মুখোমুখি অনিমেষ নন্দী

যশোধরা রায়চৌধুরী
“আমি এমন একটা ছবি আঁকতে চাই যার একটা থ্রি ডি এফেক্ট থাকবে। আত্মাটা ভারতীয়। এবং সেই বিশাল প্রান্তর বা সমুদ্র বা মহাকাশের মধ্যে দর্শক ঢুকে পড়বে, সীমাহীন একটা অঞ্চলে সে বিচরণ করতে পারবে।“

“আমি আগে ক্ষুধার ছবি এঁকেছি, দুর্ভিক্ষের ছবি এঁকেছি, রেশিয়াল প্রবলেমের ছবি এঁকেছি। যুদ্ধের ছবি এঁকেছি। যে সিরিজটা বাংলাদেশের ওপর এঁকেছি। একটা ছবির কথা বলি, মাটির বাড়ি ভেঙে পড়ছে, মায়ের শরীর থেকে রক্ত পড়ছে। অন্য একটি ছবিতে মানুষের নাড়িভূঁড়ি দিয়ে তৈরি হচ্ছে গিটারের তার। ধনীরা দরিদ্রের শরীর দিয়ে গিটার বাজাচ্ছে। সৈণিক মাঠে ঘাটে যুদ্ধ করে, আবার আকাশপথেও যুদ্ধ করে। এবার দেখ, ক্রম অগ্রসর হতে হতে এক সময় তো শিক্ষিত মানুষ যুদ্ধ চাইবেই না। আর্মস অ্যামিউনিশন বানাবেই না। সেই জায়গায় যাওয়াটাই আমার মতে বেশি প্রয়োজন। আমি জানি যে আমি মাঠে ঘাটে যুদ্ধ করতে পারব না। এ পথটা সমাধানের পথ নয়। কাজেই আমি তার মধ্যে যাবই না। তাই আমি দৈন্যদশা, মারামারি হানাহানি দেখব না। ঈর্ষ্যা বা ঘৃণাও দেখব না। তার জন্যই সংগ্রাম। এই শান্তির কথা বলাটাও একটা সংগ্রাম কিন্তু, বুঝতে পারছ তো? হয়ত বা সার্বিক, দীর্ঘকালীন সংগ্রাম, অনেকদিন ধরে, চিরদিনের জন্য থেকে যাবে এমন একটা জায়গায় সংগ্রামটাকে নিয়ে যেতে চাইছি। মানুষ চাইবে শান্তি।“



অনিমেষ নন্দী। প্রখ্যাত চিত্রী। মূলত ইউরোপিয় ঘরানার তেলরং এর শিল্পী। আপাতত বসবাস কলকাতায় কিন্তু দীর্ঘকাল কাটিয়েছেন ইউরোপে। তাঁর শিল্পীজীবন নিয়ে কথা বললেন যশোধরা রায়চৌধুরীর সঙ্গে।


প্রঃ অনিমেষমামু, আমার খুব কাছের মানুষ তুমি । ছোটবেলা থেকে তোমাকে দেখেছি। তুমি আমাদের শৈশবে আর্টিস্ট বলতে ঠিক যে ছবিটা মনের মধ্যে ফুটে ওঠে তার প্রতিভূ ছিলে। উশুখুশ দাড়িগোঁফ, উদাস চোখ, পাজামা বা প্যান্টের সঙ্গে খাদির কুর্তা। আশ্চর্যের ব্যাপার , এখনো তুমি সেরকমই আছ। অপরিবর্তিত। আমার স্মৃতিতে আছে তুমি আর আলেক্সান্দ্রা মামি এসেছ, আমরা ছাতে, চাঁদের আলোয় বসে কাঁচা আম মাখা খাচ্ছি! আর মনে পড়ে তোমার একজিবিশনে গেলে মা কেমন করে আমাদের বলতেন, নীল টা দেখ, নীলের ব্যবহারটা লক্ষ্য কর। মা তোমার ছবি খুব ভালবাসতেন, অসম্ভব মেধাবী কাজ, বলতেন। তুমি গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজ থেকে ১৯৬১ তে ডিগ্রি পাও মায়ের পরের বছর। তোমার স্পেশালাইজেশন –এর বিষয় কী ছিল?
উত্তরঃ হ্যাঁ, আমি গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজ , কলকাতা থেকে ১৯৬১ তে ডিপ্লোমা ইন ফাইন আর্টস করি। ওয়েস্টার্ন স্টাইল। আমরা যখন শিখতাম, আর্ট কলেজের পরিবেশটা অসাধারণ ছিল। বেশি করে মনে পড়ে, মাস্টার মশাইরা কী উৎসাহ দিতেন। ক্রমাগত বলতেন, কাজ কর, কাজ কর।
প্রঃ কারা কারা ছিলেন সেই মাস্টারমশাইরা?
উত্তরঃ সত্যেন ঘোষাল ছিলেন, আর ছিলেন কিশোরী রায়। ছিলেন গোপাল ঘোষ, দেবকুমার রায়চৌধুরী, রথীন মৈত্র, প্রমুখ ।
প্রঃ তোমার একেবারে শুরুর জীবন কোথায়?
উঃ আমার জন্ম ১৯৪০ সালে মুর্শিদাবাদ জেলায়, একটি ছোট জনপদে। জায়গাটির নাম ভাবতা, বাবা রেলে কাজ করতেন, ওই স্টেশনটির সংলগ্ন কোয়ার্টারে আমার জন্ম। ছোটবেলা কেটেছে অধুনা বাংলাদেশের দুটি গ্রামে, আড়কান্দি ও দৌলতপুরে । ১৯৪১ থেকে ১৯৪৬ পর্যন্ত। তারপর কলকাতায় চলে আসেন আমার বাবা মা। আমার বড় হওয়া মধ্যবিত্ত ঘরে, পড়াশুনো কলকাতার কসবা অঞ্চলের চিত্তরঞ্জন হাইস্কুলে। আমরা সাত ভাইবোন, আমি সর্বকনিষ্ঠ। ছোটবেলায় বইতে কোন ছবি দেখতাম , মনটা খুশিতে ভরে যেত। আমি খুব খারাপ ছাত্র ছিলাম, পড়াশুনো পারতাম না, মাঝেমধ্যে বেঞ্চির ওপরে দাঁড়িয়ে থাকতে হত। থ্রি থেকে ফোরে ওঠার সময় মামা উপহার দিলেন ‘পাগলা দাশু’ বই, তার ড্রইং গুলি অসম্ভব ভাল লাগল। সত্যজিৎ রায়ের করা সেই ইলাস্ট্রেশনগুলো নিজের খাতায় কপি করতাম। ছোটবেলায় মাটি ঘাঁটতাম, আপনমনে মূর্তি, প্রতিমা গড়েছি। দুর্গাপূজার সময়ে মূর্তি তৈরির জায়গায় অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে দেখতাম। নিজে সেই জিনিসটা তৈরি করার ইচ্ছা ছিল বলেই , খুঁটিয়ে দেখতাম। পরে অবশ্য মূর্তি আর করা হয়নি বিশেষ। স্কুলের ড্রইং ক্লাসের মাস্টারমশাই আমাকে খুব ভালবাসতেন, আমি একবার পুরস্কৃতও হয়েছিলাম।
প্রঃ আচ্ছা ১৯৪৭ সালের দাঙ্গা তোমার তো দেখা।
উঃ হ্যাঁ। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় এল মুসলমান হিন্দুদের মধ্যে ভয়াবহ দাঙ্গা , তার ছাপ আমার মধ্যে পড়েছিল। আমার শিশু মনে এই বীভৎস হত্যালীলা নিজের চোখে দেখে। রাতে ভয়ে ও আতঙ্কে সময় কাটত। তখন আমরা বালিগঞ্জে থাকতাম। এখানে অবশ্য সেই হত্যালীলা তুলনামূলকভাবে কম হয়েছিল।
প্রঃ ১৯৫৬ সালে তুমি আর্ট কলেজ গিয়েছিলে। বাড়ি থেকে কোন বাধা পাও নি?
