গমের বস্তা

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়



"সান্টুকে বলেছি ক'টা নয়া পোস্টার দিয়ে যেতে... এসে লাগিয়ে দিয়ে যাবে। একটু দেখেশুনে লাগিয়ে নিস... সমঝি! তোর যা ছিরি, ওই দিকে তাকিয়ে... "
কথাটা না শেষ করেই এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখল একলাখ... নাহ্‌ কোনও মানুষকে খুঁজছে না, মুখের ভেতর বজবজ করে ওঠা গুট্‌খার গড়লটা ফেলতে হবে শিগগির।
যাকে উদ্দেশ্য করে বলা এই কথাগুলো... সে ঘরের ভেতরেই দেওয়ালে একটা হাতে ভর দিয়ে তির্যক হয়ে দাঁড়িয়ে শুনছিল চুপ করে। একলাখের কথায় যতি পড়তে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বেগুনি রঙের শাড়ীর আঁচলটা ভাল করে কোমরে গুঁজে নিলো; মেদবহুল তামাটে কোমর আর পেটের খানিকটা ইচ্ছে করেই আয়ত্ত করা কায়দায় এলো করে ঠোঁটে বাঁকা হাসি নিয়ে বলল “কোন দিকে তাকিয়ে একলাখ ভাই?” ভচাৎ করে দরজার বাইরের দেওয়ালে গুটখার খানিকটা উগড়ে দিয়ে একলাখ রীতিমত বিরক্ত হয়ে তাকালো সেই অনাবৃত কোমড়ের দিকে। শরীর তাকে আকৃষ্ট করে না সহজে... অন্ততঃ ঢলে পড়া যৌবনের ধস্তাধস্তি তো একেবারেই না। পুরো বিরক্তিটা ওই গুটখার মতই থুঃ করে ফেললো একলাখ, “অ্যাহ্‌... ভিজে গমের বস্তার মত পেটের হাল... মাগীর ছেনালী কমে না! অওর পুছ রহি হ্যায় - কোন দিকে তাকিয়ে! দেখ শিউলি... অ্যায়েসে হি অব্‌ সেকণ্ড হ্যাণ্ড মাল হয়ে গেছিস... গ্যারেন্টি খতম্‌... এরপর বেশি হ্যাজালে...”
কিছুই বলার থাকে না... শিউলি জানে, যখন একলাখ নিজের স্পষ্ট কথাগুলো বলে দিয়ে যায়, তখন অন্য কারও কিচ্ছু বলার থাকে না। এমনিতেই শিউলিদের বেশি কিছু বলার নেই এখানে। একলাখের কথার পেছনে যে কতখানি লাভ-লোকসানের অভিজ্ঞ হিসেব আছে, তাও তার অজানা নয়। গতরটাকে খোরাক তো এমনিই বানিয়েছে, খিল্লী ওড়ালেই বা ক্ষতি কি... ওদেরই সবটা। শরীরের কতটা এই আঁচলটা ঢাকল, তাতে আর কিছু আসে যায় না... একলাখের কথা শুনেও, যা খোলা ছিল তা খোলাই রাখল... জোর করে সেই বাঁকা হাসিটা ঠোঁটে ঝুলিয়ে রেখে বলল, “থামো থামো... একলাখ মাস্টার! তোমার ওই সান্টুকেই পাঠিয়ে দিও পোস্টার লাগাতে... দেখি, সে কেমন কাজের..."
একলাখ, ঘরের চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে বলল "হাঁ", তারপর দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় পেছন ফিরে বলল, "আজ উনতিস... ছেলেরা খালি হাত ফিরে না যায়!"
শিউলি কোনও উত্তর দিতে গিয়েও চুপ করে গেল... তার সংশয়ের মাঝেই একলাখ ঘর থেকে বেরিয়ে গলির রাস্তা দিয়ে বেশ খানিকটা এগিয়ে গেছে। দ্রুত পায়ে দরজার সামনে এসে, কাঁধ থেকে খসে পড়তে চাওয়া অবাধ্য আঁচলটাকে পাত্তা না দিয়ে যতটা সম্ভব সামনে ঝুঁকে পড়ে শিউলি চেঁচিয়ে বলল, "আরে ও মাস্টার... তোমার ছাত্তরদের হাতের মাপ কত? দিলে ধরতে পারবে তো?" একলাখ শুধু একবার থমকে দাঁড়ালো, রাস্তার ধারে জুলজুল করে চেয়ে থাকা সাদাকালো কুকুরটার গায়ে সশব্দে গুটখার থুতু ফেলে চলে গেলো হন হন করে।

... ... ...

