ঝিনুক, তোমারই জন্য বা হয়তো তোমারই জন্য

অভিমন্যু মাহাত


সূর্যমুখী ফুলের পাশে তোমার সেলফি। আর সেটাই প্রোফাইল পিকচার। আমি সূর্যমুখী ফুল হতে পারলাম না। হতে পারে সুযোগও দেওয়া হয়নি। কিন্তু তুমি ছুটে গিয়েছো সূর্যমুখী ফুলের কাছে। এটা রাবণের চিতার মতো বাস্তব। আমার হিংসে হয়? হ্যাঁ, একটু হয় বইকি। তুমি ফুল ভালবাসতেই পার, আপত্তি নেই। কিন্তু... আমি যে আছি...আমার অস্তিত্বটুকু কোথায় ঝিনুক? ইংরেজির ‘ফুল’ও তো চরিত্র আর আমি হতে পারি না।
সেই তো একদিন, মনে পড়ে? তুমি আমি আম গাছের নিচে ছিলাম। আমার তোমার মধ্যে ব্যবধান বাড়াচ্ছিল... একটি ঝরাপাতা। আমি ঝরাপাতা কুড়িয়ে তোমার অজান্তে কানের পাতার সাথে মিলিয়ে সুর তোলার চেষ্টা করেছিলাম। তুমি সেই ঝরাপাতা আমার হাত থেকে কেড়ে নিয়েছিলে দ্রুত। তুমি ঝরাপাতা নিয়ে কেঁদেছিলে। আমার মনের সঙ্গে তোমার মনের অমিলে নয়। সেই অঝোর কান্না ছিল, ঝরাপাতা লাগি।
একটু পরেই বিকেল হানা দিয়েছিল। তার একটু পরেই মেঘদূত। মেঘমুখ অনতিবিলম্বে ভার। 4G স্পিডের মতো বৃষ্টি। তুমি আমি এবারে চায়ের দোকানে। দোকানের ত্রিপলের ছাতে বৃষ্টিদের হুটোপুটি। দাদা, দু’টো চা। তুমি বললে, খাব না। বল্লে, চলো ভিজি। আমি বললাম, না। ঠান্ডা লাগবে, জ্বর হবে। তুমি নিষেধ মানলে না। ছাউনির নিরাপত্তা ছেড়ে আশ্লেষে জড়ালে ধারাপতন। আমি হিংসুটে। আমি চা না খেয়ে, দাম মিটিয়ে পালিয়ে এসেছিলাম। সেবার বসন্ত উৎসবটা একসঙ্গে কাটানোর কথা হয়েছিল। পথে যেতে যেতে দেখা হল... আবির কিনলাম। তারপর তুমি বান্ধবীদের দলে ভিড়ে গেলে। ‘রাঙিয়ে দিয়ে যাও গো আমায়’ গান গেয়ে উঠল সবাই। সহস্র আবির উড়ল আশ্রম মাঠে, আকাশে। খোলে, করতালেও লাগল আবির।
আমার আবির প্যাকেটেই থমকে রইল, উড়ন ছু হল না। বসন্ত ‘কাই পো চে’। তোমাকে উধাও নেটওয়ার্কে। ফোন শুধু যান্ত্রিক স্বরে ব্যস্ততার জানান দিয়েছে। তারপর তোমার সঙ্গে থাকার মদ হারিয়ে মহুয়া মদেই ভরসা রেখে যখন অশক্ত তখনই তোমার সঙ্গে দেখা...আমি আবির দিতে গেলাম... তুমি রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে উঠলে... ঘন্টাতলায় নাচলে কিছুক্ষণ। আমি তোমাকে ছুঁতেও পারলাম না। আমার রঙ বুকের ভেতর বন্দি আর কাপড় রাঙানোর রঙ কাগজের খোলে। আমি তোমায় মাখাতে চাওয়া আবির এখন পাথরের খন্ড, আমার বুকও। তুমি সেদিন রবীন্দ্রনাথের হয়ে গেলে, আমি বাক্যহারা... শুধু দেখলাম।

পলাশের জঙ্গলের পাশেই পাহাড়। তোমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম মার্চে। তুমি ‘আগুন লেগেছে বনে বনে’ দেখে আত্মহারা হয়েছিলে। আমার জঙ্গলে থাকাটা কাজে দিয়েছিল। তোমায় খুশি করতে পলাশ ফুল ছিঁড়ে বাঁশি বাজিয়েছিলাম। তুমি শুনেছিলে। পরক্ষণেই পাহাড়ের চূড়ার দিকে দৌড়ে গিয়েছিলে। তারপর কি যেন গোপন কথা নাগাড়ে উগরে দিচ্ছিল শীতল বুকের কঠোর পাথরে। ঝিনুক, তুমি দেখনি, দেখতে চাওনি আরও একটা পাথরের মত কালো জমাট বুক একরাশ উষ্ণতা নিয়ে অপেক্ষায় ছিল। আমার অভিমান হয়েছিল টাওয়ারবিহীন মোবাইলের মতো।

আমি পাশে এসে বসলেই তুমি মীরা বাঈয়ের কথা বলো। তার কৃষ্ণ প্রেমের কথা বলো। তার আত্মোৎসর্গ তোমায় টানে। আমি তোমার পাশে যেন থেকেও নেই। তোমার বিষণ্ণ চোখের দিকে আমার রেটিনা তাক করে রেখেছি... তা আমার খেয়ালেই থাকে না। এতো কেন উপেক্ষা? মীরার চোখের জলের গভীরতা, কখনও তোমার চোখে দেখি। সেই গভীরতা আমি মাপতে পারি না। ঝিনুক আমি মুক্তো হতে চেয়েছি, মহামানব নয়। তুমি বোঝনি, হয়ত বুঝতেও চাওনি। হয়ত এসব বোঝা তোমাদের সাজে না।

ঝিনুক, আমি তোমার আপন হতে পারলাম কই? আজ, প্রেমের দিন। আমার কাছে অপ্রেমের। কারণ যেদিন, বসন্ত এসে গ্যাছে এসো হাঁটি একসাথে আয় তবে সহচরী হাতে হাত...। এসো তোমায় হলুদ মাখাই। সেদিনই তুমি তেপান্তরের ঠিকানা খুঁজতে ডুব দিলে ভাবনা সাগরে। তুমি ছুটলে ঝরাপাতার কাছে, মেঘমল্লারের সনে, রবীন্দ্রনাথের নিকট, পাহাড় ডুংরির পানে...। সখি (যদিও অনুমতি নেওয়া হয়নি), আজ ফেসবুকে তোমার প্রোফাইল ভিউয়ার চেক করো। দেখবে সহস্রবার তোমার প্রোফাইল ভিউয়ার একমাত্র, এই পুরুষ। আজ, কি তোমার ম্যাসেজ বক্সে প্রশ্নচিহ্ন পাঠাবো? নাকি উত্তরের অপেক্ষা, দীর্ঘ...দীর্ঘতর হবে। অপেক্ষা জীবাশ্মে পরিণত হবে?...এই তো দেখছি, তুমি আমায় অনন্ত অপেক্ষার জন্য রেখে দিয়ে ছুঁয়ে ফেলেছো হলুদ মাখা সূর্যকে...। আমি প্রেমের দিনে নিষেধ করবো না। তোমার গায়ের রঙ ক্রমেই হলুদ হচ্ছে। আমার শুভেচ্ছা নিও।

আপনার মতামত জানান