উঃ ছোটবেলায় আঁকাজোকা এবং মূর্তি করতাম বলে, আমার বড়দা একদিন আমাকে বলল, আর্ট কলেজ থেকে ফর্ম নিয়ে আয়। নিয়ে আসার পরে, ওখানে একটা কলম ছিল, কী শিখতে চাও? বড়দা লিখে দিলেন স্কালপচার, মডেলিং। এইভাবেই আমার আর্ট কলেজে ঢোকা। পড়াশুনো করতে ভাল বাসতাম না বলে, স্কুলজীবনকে আমার বন্দী জীবন বলে মনে হত। সেই তুলনায় আর্ট কলেজে গিয়ে পেলাম মুক্তি। প্রথম বর্ষে দেখলাম, আমার সঙ্গে যারা সহপাঠী তাদের মধ্যে কয়েকজন অন্য আর্ট কলেজের ফার্স্ট ইয়ার সেকেন্ড ইয়ার শেষ করে এসেছে। আমি সেই তুলনায় অথৈ জলে পড়লাম। এবং তাদের পাশে গুটিসুটি হয়ে থাকতাম। এখনো আমি পন্ডিতদের ভয় পাই। তা সে যে ধরণের পন্ডিতই হোক। প্রথম দু বছর কলকাতা আর্ট কলেজে সব বিষয় শিখতে হত। প্রথম বছরে আমি সেভাবে কোন কাজই করতে পারলাম না। দ্বিতীয় বছর থেকে আগ্রহ পেতে শুরু করলাম। তৃতীয় বর্ষে যখন স্কালপচারে যেতে হল, আমার সেই দিকে মন টানল না। তখন আমি স্ট্রিম চেঞ্জ করি, ফাইন আর্টসে যাই। ১৯৫৯-১৯৬১ এই দুই বছর আমি প্রায় শূন্য থেকে একেবারে ওপরের দিকে চলে এলাম ক্লাসের মধ্যেই। প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান পেলাম, বাৎসরিক প্রদর্শনীতে শ্রেষ্ঠ তৈলচিত্রে পুরস্কৃত হলাম। ১৯৬১ তে আমরা কয়েক বন্ধু মিলে শিল্প সংস্থা ইয়াং আর্টিস্টস সোসাইটি তৈরি করি, ১৯৬৩-৬৪ তে আমি যুগ্ম সম্পাদকের ভূমিকা পালন করেছিলাম। প্রথম একক প্রদর্শনী হয় ১৯৬২ সালে।



প্রঃ তারপর তুমি অবশ্য বেলগ্রেডে চলে যাও । বেলগ্রেডে তুমি কি আঁকা শিখতেই গিয়েছিলে? এই বিষয়ে বল।
উঃ ১৯৬৫ তে বেলগ্রেডে যাই চার বছরের স্কলারশিপ নিয়ে। গিয়েছিলাম মোসাইক ও ফ্রেস্কো নিয়ে কাজ শিখতে। যাবার সময় আমার বয়স মাত্র ২৫। সেই কম বয়সে কমিউনিজম আদর্শে অনুপ্রাণিত ছিলাম। তারপর ১৯৬৯ তে বৃত্তি শেষ হয়ে যায়, ফিরে আসি। কিন্তু কলকাতায় ফিরে কাজের পরিবেশ পেলাম না, তাই যুগোস্লাভিয়ায় আবার ফিরে যাই।
প্রঃ যুগোস্লাভিয়া তার মানে তোমার কাছে দ্বিতীয় মাতৃভূমির মত?
উঃ হ্যাঁ তা তো বটেই। এর পর ১৪ বছর আমি ওখানে ফ্রিলান্স আর্টিস্ট হিসেবে থেকে যাই। ওখানকার মানুষের অনাবিল ভালবাসা পাই, আমার বিপদের দিনে অনেকে বন্ধুর হাতও বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। এখন সার্বিয়া বলেই চিনি আমরা ওই দেশটিকে, সেই জাতির মানুষ খুবই উষ্ণ এবং আবেগপ্রবণ। সার্বকন্যার সঙ্গে আমি ১৯৭০ সালে বিবাহবন্ধনেও আবদ্ধ হই। যদিও পরে আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছি, তবে আমার কন্যা নিরভানাও বেলগ্রেড থেকে স্কালচার মডেলিং নিয়ে পড়াশুনো করেছে। সেই সময় আমি নিউ বেলগ্রেডে থাকতাম। সব মিলিয়ে আটটি একক প্রদর্শনী করি বেলগ্রেডে, এছাড়া যুগোস্লাভিয়াতে ৯টি , ইউরোপে ৫ টি প্রদর্শনী করি। আমার ছবির মাধ্যমে আমি বর্ণবিদ্বেষ, জাতিবিদ্বেষ এর বিরুদ্ধে দাঁড়াতাম। ১৯৭১ এর বাংলাদেশ যুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তানের মেয়েদের ওপরে পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর দানবিক অত্যাচারের ঘটনার প্রতিবাদ করে আটটি ছবি এঁকেছি বেলগ্রেডে বসেই, এবং প্রদর্শনী করেছিলাম। ঘোষণা করেছিলাম , ছবি বিক্রির অর্থ, আমার কন্যার মত বয়সী যে শিশুরা অবৈধ , ধর্ষণজাত সন্তান হিসেবে বেড়ে উঠছে বাংলাদেশে, ওই বিক্রিত ছবির অর্থ আমার কন্যার তরফ থেকে তাদের প্রতি উৎসর্গ করব।
প্রঃ একটু বলো তোমার নিজস্ব শৈলী কী এবং তোমার কলকাতার গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজের শিক্ষার ইতিবৃত্ত।
উত্তরঃ প্রথমত, আমি শিখেছি অয়েল পেন্টিং। গ্রাফিক আর্ট ওয়াটার কালার কম করেছি। ইন্টারমিডিয়েট অব্দি ওয়াটার কালার ছিল। অ্যাক্রিলিক যে কালারটা আছে আমার সেটা পছন্দ হয়নি, সেটার ওপর আমি দখলও আনতে পারিনি। তেলরং ধীরে ধীরে আমার আত্মিক মাধ্যম হয়ে ওঠে, তাই আমি শৈলী চেঞ্জ করার কথা ভাবিওনি।
প্রঃ এক সময় তো ভাস্কর্যেও হাত পাকিয়েছ, এবং ফ্রেস্কো ও মোজেক নিয়েও কাজ শিখেছিলে। কিন্তু শেষ অব্দি অয়েল পেন্টিং ই তোমার মাধ্যম হয়ে দাঁড়াল । কেন?
উত্তরঃ আমার সাবজেক্ট ছিল ফ্রেস্কো ও মোজাইকের ওপর স্কলারশিপ । বিদেশ যাবার একটা সুযোগ তৈরি হয়েছিল। ইউরোপ যাবার সুযোগ পেয়েছিলাম, সেইকারণেই মোজাইক ও ফ্রেস্কোর স্কলারশিপ গ্রহণ করি। আর আমি যে দেশটায় গেছিলাম সেই যুগোস্লাভিয়ার আশপাশেই বাইজান্টাইন ফ্রেস্কোর বিপুল সম্ভার আছে। কাছেই ইটালি আর গ্রিস। সেখানেও । প্রচুর মোজাইক ফ্রেস্কো আছে, সেগুলি আমি কিছু কিছু দেখেছি। আর ফ্রেস্কো আমি যুগোস্লাভিয়াতে প্রচুর পেয়েছি। প্রায় তিনশো মনাস্তারি আছে। তার মধ্যে কিছু আছে অসাধারণ। অজন্তার সঙ্গে তারা লড়াই করতে পারে এত সুন্দর।


প্রঃ কত পুরনো সেগুলো?
উত্তরঃ সেগুলো হচ্ছে মধ্যযুগের। আরেকটা জিনিস হল, ওখানে আইকনও প্রচুর আছে। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে অদ্ভুত একটি জায়গা আছে, তার নাম মাউন্ট অ্যাথস। গ্রিসে এই জায়গাটার নাম হয়ত এখানে কেউই জানে না। গেছে খুব কম লোক। প্রথমত এখানে মহিলাদের প্রবেশ নিষেধ। অন্তত তখন ছিল আমি যখন গেছিলাম। দেখেছিলাম মহিলাদের ঢুকতে দেওয়া হয়না। সেটা ৬৬ সালে । এটা একটা পেনিনসুলা। ফুল ফলে ভরা। পায়ে হেঁটে যেতে হয়। গেলে মনে হয় নন্দন কাননে আমি উপস্থিত হয়েছি, পাখির ডাক ছাড়া আর কিছুই শোনা যায়না। সেখানে গাড়ি ঘোড়া কিছু নেই। বিশাল বিশাল মনাস্টারি আছে , বাইজান্টাইন মনাস্টারি। প্রতিটি দেওয়ালে ফ্রেস্কো করা আছে। অত্যন্ত সমৃদ্ধ।
প্রঃ এর সঙ্গে তোমার লিংক?