“নো নো নো সাতানিক, ইয়ু আর নট গেটিং মাই পয়েণ্ট! উই আর নট হিয়ার টু প্রেজেণ্ট আ ডিবেট অন আওয়ার প্রোজ্‌ অ্যান্ড কন্‌স... উই শুড অনলি ফোকাস অন হোয়াট উই ক্যান প্রমিস টু ডেলিভার!” শ্রীনিবাস যখন নিজের মতটা চাপিয়ে দেবে বলে স্থির করে ফেলে, তখন আর অন্য কারও বিশেষ কিছু বলার থাকে না। সতানিকও ব্যাপারটা বোঝে, এখন যাই বোঝানোর চেষ্টা চলুক, শ্রীনিবাসের ‘ইগো’ চোখ আর কান একসঙ্গে বন্ধ রেখে দিয়েছে, সব ঠোক্কর খেয়ে এদিক ওদিক চলে যাবে। ‘ইয়েস... নো... বাট... স্টিল...” এসব কিচ্ছু বলল না আর সতানিক... শুধু নির্বিকার ভাবে বলল “ফাইন... লেট মি রিভিউ ইট।” শ্রীনিবাস হাত আর মাথা এক সঙ্গে নেড়ে একই ভাবে বলল, “নো নো নো... হোয়াট’স দেয়ার টু রিভিউ? জাস্ট মেক দ্য চেঞ্জেস ইন দ্য প্রেজেন্টেশন অ্যাজ উই ডিসকাস্‌ড” সতানিক ল্যাপটপ টা লক করে “শিউর... আই উইল মেক দ্য চেঞ্জেস অ্যাজ্‌ ইয়ু মেনশনড... উইল মেইল ইয়ু” বলে সরে গেলো ডেস্ক থেকে। শ্রীনিবাস একবার হাতঘড়িটার দিকে তাকিয়ে বলল, “টেক ইয়োর টাইম... উই ক্যান সিট আফটার ফাইভ।”, তারপর আর সতানিকের দিকে তাকালো না, সোজা নিজের ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে রইল। সতানিক যতটা সম্ভব সাবলীল থেকে একটা সম্মতিসূচক হাসি হেসে নিজের কিউবিক্‌লের দিকে এগিয়ে গেলো। ল্যাপটপের দিকে তাকিয়েই সতানিকের চলে যাওয়া টা আড় চোখে দেখে নিলো শ্রীনিবাস... তারপর কষ দাঁতের ফাঁকে আটকে ছিবড়ে হয়ে যাওয়া স্ট্রবেরি চিউইংগামটা থুঃ করে ফেলে দিলো পায়ের কাছে রাখা ছোট ওয়েস্ট-পেপার বাস্কেটে। কাঁচের দেওয়ালে ঘেরা কর্পোরেট বাতাবরণ, এখানে সশব্দে কোনও কাজ হয় না...

ল্যাপটপটা টেবিলের ওপর রেখেই মনে পড়ল মোবাইলটা সাইলেন্ট করে গেছিল শ্রীনিবাসের কাছে যাওয়ার সময়। পকেট থেকে বার করে দেখল সাতটা মিস্‌ড কল... স্নিগ্ধার নাম্বার... লাঞ্চ হয়েছে কি না জানার জন্য ফোন করেছিল, যেমন রোজ করে। একটু নির্বিকার ভাবেই ফোনটা টেবিলে রেখে দিলো নর্মাল মোড-এ পালটে। আড়াইটে বাজে, এখন অফিস ক্যান্টিনেও স্বাভাবিক কিছু জুটবে না... পিৎজা গিলতে হবে। ল্যাপটপটা আনলক করে স্লাইডটার দিকে তাকিয়ে চুপ করে বসে রইল কিছুক্ষণ। পাশে বসে থাকা সহকর্মী মনিশ শুধু দেখল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে কিছু বিড়বিড় করছে সতানিক। চেয়ারটা সতানিকের দিকে ঘুরিয়ে বলল, “ক্যায়া হুয়া দাদা... কিস্‌ কা লে রহে হো?” সতানিকের মাথাটা অল্প অল্প ঘুরছিল, হয়ত এতক্ষণ না খেয়ে থাকার জন্য... উত্তেজিত হয়ে থাকলেও, সামলে নিয়ে বলল “ভোসড়ি কে... অব ড্যাশবোর্ড ভি চাহিয়ে উস্‌কো... ডমিনোজ্‌ কা নম্বর হ্যায় তেরে পাস?”

চার তলার ফ্ল্যাটের দেড় খানা বারান্দা, যেটা একটু লম্বা সেখানে কিছুক্ষণ চেয়ার নিয়ে বসে থাকা যায়... কিন্তু ইচ্ছে হয় না। বেশ খানিকটা নিচে নির্লিপ্ত ফুটপাথ আর তার ওপর হেঁটে চলা যান্ত্রিক নাগরিকতা ছাড়া দেখার কিছু নেই। সামনে আকাশ ঢাকা বিলবোর্ডে পণ্য হয়ে ওঠা ওই হাসিহাসি মুখটা দিনের পর দিন দেখতে দেখতে... এখন কেমন গা ঘিনঘিন করে। স্নিগ্ধা নিজেও মাঝে মাঝে অবাক হয়ে, গোটা বারান্দাটা জুড়েই যেন একটা অপছন্দের প্রদর্শনী। দু’মিনিটের বেশি ওই বারান্দাটায় দাঁড়ানো যায় না... শুধু ভিজে কাপড়গুলো ক্লিপ দিয়ে আটকে পালিয়ে আসা। অপছন্দের কখনও তালিকা করতে নেই, ওটা সব সময় বেশির দিকেই থাকে... ক্রমবর্ধমান। কিছু আগে, কিছু পরে... সময়ের সাথে সাথেই মানুষ এই সত্যিটা ঠিক বুঝে নেয়। স্নিগ্ধাও বুঝে নিয়েছিল। কিন্তু মানিয়ে নেওয়া অপছন্দগুলো বড় দ্রুত যেন এক অসহ্য বিরক্তির রূপ নিয়ে নিচ্ছে চারিদিকে। কতদিনই বা গেছে, এই তো চার বছর হ’বে ক’মাস পর। সব কিছুই তো বেশ হিসেব করে, ভেবে চিনতে ঠিক করা... তবু সব হিসেবের অবশেষ হয়ে থেকে গেল এই হাঁফিয়ে ওঠা অস্বস্তি। এখনও হিসেব করে করে দেখে... অভিযোগ আর অজুহাত গুছিয়ে রাখে পাট করে করে... আর ওয়াইফাই অন রেখে সতানিকের ল্যাপটপটার পর্দায় তাকিয়ে তাকিয়ে ক্লান্ত হয়ে গেলে সেই অপছন্দের বারান্দাটাতেই এসে বসতে হয় নিঃস্বাস নেওয়ার জন্য। রাস্তার ওপারের বড় বিলবোর্ডের হাসিটা বিদ্রুপ করে, তাই চোখ বন্ধ করেই বসে থাকে। ব্যস্ত রাস্তায় জানবাহনের যান্ত্রিক আর্তনাদ ক্রমাগত করাতের শব্দর মত মনে হয়, তাই কানে ইয়ারফোনের কৃত্তিম বধিরতা। শুধু হাওয়ার স্পর্শটা দরকার, দূষণ থেকে কিছুটা ওপরে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে আর সব পার্থিব স্পর্শ আর আঁকড়ে ধরার বাইরে, ভেসে আসা এই বাতাস... যাপনের শ্বাস-প্রশ্বাস।

