মিডিয়া বিভ্রাট

স্বপ্না মিত্র
-- এই আজ অফিস যেও না প্লিজ ।
-- সাতসকালে কি যে বোকা বোকা আব্দার করো । মিড উইক , ইয়ার এন্ডিং । অফিস না গেলে হয় !
-- আহা , একদিন তো । কাল যেও । একদিন ক্যাজুয়াল লিভ নিলে মহাভারত অশুদ্ধ হবে না । তোমার বিরহে কোম্পানিও উঠে যাবে না ।
-- তাই বলে খামোখা ছুটি নেব ? কোনো কারণ ছাড়া ?
-- খামোখা কেন ? কারন আছে তো । কারনটা আমি । আমার জ্বলজ্যান্ত ইচ্ছে । আমি বলছি বলেই ছুটি নেবে , ব্যাস ।
-- সে তো বুঝলাম । কিন্তু বসকে কে সামলাবে ডার্লিং ? আজ বুধবার । ছুটি নিলে চিতার মতো চিবিয়ে গিলে খাবে ।
-- কে, ঐ মিঃ বটব্যাল ? গুঁফোকার্ত্তিক ? কালো চশমার ফ্রেমে গম্ভীরানন্দ ?
-- ওরকম বোলো না । আই আই টি , আই আই এম ।
--ছাড়ো তো । সুকুমার রায় পড়ো নি ? কিন্তু সবার চাইতে ভালো পাউরুটি আর ঝোলা গুড় । সব থেকে ভালো আই আই আই টি আর আমার নিউলি ম্যারেড নেকুপুসু বর অনুপম সান্যাল ।

এইবার অনুপম একটু নড়েচড়ে বসে । সে পাঁচ মাসের পুরোনো স্ত্রী তানিয়ার গালে ডান হাতের তর্জনী দিয়ে ছোট্ট একটা টুসকি মেরে বলে ,
-- এই সামলে । নেকুপুসু ?
-- শুধু নেকুপুসু ? বোকা , সোকা , বুদ্ধুর ডিম ।
অনুপম হো হো করে হেসে বলে , তা কি করলে শ্রীমতী তানিয়া বসু থুড়ি তানিয়া সান্যালের কাছে অনুপম সান্যাল একজন শাহরুখ শচীনের ককটেল চরিত্র হয়ে উঠতে পারে ?
-- খুব সোজা । ছুটি । আজ অনুপম সান্যাল বটব্যালকে বোকা বানিয়ে বৌ নিয়ে বেড়াতে যাবে ।
-- প্লিজ ছুটির কথা বোলো না । মারা পড়ে যাবো বস ।
-- সাধে বলি নেকুপুসু , বুদ্ধুর ডিম । একটা সলিড প্ল্যান করতেও পারে না ।
-- আচ্ছা , বুদ্ধির জাহাজ ! তুমি হলে কি প্ল্যান করতে শুনি ?
-- ম্যালেরিয়ার নাম শোনোনি ?
-- ওহ , আমার রাতারাতি ম্যালেরিয়া হয়ে গেছে ?
-- ধরো তাই । ঐরকমই কিছু । ঘড়িতে দশটার অপেক্ষা করো । তারপর বটব্যালকে ফোন । একটু সরু শুকনো ক্লান্ত গলায় , স্যার একশো দুই । মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে । হাত পা নাড়াতে পারছি না । গতকাল রাত থেকে কম্বল মুড়ি দিয়ে স্যার ।