উঃ এর দ্বারা যে আমি উদবুদ্ধ হয়েছিলাম তা ঠিক, কিন্তু আমার শৈলীকে কিন্তু সেটা কোনভাবে প্রভাবিত করেছে বলে আমার মনে হয়না।
প্রঃ কলকাতার গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজের কথা আর একটু বল।
উত্তরঃ সত্যেন ঘোষালকে আমি আজো পর্যন্ত ভাবলে আমার কথা বন্ধ হয়ে যায়। ( কন্ঠস্বর রুদ্ধ)
প্রঃ এতটাই শ্রদ্ধা কর ? ঈশ্বরের মত? তিনিই কি অয়েল পেন্টিং শেখাতেন?
উত্তরঃ হ্যাঁ তিনি আমাদের অয়েল পেন্টিং শিখিয়েছিলেন। পশ্চিমি ধারায়। শেষের দিকে উনি একদম অন্যরকম হয়ে গেছিলেন। ওরঁ শেষ একজিবিশনে দেখেছি নেচার ইন মেডিটেশন। শেষ প্রদর্শনী তাঁর যেটা, যেখানে আমাকে বলতে বলা হয়েছিল। আমি সেভাবে বলিনি, কিন্তু বলার ইচ্ছে ছিল। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন যে শেকসপিয়ার লোকালয়ের কবি, কিন্তু কালিদাস প্রকৃতির কবি। এইখানেই প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের তফাৎ। সত্যেনবাবুর ভেতরে ভারতের আধ্যাত্মিকতাটা এসে গিয়েছিল শেষ দিকে।
প্রঃ হ্যাঁ, অর্থাৎ , তিনি পাশ্চাত্য ধারায় কাজ করতে শুরু করলেও, তাঁর ভেতরকার যে ভারতীয়ত্ব তা জেগে ওঠে সেই সময়ে।
উত্তরঃ একদম তাই।
প্রঃতোমার যে স্টাইল, সেটাকে তুমি কী বলবে? সেটা কি কনটেম্পোরারি রিয়ালিজম? না কি সুররিয়ালিজম?আমরা সুররিয়ালিজম সম্বন্ধে কিছু মোটাদাগের আইডিয়া জানি। তোমার ইজম কি?
উত্তরঃ আমি যখন কথা বলি, সরাসরি উত্তর দিইনা, কিছুটা ঘুরিয়ে দিই। এর মধ্যে একটা সুররিয়ালিজমের গন্ধ আছে মনে হয়। সেই অর্থে আমি সুররিয়ালিজম –এর পথিক বলা যেতে পারে। কিন্তু আগে এই ব্যাপারটা বেশি ছিল। এখন আমি স্পিরিচুয়ালিজমের দিকে ঘুরে গিয়েছি। আমার ছবির মধ্যে স্বপ্নের ব্যাপার নেই। ভাবজগতের, মনোজগতের কথা আছে।
প্রঃ তোমার অঙ্কনের রীতিটা সম্বন্ধে তুমি কি বলবে?
উত্তরঃ হ্যাঁ, অঙ্কনরীতির কথাটা আমি আমার বই মন ও ঈশ্বরের মধ্যে লিখেছি। তোমাকে সেটাই বলব। আমার জামাকাপড় যদি দেখো, আমি প্যান্ট পরি, তার সঙ্গে পাঞ্জাবি পরি। মানে আমি দুটো ধারার পোশাককে মিশিয়ে পরছি।


প্রঃ তুমি ফিউশনের কথা বলতে চাইছ।
উত্তরঃ একজ্যাক্টলি। ফিউশন। আমি শিখেছি ওয়েস্টার্ন আর্ট, পদ্ধতির দিক থেকে। জন্মসূত্রে যখন একটা শৈলী দিয়ে শুরু হয়ে, সেটাকে ত্যাগ করা প্রায় যায় না। কাজেই আমি ইউরোপিয় ধারার আঁকিয়ে। কিন্তু আমার ছবিতে আমি নির্জনতা ভীষণ পছন্দ করি।এবং দৃশ্যের সব মিলে এক আত্মা হয়ে যায় যেন। সব মিলে যেন একটা নতুন সুর তৈরি করবে। দর্শকরাও এটা বার বার বলেছেন।
প্রঃ হ্যাঁ তুমি লিখেছঃ “আমার ছবিতে তিনটে দেশকে পাওয়া যায়। চিন-জাপান, ভারত, ও ইউরোপ। আঁকার ধরণ ইউরোপের, চিনের নির্জনতা,নিস্তব্ধতা ও শুদ্ধতা । আর ভারতের চিন্তা ভাবনা।“ ভারতের চিন্তা ভাবনাকে তুমি ভারতীয় দর্শনের কথা বলতে চেয়েছ। আর চিনের ব্যাপারে? ওদেরও তো অনেক দর্শন আছে, তাই না?
উত্তরঃ হ্যাঁ, কিন্তু ওদের যেটা মূল জিনিশ আমাকে অ্যাপিল করে চিত্রশিল্পে সেটা হল নির্জনতা, নিস্তব্ধতা এবং শুদ্ধতা।
প্রঃ তোমার ছবিতে সত্যিই নির্জনতা থাকে। ছবিটা দেখলেই মনে হয় একটা ফাঁকা বিশাল প্রাঙ্গনের মধ্যে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। এবং ফিগার যদি কিছু থাকে তা একটি মাত্র ফিগার, তার সামনে পিছনে শূন্যতা। প্রান্তরের মধ্যে একা। পুরো একটা ল্যান্ডস্কেপে একটি মাত্র ফিগার। বার বার এটাই তুমি আঁক।
উত্তরঃ আমি শুধু ফাঁকা প্রাঙ্গনের ছবি আঁকছি না। আমি আঁকছি বিশাল সমুদ্র, পর্বতমালা, মহাকাশ, তার মধ্যেই আমি বিচরণ করতে চাই। আমার এই মানুষটির প্রতিনিধিত্ব করছে মানুষ,পাখি, পাথর, পর্বত বা গাছ ইত্যাদি।
প্রঃ এই যে একটা ছবিতে একটা পাথর? এটা কি তাহলে মানুষের প্রতীক?
উঃ প্রতিটি ধূলিকণার ভেতরেও আছে আত্মা, তাই পাথর হয়ত বা কেবল পাথরই কিন্তু এখানে সে মানুষের প্রতিভূ। সে যা-ই হোক, সেই বস্তুটির ওপরে একটা কসমিক আলো এসে পড়েছে, অর্থাৎ উত্তরণের দিকে যাত্রা আমি আঁকতে চেষ্টা করেছি।
প্রঃ হ্যাঁ, ঠিক, আর তোমার ছবিতে একটা প্রশান্তির ব্যাপার থাকে। দেখলেই অদ্ভুত একটা সিরিনিটি এসে পড়ে। এটা নিশ্চয়ই সব দর্শকরা বলেছেন।
উত্তরঃ তুমি যে কথা বললে, দর্শকরা অবশ্যই বলেছেন। তাছাড়া আমাকে খুব টানে মিস্টিসিজম বা রহস্যময়তা। এবং আমাকে ধ্বংসাবশেষ ও খুব আকর্ষণ করে, আমি কয়েকটা ছবিও এঁকেছি । আমি প্রায় সব ছবিতেই আলোর ব্যবহার করেছি। মানুষ কিন্তু বেসিকালি মুক্তি চায়। অনেক ছবিতেই এই মুক্তির স্বাদ দেবার চেষ্টা করেছি। আর একটা ছবির কথা বলি, নাম কো একজিস্টেন্স। এখানে জীবজগৎ, প্রাণিজগৎ আর উদ্ভিদজগতের এবং মানুষের কথা আছে । এই ছবিটি দেখ, এখানে একটা মেঘের তলায় একটা পাথর রয়েছে। অথচ মেঘের ওপর আলো এসে পড়েছে। এটা স্বামী বিবেকানন্দের কথা ভিত্তি করে, আমার মতন করে ছবিটা আঁকা। এখানে তোমার অজ্ঞানতার অন্ধকার তোমাকে ঢেকে রয়েছে, মেঘটা সরে গেলেই, তুমি তার উর্ধে যে আলো তার দেখা পাবে। তোমার দুঃখ বা নিরানন্দটা একটা সাময়িক জিনিশ, সেটা না থাকলে বাকিটা আনন্দময়, আলোকময়। আমরাই তৈরি করি, অন্ধকারটা।

প্রঃ অন্ধকারটা আমাদেরই সৃষ্টি।
উত্তরঃ একদম ঠিক। আরেকটি ছবি আমার আছে, একটি ডোবার মধ্যে এসে পড়েছে মেঘের প্রতিবিম্ব। নিঃসহায় নিঃসম্বল একজন মানুষের আর্তি কোন এক সময় আসে বন্ধু হিসাবে একজন উপস্থিত হয়। এখানে মেঘ তার নয়নের মণি হয়ে উপস্থিত হয়েছে। তারা পরস্পরে কথা বলছে। তার বন্ধু এল। একাকিত্ব চলে গেল। জীবনটাই বদলে গেল। জীবন সুন্দর।
প্রঃ তোমার অনেকগুলো ছবিতেই জার্নি নাম দিয়েছ। এর কারণ কী?