একের পর এক তীক্ষ্ণ যান্ত্রিক চিৎকার ভেসে আসছে ফোনটা থেকে। বেশ ছিমছাম চেহারার স্মার্ট ফোন, জন্মদিনে সতানিক গিফ্‌ট করেছে। একের পর এক ম্যাসেজ ঘণ্টার মত মুহূর্মুহু বেজে চলেছে... তীক্ষ্ণ যান্ত্রিক চিৎকার। একের পর এক বার্তা আসছে... বন্ধুদের, প্রাক্তন সহকর্মীদের... হয়ত সতানিকেরও। কিন্তু স্নিগ্ধার হাত একেবারেই এগলো না ফোনের দিকে... সন্ধে নেমে গেছে, সতানিকের ফিরতে রাত হয়, তার আগে হাতের কাজে সেরে নিতে হবে একটু একটু করে। সব কিছুই প্রতিদিনের রুটিন, অথচ চাকরি করতে করতে কোনওদিনও মনে হয়নি যে এইভাবে একটা অন্য রুটিন হয়ে যেতে পারে জীবনে। এখন সেই চাকরিতে যেতে হয় না... এখন গীজারের ব্যবস্থা করা বাথরুমে দিনে তিনবার চান করতে হয়... প্রতিবার দূষিত হওয়ার পর নিজেকে ধুয়ে নেওয়া... দিনের পর দিন। এই ক’বছরে অবশ্য ব্যাপারটা অনেকটাই গা শওয়া হয়ে গেছে। প্রথম কয়েক মাস, শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে নিজের শরীরের দিকে তাকাতে পারত না। প্রথমবারের তীব্র সুখ বড় অদ্ভুত লেগেছিল, মনে হচ্ছিল ছেলেটা প্রথম সুযোগে যেন দিশেহারা হয়ে পড়ছে। তারপরের রাত... আবার রাত... আবার রাত। বাইরে, ঘরে আর বিছানায় রাতের অন্ধকার নেমে এলেই সেই পৌরাণিক সাপটা পাগলের মত অভিশপ্ত আপেল খুঁজে বেড়াতো স্নিগ্ধার অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। হিস্‌ হিস্‌ করত তার জিভ, গরম শ্বাস-প্রশ্বাস বিচরণ করত স্নিগ্ধার আত্মসমর্পনকে বেষ্টিত করে। কথাবার্তায় আধুনিক, সেন্সিটিভ, সংবেদনশীল একটা ছেলে চরম মুহূর্তে যে একেবারেই অন্য কেউ হয়ে যেতে পারে, তা স্নিগ্ধাকে চমকে দিয়েছিল। প্রাথমিক তৃপ্তি আর সুখে মন ভরে ওঠার সঙ্গেই সঙ্গেই বুঝতে পারত - পূর্ণতা এক মরীচিকা মাত্র; আসলে একজনের সাফল্য এর একজনের যন্ত্রণাকে কর্ষণ করে চলে এই ভাবেই... যে কোনও অজুহাতে। একদিকে ক্লান্ত আত্মসমর্পন, আর একদিকে অক্লান্ত অন্বেষণকে জিইয়ে রেখেই প্রথমে মাঝে একটা চিড় ধরে, তারপর সেটা বেড়ে ফাটল হয়। তবু দু’হাত দিয়ে এক ঝটকায় দূরে সরিয়ে দিতে পারেনি। যে ঊরুসন্ধির মাঝে সতানিকের মাথা আশ্রয়ে খুঁজত, জঙ্ঘার আঘাতে তাকে সরিয়ে দিতে পারেনি। কারণ, সারাদিন ধরে দেখা মানুষটা একেবারেই এরকম নয়, তাকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার মত মনের জোর স্নিগ্ধার হবে না কোনও দিন। একটা বন্য ঘোড়াকে লাগাম পড়ানোর মত সামলাতে হয়েছে অন্ধকারে... মাস ছয়েক, কখনও তীব্র হ্রেষাধ্বনি, কখনও আগুনের ফুলকি। রাতের আঁধার ছাড়া কেউ কিছুই টের পায়নি। শুধু ওই শাওয়ারের তলায় দাঁড়িয়ে নিজের শরীরের এখানে ওখানে রক্তজমা দাগ, আর দংশন-চিহ্নগুলো স্পর্শ করলে শিউরে উঠত। মনে হ’ত সতানিক নয়, নিজেই একটা ম্যাসোকিস্ট, তাই ইচ্ছে করেই এইভাবে আঘাৎ পেতে ভাল লাগে, ভালবাসার অজুহাতে। তারপর, প্রায় চার বছর হ’তে চলল, সোশ্যাল নেটোয়ার্কিং-এর অলিন্দে দু’জনের হাসিখুশি ছবিতে পছন্দ আর মন্তব্যের বৃষ্টি। সতানিক এখনও ভীষন সেন্সিটিভ, সংবেদনশীল, দায়িত্ব শব্দটাই যেন ওর জন্য তৈরী... আর খুব নিশ্চিন্তে ঘুমোয়ে এসি-টা বাড়িয়ে, চাদরটা মাথা পর্যন্ত টেনে নিয়ে।
সন্ধেবেলা শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে শরীরের সেই জায়গা গুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখে মাঝে মাঝে স্নিগ্ধা, যেখানে ফুটে উঠত যুদ্ধের ক্ষত... সত্যিই কি অসহ্য নিষ্ঠুর! কিন্তু কে দিয়েছিল সেই আঘাত? আজ সে কোথায়? গ্রীবা বেয়ে, তৃষিত স্তনদের ছুঁয়ে, যোনীদেশ উপেক্ষা করে ঝরে পড়ে ঠাণ্ডা জল... ভিজে যায় যুদ্ধবীরতির উপত্যকা।

