সবজেটে গ্রীন ক্যাম্পাস

সপ্তম পর্ব
(৯)
এ.কে.শান্তিপ্রিয়া মহিলাটি মোটেই সার্থকনামা নন।
ভদ্রমহিলাকে স্মরণের দিব্যি স্মরণে ছিলো। কোলকাতায় পিআইয়ের সময় ইনিই তরী পার করিয়েছিলেন – অর্থাৎ ইন্টারভিউয়ার ছিলেন। জিজ্ঞেস করেছিলেন বেশ কিছু প্রশ্ন – বেশিরভাগ ইন্ডিয়ান ইকোনমি রিলেটেড – ক’টা দিন খানিক ইকোনমিক টাইমসে মুখ গুঁজলেই জানা যায় – আর জিডি পিআইয়ের সময় সেটা না করে আকাটে।
যাই হোক আমাদের ছোটো নদী যে সে শেষে কুমীর কামট আকীর্ণ মাতলায় মাতাল হতে চলেছে – সে সিঁদুরে মেঘ তখনো দূর অস্ত।
তাই প্রথম দিনে চেনা মুখের প্রফেসর দেখে স্মরণ বলতে নেই খুশিই হয়েছিলো।
তবে এমবিএ দেবতা মোস্ট প্রবাবলি একটু স্যাডিস্ট টাইপের – লোকের খুশি বেশি সহ্য হয়না।
শান্তিপ্রিয়া মোটামুটি তড়িৎ বেগে গ্রাউন্ড রুল সেট করে দিলেন। বলা হয়নি সাবজেক্টের নাম ছিলো মাইক্রো ইকোনমিক্স।
- প্রতিদিন একটা করে চ্যাপটার পড়ে তার নোটস বানিয়ে আনতে হবে।
- সেই নোটস ভদ্রমহিলার টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্টের কাছে সাবমিট করতে হবে প্রতিটা ক্লাসে।
- তার সাথে মাথাকেও বিশ্রাম দিলে চলবে না। মোটামুটি কমা- দাঁড়ি- বিস্ময়সূচকচিহ্ন শুদ্ধু মুখস্থ রাখতে হবে ডেলি বেসিসে।
- যে কোনো সময় যে কোনো কাউকে প্রশ্ন করা হবে। না পারলে সোজা ক্লাসের বাইরে, অ্যাটেন্ডেন্স পাওয়া যাবেনা। এদিকে প্রতিটি পেপারে মিনিমাম আশি শতাংশ অ্যাটেন্ডেন্স না থাকলে পরীক্ষায় বসা যাবেনা।
মোটামুটি সাঁতার না শিখিয়ে ইংলিশ চ্যানেল পেরোতে বলার সমতুল্য চ্যালেঞ্জ।
অতঃপর – পিনাকল রাত জাগলো।
স্মরণ নিজের গলধঃকরণের ফাঁকে একবার বিনয়ের ঘরে উঁকি মারলো। স্মরণের পড়ার স্টাইলটা মোটামুটি এরকম – নিজের খাটে শুয়ে, ল্যাপটপটাকে পাশে রেখে – একটু পড়া আর বেশ খানিক ফেসবুক করা।
বিনয় সটান চেয়ার টেবিলে বসে পড়ে – ল্যাপটপটাকে ডেস্কের ওপর রেখে ডেস্কটপের মর্যাদা দেয়। আর বইয়ের পাতায় দু’রকম হাইলাইটার পেন দিয়ে মার্ক করে।
সবাই অবশ্য ব্যাপারটাকে এতোটা সিরিয়াসলি নেয়নি। এর ওর নোটস থেকে কপিও হচ্ছিলো এন্তার। ফলতঃ দ্বিতীয় দিনের ক্লাসে চার পাঁচজনকে বেরোতে হলো।
মানামাই গ্রামটা পড়েছিলো স্মরণদের কর্মযোগ গ্রুপের কপালে। আনন্দ কার্তিকেয়ন ওদের গ্রুপ কোঅর্ডিনেটর ছিলো। ছেলেটা একটি উচ্চপ্রজাতির জীব – তিলে খচ্চর সারণীতে।
পিনাকলটাকে মোটামুটি কার্তিকেয়ন দুটো কাজের জন্য ব্যবহার করতো। প্রথমতঃ কার্তিকেয়ন আর ওর হবু বেটার হাফ মায়া দুজনেই পিনাকলে পড়তো। তো দুজনের ফেসবুক ওয়ালটা মোটামুটি ফলো করলে কনটেম্পোরারি তামিলনাড়ুতে রোমান্সের গতিপ্রকৃতি জাতীয় প্রবন্ধ লেখার জন্য যথেষ্ট কনটেন্ট জোগাড় হয়ে যেতো।
