নীল ঘূর্ণি

আবেশ কুমার দাস


২.

নীল ঘূর্ণি... নীল ঘূর্ণি...
সংশয় বা অস্বস্তির পর্যায়ে আর নেই ব্যাপারটা। এবারে সত্যি সত্যি আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ছে দর্পণ। হরিপদ কালাণ্ডির কথাগুলো আর কানে ঢুকছে না তার। মনকে ভেতরে ভেতরে ছেয়ে ফেলছে এক অবিমিশ্র অস্থিরতা।
এই দূর পাহাড়ের রাজ্যেও শেষে নীল ঘূর্ণির আতঙ্ক পিছু নিল তার? কেমন করে...
কলকাতার মতো দু’ হাত তফাতে কংক্রিটের জঙ্গল আর দু’ পা চলতে গিজগিজে ভিড়ের দৌরাত্ম্য এখানে নেই। বেগুনকোদর জায়গাটুকুকেই যা একটু জমজমাট আর গঞ্জ ধরনের বলা যায়। আর মুরগুমায় এসে তো মনে হয়েছিল একেবারে ঠিকঠাক জায়গারই হদিশ দিয়েছে সুমন্তদা। দিনকয়েকের জন্য ঠিক যেমনটা চাইছিল সে।
টু মাচ এক্সহস্টেড আমি, ক্লান্ত চোখমুখে বলেছিল দর্পণ, একদম নিরিবিলি একটা জায়গার খোঁজ দিতে পারবে সুমন্তদা? ক’টাদিনের জন্য এই ভিড়ভাট্টা আর মানুষের রাজ্য থেকে পালিয়ে যেতে না পারলে এবারে সত্যি সত্যি পাগল হয়ে যাব আমি...
ওয়েট ওয়েট, হাত তুলে অস্থির দর্পণকে থামিয়েছিল সুমন্তদা, আমি বুঝতে পারছি অফিসের প্রেসারটা বড্ড বেড়ে যাচ্ছে...
নেভার। আরও অনেক বেশি প্রেসার হ্যান্ডেল করেছি এর আগে। কিন্তু... কিন্তু তোমায় ঠিক বোঝাতে পারব না এবারের সমস্যাটা। কখনও তো হয়নি এমন...
কী হয়েছে সেটা তো বলবি আগে?
ছেড়ে দাও। শুনলে হয় তুমি হাসবে নইলে ভাববে সাইকো হয়ে যাচ্ছি
আমি কি ভাবব সেটা না ভেবে তোর কী প্রবলেম হচ্ছে সেটা আগে বল তো শুনি
তবুও বলতে চাইছিল না দর্পণ। কিন্তু সুমন্তদাও নাছোড়। আসলে বয়সের অনেকটাই ব্যবধান থাকলেও তাদের এজ গ্রুপটার সঙ্গে দারুণ মিশতে পারে সুমন্তদা। অনেক দেখেছে আর অনেক ঘাটের জল খেয়েছে লোকটা জীবনে। ঘুরেছে অনেক জায়গায়। মিশেছে অনেক ধরনের মানুষজনের সঙ্গে। তাই কারও কোনও সমস্যায় সুমন্তদার কাছে পরামর্শ চাইতে গেলে কিছু একটা রাস্তা ঠিক বেরোবেই। কিন্তু দর্পণের সমস্যাটাও যে উদ্ভট!
শেষে যা থাকে কপালে মনে করে কিছুটা পেটে রেখে বলেই ফেলতে হল দর্পণকে, জাস্ট একটু ভিড়... একটু গ্যাদারিং দেখলেই অস্বস্তি শুরু হয়ে যাচ্ছে ইদানিং। আর ফিল করতে পারছি... কেউ যেন... ধারেকাছে কেউ যেন কন্টিনিউয়াস ফলো করে যাচ্ছে আমায়। ড্যাম সিওর। ওই ভিড়ের মধ্যে... হয়ত ঠিক দু’ হাত আশেপাশেই কোথাও আছে লোকটা। আমি হয়ত চিনিও না তার মুখ। কিন্তু সে খুব ভাল করে চেনে আমায়। যেখানেই যাচ্ছি... দিন হোক বা রাত... লোকটা ঘুরে বেড়াচ্ছে আমার পেছন পেছন...
