মা-এর কথা

সোমা মুখোপাধ্যায়
দেখতে দেখতে বহুবছর হলো মার্কিণ-মুলুকে পরবাসী, কর্মজীবনএর অভিজ্ঞতাও আমার এদেশেই। অধ্যাপনার সূত্রে ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে নিয়ে চলা, অনেক ক্ষেত্রেই তাদের নিয়েই জীবনের অনেক কাহিনী। বিভিন্ন শহর , বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বিচিত্র মানুষ দেখে চলেছি আর জমে যাচ্ছে উপচে পরা বিস্ময় !! আজকের এই কাহিনী সেইরকম-ই এক অভিজ্ঞতা থেকে নেওয়া।
সিনসিনাটিতে থাকাকালীন একটি ছোট কলেজে পড়িয়েছিলাম কিছুদিন। কলেজ-টি ডাউন-টাউন এর কাছে, কৃষ্ণাঙ্গ ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা বেশ বেশী। এদেশের অধিকাংশ শহরেই ডাউন-টাউন এলাকার চিত্র একই ধরণের, কৃষ্ণাঙ্গ ও অর্থনৈতিক ধাপের বেশ নিচুস্তরের লোকেদের বাসস্থল বেশি; বাড়ি-ঘর গুলোতে দৈনতার ছাপ স্পষ্ট; তারফলে জীবিকা নির্বাহের তাগিদে পড়াশুনো জানা ও ইচ্ছুক দু-এর সংখ্যাই শতকরায় বেশ কম। তবে পড়াশুনা করতে চাইলে অনেক রকম সুযোগ ও আর্থিক সাহায্য সরকারের থেকে দেওয়া হয় এটাও ঠিক। সঠিক সদ্ব্যবহার করতে পারলে জীবনে কিছুটা উন্নতি করতে পারে এইসব জায়গার বাসিন্দারা। কিন্তু উৎসাহ দেবার ও নেবার লোকের সংখ্যা কম। এখানে স্কুলের গন্ডী পেরোনোর সময় উচ্চ-শিক্ষা, কলেজ ও কর্মের সম্ভাবনা সম্পর্কে অনেক রকম বাস্তব শিক্ষা দিয়ে দেওয়া হয়, কিন্তু এই সব অঞ্চলের ছেলেমেয়েরা বহু ক্ষেত্রেই বিভিন্ন কারণে তার বহু আগেই স্কুল ছেড়ে দিয়েছে। তারপর কিছুটা বড় হয়ে অনেক ঘাটে অনেক কঠিন পরীক্ষা দিয়ে হয়ত বুঝেছে লেখা পড়া করলে একটু অন্য ও সুস্থ জীবন, সম্মান ইত্যাদি পেলেও পাওয়া যেতে পারে, তাই তখন নাম লিখিয়েছে কলেজের খাতায়। আমরা বিদেশ থেকে এসে তাদের-ই ভাষায় বিদেশীদের শিক্ষার দায়িত্বে, কাজেই ভাষা, আদব-কায়দা অনেকই রপ্ত করতে হয়েছে সময়ের সাথে। এই কলেজের আগে দুটো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর অভিজ্ঞতা হলেও লক্ষ করলাম আবার একটু হোঁচট খাচ্ছি, কারণ এখানকার ছাত্র-ছাত্রীদের উচ্চারণের ও কথা বলার কায়দা আর একটু অন্য ধরণের। খুব অসুবিধে হলে ছাত্র-ছাত্রীদের থেকেই জেনে নিতে থাকলাম উচ্চারণের কায়দা। আর ওরাও মহা উৎসাহে শেখাতে লাগলো আমায়। এই দেশে একটা বড় সুবিধে কেউ পড়াশুনা করতে চাইলে যে বয়েসেই হোক তারা সে সুযোগ পায়। কাজেই ক্লাসে অনেক বড় বয়েসের ছাত্রীরা রয়েছে। আসতে আসতে সবই যখন আয়ত্বে আসতে শুরু করেছে বিপত্তি শুরু হলো এইরকম-ই এক বয়স্কা মহিলা মেরী-কে নিয়ে। নার্সিং পড়বে বলে এসেছে কলেজে, তবে সে সারাক্ষণ-ই হই হই করে, কথা বলে ও হাসে, প্রশ্ন থাকলে অপেক্ষা করার