স্ট্যাটাসগুলো মোটামুটি এরকম হতো – ‘আজ মায়া আমার সাথে কফি খায়নি, আমি কফির প্রতিটি চুমুকে ওকে মিস করেছি’।
মায়ার ফিরতি স্ট্যাটাস – ‘আজ কার্তিকেয়নের সাথে কফি খেতে পারিনি, তাই সারাদিন কফির দিকে তাকাইনি আমি’।
পাব্লিক ডিসপ্লে অফ অ্যাফেকশান বলে যে শব্দটা ইদানীং শোনা যায় সেটা তো কালকের ছোকরা – এই সবে হাফপ্যান্ট ছেড়ে ফুলপ্যান্ট ধরেছে। কার্তিকেয়ন আর মায়া যেটা করতো সেটাকে আ গাইডবুক ফর সিকিং অ্যাটেনশন ইনটু পার্সোনাল লাইফ বলা যেতে পারে।
কার্তিকেয়ন স্মরণের স্টাডিগ্রুপেই পড়েছিলো – সে স্মরণেরই পূর্বকৃত পাপের ফল। ছেলেটা যখন পুরো পিনাকল রাত আড়াইটে তিনটে অবধি জাগতো তখন ডেইলি দশটায় ঘুমোতে যেতো। যাবার সময় শুধু ‘টু টায়ার্ড মাচ্ছা’ বলে।
মানামাই গ্রামটা বাকি গ্রামগুলোর তুলনায় পিনাকলের সবচেয়ে কাছে।
গ্রামটায় একটাই স্কুল আছে – সর্বশিক্ষা অভিযানের সময় তৈরী।সেকেন্ডারি স্কুল। যদিও কর্মযোগ জেনারেলি রবিবার রবিবার হতো বলে স্কুলটা বন্ধই থাকতো।
প্রথম রবিবারের মধ্যে ওকে গ্রামটার ইতিহাস-ভূগোল মোটামুটি সরেজমিনে তদন্ত করে একটা রিপোর্ট জমা দিতে হতো।
প্রতিটা কর্মযোগ গ্রুপ খান দশেক স্টুডেন্টস নিয়ে তৈরী হতো। প্রতিটা গ্রুপে তিন থেকে চারজন তামিল থাকতো – কারণ গ্রামের লোকেরা হিন্দিটা না বোঝারই সম্ভাবনা বেশি থাকতো। ইংলিশ তো দূর অস্ত।
পিনাকলের এসি বাস থেকে যখন গ্রুপটা নামলো – তখন দূরে কয়েকটা বাচ্চা জটলা করে দাঁড়িয়ে ছিলো। ওরা কথা বলতে যেতেই দৌড়ে পালালো।
গ্রামটা বেশ রুক্ষ – বাঙলার গ্রাম দেখার যে অভিজ্ঞতা আছে স্মরণের তার সাথে কোনো মিল নেই – চারদিকে ছোটোবড়ো পাথরের স্তূপ, মাঝেসাঝে হঠাৎ মন্দির, আর প্রত্যন্ত দাক্ষিণাত্য। সামান্য দূরেই কলপক্কম নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট। তার কিছু লোকের কোয়ার্টাস আছে গ্রামের মধ্যেই – বাকিটায় গ্রাম্যতা বেশ গভীরে প্রোথিত।
সোশাল স্ট্রাকচার সম্বন্ধে যেটুকু জানা গেল –গ্রামটা তিন চারটে পাড়ায় ডিভাইডেড। সেটাও আবার কাস্টের বেসিসে। মানে অনেকটা সেই মুচিপাড়া, নাপিতপাড়া ইত্যাদি টাইপ।তবে মুচিপাড়া, নাপিতপাড়া যখন তৈরী হয়েছিলো তখন তো ঠিক সেগুলো জাতের হিসেবে হয়নি – পেশার হিসেবে হয়েছিলো। তারপর আসমুদ্র হিমাচল আবাল (হ্যাঁ মানে ওই বৃদ্ধ এবং বণিতা) সেই প্রফেশনগুলোকেই কাস্ট বানিয়ে নেয়। আমরা একবিংশ শতাব্দীর এনলাইটেন্ড উঠতি সুপারপাওয়ারের সুপার নরাধমেরা সেই পূর্বপুরুষকৃত হারাকিরিগুলোকে এখনো গ্রামবাঙলায় এবং গ্রামতামিলনাড়ুতে সসম্মানে বয়ে চলেছি।