উত্তরঃ জীবন তো চলমান। যেমন দিনের পর দিন যায়। গতি। জীবন তো যাত্রাই বলা যায়।
প্রঃ তোমার ছবিগুলো খুব অ্যাবস্ট্র্যাক্ট মনে হচ্ছে। তুমি যে মানে গুলো বলছ, অন্য কেউ দেখে অন্য কিছুও বলতে পারে তাই না?
উঃ হ্যাঁ, ওইজন্য আমি বলে দিতে চাইনা। আমার থেকে তুমি হয়ত অন্য কোনভাবে ভাবলে। আমি ব্যাখ্যা করলে একভাবে করব। কিন্তু তোমার কাছে অন্য কোন মানে নিয়ে আসতে পারে। দর্শকরা যখন এসে আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, ছবিটির অর্থ। আমি সেজন্য বলিনা। জিগ্যাসা করি, আপনার কী মনে হচ্ছে? বম্বের একজিবিশনে এক খ্রিশ্চান মহিলা বেরিয়ে যাবার সময়ে বললেন, আই ক্যান্ট বাই ইয়োর পেন্টিং, বাট ইট ইজ ডিভাইন। এর থেকে বড় আনন্দ কী হতে পারে বল?
প্রঃএই ছবিতে একটা ডিম দেখছি।
উত্তরঃ হ্যাঁ এটা আমি কয়েকজায়গায় ব্যবহার করেছি। রবীন্দ্রনাথ থেকে পেয়েছি ধারণাটা। ডিম হিসেবে প্রসব হলেই জন্ম হয় না। যতক্ষণ না সেটা ফেটে দ্বিতীয় জন্ম হচ্ছে ততক্ষণ জন্ম সম্পূর্ণ হয়না। প্রকৃত জন্ম হয়না। মানুষের মনুষ্যত্ব না এলে প্রকৃত জন্ম হয়না। এই ছবিটিতেও দেখ ডিমের কুসুম ফেটে বেরিয়ে পড়ছে। আমি ব্যবহার করেছি। বলতে চেয়েছি মানুষের জাগরণ।
প্রঃ তোমার ছবিতে পবিত্রতার বোধ এবং সিরিনিটি আছে। এই ছবিটিতে গৌতম বুদ্ধের কথা মনে আসছে।
উত্তরঃ হ্যাঁ এ ছবিতে সেটা তুমি ভাবতে পার।
প্রঃ তোমার অন্য আর একটি ছবিতে মোমবাতি সূর্যকে জ্বালিয়ে দিতে চাইছে। কেন?
উত্তরঃ মোমবাতি সূর্যকে জ্বালিয়ে দিতে চাইছে। কিন্তু বাস্তবে সেটা সম্ভব নয়। তাই ছবিটির নাম দিয়েছিলাম “রিজন উইদাউট রিজন”। মানুষ ভাবতে পারে আমি সূর্যকে জ্বালিয়ে দেব। এটা অবাস্তব, কিন্তু মানুষের অনেক ক্ষমতা আছে। এখানে তার ইচ্ছা শক্তির কথা বলেছি। এই শক্তির জোরে অনেক সাফল্যও এনে দেয়। এক্ষেত্রে, মানুষ চাইছে প্রতিস্পর্ধী হতে? ঈশ্বরের বা সূর্যের কাছে পৌঁছতে চাইছে। হ্যাঁ, পরাজিত হওয়াটা দুঃখের বা খারাপ নয়। সারেন্ডার করা আছে, দুঃখ বা আনন্দের অশ্রু আসছে। এই মনের জোর এবং আন্তরিকভাবে অজানাকে জানার প্রবল আকাংক্ষাই মানুষকে অমৃত লোকে নিয়ে যাবে।
প্রঃ এবার আর একটা ছবির কথায় আসি। woman pillar of man এটা বলতে কী বোঝাতে চাইছ।
উঃ নারী পুরুষের পাশে না থাকলে পুরুষ তার আকাংক্ষা সফল করতে পারত না। আমি একটু ব্যক্তিগত ব্যাপারে আসি। ১৯৮৩তে দেশে স্থায়ীভাবে ফিরি এবং আবার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হই, জয়শ্রীর সঙ্গে। জয়শ্রীই আমাকে প্রমাণ করে দিয়েছে, আমি যদি একটুও সফল হয়ে থাকি সেটা ওর অবদানে। প্রতি মুহূর্তে আমার প্রতি নজর, আমার সুবিধা অসুবিধা, আমার ছবি ভাল হচ্ছে না এতে ওর কষ্ট ও সহানুভূতি। বিদেশে যখন গেছিলাম বেশির ভাগ সময় গ্যালারি, মিউজিয়াম দেখেছি। খুব যত্ন করে দেখেছে এমনকি আমার থেকেও বেশি। সেই অর্থে বলতে পারি পিলার স্বরূপ আমাকে ওই দাঁড় করিয়ে রেখেছে।

প্রঃবেলগ্রেডের অভিনেতা ও পরিচালক স্তেভো জিগোন তোমার ছবি সম্বন্ধে বলেছেন, পৃথিবীকে কাছাকাছি নিয়ে আসতে পারে না স্যাটেলাইট অথবা এরোপ্লেন। কিন্তু তোমার ছবি হয়ত কোথাও সেই একাত্ম করার কাজটা একটু হলেও করতে পারে। ( “it is dangerous to say that satellites have brought the earth closer to us by photographing it from outer space, it is dangerous to believe that aeroplanes have reduced distance. An exhibition of this nature is better able to bring us close to the earth and to shorten our journey to the secrets of life, than satellites and airplanes .”) এ বিষয়ে তুমি কি বলবে?
উঃ আমি আর কী বলব। এটা একজনের অনুভূতি। আমি আনন্দ পেয়েছি, উৎসাহিত হয়েছি তাঁর কথায়।
প্রঃ কিন্তু তোমার জীবনের উদ্দেশ্য কি তাই নয়? তোমার অভীষ্ট কী? ছবির মধ্যে দিয়ে মানুষকে একাত্ম করা? বা মানুষকে একটু হলেও শুদ্ধ বা পরিচ্ছন্ন করে তুলতে চাওয়া?