ধার ধারে না, ক্লাসের শুরুতে করিডরে এমন হুল্লোড়বাজি করে যে অন্য প্রফেসর এর থেকে আমার কাছে অভিযোগ-ও এসেছে। বারবার মনে করিয়ে, ছোটো বাচ্ছাদের মত ‘time-out’ করেও সামলাতে পারি না। আমেরিকানরা এমনিতে খুব উচ্ছ্বাসপ্রবণ, খুব হৈ-হৈ করে হাত-মাথা নেড়ে কথা বলে। কিন্তু এই মেরী যেন তারও এক কাঠি ওপর দিয়ে যায়। যখন বলি এরকম আবার করলে আমি ভীষণ রেগে যাব, উল্টে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে তুমি ওইরকম সুন্দর হাসো, তুমি রাগ করতেই পার না. খুব মুশকিল-এ পড়া গেল যা দেখছি ! কিন্তু এত সব হলেও কিছু বলতে পারি না কারণ দেখি সত্যি পড়ার আগ্রহ আছে; কিছু বুঝতে এলে যখন বোঝাই খুব মন দিয়ে শোনে, হোম-ওয়ার্ক যা দেওয়া হয় সব করে আনে ঠিক মতো। মনে মনে ভাবি একটা সেমেস্টার, বড়জোর একটা বছর থাকবে ছাত্রী হিসেবে, ঠিক ম্যানেজ করে নেব। যখন জীবনের এত পরে এসেছে পড়তে তখন গুরু হিসেবে সেটাও তো আমার ধর্ম ওকে সঠিক রাস্তায় চালিয়ে নিয়ে যাওয়া। ভাবি পড়ার চাপ বাড়লে আপনা থেকেই কমে যাবে। তা আমার আন্দাজ কিছুটা ঠিক হতে লাগলো, প্রথম দিকে যত লাগাম ছাড়া ছিল আসতে আসতে সেটা কমতে শুরু করলো, পরীক্ষাতেও দেখলাম ভালো করছে। ভালো লাগলো দেখে। আমি ক্লাসে শরীরবিদ্যা জীববিদ্যার সাথে সাথে মানবধর্ম শিক্ষাও উল্লেখ করি যে মানুষের মানুষের প্রতি ভালবাসা, সহানুভূতি থাকার কত দরকার; আর মনে করাই আমরা জীবনে পেশাগত দিকে যাই করি আমাদের উচিত আমাদের সমাজকেও কিছু দেওয়া উন্নতির জন্য। এগুলোর সঙ্গে সঙ্গে গল্প করি জীবনের, আমার ও আমার জানা কিছু গল্প; উল্লেখ করি জীবনে কতরকম কঠিন সময় গেছে তবু ভালো চিন্তা মনে রেখে স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলেছি কারণ জীবন থেমে থাকে না। এবং দুঃখ-কষ্ট সবারই আছে কম বা বেশী । শিক্ষকতার সূত্রে হয়ত জ্ঞান দেওয়া তবু বলি।
এদিকে এগিয়ে চলেছে সেমেস্টার, মেরীর উদ্দাম ভাব অনেকটা কমলেও একেবারে হৈ-চৈ বিলীন হয়ে যায় নি, সেটা হয়ত ভালো-ও লাগত না। আমিও খুব জোরে হাসি, অধ্যাপিকার পক্ষে শোভন নয় বলে সংযত হয়ে থাকি এই আর কি। কোর্সের শেষে ছাত্রদের রিসার্চ প্রেসেনটেশন আছে, সবাই খাটছে ভালোই, মেরীও অনেক বেশী মনঃসংযোগ করে । নিজের থেকেই একটা বেশ শক্ত বিষয় বেছে নিয়েছে, ক্লাসের পরে নিয়ম করে ওর টিম ও আমার সাথে প্রাকটিস করে, অবাক হয়েছিলাম। কিন্তু বুঝি নি অবাক হওয়া কতটা বাকি ছিল।