অনুপম আর তানিয়া । দুজনে একই অফিসে কাজ করতো । অনুপম এক্সিকিউটিভ , তানিয়া ননএক্সিকিউটিভ । বটব্যাল ছিল ওদের ব্যাটিং বস । পৌনে তিনবছর টানা ভিক্টোরিয়া , গড়ের মাঠে প্রেমের পর আজ পাঁচ মাস হোলো ওদের গাঁটছড়া বাঁধা পড়েছে । বিয়ের পর থেকে তানিয়া গৃহবধূ । প্রথম কিছুদিন তানিয়া মনের সুখে আড়মোড়া ভাঙলো , হাত পা ছড়ালো । এখন তানিয়ার সময় আর কাটতেই চায় না । মুখে স্বীকার না গেলেও মনে মনে পারুলের ওপর একটু হিংসে হয় বৈকি ! এখনও কেমন পারুল সেজেগুজে হালফ্যাশনের জামা পড়ে রোজ অপিপি যায় !
সে নিজেই তো সাত তাড়াতাড়ি সাধ করে পায়ে বেড়ি পড়লো । প্রেম করতে করতে বিয়ে , ঘণ্টা ঘণ্টা ভ্রুকুটিহীন প্রেমের আশায় । ও হরি ! সাধের ঘোলে বালি ! প্রেমপর্যায়ে অনুপমের সঙ্গে টিব্রেক , লাঞ্চ ব্রেকে ছোট্ট ছোট্ট গুলতানি ছিল । ছিল অফিস শেষে দুজনে ইধার উধার , সিনেমা , রেস্তোয়ায় যাওয়া । বিবাহ পর্বে দেখা যাচ্ছে সকাল ন-টা বাজতেই অনুপম আপিসে বেরোয় । ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যে সাতটা আটটা । যেদিন যেমন ট্র্যাফিক জোটে ।
অনুপমের পরিবর্তে এখন অনুপমের মা , মিল , তানিয়ার নতুন সাথী । ঘাড় পর্যন্ত চুল ছাঁটা , পাটিয়ালা পরিহিতা মিল তানিয়াকে বলবে , হাই বেব , আর ইয়ু গোয়িং পার্লার টুমরো ? প্লিজ গেট হেয়ার স্পা বুকিং ফর মি অলসো । তারপর যখন বেরোবে, বাপরে ! কাহার জেগিংস বেশী টাইট তাহা টানিয়া দেখিতে হয় । যত তাড়াতাড়ি পারে তানিয়া মা'র জন্য দুটো জিনস কিনবে । প্রেস্টিজ থাকছে না বস । আধুনিকতায় এমন পিছিয়ে পড়া ! আর অনুপমও হয়েছে তেমন ! তানিয়াকে সাতপাকে বেঁধে নিশ্চিন্তে মা'র সাথে ভিড়িয়ে দিয়ে নিজে ঘোড়ার মত কাজ করছে । আজকাল তানিয়ার তাই মাঝেমধ্যেই মাঝ সপ্তাহে ছুটির আব্দার , টই টইয়ের পরিকল্পনা । অত কাজ করে হবে কি অনুপমের ? অফিসে যখন তানিয়াই নেই !
রোজ রোজ ঘ্যানঘ্যানানিতে শেষমেশ অনুপমেরও মন টললো । সকালে অফিসের জন্য অনুপম তৈরি হোলো না । নটা বাজতেই অফিসে ফোন করে জানিয়ে দিল, গতকাল রাত থেকে অনুপমের প্রবল জ্বর । একশো তিন । সারা শরীরে অসহ্য ব্যাথা । উঠতে পারছে না । ডাক্তার চিন্তিত । এইমাত্র ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে লোক বাড়িতে এসে রক্ত নিয়ে গেল ।

ওপাশ থেকে বটব্যাল , সান্যাল, এখন তাহলে সাতদিনের মত ...
এপাশ থেকে উত্তেজিত অনুপম স্বাভাবিক গলায় বলে ফেলে আর কি । অতিকষ্টে নিজেকে সংযত করে ধরাধরা শুকনো গলায় বলে , না স্যার । দু-তিনদিনের মধ্যেই ... দেখি, অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে কাল যদি পারি ...
ওপাশ থেকে বটব্যালের হুঙ্কারধ্বনি, আগে শরীর তারপর কাজ । নো ওরিজ । টেক রেস্ট মাই বয় ।
ফোন রেখে অনুপম হুররে বলে একলাফে উঠে পড়লো । তানিয়াকে বললো , তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও । নো ওয়েস্ট অফ টাইম । প্রেসিয়াস লিভ ইন দ্য মিড উইক । একটা আস্ত দিন । সিপ দিয়ে দিয়ে ওয়াইনের মত উপভোগ করবো ।

