নববর্ষ- প্রবাসের খেরোর খাতায়

কেয়া মুখোপাধ্যায়


ঘুম ভাঙতেই জানলা দিয়ে চোখ চলে গেল বাইরে। শূন্য ডালগুলোর কোন কোনটা ভরে উঠছে কচি লালচে সবুজ পাতায়। বসন্ত এসে গেছে। তারমধ্যেই রাতভোর ফ্রিজিং রেইন। এখন বৃষ্টি থেমেছে। ডালগুলোর ফাঁকে আটকে আছে হীরে কুচি বরফ। একটু বেলা বাড়লে হয়তো রোদ মুখ দেখাবে। তখন হীরে কুচি গলে ডালজুড়ে তৈরি হবে মুক্তোদানার ঝালর। তারপর টুপ টুপ করে ঝরে যাবে মুক্তোদানাগুলো। এরই মাঝে চোখ পড়ল ঘরের দেওয়ালে। ক্যালেন্ডারের পাতা মনে করিয়ে দিল, আর ক’দিন পরেই দেশে বাংলা নতুন বছর, ১৪২২।

মুহূর্তে নস্ট্যালজিয়ার জেটে সওয়ারী হয়ে সোজা কলকাতায়। যে কলকাতা আমার চেতনায়, আমার অনুভবে। যে কলকাতার নামেই মন ভাল হয়ে যায়। এই পরবাসেও যে কলকাতা বাস করে আমার বুকের ভেতর, অনেকখানি ভালোলাগা আর সঙ্গে একটুকরো বিরহের ক্ষত নিয়ে। যে কলকাতায় মনে মনে রোজ ফিরে ফিরে আসি।

‘নব আনন্দে জাগো আজি নবরবিকিরণে...’ রেডিও থেকে ভেসে আসা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গলায় ঘুম ভাঙত ছোটবেলায়, নতুন বছরের প্রথম দিনে। সেই গানের রেশ নিয়ে জীর্ণ পুরাতন সব ভাসিয়ে এসে পড়ত শুভ্র সুন্দর, প্রীতি-উজ্জ্বল একটা গোটা ছুটির দিন। কারোর কোন তাড়া নেই। সেকন্ড রাউন্ড চায়ের সঙ্গে টিভিতে নববর্ষের বৈঠক। দু’গালে পান ঠুসে বৈঠকি গান নিয়ে রামকুমার চট্টোপাধ্যায়। গান শুনতে শুনতে দুপুরের মেনু ঠিক করতে ব্যস্ত বড়রা। একটু পরে রান্নাঘর থেকে ফুলকো লুচি আর ছোলার ডালের গন্ধ। আর আমার গায়ে নতুন জামার গন্ধ। ক’দিন আগে গেছে চৈত্র সেল। প্যাকেটে ভরা হাতিবাগান আর গড়িয়াহাট। রাস্তা থেকে ভেসে আসছে প্রভাতফেরীর গান ‘বাংলার মাটি বাংলার জল...’। বাংলা নতুন বছর মানে লাল মলাটের হালখাতা। কালীঘাট আর দক্ষিণেশ্বরে রাত থাকতেই থই থই ভিড়। বিকেল থেকে সন্ধ্যে বড়দের হাত ধরে দোকান থেকে দোকানে ঘুরে মিষ্টির বাক্স আর নতুন ক্যালেন্ডার সংগ্রহ করার অমলিন আনন্দ। আমার নববর্ষ এইসব স্মৃতির টুকরো জুড়ে জুড়ে তৈরি রঙিন কোলাজ। সময়ের হোয়াইটওয়াশেও এই কোলাজের রঙ হারায় না। বরং গভীর থেকে চারিয়ে যায় মনের আরও গভীরে। আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, কারণ তাতে মিশে আছে এক কুচি কলকাতা- শৈশব থেকে কিশোরীবেলা কি তারপর থেকে এই মুহূর্ত পর্যন্ত আমার অনুভবে-চেতনায় জুড়ে থাকা আমার প্রথম সব কিছুর সাক্ষী সেই তিলোত্তমা শহর।

সময় পাল্টায়। ছবি পাল্টায়। মনের মধ্যে নানা রঙের আঁচড়ে আঁকা ফ্রেমে বাঁধানো ছোটবেলার নববর্ষের সেই ছবি পাল্টে গেছে এই দূর প্রবাসে। চলতি হাওয়ার পন্থী আমেরিকার শহরগুলোর আধুনিক নাগরিক জীবনযাপন, সংস্কৃতি, কি রাজনীতির হালচাল সব আলাদা। কিন্তু জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মায়াময় নববর্ষের ছবিগুলো ভুলতে না পেরেই গ্লোবাল বাঙালির আমেরিকায় নববর্ষ উদযাপন। পয়লা বৈশাখ পড়েছে সপ্তাহের মাঝে। তাই অপেক্ষা উইকএন্ডের। শনিবারের। তার আগে দেশের পয়লা বৈশাখের দিনক্ষণ মেনে বাড়ির কোন এক ঘরে বা স্টাডির এক কোণে লক্ষ্মী-গণেশের মূর্তিতে ফুল মিষ্টি দেওয়া। যতই ভুবনীকরণ হোক, এইখানে বাঙালির আবেগ আর সরল বিশ্বাসের জায়গাটা বোধহয় আজও এক।

