ফেরা

অনির্বাণ ভট্টাচার্য্য


‘সরে যাও’ ব’লে নিজেই সরে গেছিল বিদিশা। সমস্যাটা কী, কোথায় ভাবতে ভাবতেই রোজকার অশান্তি, সাফোকেশন বেড়ে যাচ্ছিল। ডিসিশনটা নিতে হতই, তবু এখনো সেই ভরসাটুকু পাচ্ছি না। একটা নতুন শুরু, ওখানে রাতদুপুরে জ্বালানো নেই, ফুঁপিয়ে কান্না নেই, এতসব নেই-এর লিস্টি ধরানো বাজারের থলি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটা ছোট্ট ‘না’। বিদিশা কি অবাক হবে? মনে হয় না। হয়ত দেখা যাবে আমি না বললে ওকেই শেষমেষ বলে ফেলতে হবে সত্যিটা। তার চেয়ে নিজেই দাঁওটা মারব। ইউনিভার্সিটির চার নম্বর গেটটা এখন ঠিক আমার জন্য না। ওখানে সেমিনার-ফেরত স্লিভলেস, চুল এলো করা বাসের অপেক্ষারতা জিনস্‌-টিশার্ট, মনে করাচ্ছে ভিক্টোরিয়ার সবুজ বিকেল – ঐতিহাসিক পরী আর সান্ধ্য ঘোষণায় টহলরত গার্ড একটা শটে ফ্রিজ হয়ে যেত, আর কয়েকশ চুমু আর শরীর ছোঁয়াছুয়ির মধ্যে আমাদেরটাও জাস্ট একটা অংশ হয়ে যেত। লোকটাকে অনেকক্ষণ ধরেই দেখছি। পাগল বোধহয়। কোনোরকমে রাস্তা পেরিয়ে ডিভাইডারটায় এসেছে। বাকিটা পারছে না। এই মহানগরী, এই রাস্তাঘাটের ওর আর কি? পাশ থেকে ‘গড়িয়াহাট নিচ দিয়ে’ চেঁচানো বাসের কোনো এক জানলাওলার ছেটানো থুতুকে সে থোড়াই পরোয়া করে। চা-টা বিস্বাদ মনে হল। আজও ধারেই চালিয়ে নেব। ধারেকাছে এমন কেউ থাকে না, যে কাজের সময়ে বলবে তুমি কোন রাস্তায় হাঁটবে। একটা ডিভাইডার। পাগলটা কিছুটা পেরোল। বাকিটাও পেরোবে। আমি?
সিগন্যাল দেওয়া। বাকিরা পেরোচ্ছে। পাগলটা এখনো দাঁড়িয়ে। একা। চোখে চোখে আর পারছি না বোঝালেও বিদিশা ক্যান্টিন থেকে বেরোতে গিয়ে বারকয়েক পিছু ফিরেছিল। আমারও শেষ এসএমএস টা লিখতে কেন যে এত বানান ভুল হয়ে যাচ্ছে? মা-বাবা, সেট্‌ল হওয়ার তাড়া, গয়নাগাঁটি, ‘মেয়ে হলে বুঝতে’, এসব পেরিয়ে একটা সিদ্ধান্তে আসাটা একটা লড়াই। বাকিটুকু জুড়ে থাকে একটা মেয়ের মুখ। আশ্চর্য, পাগলটা ডিভাইডার থেকে আবার ওপারের ফুটপাথেই ফিরে গেল। চায়ের গ্লাসটা হাত থেকে পড়ে গেল। বিদিশা গাইলে আকাশ ভরে ওঠে। আজ পঁচিশে। হঠাৎ-ই বিপ্‌ বিপ্‌ ‘তোমায় দেখতে ইচ্ছে করছে খুব।’ – ‘আমারও’। ফেরার সময় লোকটাকে খুঁজে পাইনি।

আপনার মতামত জানান