পাখি দাদু

রিংকু কর্মকার চৌধুরী


বাড়ি থেকে গুনে ঠিক সাত পা ফেললে বাজার, তিনবেলা
কিচকিচানি লেগেই আছে। মাঝেমধ্যে মনে হয় পাগল হয়ে যাব ।এ যন্ত্রনার নিস্তার নেই যেন। তার মধ্যে মায়ের নানা রকম ফিরিস্তি , এটা নিয়ে আয় ওটা নিয়ে আয়।
প্রায় রাগ করে সেদিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছি। শালা সকাল থেকে কিছু পড়াশোনা হল না, এদিকে সামনে পরীক্ষা কপালের উপরে ব্রেক ডান্স করছে। বাড়ির গলি থেকে বাজার পেরিয়েছি মাত্র কা-কা করে গাছের ডালে বসে থাকা কাকটা জামা টা শেষ করে দিয়ে উড়ে গেল। "জাহান্নামে যাও" "চোদ্দো গুষ্টির ফোঁড়া হোক ওখানে ,বিড়বিড় করছি ,দেখি মিতা হন্তদন্ত হয়ে আসছে। মিতা আর আমি ছোটবেলাকার বন্ধু।
একসাথে একই কলেজে ও পড়ি।

"এই মিতু কি হয়েছে রে? কোথায় যাচ্ছিস??
গুলেদের বাড়ি, হাঁপাতে -হাঁপাতে মিতা বলল।
কেন? কি কেস? কাকের ভালোবাসা গাছের পাতা দিয়ে মুছতে-মুছতে জিজ্ঞেস করলাম।
গুলের দাদু নাকি রাতে পাখি হয়ে যাচ্ছে।গোল চোখ পাকিয়ে মিতা বলল।
কি? আরেকটু হলে মাথা ঘুরে পড়ে যাচ্ছিলাম আর কি।
কাল রাতে কি খেয়েছিলি মিতু? ঘি নাকি? হজম হয়নি ।
তেলে যেন জল পড়ল। একদম বাজে কথা বলবি না । বিশ্বাস না হলে চল। অনেকেই যাচ্ছে ।খালি যাতা বলা।খিঁচিয়ে উঠল ও ।
চাপ খেয়ে আমিও বললাম চল।


গুলের বাড়ি পাশের পাড়ায়।ওর সাথে কোচিং সেন্টারে আলাপ, বিশ্ব গুলবাজ।আসল নাম আকাশ,
ও চাইলে গুলের ফানুসে চড়ে নেংটি পড়ে প্রশান্ত মহাসাগরে ডুব দিয়ে আসতে পারে। তাই ওর নাম রেখেছিলাম গুলে।। এর কথায় মিতু বিশ্বাস করে কি করে? মানুষ কি করে পাখি হয়ে যাবে। এত রাগ ধরল,।যত আপদ।