উত্তরঃ হ্যাঁ অবশ্যই তাই। ছবির মধ্যে যাতে শান্তি পায়, সে যেন মুক্তির বাণী শুনতে পায়। মুক্তি খোঁজা মানুষের ধর্ম। সব ঢেকে থাকে বলেই আমরা তা বুঝতে পারিনা। পাথরের ওপরে মেঘ রয়েছে, ওপরে কসমিক আলো আছে কিন্তু মেঘের জন্য সেই আলোটা ঢেকে গেছে। তার মানে আমরা বুঝতে পারছি না আমাদের ওপরে আলোটা আছে, আমরা তার অস্তিত্ব জানছি না। তাকে সরালেই মুক্তি।
প্রঃআচ্ছা তুমি একটা জিনিস বল, তুমি বলেছ প্রথম যৌবনে তুমি কম্যুনিজম এ বিশ্বাসী ছিলে। কিন্তু এখন তোমার ছবিতে সমাজ কে খুঁজে পাওয়া যায় না। তোমার ছবিতে রাস্তা ঘাট বাড়ি ঘর দোর কিছুই নেই, মানুষের ছবি সে অর্থে নেই। একটা অভিযোগ উঠতে পারে যে তুমি নিজের স্বপ্ন রাজ্যের বাসিন্দা, তুমি কেন সমাজের এই কুৎসিত দিকগুলোকে ইগনোর করছ।
উত্তরঃ প্রশ্নটা দারুণ। আমি আগে ক্ষুধার ছবি এঁকেছি, দুর্ভিক্ষের ছবি এঁকেছি, রেশিয়াল প্রবলেমের ছবি এঁকেছি। যুদ্ধের ছবি এঁকেছি। যে সিরিজটা বাংলাদেশের ওপর এঁকেছি। একটা ছবির কথা বলি, মাটির বাড়ি ভেঙে পড়ছে, মায়ের শরীর থেকে রক্ত পড়ছে। অন্য একটি ছবিতে মানুষের নাড়িভূঁড়ি দিয়ে তৈরি হচ্ছে গিটারের তার। ধনীরা দরিদ্রের শরীর দিয়ে গিটার বাজাচ্ছে। সৈণিক মাঠে ঘাটে যুদ্ধ করে, আবার আকাশপথেও যুদ্ধ করে। এবার দেখ, ক্রম অগ্রসর হতে হতে এক সময় তো শিক্ষিত মানুষ যুদ্ধ চাইবেই না। আর্মস অ্যামিউনিশন বানাবেই না। সেই জায়গায় যাওয়াটাই আমার মতে বেশি প্রয়োজন। আমি জানি যে আমি মাঠে ঘাটে যুদ্ধ করতে পারব না। এ পথটা সমাধানের পথ নয়। কাজেই আমি তার মধ্যে যাবই না। তাই আমি দৈন্যদশা, মারামারি হানাহানি দেখব না। ঈর্ষ্যা বা ঘৃণাও দেখব না। তার জন্যই সংগ্রাম। এই শান্তির কথা বলাটাও একটা সংগ্রাম কিন্তু, বুঝতে পারছ তো? হয়ত বা সার্বিক, দীর্ঘকালীন সংগ্রাম, অনেকদিন ধরে, চিরদিনের জন্য থেকে যাবে এমন একটা জায়গায় সংগ্রামটাকে নিয়ে যেতে চাইছি। মানুষ চাইবে শান্তি। চাইবে অজানাকে জানতে। এইভাবে সে অনেককিছু খুঁজে পাবে। এই সীমাহীন ব্রহ্মান্ডে জানার শেষ নেই। চাই বাঁচার আনন্দ।
প্রঃখুব স্পষ্ট হল এই উত্তরটা। আসলে ঠিক এই কথাই তোমার প্রসঙ্গে বলেছেন একজন বিখ্যাত শিল্প সমালোচক, প্রশান্ত দাঁ। আমি সেদিন পড়লাম। সেই লেখায় তিনি বলছেনঃ চিত্রকল্প চেনা অচেনা জগতের মন্থন থেকে উৎসারিত। অলীক বা অবাধ কল্পনাপ্রসূত মনে হতে পারে। পাহাড়, জলাশয়, গাছগাছালি, পশুপক্ষী, মানুষজন প্রভৃতি অনুষঙ্গগুলো যেন কালের পরিবৃত্ত থেকে সুদূরের যাত্রী...ছবিতে সমকালীন সময়ের প্রত্যক্ষ কোন ছাপ নেই। ত্রিকাল যেন একই সুরে সং হত হয়ে আবিশ্বের শাশ্বত সত্যকে পাঁপড়ি মেলে ধরতে চাইছে।“ এখানেই আরেকটা প্রশ্ন। তোমার ছবিতে কিছু আর্কিটাইপ বা মিথোলজি ব্যবহার করেছ। একটা ছবি দেখলে মনে হয় ধ্যানমগ্ন মানুষ যেন গৌতম বুদ্ধ, কোন ছবিতে শংখ এসেছে, কোথাও বা গাছ। তুমি যাদের কাছে আঁকা শিখেছ, তাঁদের অবদান এটা? নাকি ভারতীয় দর্শনের অবদান?
উত্তরঃ যে সময়ে আঁকা শিখেছি, সেই সময়ে এই খাদ্য পাইনি। কলকাতার কলেজে বা বিদেশেও পাইনি। আমার পুষ্টি হয়নি, সুন্দর চিন্তার রাজ্যের প্রসার আর গতি পাইনি। বিদেশের ছবি দেখে তাদের ধরণ ধারণ আমাকে উদবুদ্ধ করে, যেহেতু আমি পশ্চিমি ধারায় শিক্ষিত, তাই সেগুলো এখনো নাড়া দেয়। পুষ্টি আমি পরে পেয়েছি, গান, বা অন্যান্য জায়গা থেকে। রবীন্দ্রনাথের থেকে, বিবেকানন্দের থেকে পেয়েছি। শান্তিনিকেতন বইটির থেকে আমি অমৃত পেয়েছি, যেটা পড়ি সেটা ই মনে হয় সেটাই গ্রহণযোগ্য, আমার এখনই এই মুহূর্তেই এটা প্রয়োজন। বিবেকানন্দ শক্তি ত্যাগ যে ভাবে সহজ ভাবে বুঝিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথও বুঝিয়েছেন। মানুষকে আনন্দময় করে তোলা, তার পথকে পরিষ্কার করে দেওয়া মুক্তির দিকে। এগুলো থেকে আমি খাদ্য পেয়েছি। প্রঃ এ প্রশ্নটা জানা হল না। তুমি সুইডেন গিয়েছিলে। স্থায়িভাবে থাকবে ভেবে গিয়েছিলে, কিন্তু মাত্র তিনমাস থেকে ফিরে এসেছ। কেন?
উঃ হ্যাঁ আমি স্থায়িভাবে থাকব বলে গেছিলাম। ওদেশের মানুষদের খুবই ভাল লেগেছিল। মোট আমি সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর তিনমাস ছিলাম। থাকতে পারিনি এই কারণে, যে প্রায় চার পাঁচ মাস সূর্যের আলো দেখা যায়না আর আমার মানসিক অবস্থাও ভাল ছিল না। আলোর অভাবেই আমি থাকতে পারলাম না। আবার বেলগ্রেড ফিরে এলাম।
প্রঃ তুমি তো ১৮ বছর বিদেশে ছিলে। নিশ্চয় অনেক ইন্টারেস্টিং ঘটনা ঘটেছে? কয়েকটা ঘটনা বলবে?
উঃ ঘটনা তো অনেক। বলতে শুরু করলে থামতে পারব না। আমি কয়েকটা ঘটনার কথাই শুধু বলব। আগে সুইডেনের কথা বলেছি, কিন্তু এটা না বললেই নয়। ওরিয়ান স্তুরেসো ( Orijan Stureso) একজন অর্থনীতিবিদ । ওঁর সঙ্গে আমার আলাপ হয় বেলগ্রেডে। নয় মাসের জন্য এসেছিল সে। একদিন কথাপ্রসঙ্গে উঠল, ছবি এঁকে আমার কী ভাবে চলে। বললাম, দিন আনি দিন খাই –এর মত। ছবি এঁকে বাঁচা কষ্ট। আমার ছবি সে দেখতে চাইল। তারপর দামোদর নদের একটি দৃশ্য জলরং এর, সেইটি ওকে উপহার দিলাম। পরদিন সকালে আমাকে ফোন করে ধন্যবাদ জানিয়ে ছবির প্রশংসা করল। আর বলল, আমি তোমার কথা ভাবছিল্মা, যদি তোমাকে একটু সাহায্য করতে পারি। আচ্ছা ধর আমি ১০ জন ক্রেতা জোগাড় করে দিলাম আর তোমাকে প্রত্যেক মাসে এতটা করে টাকা দিলাম, বছর শেষে ১০ টা ছবি বেছে নেব। এ তো ভীষণ ভাল প্রস্তাব, আমি রাজি হয়ে গেলাম। এর পর সে সুইডেনে গেল, ফিরে এসে জানাল, আমি ৭ জনকে জোগাড় করতে পেরেছি। মা, বান্ধবী, বান্ধবীর বাবা, এমন কয়েকজন। এই ভাবে সে তিনবছরের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। ওর সঙ্গে পরিচিত হবার আগে আমি একবার সিডেনের ছোট শহর উপসালা –তেও ১ মাসের জন্য যাই। গেছিলাম হিচহাইক করে। কিছুদিন কাজ করে কিছু অর্থ যদি আয় করা যায়। কিন্তু খুব একটা সুযোগ হল না। একজন একবার ছুটি নিয়ে ৬ দিনের জন্য তার নিজের কাজ আমাকে দিয়েছিল। রেস্টুরেন্টে রাত্রি ১০ টার পর মেঝে, বাথরুম ধুয়ে পরিষ্কার করা। আর ২ দিন অন্য এক রেস্টুরেন্টে বাসন ধোবার কাজ করেছিলাম। চেষ্টা করেছিলাম রাস্তার কাজের জন্য। ওটাতে পয়সা বেশি পাওয়া যেত। মোট ১০ দিন কাজ করেছিলাম। তারপর বাড়ি বাড়ি গিয়ে কিছু ছবি দেখিয়ে বিক্রির চেষ্টা করেছিলাম, কিছু ছবি বিক্রিও হয়েছিল।