... ... ...

একলাখের নাম আসলে মোটেই একলাখ নয়। মহল্লায় সবাই জানে ‘ইকলাখ বহৎ শানা হ্যায়’। বিহার থেকে এই শহরে এসেছিলো আট বছর বয়সে, কোনও খালু কিংবা মামু’র সঙ্গে। আসল নামটা উর্দুতে উলকি করা আছে হাতে, ইশতিয়াখ। তারপর প্রায় ত্রিশ বছর, ইশতিয়াখ থেকে ইকলাখ। তাকে ফেজ পরে মসজিদে যেতে দেখা যায় শুক্রবারে, বুলেটে চড়ে নজরদারি করতে দেখা যায় বাজারে, নির্বাচনের সময় তার ডাক পড়ে উপযুক্ত সময়ে... উন্নতি করেছে একলাখ, ‘একলাখ ভাই’ বলে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার মত যথেষ্ট উন্নতি। এখন আর ওই ইশতিয়াখ নাম ধরে ডাকারও আশেপাশে কেউ না। লাইন থেকে বাজার এরিয়া অবধি, কাজে-অকাজে যাদের মাতব্বরি চলে, তাদের মধ্যে একজনের ওপরেই ভরসা করা যায়... হয়ত আশা করা যায় কিছুটা মানবিকতাও... তার নাম একলাখ। একলাখ যেমন ‘শানা’ তেমনই হিসেবী মানুষ। তাকে সবদিক সামলে চলতে হয়, ‘ফিজুল কা লাফড়া’ একদম এড়িয়ে চলে। সেই একলাখ এই নিয়ে দু’তিনবার শিউলিকে বুঝিয়ে দিয়ে গেল, তোমার রিটায়ারমেন্টের টাইম এসে গেছে! একলাখ বলেই রয়েসয়ে বলছে, সান্টুকে পাঠাচ্ছে দালালী করার জন্য। অন্য কেউ হ’লে এখান থেকে খেদিয়ে দিতো এক মাসেই, রেণুদি’র মত লাইনের ওপারে পাঁচ’টাকা আঁটির হিসেবে দিনে পালং-শাক রাতে নিজেকে বেচতে হ’ত... মাথার ছাদটাও থাকত না আর। নিজেকে বেচার কায়দা আর অভ্যেস দু’টোই কানের নিচে গজিয়ে ওঠা অযাচিত আঁচিলটার মত গা সওয়া হয়ে গেছে ষোলো বছর বয়স থেকেই... কিন্তু মাথার ওপর এই ছাদ, এই আস্তানা ছেড়ে কোনও চাতালে কুকুরের মত ঘুমোতে হবে... অন্য কোনও কুকুর যোনী শুঁকে চলে যাবে, তা শিউলি কিছুতেই হ’তে দেবে না।