নতুন বছর শুরুর শুভ দিনে বাংলায় গুরুজন, প্রিয়জনকে যথাযোগ্য সম্ভাষণে লেখা চিঠির প্রজন্ম কবেই হারিয়ে গেছে। দারুণ স্মার্ট মুঠোফোনে নববর্ষের ঐতিহ্য মেনে শুভেচ্ছা বিনিময়টুকুর রেওয়াজ অক্ষুণ্ণ আজও। কয়েক সপ্তাহ আগেই মিটিং করে ঠিক হয়ে গেছে কার ভাগে কী রান্না। কোনও চার্চের হল ভাড়া করে কিংবা কারও বাড়িতে নববর্ষের আড্ডা। তার সঙ্গে ভোজনরসিক বাঙালির রসনার তৃপ্তি। দেশে ফোন করে কি স্কাইপে প্রণাম আর ভালোবাসা জানানোর এক ফাঁকে উইকএন্ডের নববর্ষ গেট টুগেদারে নিজের ভাগে পড়া রান্নার রেসিপিটা একবার ঝালিয়ে নেন গিন্নি। ফোনে কলকাতার বাড়ির মেনু আর মিষ্টির লিস্টি শুনে ভোজনরসিক কর্তা নস্ট্যালজিক আর বিরহকাতর হয়ে পড়ে ফুলকো লুচি খাওয়ার আব্দার করেন।

গ্লোবাল বাঙালি পোশাকের রক্ষণশীলতাকে অনেকদিনই টা টা করে দিয়েছে। কিন্তু নববর্ষের উইকএন্ড-এ সে খাঁটি বাঙালি, অন্তত পোশাকে। শেষবার দেশ থেকে যেগুলো আনা হল, তসর সিল্ক শাড়ি কি জমকালো কুর্তা, সেগুলো পরা চাই-ই চাই। আগে কোনও পার্টিতে পরা পোশাক নৈব নৈব চ। যারা তখন দেখেছে, সবার মনে আছে না? কী ভাববে তারা? হ্যাঁ, ‘এই লোকে কী ভাববে’ সিন্ড্রোম থেকে এখনো পুরোপুরি বেরোতে পারেনি আমেরিকার বাঙালিও। শনিবারের সকালে ঘুম ভাঙবে নরম মেজাজে। স্কুল-অফিস সব ছুটি। তাই একটু আরামের আড়া়মোড়া ভাঙার দিন। তবে ওই একটুই। তারপরই রান্না করে, বিকেল থেকে সেজেগুজে অনেক মাইল ড্রাইভ করে উইকএন্ডের নববর্ষের বৈঠকে হাজিরা। কচিকাঁচাদের আমেরিকান অ্যাকসেন্টের কবিতা, গানে অবধারিত উপস্থিতি সেই লম্বা দাড়িওয়ালা, জোব্বাপরা, বাঙালিকে আলোর পথে নিয়ে যাওয়া মানুষটার। ক’দিন পরে তাঁর জন্মদিনও যে এসে পড়বে নববর্ষের পিছু পিছু। বড়দের গান, কবিতার ফাঁকে নস্ট্যালজিয়ায় ডুব, পানীয়ে ঠোঁট ছুঁইয়ে। আস্তে আস্তে আড্ডার মোড় ঘুরবে সেলফোনের নতুন স্মার্টার মডেল, নতুন গাড়ি, টিভি, ফ্যাশন, নতুন বাংলা ছবি- এইরকম নানা দিকে। রাতের মেনুতে পাঁঠার মাংস আর ইলিশ- দুই-ই থাকতে হবে। মিষ্টি বেশিরভাগই বাড়িতে বানানো আর তাক লাগানো। সারা বছর পাওয়া যায় শুকনো কি ভিজে, সুইটেনড্ বা আনসুইটেনড্ কোরানো নারকোল। সিলড্ প্যাকেটে। কারোর মা কি শাশুড়ি দেশ থেকে এইসময় এসে থাকলে, তাঁকে হাতে হাতে সাহায্য করে সেই গিন্নি হাজির হতে পারেন নারকোল পুরভরা পাটিসাপ্টার ট্রে নিয়ে। পিৎজা-পাস্তায় মজে থাকা এই প্রজন্মও এক ছুটে হাজির হবে হাত চ্যাটচেটে করে তার স্বাদ নিতে। রাত বাড়বে। বারোটার কাঁটা পেরিয়েও আড্ডা গড়াবে আরও অনেকক্ষণ। তারপর একে একে বাঙালি নস্ট্যালজিয়ায় আচ্ছন্ন কর্তা গিন্নিরা পা বাড়াবেন গাড়ির দিকে।

আবার লম্বা ড্রাইভ। ফিরতি পথে কলকাতা কি বাংলা থেকে দূরে থাকার মন-খারাপ ঘিরে ধরবে কুয়াশার মত। সামনের বছর নববর্ষে দেশে যাবার প্ল্যান করতে করতে একটু পাতলা হতে থাকবে সেই কুয়াশার ঘনত্ব। তারপর রাত ফুরোলেই আবার সেই প্রবাস জীবনের খেরোর খাতার ভীষণ-চেনা দিনলিপি।

যত দূরেই থাকি, আমার শহর, আমার বাংলা জড়িয়ে আছে প্রাণে, অনুভূতিতে, ভালবাসায়। অগুন্তি নববর্ষের ভোরের নরম আলো ছুঁয়েছে তাকে। স্বপ্ন দেখি, প্রতিদিনের টুকরো গ্লানি কি নিত্যনৈমিত্তিকতাকে দূরে ঠেলে, যাবতীয় হীনমন্যতাকে অতিক্রম করে নিজের গৌরবমাখা উজ্জ্বল সভ্যতা-সংস্কৃতিতে আস্থা রেখে বিশ্বসভায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে সে। নতুন বছরে সেই স্বপ্ন ছুঁতে দিগন্তের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ুক আজকের নতুন বাঙালি।

আপনার মতামত জানান