যাই হোক সেসব জ্ঞানের বচন। স্মরণের সাথে সমর্পণ রক্ষিত, বিনয় গুপ্তাও ছিলো ওদের গ্রুপটায়। আরো ছিলো কিছু নরনারী – দক্ষিণ উত্তর মিলিয়ে মিশিয়ে। যাদের মধ্যে এককন্যা কোয়েম্বাটুরের কোল আলো করে জন্মেছিলেন – নাম শান্তা কুমারেশান। তামিলনাড়ুতে সোনার ওপর যা ফ্যাসিনেশান তা জানলে গ্রেগরি পেক আর ওমর শরিফ বুকে করে জ্বলজ্বল করা ম্যাকানাস গোল্ড শিওর চেন্নাইতে সেট ফেলতো। তখনো রজনীকান্ত বোধহয় ঘুড়ি টুড়ি ওড়াচ্ছেন – নইলে রজনী থাকিতে কেন গ্রেগরি কহো কথাও হতে পারতো।
তো শান্তার বাবা সোনা কেনেন না – বেচেন। সোনার দোকানের চেন আছে ভদ্রলোকের – যেখান থেকে সোনার চেনে বাঁধা পড়েছেন কোয়েম্বাটুরের প্রচুর স্বর্ণবুভুক্ষু। এহেন বাবার নাম রেখেছে শান্তা – ক্লাসে বসে ম্যাকবুক প্রোতে পোকেমন খেলে – যেটায় আজকাল মোটামুটি প্রমাণ লেঙথের ফিচার ফিল্মও এডিট করা যায়। আর জল খায় অ্যাডিডাসের আড়াই হাজারি ওয়াটার বোতল থেকে।
তবে হিংসে করে লাভ নেই। গুড লাইফকে তামিলনাড়ুর গ্রামে বেশ ড্যামশেল ইন ডিস্ট্রেস দেখে কিঞ্চিৎ পুলকই বোধ করছিলো অনেকে।
কার্তিকেয়ন মোটামুটি লোকাল ট্যুর অপারেটরের দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছিলো। এদিক ওদিক দেখাচ্ছিলো – বিবিধ প্রশ্নপত্র রাখছিলো গ্রামের লোকেদের সামনে। যা’তে বেশির ভাগ লোকই বেশ বিরক্ত হয়ে যাচ্ছিলো। কয়েকজন বেশ পুলকও পাচ্ছিলো – আরবান ইন্ডিয়ান ইউথের গ্রামকল্যাণে। তবে বাচ্চারা আর মেয়েরা প্রশ্ন করতে গেলে বেশির ভাগই পালাচ্ছিলো।
একজন বয়স্ক লোক হঠাৎ একটা চালার ঘর থেকে ডাকলেন। ওরা ছোটাছুটি করে গেলো। ভদ্রলোকের দুটো চোখেই ছানি। মনে হয়না ভালো দেখতে পান বলে – তিনি কার্তিকেয়নের সাথে অনেকক্ষণ কথাবার্তা বললেন।
কথা বলে বেরিয়ে এসে কার্তিকেয়নের টগবগে যৌবনে কেমন জানি ভাঁটা পড়ে গেল। ফেরার সময়ও হয়ে এসেছিলো – পিনাকলের বাস এসে যাওয়ায় সবাই সেটায় চড়ে বসলো। বাসে অনেক চাপাচাপির পর কার্তিকেয়ন মুখ খুললো যে ভদ্রলোকের সাথে কি কি কথা হলো।
মানামাই গ্রামটায় দুটো জিনিসের প্রবল অসুবিধে – প্রথমটা জল। তামিলনাড়ুতে গরমকালে জলস্তর বেশ নীচে নেমে যায় – তাই পুকুরে এবং টিউবওয়েলে জল পাওয়াটা বেশ দুস্কর হয়ে পড়ে। বাড়ি বাড়ি জলের লাইন দেবার কথা প্রত্যেক পঞ্চায়েত ভোটেই বলা হয় এবং যথারীতি কিছু হবার আগেই পরের পঞ্চায়েত ভোট এসে যায়। অনেকেই নিজের বাড়িতে গর্ত খুঁড়ে জলের ব্যবস্থা করে – বিশেষতঃ যাদের সামর্থ্য নেই। জলটা বেশ ময়লা – সেটাতেই কাপড় কাচা, রান্নাবান্না ইত্যাদি চলে যা হোক করে।
