তিনটি কবিতা

আদিদেব মুখোপাধ্যায়
আমি বলতে চাই



আমি জানি না চরাচর, কপোতের সমবেত ডানা
জানি না প্রবাহমানতা কাকে বলে
জানি না নক্ষত্রবোধ
অথবা কীভাবে উড়ে আসে উজ্জ্বল মথ
গরাদের ফাঁকে
আমি বলতে চাই নিসঙ্গ রাত্রির কথা
যখন আমি ছুঁয়েছি আত্মাকে, চালিয়েছি আঙুল
ক্ষতরক্তময় সে আর্তনাদ করে
আমি সে গান শুনেছি।



ঠান্ডা ও ভিন্নগ্রহের গান

এবার শুরু হয়েছে দহন
গলে যায় আমাদের ধাতু
এবার স্থির হয়েছে নর্তক
থেমে আছে ঘড়ি
স্পর্শের ওপার থেকে, শ্রুতিগ্রাহ্যতায়
ভেসে আসে বহুস্বর

আমরা গড়ে তুলেছিলাম সৌধ
যা আজ বিক্ষত, তোমার মুখশ্রী
বা প্রিয় স্বপ্নের মতো,
যা ধসে পড়বে এবং
ছড়িয়ে থাকবে ইতস্তত ফলকের প্রায়

আর ধ্বংস হয়ে যাব আমরা
আর ধ্বংস হয়ে যাবে আমাদের শোক
আর ধ্বংস হয়ে যাবে আমাদের অসামান্যতা
আর দীর্ঘশ্বাসের মতো জেগে থাকবে
          আমাদের জাতীয় সংগীত


কবিসম্মেলন
এসো স্থবিরতা, রাখো কুঁচকোনো হাত নশ্বর আঙুলে, এসো চিনে নিই অভিজ্ঞান, পরস্পর ত্বক। দ্যাখো আমাদের খুলে-রাখা সারিবদ্ধ চোখ, চেয়ে আছি দ্বিধাশূন্য, চিন্তারহিত। আমরা শিখিনি জলীয়তা, মৃত্যুবোধ, অস্ত্রকৌশল। আমরা জানি না কীভাবে ক্ষত বুজে যায় প্রদত্ত ঘাসে। জানি না কীভাবে রস শুষে নিয়ে পাতারা সবুজ। আমরা লিখেছি বাক্য, জেনেছি বিদ্যুৎ, পেয়েছি অর্গাজম। স্থবিরতা দ্যাখো আমাদের রুদ্ধ ঘর, আমাদের মানচিত্র নেই, আমরা ভূগোল জানি না। আমাদের মেধা কম, চোয়াল নিম্ন, অস্থি মানবিক। তবু, অনভিজ্ঞ নই। আমরা কি শুনিনি উন্মুখ ঘোড়ার চিৎকার, মেহনের তরে? পাইনি কি অমরতা একেকটি অশ্রুত শ্বাসে? আমরা কি করিনি নিয়ত ভুল, পাতিনি নিজস্ব ফাঁদ, জড়াইনি তাতে? রাখিনি কি বিশ্বাস, একবারও, স্বর্গ-নরকে? দেখিনি কি সিঁড়িতে লুকিয়ে থাকা শৈশবের নীলাভ দানব? এখন ললাটে আছে ধর্মচেতনা, মানি সত্য, তবু ক্রিয়াশীল। তবু চ্যুত হয় অনুপুঙ্খ, খচিত হরফ পায় অন্যতর মানে। তবু আভা থাকে আমর্ম, বুদ্বুদে লেগে। তবু এখনো মধ্যরাতে খেয়ে ফ্যালে সুখ, ছিটকে বেরোয় রঙ বুকের গহনে। কারণ জানি না। কী লাভ বা জেনে। শেষে থাকে অবসাদ। আর বর্ণহীনতা। আর নিষ্ঠুর ঘাতক। ...টেবিলে সাজানো হাত, নতমুখে সমবেত, অপেক্ষায় আছি। স্থবিরতা এসো, রাখো কুঁচকোনো হাত নশ্বর আঙুলে। এসো চিনে নিই অভিজ্ঞান, পরস্পর ত্বক। এবার অবশ করো।

আপনার মতামত জানান