আজ আর ব্রিজের ধারে দাঁড়াতে যায়নি অন্যদের সাথে। এমনিও দুপুর অবধি দাঁড়ালে একজনও আসবে কি না সন্দেহ... শরীরটাও সায় দিচ্ছে না। ‘শরীর খারাপ’ বলতে পারে না শিউলি... ওটা তো অনেক আগেই খারাপ হয়েছে, খারাপই থাকবে মরার পরেও। আর ‘অসুস্থ’-র মত পোশাকী শব্দও ওর অভিধানে নেই... তাই অসুস্থ থাকলে ওটাই বলে... শরীর সায় দিচ্ছে না। শরীর সায় না দিলে কাস্টমারেরও লস্‌... শিউলিকেও সামলাতে হবে দু’তিন দিন। তাই আজ দুপুরে ব্রিজের রোদ্দুর নয়... কেরোসিন-স্টোভের আগুন... ভাত, আলু আর ঢেঁড়স সেদ্ধ হচ্ছে। অনেক ছোটবেলা কয়লার আঁচের সামনে বসলে, চোখে ধোঁয়া লেগে লাল হয়ে উঠত... তারপর ঝাপসা। গ্রাম পঞ্চানন্দপুর, জেলা মালদাহ... বাপের নাম... নাহ্‌ সে সব ঘাঁটতেও ভাল লাগে না। সেসব বছর কুড়ি আগেই সব ছেঁড়া-কাটা হয়ে গেছে... শুধু এই রান্না করতে বসে মাঝে মাঝে চোখ ঝাপসা হওয়ার ব্যামোটা কিছুতেই সারল না। সোনালী মাসি গড়ে পিঠে নিয়েছিলো। চুলের মুটি ধরে যেমন দেওয়ালে মাথা ঠুকেছে, তেমন জ্বর হ’লে নিজের টাকায় ‘অ্যালাপাতিক’ ডাক্তারও দেখিয়েছে। বার বার করে বলত, “কষ্ট হয়... কিন্তু মেনে নিতে হয়... কি করবি বল, তুই যেমন এখানে মানিয়ে নিবি, অন্য কোথাও থাকলেও মানিয়ে নিতি... কেউ কারও নয় বুঝলি, আমাকেও যে মাসি বলে ডাকছিস, ওটা কিছু একটা বলতে হয় তাই... মনে মনে যে কাঁচা খিস্তি করবি, তা কি আর জানি না?” কথাগুলো গেলা খুব কঠিন... মানিয়ে নেওয়া আর লাইনের শিউলি হওয়া কি এক! তবু কেমন যেন কুড়িটা বছর পেরিয়ে গেলো... একলাখ বলে গেলো – শিউলি, তোর গ্যারেন্টি শেষ!

চোখটা আবার ঝাপসা হয়ে এসেছে... ভাতের ফ্যান স্টোভের ওপর পড়ে ফ্যাঁশ করে উঠল। তাড়াতাড়ি সে সব সামলে নিয়ে আবার মাদুরের ওপর এসে বসল শিউলি। চাদর দিয়ে ঢাকা, ছেঁড়া তোষকের বিছানাটায় শুতে-বসতে ইচ্ছে করে না... ওটা শুধু বাইরের লোকদের জন্য... প্রয়োজনে শুতে হয়। তাদের কথা ভেবেই সান্টুকে পাঠাচ্ছে নতুন বিলিতি পোস্টার লাগিয়ে দিতে ঘরে। অবশ্য, সবাই যে শুতে আসে, বা শুয়েই থাকে শুধু এমন নয়। কেউ কেউ একটু অন্যরকম হয়... জাতে ভদ্দরলোক, ভেবে চিনতে কথা কয়... দু’চার কথা কয়। তবে সেও এক ধান্দা, গা বাঁচানো ধান্দা... কাপড়-জামা খুলে ফেললে সব সমান। একটা ছেলে অবশ্য একটু অন্যরকম ছিলো। কি যেন নাম?... ধুস্‌, নাম কি আর বলে? বয়সে বেশ ছোট শিউলির থেকে। প্রথম দিন এসে মিনিট ত্রিশ ধস্তাধস্তি করার পর সে কি হাউহাউ করে কান্না! বছর পঁচিশ-ছাব্বিশের ছেলে যে এ’পাড়ায় এসে নগদ খসিয়ে ওই ভাবে কাঁদতে পারে, সে শিউলির আগে দেখা ছিল না। কান্না থামিয়ে, জল খাইয়ে, কাঁচা খিস্তি দিয়ে... জানল ‘গালফেণ্ড’ পথে বসিয়েছে। ইচ্ছে হয়েছিল ঠাঁস করে একটা চড় মাড়তে, কিন্তু ব্যবসার সময়... এমন করলে একটা চড়ের বদলে দশটা লাথি পড়বে। সেদিন আর কিছুই করে উঠতে পারেনি, চোখ মুছে চলে গেল। তাই বলে শিউলি অবশ্য টাকা ফেরত দেয়নি... সেসব সিন্‌ই নেই। শরীরের থেকেও সময়ের দাম বেশি, ওটা ফেরত হয় না। শিউলির এখনও ভাবলে হাসি পায়ে, সেই ছোকরা, তার পরেও আবার এলো... মাস দুয়েক পরেই, আর ওর কাছেই এলো। শিউলি খুঁচিয়ে ছিল সেই কান্নার কথা বলে... ‘ন্যাকা মেয়েমানুষ’। কিন্তু কোথায় কান্না! সে যেন এক রাক্ষস! মাঝবয়সি হাভাতে ‘ঢ্যামনা’গুলোও এত জোর খাটায় না। বিন্দু-মাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই, সে যেন এক অন্য মানুষ... নির্বিকার টাকা দিয়ে চলে গেলো লণ্ডভণ্ড শিউলিকে বিছানায় ফেলে রেখে। চাদর সরে গিয়ে ছেঁড়া তোষক আর শিউলি এক হয়ে আছে।
তারপর দু’দিন পরেই আবার এলো। শাড়ীর আঁচলটা এক ঝটকায় টেনে সরালো আগের দিনেরই মত, ব্লাউজটাও হিঁচরে নামালো... কিন্তু ঝাঁপিয়ে পড়ল না। চোখে সেই আগুন নিয়ে তাকিয়ে রইল, দু’দিন আগে রেখে যাওয়া ক্ষতগুলোর দিকে। আঙুল বুলিয়ে বুলিয়ে সারা শরীরে নিজের তৈরী করা ক্ষতগুলোকে শুধু স্পর্শ করল, চুমু খেলো... স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। সেইরকম খেলা এর আগে কাউকে খেলতে দেখেনি শিউলি। চাইলে থামাতে পারত, এক ঝটকায় সরিয়ে দিতে বলতে পারত ‘যা করতে এসেছিস কর, টাকা ফেল... কেটে পর... নক্সা করিস না’... কিন্তু সে আর পারল কই? ছেলেটা ওইভাবেই চড়াই-উতরাই বেয়ে ওঠা নামা করে গেল আধ ঘণ্টা ধরে... তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়ল খাটেই। শিউলি জেগেছিল... নিথর, উলঙ্গ শরীর নিয়ে জেগেছিল পুরো সময়টাই... রান্নার ধোঁয়া ছাড়াই চোখ ঝাপসা হয়েছিল বার দুয়েক, তবে চোখ মোছার জন্য হাত সরেনি... অর্ধশায়িত উলঙ্গ ভাস্কর্য হয়ে পড়েছিল ছেঁড়া তোষকটাকে লুকিয়ে রাখা নতুন চাদরটার ওপর। এরপর কেমন যেন নিয়ম হয়ে গেলো... কখনও মাসে একবার কি দু’বার আসত... একদিন জমে থাকা বিষগুলো সব শিউলির ওপর উগড়ে দিত... আর তার ঠিক ক’দিন পরেই অ্যালাপাতিক ওষুধ আর মলম নিয়ে আসত একটা ছোট প্যাকেটে করে। ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ থাকত... বসে থাকত চুপ করে মাদুরের ওপর, খাটে উঠত না সেদিন আর।