দ্বিতীয় সমস্যাটা চিকিৎসা। একটা গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্র আছে – সেখানে ডাক্তারের আসা না আসা বেশ তামিলনাড়ুতে প্রপার শীতকাল দেখতে পাওয়ার মতোই আশ্চর্য দৃশ্য। কাছাকাছি বড়ো হাসপাতাল বলতে পঁচিশ কিলোমিটার দূরে চেট্টিনাড় হসপিটাল। সবচেয়ে বেশি দরকার একটা আই হসপিটালের – কারণ গ্রামে প্রচুর বয়স্ক মানুষ – অল্পবয়সীরা অনেকেই শহরে সেটলড কাজকর্মসূত্রে এবং অনেক বয়স্ক মানুষেরই চোখের সমস্যা। তো একটা টেম্পোরারি ব্যবস্থাও যদি করা যায় চোখ দেখার খুব ভালো হয়।
শেষ যে কথাটা কার্তিকেয়নকে ভদ্রলোক বলেছিলেন সেটা এই যে – এই সমস্যাগুলো গত তিন-চার বছর ধরে উনি পিনাকলের কর্মযোগীদের বলে আসছেন – প্রত্যেকেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দেদার, আইক্যাম্প এবং ইত্যাদি নিয়ে। আজ অবধি দৃশ্যমান কোনো কিছু দেখেনি মানামাই।
(১০)
ছায়াবিচ্ছিন্না অশরীরীপ্রায়া হয়ে নিয়মিত জেগে থাকে গোটা গোটা রাজপথ – যাদের বিস্তৃতি ডায়মন্ডহারবার থেকে মিরিক। মানুষ শৈশবে অনিশ্চয়তা নিয়ে বড়ো হয় – রাজনৈতিক বিশ্বাসের নিধন হতে দেখে অতি সাড়ম্বরে। প্লাস টু পেরিয়ে ঢোকে এঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলোর সীমাহীন আদেখলেপনায়। সে পাট চুকিয়ে কেউ কেউ বেরিয়ে পড়ে দেশ দর্শনে – কেউ কেউ – অন্য টাইমজোনে।
একাকিনী পশ্চিমবঙ্গে কুয়াশায় কুয়াশায় জমে ওঠে টেনশন। বাবা-মায়েরা উদ্বিগ্নচিত্তে বসে পড়ে স্কাইপিতে, কেউ কেউ এস-টি-ডি আই-এস-ডি কলচার্জ মুখস্থ করে সত্ত্বর – এ শহর, এ রাজ্য, এই ঘরবাড়ি – হাল্কা হাসি, ন্যাকামি, গাম্ভীর্য্য জড়িয়ে আদতে মিস করতে থাকে লাবডুব লাবডুব।
এ রাজ্যে আর ঝড় আসেনা – নিম্নচাপেরাও মুখ ফিরিয়ে নেয় ওড়িশায়, বাঙলাদেশে।
তামিলনাড়ুতে কিন্তু ঝড়টা এসেছিলো।
ভারতবর্ষের পূর্ব উপকূল – বরাবরই দুর্বিনীতা বঙ্গোপসাগরের কোপদৃষ্টি ধারণ করে আসে। আরবসাগরের নাতিশীতোষ্ণ ভালোবাসার প্রলেপ সেখানে নেই। বর্ষায় এবং শরতে প্রায়শই ডিপ্রেশন ভর করে –আর তার আঘাতে নিয়মিত ছিন্নমস্তা হয় ওপার বাংলা দুর্ভাগ্যময়ী।
কিছু ঝড় নিতান্ত আকস্মিকতায় ছিটকে যায় এদিক ওদিক – পারাদ্বীপে, অন্ধ্র উপকূলে, তামিল প্রদেশে।
এবারের ঝড়টা সেরকমই এক পথভোলা সাইক্লোন। আসবে আসবে শোনা যাচ্ছিলো বেশ কিছুদিন ধরেই।