একটি ইনসিওরেন্স কোম্পানির ডিরেকটর বাংলাদেশের সাইক্লোনের ওপোর আঁকা একটা ছবি কিনেছিলেন। বলেছিলেন, আমার কাছে ডালির একটা ছবি আছে। যদিও আমার খুব একটা পছন্দ নয়। এবার তোমার ছবি মাঝে মধ্যে দেখব, আর তোমার কথা মনে পড়বে।
গ্রীষ্মকালের উপসালাতে শান্ত আর বিশাল নীল আকাশ আমাকে আকর্ষণ করেছিল। মনে মনে ভাবলাম এটাই আমার জায়গা। আমার মনের কথা ওরিয়ানকে জানালাম। কয়েক মাস পরে ও আমাকে ব্যবস্থা করে দিল। দুটো ঘর, বিরাট রান্নাঘর, আসবাব হীন। আর জানালো ভবিষ্যতে এটা কেনা হবে আর তোমাকে কোন অড জব সপ্তাহে দুদিন করতে হবে। সেটা জোগাড় করতে হবে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমি সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও থাকতে পারিনি। এটা আগেই তো বলেছি।
এবার আর একটা ঘটনায় আসি। অ্যান্টওয়ার্প, বেলজিয়ামের প্রদর্শনীর ব্যাপারে। ১৪ টা ছবি নিয়ে রওনা হলাম। যখন পৌঁছলাম, আমার বড় দুটো ছবির বান্ডিল কাঁধের দুপাশে, প্রত্যেকটা বান্ডিলে ৭ টা করে ছবি। আর সামনে একটা বড় ব্যাগ। হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল আমি বেলগ্রেডের জিপসি। আমার গায়ের রঙ জিপসিদের মতনই। ওখানে ওরা নানা ঝোলা নিয়ে ঘোরে। রাস্তায় দেখা যায়। আর্থিক অবস্থা ভাল না। প্লাটফর্মে যখন হাঁটছি, তখন আমার মনে হচ্ছিল আমাকে সকলে দেখছে। একটা দর্শনীয় বস্তু যেন। এইভাবে গ্যালারিতে পৌঁছলাম। পরের দিন প্রদর্শনী শুরু হল। ১৫ দিন চলবে। কিন্তু অতদিন হোটেল খরচা কে দেবে? চল কাছে ডর্টমুন্ড। গেলাম আমার বন্ধুর কাছে। ওর অসুবিধা ছিল। ওর এক বন্ধুর কাছে ব্যবস্থা করে দিল।১২ দিন পর ফিরে এলাম। বইতে পড়েছি, স্বামী বিবেকানন্দের শিকাগো বিশ্ব ধর্ম সভায় যাবার সময়ে এমনই অবস্থা হয়েছিল। দেখলেন এক মাস বাকি, শিকাগোতে থাকা সম্ভব নয়, এত ব্যয়সাপেক্ষ, রওনা দিলেন বস্টনের দিকে, ট্রেনে এক ভদ্রমহিলার সঙ্গে দকেহা হবার পর উনি বস্টনে অতিথি হিসেবে ওনার কাছে ছিলেন, এবং অনেক সাহায্য পেয়েছিলেন।
আমি আবার অ্যান্টওয়ার্প ফিরে এসে জানলাম আমার একটি ছবিও বিক্রি হয়নি। এ গ্যালারি মালিক ছিলেন অল্পবয়সী দম্পতি, বেয়া ও এডওয়ার্ড। সুন্দর ছিমছাম গ্যালারি। বিদায়ের পালা, আসার দিন বেয়া-কে দেখেছিলাম যেন সেই পুরনো দিনের ভারমের-এর একটা ছবির মত, জানালার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আলাদা এক সৌন্দর্য ফুটে উঠেছিল। এখনো আমার ভারমের-এর ছবি দেখলেই বেয়ার কথা মনে পড়ে। বিদায়ের সময়ে বেয়া বলল, এর পর এখানে এলে আমাদের অতিতিহি হবেন।
এরপরের যাত্রা ট্রেনে। ফাঁকা গাড়ি, আমি ও এক আমেরিকান যুবক আছি। কথা বলছি, এমন সময় জারমানির সীমানায় পৌঁছলাম। পাসপোর্ট দেখল ও বাংকের দিকে তাকিয়ে বলল, এই বিরাট দুটো প্যাকেট কার? বললাম আমার। কী আছে? ছবি । কী কর? প্রদর্শনী করি। বিক্রি কর? কত দাম? সব বললাম। শোনার পর জারমান ভাষায় নিজেদের মধ্যে বলল, এ তো অনেক। আমি বুঝে গেলাম। বলল আপনি আমাদের সঙ্গে নেমে আসুন। আমি জানালাম , কোন ব্রেক জার্নি করব না। সরাসরি বেলগ্রেড যাব, আমার টিকিটও বেলগ্রেড পর্যন্ত, আর এই ট্রেনও সেখানেই যাবে। অনেকবার অনুরোধ করলাম, কিছু হল না। আমাকে নিয়ে গেল একটা অফিসে, টাই্প করল, প্যাকেট সিল করে দিল, এবং শেষ সম্বল ৪০০ মার্ক নিয়ে নিল। বলল, বর্ডারে সিল করা অবস্থায় দেখালে, জারমানির সীমানায় ৪০০ মার্ক ফেরত পাব।ট্রলি করে পৌঁছে দিল। এই ভদ্রতাটা দেখ্যেছলেন । বললেন এই প্লাটফর্মে গাড়ি আসবে, জারমানির সীমানায় পৌঁছে যাবেন। বিশাল স্টেশন, কিন্তু শুনশান। ঠান্ডা লাগছে পায়ে। চিড়িয়াখানার বাঘেরা যেমন করে খাঁচার ভেতর একবার এদিক একবার ওদিক করে, সেইভাবে আমিও করতে লাগলাম। যাতে শরীরটা গরম হয়। এল ট্রেন, তল্পি তল্পা নিয়ে ওঠো। ফাঁকা ট্রেন। জানলাম সীমানা পর্যন্ত যাবে না। নামো আবার, ছবি নিয়ে , আবার অন্য ট্রেনে ওঠো। শেষ মেশ স্যালসবার্গ এ পৌঁছলাম, সিল করা অবস্থা দেখানোর পর ৪০০ মার্ক ফেরত পেলাম। আবার ছবি নিয়ে অন্য গাড়িতে উঠে শেষ মেশ পরের দিন বেলগ্রেড পৌঁছই। আগে দিন এক বন্ধু গাড়ি করে নিয়ে যাবে বলেছিল কিন্তু এই বিড়ম্বনার জন্য, এক দিন পরে পৌঁছলাম। অগত্যা ট্যাক্সি তে এ পর্ব শেষ হল।
প্রঃ এ তো রীতিমত বোহেমিয়ান অ্যাডভেঞ্চার! আরো বল।
উঃ এ বার আর একটা প্রদর্শনী ভিয়েনাতে ইউনাইটেড নেশনস-এর ইউনিডোর। আমার এক ইংরেজ বন্ধু ঠিক করে দিয়েছিল। ভিয়েনাতে প্রদর্শনী শুরু হল। দু দিন একটা ছোট ঘরের এক হোটেলে ছিলাম। ১৪ দিন ধরে প্রদর্শনী হবে। অতদিন থাকা সম্ভব নয়। ওখানে এক অল্পবয়সী, যুগোস্লাভ দম্পতি, মিরোস্লাভা ও দ্রাগানের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। দ্রাগান দাবা খেলে আর মিরা মেডিকেল কলেজের ছাত্রী। আমাকে একদিন ওর ক্লাসে নিয়ে গেছিল যেখানে মৃত মানুষ কাটাছেঁড়া করে। বড় আকারের সাদা ধবধবে শবদেহগুলি কাটা ছেঁড়া করছে দু তিন জন ছাত্র ছাত্রী। শীত কাল। ঘটনা চক্রে আমার বন্ধু আলান ছিল ওখানে। গাড়ি করে ওখানে থেকে বেলগ্রেড আসছিলাম, ওর সঙ্গে। চারিদিক বরফে ঢাকা। আমাকে জিজ্ঞাসা করছে, ছবির তো বিক্রি নিয়ে, এবার কী করবে, ভেঁপু বাজাবে? আমি চুপ করে থাকি। ও আমাকে অনেক উপদেশ দেয়, সাহায্য করে, কিন্তু ওর কথা ঠিক সমর্থন করতে পারিনা। পৌঁছলাম বেলগ্রেড, ১২ দিন পর বাসে করে আবার সারা রাতের পর ভোর বেলায় এসে পৌঁছলাম ভিয়েনায়। শীতকাল, বরফ পড়ছে, একা দাঁড়িয়ে, ঠান্ডা লাগছে। সামনে স্টেশন তালা দেওয়া। কী করি, টেলিফোন বুথে ঢুকলাম। ঠান্ডা কমে না। ইউনিডো অফিস খুলতে অনেক দেরি। একবার ভাবলাম মিরাকে ফোন করি, তারপর ভাবলাম এত সকালে ফোন করলে ওর বাবা যদি ধরেন কী ভাববেন। শেষ মেশ করেই ফেললাম। ধরল মিরা। জানালাম সব। বলল, এখুনি চলে এস। ওদের বাড়ি প্রাচীন ধরণের সাজান। মোটা গদির চেয়ারে বসার কিছুক্ষণ পরে এল গরম চা। যেন স্বর্গ পেলাম। মিরা ভীষণ শান্ত, নম্র এবং আলাদা এক সৌন্দর্য আছে। এখনো মাঝে মহদ্যে ওর কথা মনে পড়ে। ছবি নিয়ে রাত্রে আবার বাসে। বেলগ্রেড ফেরত যাব। একটাও ছবি বিক্রি হয়নি। ইউনিডো অফিসের একজন কমদামে কিনতে চেয়েছিলেন, আমি দিইনি, ভেবেছিলাম এর থেকে আর্থিক কমজোরি কোন যুগোস্লাভকে বিক্রি করা ভাল।


প্রঃ বেলগ্রেডের অন্যান্য কিছু স্মৃতি আছে, যা এখনো বলনি?