এইভাবেই হয়ত, বন্ধ জেলখানার ওপরে ঘুলঘুলি দিয়ে আসা সকালের রোদের দিকে তাকিয়ে কোনও কোনও যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত বন্দী, সূর্যোদয়ের কল্পনা করে নিতে ভালবাসে। সোনালী মাসি, একলাখ, পরী, মালতী... এদের জগতের মধ্যে এই ছোট্ট ঘরটার মধ্যে ঘিনঘিনে ভাড়া-খাটানো জীবনটায় যা কিছু পাওয়া যায়... ওই একদিনের অত্যাচার আর পরের দিনের সমবেদনা, দুটোই লাইনের শিউলির কাছে ছিলো তার বাইরের একটা পাওয়া। ভদ্দরলোকের ছেলে বলেই হয়ত, বেশি কথা বলত না, অথবা বলতে চাইত না। শুধু চোখের দৃষ্টিটা পালটে যেত অদ্ভুত ভাবে... মাঝে মাঝে চা-বিস্কুট খেতে চাইত, সেদিন অল্প হাসত। এই ভাবে প্রায় দু’বছর ছেলেটার আসা যাওয়া ছিল। মাঝে মাঝে কোনও মাসে না এলে শিউলির শরীরটা নীল হয়ে থাকত... অন্য কাউকে সেভাবে খুশি করতে পারত না। নিজে দু’ঘা খেলে তিন ঘা ফিরিয়ে দিতো একে তাকে। দীর্ঘ সময়ের পরে এলে ছিঁড়ে-খাবে, জেনেও অপেক্ষা করত... তীব্র যন্ত্রণার অপেক্ষা... যা শিউলিকে বুঝিয়ে দিতো, এখনও সে বেঁচে আছে। ওই ভাবে অনিয়মের নিয়ম ছিল একটা... মাসে একবার কি দু’বার... হঠাৎ একটা মাসে পাত্তা নেই... আবার এক মাসে প্রতি সপ্তাহে একবার। তারপর একটা মাসে খুব বৃষ্টি হ’ল... ভরা শ্রাবণেই মধ্যেই বিয়ের লগনসা... এমনকি এই লাইনের বিন্দির সঙ্গেও মোতিলাল রিক্সাওয়ালার বিয়ে দিয়ে দিলো একলাখ নিজে দাঁড়িয়ে থেকে। সেই মাসে ছেলেটা এলো না... তারপরের মাস... তারপরের মাস... তারপরের মাস... জেলখানার সেই ঘুলঘুলি দিয়ে আর কখনও সূর্যের আলো প্রবেশ করেনি।