স্থির চোখে তাকিয়েছিল সুমন্তদা। সেই দৃষ্টির দিকে নজর পড়তেই আপনা আপনি থেমে গেল দর্পণের গলা। কেমন করে কাছেপিঠে বারে বারে লোকটাকে টের পাচ্ছে সে—বলা হল না সেই আসল কথাটুকুই।
ইউ আর রাইট, কয়েক মুহূর্তের অসহ্য নিস্তব্ধতা ভেঙে বলেছিল সুমন্তদা, ক’টা দিন বাইরে থেকে ঘুরে আসার দরকার আছে তোর। আই মিন বি কমপ্লিট ডিটাচড অফ আরবান ইন্ট্রিকেসিস। একটু নিরিবিলি একটু নিজের সঙ্গে একা হতে হবে তোকে। কাছেপিঠের ভেতর সস্তায় পুষ্টিকর এমন একটা জায়গার খোঁজ দিতে পারি আমি। ক’টা দিন ঘুরে আয়। আই থিঙ্ক ইওর প্রবলেম উইল ওভার...
ঠিক সেই সময়ই মেসেজ ঢোকার আওয়াজখানা টের পেয়েছিল পকেট থেকে। কিন্তু মোবাইলটাকে বের করতেও যেন অস্বস্তি হচ্ছিল দর্পণের।
সুমন্তদা তখন বলে যাচ্ছে, হাওড়া থেকে ট্রেনে জাস্ট একটা রাতের জার্নি। পরের দিন সকালেই পুরুলিয়া। স্টেশনের সামনেই পেয়ে যাবি বাস। সোজা বেগুনকোদর। তারপর...
একটা রাত ট্রেন জার্নি সুমন্তদার ভাষায় কাছেপিঠেই। কিন্তু সেইভাবে কখনও কলকাতার বাইরে পা না ফেলা দর্পণের কাছে পুরুলিয়া বেশ দূরের রাস্তাই। তাই হয়ত আরও ভাল লাগছিল এখানে এসে। বাঁশবন, পুকুরঘাট, রুখাশুখা চাষের জমির পাশ দিয়ে এবড়ো খেবড়ো রাস্তার ঝাঁকুনি খেতে খেতে বেগুনকোদর থেকে মুরগুমায় আসার পথে দিগন্তের গায়ে গায়ে চোখে পড়ছিল নীল পাহাড়ও। সব ঘরবাড়ি এখনও পাকা হয়নি এদিকে। ইতস্তত হাঁস মুরগি চড়ছিল গ্রাম্য বাড়িগুলোর মাটির দাওয়ায়।
হরিপদ কালাণ্ডির যোগাযোগটা দিয়েছিল সুমন্তদাই। এই মালভূমির দেশে ক’টা পাকাবাড়ির ভরসায় একটা হোম স্টে গোছের ব্যবস্থা চালায় শীর্ণকায় মানুষটা। ক’টাদিন থাকতে হবে যে বাড়িটায় সেটাও বেশ পছন্দই হয়ে গেল দর্পণের। পাকা মেঝে, ওভারহেডের ট্যাঙ্কের জল, কমোডের বন্দোবস্ত—সবই আছে একতলা বাড়িটায়। আবার জানলা খুললেই অনেকটা ফাঁকা জমি। ঝোপঝাড়ের আবডাল বেয়ে দিগন্তের গায়ে মিলিয়ে যাওয়া গ্রাম্য রাস্তা।
মুরগুমায় এসে পৌঁছনো অবধি মোবাইলখানাকে চালু রেখেছিল দর্পণ। হরিপদ কালাণ্ডির সঙ্গে দেখা হওয়ার পরপরই সেরে নিয়েছিল টুকিটাকি কয়েকখানা কল। তারপরেই অফ করে দিয়েছিল সেটটাকে।
মুরগুমা ড্যামের রাস্তা ধরে ভাড়া করা অটোয় বারহাডির দিকে যেতে যেতে দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল দর্পণ, ওইটাই কি অযোধ্যা পাহাড়?
অনেকগুলো পাহাড় আছে এখানে, আঙুল দিয়ে একে একে দিক নির্দেশ করতে করতে বলছিল হরিপদ কালাণ্ডি, কাছাকাছির মধ্যে ওই যে দেখুন—ওর নাম ভুরখাটুঙরি। তার ওপাশে কেনখেচি। অযোধ্যা ওই সাইডে।
তাহলে এখানে তিন চারদিন থাকতে বোর লাগবে না বলুন।
একেবারেই নয়। এখন বরং ফেরা যাক চলুন। সারারাত ট্রেন জার্নি করে এসেছেন। খেয়েদেয়ে একটু রেস্ট নিয়ে নিন। বিকেলের দিকে আপনাকে নিয়ে যাব দেউলঘাটায়।
দেউলঘাটা?
