বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনের।
জগদীশ চন্দ্র বসু বলেন,সত্যের জয় হোক।
সবাই একসঙ্গে বলেন,সত্যের জয় হোক।
আইনস্টাইন বলেন, অভিজিত যেরকম ধর্মব্যবসায়ীদের হাতে নিহত হয়েছেন, একই ঘটনা ঘটেছে গান্ধী এবং বঙ্গবন্ধুর ক্ষেত্রে। আজ্ঞে ভারতীয় উপমহাদেশ কী প্রকৃষ্ট ছাগু চারণ ক্ষেত্র!
এমন সময় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ঢোকেন আইনস্টাইনের প্রশ্নের উত্তর মুখে নিয়ে, আমি পুরো উপমহাদেশ ঘুরে দেখেছি; ছাগুদের স্বর্গরাজ্য। ধর্ম আফিম নেশায় বুঁদ অধিকাংশ; যারা সামনে একটা প্রগতিশীলতার বাঘের মুখোশ ঝুলিয়ে ঘুরে; ওগুলোও আসলে ছাগল।

আপনার মতামত জানান