দরজায় টোকা পড়ার শব্দে চমকে উঠল শিউলি... ভাতের হাঁড়ির জল শুকিয়ে তলা ধরে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে হাঁড়িটা নামালো। জল ছুঁড়ে ছুঁড়ে নেভালো স্টোভের আগুন। পোড়া ভাত আর কেরোসিনের গন্ধর অস্তিত্বই শুধু প্রবল সেই ঘরে। আবার দরজায় ঠকঠক শব্দ... খিঁচিয়ে উঠতে গিয়েও নিজে সামলে নিলো শিউলি... দরজাটা খুলে দেখলো সান্টু দাঁড়িয়ে আছে, হাতে রোল করা রঙিন পোস্টার। সান্টুকে এই সময় দেখে চিড়বিড় করে উঠল শিউলি, “এই যে কাত্তিক... তোমার একলাখ মাস্টার এটা শেখায়নি, যে এই সময় দরজা বন্ধ থাকলে টোকা দিতে নেই?!” সান্টু একটু থতমত খেয়ে বলল, “না... মানে বিকেলের পরেই আসতাম... কিন্তু তখনও তো... কাছেই এসেছিলাম, তাই আর কি...”
“থাক, যা করার করে কেটে পড়... আমায় গিলতে দে!” সান্টুর বয়স বছর কুড়ি হবে... খুব চালাক চতুর ছেলে। সকালে কাগজ-দুধ বাড়ি বাড়ি সাইকেল করে বিলি করে... ইলেক্ট্রিকের দোকানে কাজ করে... একলাখের ফরমাশ খাটে। আর লাইনে আসা যাওয়ার সুবিধে তো আছেই, এমন কাজের ছেলের দালাল হিসেবেও ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। শিউলিকে পাশ কাটিয়ে ঢুকে, একদম পেশাদারিত্বের সঙ্গে ফর ফর করে সব পুরনো পোস্টার, ম্যাগাজিন থেকে কাটা ছবিগুলো ছিঁড়ে ফেলল। তারপর একটা একটা করে পোস্টার আঠা দিয়ে সেঁটে দিলো বেশ জায়গা মত। নতুন বিলিতি বিনোদিনীদের লাস্যে ঝলমল করে উঠল ঘরটা। টিউবলাইটটা অন করে আবার অফ করে সব দিক দেখে শিউলির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ব্যস্‌... একদম ফাস্‌ ক্লাস!’ শিউলি এক তাল ভাতের দলা মুখে পুড়ে লঙ্কায় কামড় দিয়ে বলল ‘হুম’। ভাতের থালার দিকেই তাকিয়ে ছিল, দেওয়ালের কি হ’ল দেখার প্রয়োজনও মনে করল না। বেশ কিছুক্ষণ সান্টুর সারা না পেয়ে মাথা তুলে দেখল সে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। কাঁধ থেকে আঁচলটা সরে যায় কখন, সে তো নিজেই টের পায় না আর। আর শরীরের বাকিটা তো নিজের মর্জি মতনই লোকের নজর ডেকে নেয়। সান্টুর দিকে তাকিয়ে সেই শিউলি-ছাপ বাঁকা হাসিটা নিয়ে বলল, “এদিকে কেউ দেখে না বলে তো ওই সব রঙচঙে মাগীদের ফটো সাঁটালো তোর বাপ... এই যে ড্যাব ড্যাব করে চেয়ে আছিস... তার তো ভাড়া লাগবে, কে দেবে তুই না তোর বাপ?” সান্টু সঙ্গে সঙ্গে অন্যদিকে চোখ ফিরিয়ে ছেঁড়া কাগজগুলো একসাথে জড় করতে লাগল। একেবারেই আর শিউলির চোখের সঙ্গে চোখে মেলালো না। শিউলি খিল খিল করে হেসে উঠল, রাস্তা থেকেও সেই হাসির আওয়াজ শুনে কেউ কেউ তাকালো খোলার দরজার দিকে। শিউলির ঊরুতে বিকেলের রোদ এসে পড়ছে। সান্টু থতমত খেয়ে খাট ছেড়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলো। শিউলি চেঁচিয়ে ডাকল ‘ওয়ে ঢ্যামনা... শোন!’ পায়ে চটি গলাতে গলাতে পেছন ফিরে তাকাল সান্টু। সুরটা একটু নরম করে শিউলি বলল , “তুই তো কাগজপত্তর বেচতে অন্য পাড়ায় যাস... থাকা-খাওয়ার ঠিকে ঝিয়ের দরকার হয় না কারও? অল্প মাইনে হলেও চলবে... শুধু যদি থাকার... ”

... ... ...

“না না না... পাগল না পেট খারাপ... দেড় হাজার টাকা মাসে!”, স্নিগ্ধা এফ শার্পের পর্দায় চিৎকার করে উঠল। দরজার সামনে কাগজ দেয় যে ছেলেটা, সে দাঁড়িয়ে... অনেকদিন আগেই সতানিক বলেছিল, “পুরনো কাজের মাসিটা চলে যাওয়ার পর আমাদের হাল খুব টাইট... বৌদির হাতে হাতে কাজ করে দেয়, এমন কাউকে পেলে দেখ না ভাই... প্লিজ, তোকেও কিছু দেবো।” সেই মতই কাগজের ছেলেটা নিয়ে এসেছে মাঝবয়সি একজনকে... দেখে সধবা কিনা বুঝতে পারছে না স্নিগ্ধা।
- “কি গো! তুমি কিছু বলতে পারছ না?... দেড় হাজার চাইছে যে!”
- “চাইলেই দিতে হবে নাকি... কাটিয়ে দাও... অন্য কাউকে দেখবো।”, ল্যাপটপের দিকে তাকিয়েই উত্তর দিলো সতানিক।
“না ভাই... অত পারব না। একটু কমসম করে বল... হাজার অবধি পারব, তার বেশি না।” স্নিগ্ধাকে পার করে ঘরের ভেতর, ফ্ল্যাট স্ক্রিন টিভি, ঘরের সাজানোর আসবাব, সতানিক... সবকিছুই দেখতে পাচ্ছিল সেই দেড় হাজার টাকা পারিশ্রমিক চেয়ে বিব্রত করা মহিলাটি। কোমড়ে হাত দিয়ে বাঁকা হেসে বলল, “নাহ্‌... এত কমে বড় লোক পাড়ায় ডিউটি হয় না... এলুম গো বৌদি। এলুম গো দাদাবাবু।” পেছনে ছেলেটা বোকার মত তাকিয়েছিল। যেন কিছুই বুঝতে পারছে না। ঘরের ভেতর ছুঁড়ে দেওয়া “এলুম গো দাদাবাবু”-র শব্দে সতানিক দরজার দিকে তাকালো, কাগজ দিতে আসা ছেলেটিকে বলল, “এরপর কত নেবে সেসব খোঁজ করে আনিস বস... ফালতু ঝামেলা না হ’লে।”

“এটা কি হ’ল শিউলিদি? তুমি এমন কেস খাওয়ালে মাইরি!”
“বেশ করলাম... এত হাইফাই বাড়িতে কেন নিয়ে গেছিলি?”
“আরে তা বলে দেড় হাজার বলে নখরা কেন করলে? বললেই হ’ত পারব না।”
“মদন! ওই ভাবে পারব না বলা যায় না... ও বাড়িতে কাজ করা অসুবিধে আছে... বউটা সুবিধের না, দু’দিনে বুঝে নিতো... সে এক কিচাইন... তা’ছাড়া...”
“তা’ছাড়া কি?”
“কিছু না... তুই এখনও দালালী শিখিস নি... তোর বাপ কে বলে দেবো!”