উঃ হ্যাঁ, আমার বন্ধু ব্রাংকা। ১৯৭০ থেকে চেনা, ও পরিবারের দাদা দিদি, মা , বাবার সঙ্গে আমার আত্মিক সম্পর্ক ছিল। দিদি দাদা এবং ও আমার ছবিও কিনেছে। আমার বিপদে ওরা যেভাবে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল কল্পনা করা যায়না। যেন ওদের বাড়ির একজন। কলকাতায় আমাদের বাড়িতে দুবার এসেছিল, আমার মায়ের ঘরেই থেকেছিল। আবারও আসার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল।
আমি নিউ বেলগ্রেড এ বছর দশেক ছিলাম। এটা কলকাতার বিধান নগরের মতই , বালি দিয়ে ভরাট করা জলাজমি। দুই জায়গাতেই আসলে বেলগ্রেডের একটিই সংস্থা কাজ করেছিল, ভরাট করার কাজটি। এখানে আমি কিছুদিন ১০ তলার ওপর একটি ছোট ঘরে ছিলাম। আমার প্রতিবেশী রোজ আমাকে দু বেলা কফি আর মাঝে মাঝে দুপুরের খাওয়া ও টিভি দেখানোর জন্য ডাকত। ওদের একটা নৌকো ছল। আমার বাড়ি থেকে ডানিউব নদী হাঁটা পথ। ওর সঙ্গে মাঝে মধ্যে নদীতে নৌকো করে মাছ ধরতে যেতাম। আমার মেয়ে নির্ভানা থাকত। একবার পূর্ণিমা রাতে আমরা ডানিউবে অনেকক্ষণ নৌকাবিহার করেছি। একটা অদ্ভুত থমথমে ভাব ছিল। সেই সঙ্গে চাঁদের আলো। অপূর্ব অভিজ্ঞতা। শেষ মেশ গভীর রাতে আমি ও আরেকজন, তোশক পেতে বালির চরে নিদ্রা দিলাম। ভোর বেলায় ঠান্ডায় কাঁপুনি ছুটে কেবিনের মধ্যে প্রবেশ। সকাল বেলায় গাছে বেঁধে দোলনায়, কফি সহ স্যান্ড উইচ। সুন্দর একটা সন্ধ্যা ও সকাল কাটল। ডানিউবের পাড় দিয়ে প্রায়ই সন্ধে বেলায় হাঁটতে যেতাম। ওর একটা গাম্ভীর্যের ভাব আছে, দেখলে সমীহ করতে ইচ্ছে হয়।
প্রঃ তুমি বেলগ্রেডে আত্মীয় পেয়েছিলে। তাদের কথা বল।
উঃ এটা দিয়েই বিদেশের কথা শেষ করব। আমার অন্তরের বন্ধু, প্রাক্তন শাশুড়ি মায়ের কথা বলব। ওনার দুই মেয়ে। বড় জন আমার প্রাক্তন স্ত্রী। উনি সর্বদা আমার দিকে নজর রাখতেন। আমার সুবিধা অসুবিধার দিকে। দুই মেয়েকে যত না ভালবাসতেন, আমাকে যেন অনেক বেশি ভালবাসতেন। আমার প্রদর্শনীতে উনি কয়েকবার উপস্থিত হয়েছিলেন, ভীষণ আনন্দ পেতেন, আমাকে খুব উৎসাহও দিতেন। নতুন বছরে বাইরে পালন করছি, বলতেন, ঠিক বারোটায় তুমি আমাকে শুভেচ্ছা জানাবে। অন্য কেউ নয়। ওনার স্বামী ছিলেন না। সাধারণ একটা চাকরি করতেন। আর্থিক অবস্থা কোন রকম করে চলত। আমার অবস্থা তথৈবচ। এমন অনেক দিন গেছে আলুর ঝোল আর রুটি খেয়ে থাকতে হত। আমি যখন দোকানে যেতান, অনেকদিন অনেকটা এরকম হয়ে গেছিল, যে, দোকানের মহিলা বললেন, কী, আধকিলো রুটি আর আলু তো? আমি হাসতাম। শেষ কয়েক বছর উনি আর আমি ছিলাম। আমার নানান অসুবিধার জন্য ছবি আঁকতে পারছি না, বাড়িতে চুপচাপ একা বসে আছি। রুটি কিনেছি। গ্রীষ্মের সন্ধ্যা। উনি সন্ধে বেলায় এক লিটার দুধ আনতেন, তৃপ্তি সহকারে আমাদের সান্ধ্য ভোজ হত। তখনো আকাশে স্নিগ্ধ আলো আছে। বড় কাঁচের জানালাটা দিয়ে বাইরে আকিয়ে আছি, মনে অনুভব করছি যেন সুদূরের ডাক। আমরা পরস্পর কথা বলছি না। মনের ভেতর একটা প্রশান্তি বিচরণ করছে। মনে হত, এখনো মনে হয়, জীবনটা বড় সুন্দর, চারিদিকে সুন্দরের মেলা। ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যে জীবনটা কত সুন্দর করে গড়ে দেয়, কতকিছু জানা হয়ে যায়। এভাবেই তো জীবন কে সাফল্যের পথে নিয়ে যায়।
প্রঃ বিদেশে তুমি দীর্ঘকাল থেকেছ, কাদের কাছ থেকে বেশি পেয়েছ, বিদেশের, না ভারতের কাছে?
উত্তরঃ ইউরোপে যে দেশটায় ছিলাম, তারা ধনীও নয় গরিবও নয়, কিন্তু স্লাভরা খুবই আবেগপ্রবণ। আর আমি এত দিন থেকেছি, সেই শহরটাকে আমি ২৫ বছর বয়সে এত ভাল বেসেছি, সেখানকার রাস্তার অলিগলি তখন আমি জানি, আর সেটাই আমার প্রথম বিদেশ যাওয়া, বয়সও কম। সব মিলিয়ে আমি তাদের থেকে অনেক পেয়েছিলাম। কিন্তু যখন ফিরে এলাম এসে দেখলাম অর্থনৈতিক সংগ্রাম অনেকটা বেড়ে গেল। কিন্তু তবু আমার মনে হল, ফিরে এসে ঠিক করেছি, না এলে আমার ক্ষতি হত, আমার ফেরা প্রয়োজন ছিল। কেননা এটাই আমার মাটি, আমার শিকড়, আমার দেশ, আমার দেশের দর্শন। আমি সেই পথে হাঁটতে চাই। ইওরোপ থেকে অবশ্যই অনেক কিছু পেয়েছি। তবে আমার ভারত আমার কাছে আত্মিক।
প্রঃ তুমি যেহেতু অর্থনৈতিক ব্যাপারটার কথা তুললে তাই প্রশ্ন করি, তুমি ছবি আঁকা ছাড়া আর কী করো? তুমি কি আঁকা শেখাও? অধ্যাপনা করো?
