সবজেটে গ্রীন ক্যাম্পাস

নবম পর্ব


(১৩)
পরম শ্রদ্ধেয় শ্রীল শ্রীযুক্ত তপন রায়চৌধুরী তাঁর ততোধিক মহান ধর্মগ্রন্থপ্রতিম নকশা সংগ্রহে একটি অমর উক্তি করেছিলেন (মানে অনেকগুলোই করেছিলেন, করেই থাকেন জেনারেলি)। লেট মি কোট হিম – ‘বাঙালি মাত্রেই জানেন জগতে মাত্র দুটি জাতি আছে – বাঙালি আর নন বেঙ্গলি। তার মধ্যে দ্বিতীয়টিকে ধর্তব্যের মধ্যে না আনলেও চলে’।
সমর্পণ – সমর্পণ রক্ষিত এই সদবাক্যের গূড়ার্থ বেশ ছোটোবেলায় বুঝে গেছিলো। ছেলেটা গিটারটা বেশ ভালো বাজাতো – গানটা আরেকটু বেশিই ভালো করতো – আর হিন্দিটা পাল্লা দিয়ে মারকাটারি রকমের মানে একদম নোবেল পাওয়ার মতো খারাপ বলতো – প্রায় আইকনিক পর্যায়ের ‘তুম জল খায়েগা’ তো বাচ্চা ছেলে – একবার বলেছিলো – ‘হামলোগ ক্যায়া বানকে জলমে ভাসকে আয়া?’
রাষ্ট্রভাষার উপর এ’রম সন্ত্রাসবাদীসুলভ বৈমাত্রেয় আচরণের পিছনেও একটা গল্প আছে। যেকোনো লেখককে জিজ্ঞেস করুন – উপন্যাস কেন লেখেন – উত্তর আসবে বেশি পাতা ভরাতে। তো হাম ক্যায়া বানকে জল মে – সে যাই হোক। আমার কাছে উপন্যাস একটা বেশ দীর্ঘায়িত প্যাচাল – তাই সমস্ত সাবপ্লট ও সাবস্টোরি টাইপ করা একটি পবিত্র কর্তব্য বিশেষ।
সমর্পণ ছোটোবেলা থেকে মানে ক্লাসওয়ানবেলা থেকে অনার্স ক্লাস অবধি সেন্ট জেভিয়ার্সে পড়েছে – প্রাক স্বায়ত্তশাসন পর্বে – কমার্সে একটা ফার্স্ট ক্লাসও আছে - তখনো জেভিয়ার্স ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির কাছেই বিনয়াবনত ছিলো। তো সেখানে ছোটোবেলায় সমর্পণ দেখলো চারপাশে তথাকথিত ‘নন বেঙ্গলি’ গিজগিজ করছে। আর প্রায় জনমত নির্বিশেষে খারাপ বাঙলা বলে। সমর্পণের বং ইগো হার্ট হলো – ভাবলো ‘তুম হামারা ভাষা বাজেভাবে বোলেগা, তো হাম তুমহারা ভাষা আরো বেশি বাজেভাবে বোলেগা’।
এইসব প্রতিজ্ঞা-ট্রতিজ্ঞা মহাভারতীয় যুগেই ভালো – সবার ক্ষেত্রে এই পাপ কলিতে ফলটা ঠিক আপেল-কমলাটাইপ হয়না।
তো বেচারা সমর্পণের কচিকালের জেদ বেচারার হিন্দিটাকে জন্মের মতো মায়া করে দিলো।
অবশ্য প্রতিজ্ঞা সমর্পণের ধাতে সয়না বলা ভুল।
প্রতিজ্ঞা বৈশ্য – তেজপুরের তেজিয়ান পাহাড়তলিকন্যা। নামে বৈশ্য হলেও ক্ষত্রনারীর এন্ট্রান্স টেস্টে হেসে খেলে পাশ করে যেতো।
কিন্তু সুখ সইলোনা। অসম থেকে সাম্যের দুনিয়াতে নেমেই মেয়ে সব্বোনাশটা ঘটালো। প্রথমে আইটি সূত্রে কোলকাতা, পুনে, চেন্নাই এটসেট্রায় চরকিবাজি। উপরন্তু বসের ফুটানিতে মুগ্ধ হবার অভিনয়ে অক্ষমতা – মিলেমিশে চাকরি লাইফটা বিবমিষা আকীর্ণ ছিলো।
সেই উত্তরণের জন্যই পিনাকল।
সমর্পণের সাথে প্রতিজ্ঞার প্রথম এনকাউন্টার নেহাৎ গ্রহ নক্ষত্রের মুড ভালো থাকায়। তিনশোজনের এই কুম্ভমেলাটা চারটে সেকশনে বিভক্ত ছিলো – প্রথম তিনটে টার্মে – যেখানে সব সাবজেক্ট সবার জন্য কম্পালসারি। তারপর ব্যাক্তিস্বাধীনতার লাইনে শেষ কথা ইলেক্টিভস এসে গেলে – যে যার মতো চরে খেতে পারে। প্রতিটা সেকশনে পঁচাত্তর হতভাগ্য। সেই হিসেবে সমর্পণ ছিলো এস-ওয়ান বা সেকশন ওয়ানে,প্রতিজ্ঞা সেকশন ফোরে। যেহেতু সেকশনওয়াইজ ক্লাস হতো দু’জনের মোলাকাতের সম্ভাবনা ছিলোনা বললেই চলে।
বাদ সাধলো – একটা বিচ্ছিরি গেস্ট লেকচার – পৃথিবীটা তো আর জলপরী মাখামাখি নন্দনকানন নয় – তাই সব গেস্ট লেকচারার মল্লিকা সারাভাই হতে পারেননা। করেছেন নিশ্চয় কিছু – নইলে আর গেস্ট হবেন কেন – কিন্তু সে কথা আর কে শোনে।
তো গেস্ট লেকচারে পুরো তিনশোজন চাঁদপানা মুখে বসে থাকতো জাতি-ধর্ম-সেকশন নির্বিশেষে, তাতেই শাপে বর হলো।



(প্রথম খন্ড সমাপ্ত)

আপনার মতামত জানান