... ... ...

হঠাৎ করেই সন্ধের পর থেকে বেশ বৃষ্টি। ছুটির দিন সন্ধেবেলা... সারা সন্ধে আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি। সতানিকও সারাদিন কেমন গুম মেরে আছে। অফিসের ল্যাপটপটার দিকে তাকিয়েই কাটিয়ে দিয়েছে পুরোদিন। মাঝে মাঝেই স্ল্যাং বলছে কাজ করতে করতে, হয়ত অফিসের চাপ... কিন্তু বিরক্তিকর লাগে স্ল্যাং শুনতে এই ভাবে। যতই ফ্রাস্ট্রেশন থাকুক, নিজের স্ত্রীর সামনে এভাবে স্ল্যাং বলাটা ভীষণ ডিসগ্রেসফুল মনে হয় স্নিগ্ধার। বিরক্তিকর ওই বিলবোর্ডের মেকি হাসিটাও ওই ভাবেই গালি দিয়েছে সারাদিন বারান্দায় গেলেই। ডিনারের পরেও সতানিক শুতে আসেনি, ল্যাপটপ হাতে বসে আছে ড্রয়িংরুমে, টিভিতে প্রিমিয়ার লিগ চলছে। স্নিগ্ধা একাই লাইট অফ করে শুয়ে পড়েছে, বৃষ্টি, বিরক্তি আর তন্দ্রা নিয়ে। কখন ঘুম এসে গেছিল খেয়াল নেই। ঘুমটা চকিতে ভেঙে গেলো দু’টো পায়ের ফাঁকে সেই পরিচিত গরম নিঃস্বাসের উপস্থিতিতে... একটা উষ্ণ জিভ, ভীষণ চঞ্চল হয়ে উঠে প্রবেশ করতে চাইছে স্নিগ্ধার অভ্যন্তরে, অনেক দিন পর। শিউরে উঠল স্নিগ্ধার শরীর, সুখে নাকি উৎকণ্ঠায়? সেটা বুঝে ওঠার আগেই অনুভব করল... সমস্ত শরীরে সেই পরিচিত দংশন চিহ্নগুলো একে একে জেগে উঠছে... ফিসফিস করে ডাকছে, স্নিগ্ধার কোনও গোপন নাম ধরে।

হঠাৎ করেই সন্ধের পর থেকে ঝুম বৃষ্টি। ট্যাক্সির কাঁচের মতই থেকে থেকে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে শিউলির চোখের সামনেটা। নাহ্‌ শিউলি ট্যাক্সি চড়েনি বেশ কয়েক বছর হয়ে গেছে। গ্যারান্টি যে শেষ... আর কে চড়াবে? ট্যাক্সিগুলো বৃষ্টির মধ্যে হুশ হুশ করে রাস্তা দিয়ে চলে যাচ্ছে, অন্ধকার ঘরে বসে সেই আওয়াজ পাচ্ছে শুধু। হঠাৎ যে কেন শরীরটা বিকেল থেকে সায় দিচ্ছে না, শিউলি নিজেই বুঝছে না... আসলে শরীর না মন, সেটা বুঝতে দিচ্ছে না ঝাপসা চোখটা। হঠাৎ একটা ট্যাক্সি মনে হ’ল ওরই চালার সামনে এসে থামল... এত রাতে গলির ভেতর ট্যাক্সি... কেস্‌ জন্ডিস! চুপ করে বসে রইল শিউলি। কিন্তু ধাক্কা পড়ল ওরই ঘরের দরজায়। কিছুক্ষণ সব চুপ... তারপর আবার ধাক্কা। একলাখের গলার আওয়াজ, চাপা স্বরে “দরওয়াজা খোল... ম্যায় ইকলাখ!” শিউলি ঘরের আলো না জ্বালিয়েই দরজার একটা পাল্লা খুলল। সত্যিই একটা ট্যাক্সি বৃষ্টি ভিজছে একটু দূরে, বৃষ্টি ফালা ফালা করে দিচ্ছে হেডলাইটের আলো। একলাখ চাপা স্বরে বলল, “দারভাঙ্গা চলে গি? আমার দূর কি রিশ্তেদার থাকে... বিড়ি কি ফ্যাকটরি!” মুখে বিদ্রুপের হাসি নিয়ে শিউলি বলল, “কতয়ে বেচলি?”
“আল্লাহ্‌ কসম... সচ্‌ মে বিড়ি কি ফ্যাকটরি... দশ পেটি নিয়ে কালটি মারছি... ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে, চল।” ভিজে হাতটা শিউলির কাঁধের ওপর রাখল একলাখ, লাইটপোস্টের আলোয়ে চোখ দু’টো অদ্ভুত উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। কাঁধ থেকে হাতটা সেই একই বাঁকা হাসি নিয়ে ঝেড়ে ফেলল শিউলি, সেই শিউলি-ছাপ বাঁকা হাসিটা নিয়ে বলল, “দশ পেটি!... ভিজে গমের বস্তার দাম?”

আপনার মতামত জানান