হ্যাঁ, একটা পুরনো মন্দির আছে। কবেকার তৈরি কেউ বলতে পারে না। এখানকার পুরনো লোকেরা বলে নাকি একরাতের ভেতর তৈরি। বিকেল থাকতে থাকতে বেরিয়ে পড়ব...
ডিসেম্বরের বিকেল মানে খুব তাড়াতাড়ি ঝিমিয়ে যাওয়া বেলা। বুনো ঝোপঝাড় আর আগাছার জঙ্গলে ঘোর নেমে আসে আরওই দ্রুত। লোকালয়ের চিহ্ন অবধি চোখে পড়ে না দেউলঘাটার মন্দিরের সামনে দাঁড়ালে। দৃষ্টিপথ জুড়ে শুধুই বড় বড় গাছ আর প্যাগোডা ধাঁচের ভাঙাচোরা সেই কবেকার স্থাপত্যটুকু। রন্ধ্রে রন্ধ্রে যেন শেষ বিকেলের ঘনিয়ে ওঠা হিমেল আবছায়া মেখে দাঁড়িয়ে আছে। আচমকা দেখলে মনে হয় সম্পূর্ণ পৃথক এক আদিম শতাব্দীতে চলে এসেছে সময়। প্রতিদিনের পরিচিত পৃথিবীটুকু ছেড়ে কতদূরে যেন চলে এসেছে দর্পণ! যে নিরিবিলি যে নির্লিপ্তি যে নিঃসঙ্গতার সন্ধানে এতদূরে ছুটে আসা—সত্যি করে এতক্ষণে তার দেখা পেয়ে যেন তন্ময় হয়ে পড়েছিল সে।
হুঁশ ফিরেছিল হরিপদ কালাণ্ডির ডাকে, এদিকটায় দেখে যান। কাঁসাই নদী। শীতকালে একেবারে শুকিয়ে যায়...
ভাঙা দেউলের কয়েক গজ তফাতেই কাঁসাই নদীর ঘাট। অনেক নিচ দিয়ে পাথরের বুকে বয়ে যাওয়া ক্ষীণ জলের আভাস। মরা নদীর সোঁতা—রবি ঠাকুরের ভাষা মনে পড়ে গিয়েছিল সেই মুহূর্তে।
কতক্ষণ দাঁড়িয়েছিল সেই শুকিয়ে যাওয়া নদীর চরে খেয়াল ছিল না দর্পণের। মন চাইছিল না ফিরে আসতে। শীতের বিকেলের নিস্তেজ রোদ কেমন করে মজে ওঠে আবছায়ায় আবার সেই আবছায়াই কেমন ঘনিয়ে আসে ভরপুর অন্ধকারে—কলকাতায় বসে যেন খেয়ালই করা হয়নি এতকাল।
সারাদিন ঘোরাফেরার পর সঙ্গী না থাকলে সন্ধেগুলো বড় একঘেয়ে এদেশে। কিন্তু হরিপদ কালাণ্ডি লোকটা বেশ। বুঝতেই দিচ্ছিল না কোনও অভাব। ঘরে ফিরেই ধরেছিল পুরুলিয়ার লোকগানের সুর,
ঘুমায় উঠে রে ছেলা কান্দে, কান—দে
আমার মরদ ভুলা আছে কোন ফান্দে
চরচরা দুপোভরে মরদ আমার নাই ঘরে
ঘুমায় উঠে রে ছেলা কান্দে, কান—দে
আমার মরদ ভুলা আছে কোন ফান্দে
ঘরে দুটা রুটি ছিল ছেলার বাপটায় খায়ে দিল
ভকের জ্বালায় রে ছেলা কান্দে, কান—দে
আমার মরদ ভুলা আছে কোন ফান্দে
শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল দর্পণের—এই সুর, এই অদ্ভুত আঞ্চলিক ভাষা, সর্বোপরি এই কথোপকথনকে ধরে রাখা দরকার। অনেকক্ষণ পর মোবাইলখানাকে আবার চালু করে সে। টেপ করে নিতে হবে গানটুকু।
ঠিক তখনই আচমকা নজরে পড়ে তার—আবার চালু হয়ে গেছে ব্লু টুথ। এই এক বিরক্তি! কিন্তু ব্লু টুথটাকে অফ করতে গিয়েই প্রবল ঝাঁকুনি লাগল তার। সেই... সেই অজানা ডিভাইসটাকে আবার দেখা যাচ্ছে তার ধারেকাছেই। আনাচে কানাচে কোথাও...
নীল ঘূর্ণি... নীল ঘূর্ণি...