উত্তরঃ প্রথমে একটি হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলে ছিলাম তারপর তিন চার বছর রবীন্দ্র ভারতীতে পার্ট টাইম অধ্যাপনা করেছি। এখন গত ২৫ বছর ধরে একটি মূকবধিরদের কেন্দ্র, সাইলেন্স-এ আঁকা শেখাই।
প্রঃ সেটা কি তুমি খুব এনজয় কর?
উত্তরঃ আমি কোণদিন ভাবিনি এদের কাছে আসব। আমি ঘটনাচক্রে এসে পড়েছি। এখন আমার এদের সঙ্গে ভাল লাগে, এদের কাছাকাছি এসে আমি উপকৃত। সাইলেন্স তৈরি করেছিলেন এক জিওলজিস্ট। চাকরি ছেড়ে দিয়ে উনি করেছিলেন, নাম সমীর রায়। সাইলেন্স সারা পৃথিবীতে হাতের কাজের জিনিস পাঠায়, এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ।
প্রঃ তুমি কি ভাবে ওদের সঙ্গে কমিউনিকেট কর?
উত্তরঃ একবছর এক একটা ক্লাস চলে, তাদের সঙ্গে আকারে ইঙ্গিতে , লিপরিডিং ইত্যাদির মাধ্যমে যোগাযোগ হয়। আমি সাইন ল্যাংগুয়েজ শিখিনি, কিন্তু মানুষের সঙ্গে মানুষ সহবাস করলেও তো অনেককিছু বুঝতে পারে, আমিও ওদের সঙ্গে থাকতে থাকতে সব বুঝতে পারি, বোঝাতে পারি।
প্রঃ তোমার শৈলীর পরিবর্তন হয়েছে কি?
উত্তরঃ আমি এখন যে ছবি আঁকি, তাতে ভারতীয় গন্ধ পাওয়া যায়। আর বেঙ্গল স্কুল-এর কাজ আমার ভাল লাগে।
প্রঃ তোমার গাছের ডিটেলিং, বা নিবিড় আঁকাগুলো দেখলে ইন্ডিয়ান পেন্টিং এর কথা মনে পড়ে।
উত্তরঃ না, কিন্তু আমার ডিটেলিং এ দক্ষতার অভাব আছে। কিন্তু তবু বলব আমি যেহেতু ওয়েস্টার্ন স্টাইলে আঁকি, আমার আঁকায় ওয়েস্টার্ন স্টাইল থেকে সরে এসে কিছুটা অন্য রকম ব্যাপার আছে। আমার আঁকা অনেক বেশি মোলায়েম , পেলব। সেটা ওয়েস্টার্ন স্টাইলে নেই বললেই চলে।
প্রঃ মানে স্ট্রোকটার ভেতরে মোলায়েম ব্যাপার আছে। টেকনিকালি একটু বোঝাবে ব্যাপারটা? তোমার আঁকায় যে কসমিক লাইট আনো, সেটা শৈলীগতভাবে কীভাবে আন। সীপ করে আলো আসছে ওপর থেকে, এটা তুমি অ্যাচিভ কর? এটা কি অন্য কারুর ছবি থেকে পেয়েছ, না তুমি নিজে আবিষ্কার করেছ?
উত্তরঃ আমি আলোর ব্যাপারটা পেয়েছি দর্শনের জায়গা থেকেই। মনোজগতে আলোটা কাজ করে, সেটা আমার বিভিন্ন জায়গার পড়াশুনো থেকেই পেয়েছি ।
প্রঃসেটাতুমি দার্শনিক জায়গা থেকে বললে, কিন্তু আমি প্র্যাকটিকালি জানতে চাইছি। আলোর এফেক্ট তুমি কীভাবে আনছ? ফোটোগ্রাফিক এফেক্ট আনা হয়েছে বলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, মনে হয় যেন আলোটা সত্যি গিয়ে পড়েছে ওই জায়গাটায়। এটা কীভাবে অ্যাচিভ কর।
উত্তরঃ ফোটোগ্রাফিকে আমি পছন্দ করি। এবং অনেক সাহায্য পাই। কিন্তু আলোটা আঁকার সময় আমি কিন্তু ফোটোগ্রাফির মত আঁকি বললে ভুল বলা হবে। আমার মধ্যে যে কাজ করছে, সেই কসমিক আলোটা আঁকার আমি চেষ্টা করি।
প্রঃ হ্যাঁ ঠিক, এই আলোটা সে অর্থে বাস্তব কোন আলোর মতই নয়। একটা অ্যাবস্ট্রাকশন আছে, সত্যিকারের কোন আলোর মত নয়। একেবারেই অদ্ভুত একটা আলো। অবাস্তব আলো।
উঃ হ্যাঁ, ঠিক একটা অতীন্দ্রিয় আলো ওটা। তবে মনে মনে যেটা ভাবছি, তার কাছাকাছি কিছুতেই আমি পারিনা। আমার মনোজগতের ভেতর থেকে কসমিক অতীন্দ্রিয় আলোকে ছবিতে আনার চেষ্টা করি, কিন্তু আমার পছন্দ হয়না, অন্বেষণ চলতে থাকে, আমার চাওয়া থাকে আমার ধ্যানের ভেতর , সেই জায়গাটা থেকে বার বার আমি পরাজিত হই, পছন্দ হয়না। এখনো অব্দি আমি কখনো স্যাটিসফাইড হইনি। আমার অন্বেষণ এখনো চলছে।
প্রঃ সেই আলোটা সম্বন্ধে কোন লেখা থেকে কি আমরা কিছু পেতে পারি?
উত্তরঃ রবীন্দ্রনাথে আছে।
প্রঃ আমি মানব একাকী ভ্রমি বিস্ময়ে ভ্রমি বিস্ময়ে। ইউনিভার্সের সঙ্গে এক হয়ে যেতে চাইছে সেই আলো।
উত্তরঃ আমি এমন একটা ছবি আঁকতে চাই যার একটা থ্রি ডি এফেক্ট থাকবে। আত্মাটা ভারতীয়। এবং সেই বিশাল প্রান্তর বা সমুদ্র বা মহাকাশের মধ্যে দর্শক ঢুকে পড়বে, সীমাহীন একটা অঞ্চলে সে বিচরণ করতে পারবে। থাকবে আত্মার মিলন ও মুক্তির স্বাদ। এটা কোন আনকনশাসের জগত নয়, কনশাসনেসের জগত। এখানেই আমি সুররিয়ালিস্ট দের থেকে আলাদা।
প্রঃ এটা আমার শেষ প্রশ্ন। তোমার পঞ্চাশ বছরের শিল্পসাধনার যাত্রাকে তুমি কীভাবে বর্ণনা করবে?
উঃ আমি তিনটে পর্বে ভাগ করতে চাই আমার এই যাত্রাকে। প্রথম পর্ব ১৯৫৭-৬৪ । এই সময়ে, সাধারণত যা আমি দেখেছি, যা কিছু আমায় ভাবিয়েছে এই সব বিষয় নিয়ে ছবি এঁকেছি। দ্বিতীয় পর্ব, ১৯৬৫-৮০ । এই সময় আমার মনোজগতের কিছু প্রতিক্রিয়া, যার মূলে ছিল বিশ্বের ঘটনাবলী, যথা সমাজের মধ্যে ও নানা দেশে অন্যায়, মানুষের মধ্যে অশুভ আচরণ ইত্যাদি, এইগুলিকে রূপ দিয়ে প্রতিবাদ করা, প্রকাশ করা। আর তৃতীয় ও শেষ পর্ব, ১৯৮০ থেকে বর্তমান সময় অব্দি। মানুষের অন্তরে যে শুভ অনুভূতি, তার হৃদয়ে যে সম্পদ আছে তার অণ্বেষণ করে , তার মাধ্যমেই, মহাবিশ্বের সৃষ্টি কর্তাকে আবিষ্কার করা বা সমর্পণ করা। অর্থাৎ অন্তরলোককে জাগরিত করে পরম আত্মার কাছে সমর্পিত হওয়া । এই চিন্তাগুলিকেই ছবিতে আঁকার চেষ্টা করছি।
সবশেষে, আমি যাদের সান্নিধ্যে এসেছি, তাঁদের শ্রদ্ধা ও প্রণাম জানাই। এতক্ষণ পাঠক ধৈর্য ধরে পড়েছেন সে জন্য ধন্যবাদ । আর রইল আন্তরিক শুভেচ্ছা, ভালবাসা ও শ্রদ্ধা।


(ছবি- অনিমেষ নন্দী)

আপনার মতামত জানান