পিনাকল যেহেতু প্রায় উপকূলবর্তী ক্যাম্পাস – আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা ছিলোই। তাই সেদিন ক্লাসগুলো নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ করে দেওয়া হলো – স্টুডেন্টসদেরও বলা হলো হস্টেলের বাইরে না যেতে সেই রাত্তিরে - মামাল্লাপুরমের সর্বত্রগামী আমোদ একরাত্তিরের জন্য মুলতুবি রাখাই বিধেয়।
একটা বিজাতীয় গর্জন শোনা যাচ্ছিলো ধীরেসুস্থে – এই জনমানবহীন ক্যাম্পাসে প্রকৃতি একরাতের জন্য হলেও – জাগছিলো।
প্রথম ধাক্কাটা খেলো – বাইক রাখার শেডটা। জাস্ট উড়ে গেল – বাইকগুলোকে বিশ্রীভাবে দেউলে করে দিয়ে। একের পর এক বাইক বোধহয় সেই লজ্জাতেই উলটে পড়তে লাগলো।
পিনাকলে ঠিক ঢোকার মুখে প্রখ্যাত এবং প্রাচীন তামিল দার্শনিক কবি থিরুভাল্লুভরের একটা মূর্তি ছিলো। স্মিত নয়নে বহুপ্রাচীন সেই বুদ্ধিজীবী সাইক্লোনের ভৈরবী রূপ দেখে – হয়তো এক মনে নতুন কাপলেটস ভাবতে থাকলেন – সে হিসেব জানতে যায়নি কেউ।
দোলনা এতো কিছুর মধ্যে নিজের ঘরে ঘুমিয়ে পড়েছিলো। ঝড়ের লিপস্টিক-গ্লসকিছুই বোঝার সময় পায়নি।
ঘুম ভাঙলো ওর প্রতিবেশিনীর দরজা ধাক্কায় – দোলনার বাবা-মা ফোন করেছিলেন। ইস্ট কোস্ট রোডের প্রলয়ে তখন যাদবপুর যারপরনাই বিচলিত।
দোলনা ওর বাবা-মার সাথে কথা বলে রিয়ালাইজ করলো ওকে ছেড়ে ওর প্রতিবেশিনীকে কলটা করার কারণ দোলনার মোবাইলের টাওয়ার তখন নির্মমভাবে নিরুদ্দিষ্ট।
দোলনা ঘরের বাইরে এলো – কোলকাতার ছিপকাঠিতে সাইক্লোন সম্পূর্ণ ধরা দেয়না কোনোকালেই – বেশ কিছু একঘেয়ে ভারী বর্ষাতেই সীমাবদ্ধ থাকে।
তাই একটা জলজ্যান্ত ত্রিমাত্রিক সাইক্লোন দেখার লোভ সামলাতে না পেরে দোলনা বাইরে চলে এলো।
ধূলো, ধূলো, ধূলো – চারপাশে ধূলোর কিরাতগর্জন – তার সাথে একটা নাম না জানা ডাইনোসর যেন অনেকদিনের মাইগ্রেনের ব্যাথায় ছটফট করছে এমন আওয়াজ।
বৃষ্টি তখনো আসেনি – ঝড়ের সাথে শুধু হঠাৎ লাস্যে উপস্থিতি জাহির করছে সোহাগিনী বজ্রপাত। একটা আস্ত দামড়া – ডিজাস্টার মুভি নেমে এসেছে পিনাকলে।
দোলনার মধ্যে ডিজাস্টার মুভির নায়িকা হবার সমস্ত সুলক্ষণ বর্তমান ছিলো – তাই ও দ্রুত লয়ে গার্লস হস্টেলের এনট্র্যান্সেরর দিকে হাঁটতে শুরু করলো।
ঝড়ের ভয়ে গার্লস হস্টেলের সিকিউরিটিরাও আশঙ্কিতা আশ্রয় যাপন করতে গেছে বেশ খানিকক্ষণ আগেই। দোলনাকে আটকাবার তাই বিশেষ কেউ ছিলোনা। রাস্তায় দু’একজন হস্টেলমেট অবশ্য ‘কোথায় যাচ্ছিস’ জাতীয় প্রশ্ন করলো দু’একবার। দোলনা ‘ঝড় দেখতে’ বলে প্রায় ঝড় ছুঁই ছুঁই বেগেই বেরিয়ে গেলো।
দাঁড়িয়ে রিঅ্যাকশন দেখার সময় ওর আপাতত ছিলোনা।