মুহূর্তে সেই অতি পরিচিত শীতল স্রোতটুকু আবার বয়ে যায় শিরদাঁড়া বেয়ে। তাল কেটে যেতে থাকে এতক্ষণের আমেজটুকুর। নিমেষে নষ্ট হয়ে যায় মুরগুমায় এসে পৌঁছনো ইস্তক ভাল হয়ে ওঠা মুডটুকু। যাবতীয় যুক্তি বুদ্ধির অতীত সেই আতঙ্ক...
শীতের সন্ধেবেলা এই একতলার ঘরে জানলার কপাট আঁটা। বাইরের বারান্দাতেও দোর লাগিয়ে দেওয়া আছে। বাড়িটার ভেতর এই মুহূর্তে খালি সে আর হরিপদ কালাণ্ডি। তাহলে ধারেকাছে এ কার ব্লু টুথের যোগাযোগ পাচ্ছে আবার তার মোবাইল...
এই দূর পাহাড়ের রাজ্যেও কেমন করে তাকে ধাওয়া করে এল নীল ঘূর্ণি...
ঘরের বাইরে জানলার ওপাশে হয়ত এই বাড়ির ঠিক পেছনে কি তবে এই মুহূর্তে গুঁড়ি মেরে বসে আছে কেউ...
হরিপদ কালাণ্ডির লোকগানটুকু টেপ করার ইচ্ছে আর অবশিষ্ট থাকে না তার মনে। পরিবর্তে ইচ্ছে করে আছাড় মেরে ভেঙে ফেলতে হাতের যন্ত্রটাকে...
আড়চোখে চেয়ে চেয়ে দেখতে থাকে দর্পণ। হরিপদ কালাণ্ডির মুখচোখের প্রতিটি রেখা। সকাল থেকে চেনা দিলদরিয়া লোকটাকেও আর সহ্য হয় না এই মুহূর্তে...
সমস্ত ব্যাপারটুকুর সূত্রপাত মাসখানেক আগে কফি হাউসে। দেবলীনার কাছ থেকে ‘বাইশে শ্রাবণ’-এর গানগুলো নেওয়ার জন্য ব্লু টুথটাকে অন করতে গিয়ে।
কী নাম আছে রে তোর ডিভাইসের?
দেখ, দেবলীনা নামেই আছে।
অন করেছিস?
হ্যাঁ। কেন, পাচ্ছিস না খুঁজে?
না। একটাই ডিভাইস শো করছে জাস্ট। নীল ঘূর্ণি...
আশপাশে কারুর অন করা আছে হয়ত। এত লোক চারিদিকে। কেউ না কেউ কিছু না কিছু ট্রান্সফার করছে। সার্চ কর। পেলি?
তারপর থেকেই বারে বারে নীল ঘূর্ণিকে খুঁজে পেতে লাগল দর্পণ। অফিসের ক্যান্টিনে, বাসে ট্রামে, দোকানে বাজারে—সর্বত্রই। আগের সেটটা পুরনো হয়ে এসেছিল। কিছুদিন থেকেই বদলানোর কথা ভাবছিল সে। কিন্তু গড়িমসি করে করে আর হয়ে উঠছিল না। নীল ঘূর্ণিকে কেন্দ্র করে এই ঘটনাটুকু বারে বারে পুনরাবৃত হতে থাকায় শেষমেষ সেটটাকে তড়িঘড়ি বদলেই ফেলল সে। যন্ত্রপাতির ভেতর কোথাও কোনও গোলযোগ হচ্ছে কিনা কে বলতে পারে!
কিন্তু ঠিক দু’ দিনের মাথায় বাসে অফিস যাওয়ার পথে পার্ক সার্কাস ব্রিজের একটু আগে আচমকা খেয়াল হল তার। ব্লু টুথটা অন হয়ে গেছে কখন। অফ করতে গিয়েই ঝাঁকুনি লাগল তার।
নীল ঘূর্ণি... নীল ঘূর্ণি...
দুটো আলাদা আলাদা মোবাইলের হ্যান্ডসেটে একই গণ্ডগোল হতে পারে না।
এই অফিস টাইমের গাদাগাদি ভিড়ের মধ্যে খুব ধারেকাছেই আছে লোকটা। সেদিন কফি হাউসের ব্যালকনি থেকে সমানে তাকে অনুসরণ করে যাচ্ছে। কেন? আর অহোরাত্র ব্লু টুথ অন রেখেই বা ঘোরে কেন সে?