তানিয়া কষে সাজলো । স্প্লিট স্কার্ট, ট্যাঙ্ক টপ । কানে আধ মনি দুল । পায়ে ফিনফিনে কোলাপুরি । বাট নো এক্সট্রা রঙচঙ । তবে বোতল ওলটানো ফরাসী সুগন্ধি । নিজের গায়ে , অনুপমেরও । অনুপমও পিছিয়ে রইলো না । ব্লু জিনস , হোয়াইট নাইক । প্ল্যান হোলো, প্রথমে নিউ মার্কেটে ঘোরাঘুরি । তারপর পার্ক ষ্ট্রীটে লাঞ্চ । লাঞ্চের পর মুভি । মুভি শেষে প্যান্টালুনে শপিং ।
পুরোনো অভ্যাস মতো বাড়ি থেকে বেরিয়েই তানিয়া অনুপমের বাঁ হাতে নিজের ডান হাতের বেড়ি পরিয়ে নিলো । সোজা চলে এলো নিউ মার্কেট । এদিক , ওদিক , এপাশ , সেপাশ ঘোরাঘুরি। তানিয়া দুটো কানের দুল উল্টে দেখলো , তিনটে টপ ট্রাই করলো । অনুপম এক প্যাকেট সিগারেট নিল । তারপর লাঞ্চ সারলো পিটার ক্যাটে । এবার মুভি । মুভি দেখার সময় পপকর্ণের প্যাকেট ছাড়া তানিয়ার আবার একেবারেই চলে না । ঠাণ্ডা ঘর , এলানো সিট , মুখে কুচুর মুচুর । তবে না ছবি দেখা ! সবই ঠিক ছিল , একেবারে খাপে খাপ । হাফটাইমে তানিয়া অনুপমকে বলেও রেখেছে মা'র জন্য দুটো জিনস কেনার কথা । কিন্তু ছবি শেষে হল থেকে বেরিয়ে দুজনেরই চক্ষু চড়কগাছ । এত বৃষ্টি হোলো কখন ? রাস্তায় কোমর সমান জল । দুজনেই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে জলের সামনে দাঁড়িয়ে । জলবন্দী । বিপদ দেখে তানিয়া আবার অনুপমের বাহু ধরে ঝুলন্ত , বাহুলগ্না । তখনও টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছিল । শপিং আর হোলো না । জলকাদা মেখে দুজনে যখন বাড়ি , ঘড়িতে তখন রাত ন'টা ।

সারাদিন ঘুরে, বৃষ্টিতে ভিজে দুজনেই খুব ক্লান্ত । বিছানায় পড়তে না পড়তেই ঘুম । অঘোরে ঘুমোচ্ছিল ওরা । ঘুম ভাঙলো ফোনের আওয়াজে । বাইরে তখন ক্যাটক্যাটে রোদ্দুর । ঘুম চোখে অনুপম ফোন ধরতেই ওপ্রান্তে বটব্যালের বাজখাঁই গলা , বলি হচ্ছেটা কি সান্যাল ?
অনুপম ঘুম জড়ানো গলায় , কেন, কেন স্যার ?
বটব্যালের হুঙ্কার , বলি , আজকের কাগজটা দেখোনি ?
ফোন হাতে বাইরের ঘরে এসে অনুপম আজকের কাগজ হাতে নিয়ে দেখে , সর্বনাশ ! প্রথম পাতায় হেডলাইন , হঠাৎ বৃষ্টিতে স্তব্ধ নাগরিক জীবন । নীচে জলমগ্ন শহরের ছবি । সিনেমা হলের পাশের রাস্তা । রাস্তায় ধূ ধূ জল । জলের সামনে লোকজনের ভিড় । ভিড়ের মধ্যে সবচাইতে স্পষ্ট অনুপম । অনুপমের বাঁ পাশে বাহুলগ্না তানিয়া ।

এতক্ষনে অনুপমের চোখ থেকে ঘুম উড়ে উড়ন্ত জোকার---
অনুপম কোনরকমে বললো, এখ...খখ..খুনি আসছি স্যার ... ।



আপনার মতামত জানান