পিনাকলে বয়েজ আর গার্লস হস্টেলের ঠিক মাঝামাঝি একটা খোলা জায়গা ছিলো – বার্থডে সেলিব্রেশন, গাড়ি ব্যাক করা ইত্যাদি তুচ্ছাতিতুচ্ছ কাজকর্ম ওখানেই হতো।
দোলনা সেখানেই এসে দাঁড়ালো – বা বলা ভালো হাওয়ার বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাবিপ্লবযাপন করতে দাঁড়াবার চেষ্টা করলো।
‘ঝড় মাখছিস?’ – পুরুষকন্ঠে আওয়াজ এলো বয়েজ হস্টেলের দিক থেকে – দোতলা থেকে প্রিসাইজলি।
ডাইনোসরের ডাক ছাপিয়ে কে ডাকলো দেখতে পেয়ে দোলনা সমীর সিংকে দেখতে পেলো।
সমীর পাঞ্জাবের ছেলে – এবং প্রচন্ডভাবে অ-বল্লে-বল্লে। চোখে একটা বেশ ভালো প্লাস পাওয়ারের চশমা – পেটানো চেহারা – কিন্তু বাঁদরামি থেকে অনেকখানি দূরেই থাকে। ও প্র্যাকটিসিং বুদ্ধিস্ট – ঠিক লামা-কারমাপা টাইপ নয়। বৌদ্ধধর্মের একটা আধুনিক অফশুট আছে যেটা অরিজিনার লোটাস সূত্রা ফলো করে। বিশ্বাস করে ভগবান বলে কিচ্ছু নেই – আর পাপতাপময়তার মধ্যেই স্পিরিচুয়াল থাকা যায়। সমীর চন্ডিগড় চ্যাপটারের সেক্রেটারি ছিলো।
দোলনা গলা উঁচিয়ে জবাব দিলো – ‘ভাগ্যিস ঝড়টা এলো’।
সমীর বললো – ‘দাঁড়া আসছি’।
পাশাপাশি দাঁড়িয়ে সামান্যই কথাবার্তা হলো তারপর।
সমীর জিজ্ঞেস করলো – ‘ভাগ্যিস ঝড়টা এলো বললি কেন?’
দোলনা – ‘তুই যে কাউকে নিজে ডেকে কথা বলিস সেটা পিনাকল ক্যাম্পাসে আর কেউ জানে বলে মনে হয়না। অ্যাটলিস্ট আমি তো জানতাম না’।
সমীর বললো – ‘বাথরুমে গেছিলাম, বেরিয়ে দেখি ধূলোর মাঝে এলোকেশী হটপ্যান্ট পরিহিতা। তুই সত্যি না হ্যালুশিনেশান সেটা বুঝতেই খানিক সময় লেগে গেলো’।
এরপর টিপটিপ এবং ঝমঝম করে বৃষ্টি এসে পড়লো।
পরদিন সকালে বিনবিনে এসি আর আখাম্বা প্রলয়ের স্মৃতিমাখা পিনাকল – জানতে পারলো ইস্ট কোস্ট রোডে পন্ডিচেরীর কাছে বড়ো ধস নেমেছে। অজস্র গাছ উল্টেছে – হতাহতও হয়েছে কিছু জেলেবস্তিবাসী।
অনাবৃতা দোলনা মধ্যযামিনীমাখামাখি সঙ্গমের পর – ঘুমন্ত সমীরের উদোম মাংসপেশি এবং অহঙ্কারী লোমে ঢাকা বুকে পড়ে থাকতে থাকতে খুশি হতে চেয়েছিলো কিনা জানা যায়নি। দোলনার ছেড়ে রাখা হটপ্যান্ট আর টিশার্ট, সমীরের পাশে ফেলে রাখা কুর্তা আর থ্রি কোয়ার্টার্স – সমীরের ড্রয়ারের ভেতরে লুকিয়ে রাখা কন্ডোমের প্যাকেটের সদ্যব্যাবহৃত এক অংশ – তারাও জানতে পারলো না ঝড় আসলে ছ্যাবলা না কি গভীর?
হয়তো জেনেছিলেন – সমীরের বইয়ের টেবিলে রাখা সিমেন্টের মূর্তির আপেক্ষিক সাধারণত্বে লুকিয়ে থেকে –ব্যাধি জরা মৃত্যু অতিক্রান্ত প্রাচীন শাক্যমুনি।
গৌতম বুদ্ধ সে’সব কথা লোটাস সূত্রাকেও বলার অধিকার দেননি।
(ক্রমশ)

আপনার মতামত জানান