ভিড়ের মধ্যে অতিকষ্টে ঘাড়মাথা ঘুরিয়ে বারে বারে এপাশ ওপাশ তাকাতে থাকে দর্পণ। চেনা কোনও মুখ কি চোখে পড়ছে? এই ক’ সপ্তায় যতবারই ধারেকাছে টের পেয়েছে নীল ঘূর্ণির অস্তিত্ব ততবারই আশেপাশে ভাল করে চোখ বুলিয়ে নিয়েছে সে। পরিচিত না হোক আগে দেখা কোনও মুখ আছে নাকি ধারেকাছে। কিন্তু কোনওবারই চারিপাশের হাজারো চেহারাছবির মধ্যে চোখে পড়েনি কস্মিনকালেও দেখা কোনও মুখচোখ।
একদৃষ্টে তাকিয়ে তাকিয়ে ঠিক এই মুহূর্তে একইভাবে হরিপদ কালাণ্ডিকেও নিরীক্ষণ করে চলে সে।

৩.

ঘরটা বেশ নিরিবিলি। একা থাকতেই বেশ ভাল লাগে আজকাল। দু’ বছরের বেশি হয়ে গেছে বাড়ির বাইরে আর বেরোয় না সে। ছোটবেলায় খবরের কাগজে পড়া একটা খবরের কথা মাঝেমাঝে মনে পড়ে যায় ইদানিং। চৌতিরিশ বছর একটানা একটা ঘরে নিজেকে আটকে রেখেছিল একটা লোক। সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায়। যে নিঃসঙ্গতার খোঁজে একদিন ছুটে গিয়েছিল দূর পাহাড়ের দেশে তাকে যে নিজের ঘরেই এমন করে খুঁজে পাবে শেষে কে আর ভাবতে পেরেছিল!
কথা বলার যন্ত্রটা আর ব্যবহার করতে হয় না আজকাল।
নীল ঘূর্ণিও মুছে গেছে জীবন থেকে।
সপ্তাখানেক আগে একটা লোক এসেছিল ক্যামেরা আর ল্যাপটপ নিয়ে। পুরনো কথা জিজ্ঞেস করছিল। একলা লাগে কিনা একটা ঘরের ভেতর টানা দু’ বছর এইভাবে নিজেকে বন্দি করে রাখতে রাখতে। খুব একটা পাত্তা দেয়নি সে। শেষে একটা ছবি তুলতে চাইল লোকটা। আপত্তি করেনি সে। ছবি তুলেই যদি বিদায় হয় লোকটা তবে তুলুকই না।

১.

ছুটির দিন একটু বেলা করেই ওঠেন সুমন্ত ঘোষদস্তিদার। উইকের মধ্যে এমন টানা দু’ দিনের ছুটিও তো সচরাচর পাওয়া যায় না। চায়ের কাপ হাতে খবরের কাগজের দিস্তা নিয়ে আয়েশ করে বারান্দায় বসেছিলেন তিনি। আজ তো কাগজের সঙ্গে একরাশ সাপ্লিমেন্টারি।
পরের পর পাতা উল্টোতে উল্টোতে পাঁচের পাতায় নিচের দিকে একটা চেনা মুখের ছবিতে আচমকাই চোখ আটকে যায় তাঁর। এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলেন পুরো খবরটুকু।
পড়া শেষ হলে একটা সিগারেট ধরান। দীর্ঘশ্বাস পড়ে তাঁর।
তাঁর অধীনেই তিন বছর আগেও কাজ করেছে ছেলেটা। কী যে হয়ে গেল তারপর! ভেবেছিলেন বাইরে থেকে দু’ দিন ঘুরে এলে ঠিক হয়ে যাবে। নিজেই উদ্যোগ নিয়ে লিভের ব্যবস্থাই শুধু করে দেননি—পুরুলিয়ার একটা ইন্টিরিয়র জায়গায় একরকম জোর করেই পাঠিয়েছিলেন ছেলেটাকে।
ক’টা দিন বাইরে থেকে ঘুরে আসার দরকার আছে তোর। আই মিন বি কমপ্লিট ডিটাচড অফ আরবান ইন্ট্রিকেসিস। একটু নিরিবিলি একটু নিজের সঙ্গে একা হতে হবে তোকে। কাছেপিঠের ভেতর সস্তায় পুষ্টিকর এমন একটা জায়গার খোঁজ দিতে পারি আমি। ক’টা দিন ঘুরে আয়। আই থিঙ্ক ইওর প্রবলেম উইল ওভার...
নিজেরই বলা পুরনো কথাগুলো মনে পড়ে যাচ্ছিল তাঁর।
১৪২২ সালের পয়লা বৈশাখের সকালটা হঠাৎই একরাশ বিষণ্নতা বয়ে আনে তাঁর মনে।

আপনার মতামত জানান