গুলের বাড়ির মুখে দেখি জনা কয়েক লোক ঘোরাঘুরি করছে । তার মধ্যে
বেশ কিছু মহিলা ও আছে । হৈচৈ চলছে । আমরা বাড়ির ভিতরে ঢুকে দেখি, আশি বছরের দাদু, দুটো হাত এমনভাবে নাড়াচ্ছেন যেন ডানা মেলে উড়ে গেল, পাশে বসে থাকা গুলে দাদু কে হাতপাখার হাওয়া করছে।গুলের বাবা পঞ্চানন ঘোড়ুই যম কিপটে লোক, বিশাল মুদিখানা আছে, এক পয়সার মা-বাপ। দেখি ঘরে ঢোকার মুখে বসে টোকেন কাটছেন । বিনে পয়সায় প্রবেশ নিষেধ। কারণ দাদু নাকি পাখি হয়ে খুব উপকার করছেন।দাদু ওড়ার সময়ে উপর থেকে অনেক কিছু দেখতে পাচ্ছেন যেমন, তেমনি ডাসা পেয়ারা, কচি ডাব পেড়ে আনছেন কবে নাকি কাজের মেয়ে মাধুরীর ঝুটো মুক্তোর মালা ও এনে দিয়েছেন কাকের বাসা থেকে। তাই ফেলো কড়ি মাখো তেল। আশপাশের কিছু লোকজন ও এসেছেন নিজের নিজের অনুরোধ নিয়ে।
গুলে কে ডেকে ভিড় কাটিয়ে এগোতে চাইলাম, দেখি ওর কিপটে বাবা ওকে রক্ত চক্ষু দেখাচ্ছে। ও চলে গেল।শশশালা. ..
মুখ থেকে বের হতে চাওয়া বেদ বচন গুলো গিলে নিলাম। মিতু কে লাইনের দিকটা দেখিয়ে বললাম, চল ওদিকে কি সিন দেখার আছে। লাইনে দাঁড়িয়ে দেখি লোকজন যাচ্ছে বায়নার লিস্টি নিয়ে , কারুর মগডালের ডাসা পেয়ারা চাই, কারুর ছেলের পেটকাটি আটকে ভাঙা বাড়ির চিলেকোঠায়। হরেক বায়না পঞ্চাশ টাকা। এক ভদ্রলোকের মেয়ের সোনার চেন কাকে নিয়ে পালিয়েছে, উনি ঘুরে আসার সময় ওনাকে ধরে জিজ্ঞেস করলাম , আসলে কি হচ্ছে? দেখেছেন নাকি উড়তে? বললেন উনি নাকি শুনেছেন, তাই বুক করতে এসেছিলেন। যাকেই জিজ্ঞেস করি বলে শুনেছি, দেখিনি। এবার আমাদের পালা, গুলে বলল তোদের কি চাই? দেখি তখন ও দাদু হাত নাড়িয়ে চলেছেন। মিতু হঠাৎ বলল আমরা দাদু উড়ছেন দেখতে চাই, ফটো তুলব।ওমা মিতুর কথা শেষ হওয়ার বাকি, রে রে করে ছুটে এল পঞ্চা ঘোড়ুই।চিৎকার করে উঠলেন, উনি রাতে ওড়েন তোমরা ভাগো এখান থেকে। আচমকা চেঁচানি তে ঘাবড়ে গেছিলাম আমরা, সামলে নিয়ে বললাম না দেখতে চাই। দাদু কি করে ওড়ে দেখতে চাই।আমাদের দেখে অন্যরাও চেপে ধরল।পঞ্চানন ঘোড়ুই বললেন দাদু রাতে ছাড়া উড়তে পারেন না। রাতে এলে দেখতে পাব আমরা।কিন্তু এর জন্য আরো কিছু টংকা খরচ করতে হবে আমাদের। পাখি দাদুর ওড়া দেখার জন্য আমরা সহ লোকে আরো একশো করে টাকা দিল, তারপর রাতে আসব বলে চলে এলাম সবাই। বাড়ি ফিরে খাওয়া দাওয়া করে ঘুমিয়ে, ঠিক রাত দশটা নাগাদ দাদুর বাড়ি উপস্থিত হলাম। ততক্ষণে সব লোকজন ও পৌঁছে গেছে। গিয়ে দেখি দাদু সেই হাত নাড়িয়ে যাচ্ছেন। পঞ্চা ঘোড়ুই আর গুলে কে দেখতে পেলাম না কোথাও।বাড়িতে দাদু আর ওদের কাজের মেয়ে মাধুরীর ছোট মেয়ে টুকি আছে খালি, টুকি বলল এখুনি সব ফিরবে নেমন্তন্ন খেয়ে। দেখতে- দেখতে বারোটা বেজে গেল, দাদু একি রকম বসে, ওরা কেউ নেই, হঠাৎই টুকি একটা টুকরো কাগজ হাতে গুঁজে চম্পট দিল। কাগজ খুলে দেখি একটা চিঠি,যাতে লেখা


দাদুর ওড়া হলে বাড়ি চলে যেও সব, আমরা ঘুরতে যাচ্ছি।। যদিও এপ্রিল মাস না, তবুও মুরগি করা তো দোষের না। টাটা। ওই যে দাদু উড়ছেন আফিম খেয়ে ওই যে তোমাদের পাখি দাদু।

আপনার মতামত জানান