প্রেসেনটেশন এর দিন আমি অবাক !!! এ যেন সেই মেরী নয়, যেন আমার কার্বণ-কপি, স্কার্ট, জামা, জুতো....... সব অবিকল আমার মতো, শুধু এক মাথা ঝাঁকরা কোকড়ানো চুল ছাড়া যেন আমার ছায়া। অনেক চুপচাপ, শান্ত এবং তার সঙ্গে সারা ক্লাসকে চমকে দিল ঝকঝকে বক্তৃতা সব নিয়ম ও সময় মেনে। এত ভালো উপহার জীবনে কম পাওয়া যায়, আমার পরিতৃপ্তি অনেক। ক্লাসের পরে বলল তোমার সময় আছে? কিছু কথা বলতে চাই। অবশ্যই, তুমি আজকে যেভাবে নিজেকে উপস্থিত করেছ, প্রস্তুতি নিয়েছ তার পরে অনুরোধ আমাকে রাখতেই হবে, বললাম হেসে। সেই হৈ-হৈ করে বলল দেখেছ তোমাকে কেমন সারপ্রাইস দিয়েছি, অনেকদিন ধরে শপিং করেছি তোমার মত জামাকাপড় কেনার জন্য ! সে আর বলতে, বলে খাতা-বই-কাগজ গোছাতে গোছাতে মৃদু হেসে তাকিয়ে দেখি যার হৈচৈ নিয়ে সমস্যা ছিল তার কালো দুচোখের তারা দিয়ে অঝোর ঝরে বাদল ধারা বয়ে যাচ্ছে। বলে চলল এক নিঃশ্বাসে, জান আজ কুড়ি বছর হলো আমার ছোট ছেলে মারা গেছে। আমার তিন ছেলে, একা মা আমি বড় করছিলাম ওদের। কলেজের কাছেই বাড়ি। একদিন বিকেলে মেজ আর ছোট ছেলে গেছে খেলতে, ওরা দুজনে কাছাকাছি বয়েস তাই একসঙ্গেই থাকে প্রায় সারাক্ষণ। হঠাত শুনলাম গুলির আওয়াজ ; অত খেয়াল করি নি. এচত্তরে মাঝে মাঝেই শুনি ড্রাগ ইত্যাদির বচসা। একটুর মধ্যেই দরজায় ধাক্কা সজোরে, বুকের ভিতরটা কেমন করে উঠলো। দৌড়ে গিয়ে খুললাম মেজ ছেলে দাঁড়িয়ে আছে ছোটছেলের রক্তাক্ত গুলিবিদ্ধ দেহটা কোলে নিয়ে। হাসপাতালে নিয়ে যেতে যেতে মারা যায় ছেলে। কারা রাস্তা দিয়ে গুলি করতে করতে যাচ্ছিল, শিকার হলো আমার ছেলে। কোনদিন খুনীরা ধরা পড়ে নি, কোনো বিচারের চেষ্টাই হয় নি কারণ আমরা গরীব। কিন্তু জান ডঃ সোমা আমি কিছুতেই ভুলতে পারি না ছেলের ওই রক্তাক্ত নিস্তেজ শরীর, ভুলতে পারি না ছেলেরা খেলতে গেল আর আমার কাছে ফিরে এলো না; তাই আমি অত হৈচৈ করি বুকের ভেতরে জমাট কান্নাটা আটকাতে। আমি বুঝতে পারতাম লোকে বিরক্ত হচ্ছে, কিন্তু কেউ কোনদিন আমাকে বুঝতে চায় নি, তুমি প্রথম আমাকে বোঝার চেষ্টা করেছ, তুমি রেগে গেলেও আমার সঙ্গে প্রথম থেকে ভালো করে কথা বলে বোঝানোর চেষ্টা করে গেছ। আমি তোমার কথায় আবার নতুন করে জীবনকে ভাবতে শুরু করলাম, মনে হলো সত্যি যা চলে গেছে তার হাহাকারে তো জীবনের পুরো সময়-টাই চলে যাচ্ছে। আমার মেজ ছেলে যে ওই অবস্থায় ভাইকে কোলে তুলে নিয়েছিল সেও তো কেমন হয়ে গেছে, অথচ সে কথাও আমি ভাবি নি, শুধু নিজের দুঃখ নিয়েই ভেবে গেছি.........এখন মনে হচ্ছে আরও কত হারিয়ে ফেলেছি ....... তোমার কথায় আমি তাই আস্তে আস্তে নিজেকে সংযত করতে শিখলাম.........দেখো আমি ঠিক ডিগ্রী নিয়ে বেরোব যাতে সুস্থ জীবন দিতে পারি সমাজকে ।
আমি সারাটা সময় শুধু মেরীর হাতটা ধরে বসে ছিলাম, বুঝতে পারছিলাম ওর এই কুড়ি বছরের জমে থাকা দুঃখের বোঝা ও আর টানতে পারছে না, হাল্কা হতে চাইছিল কাউকে বলে। কারও কাছে নিজেকে সঁপে দিতে চাইছিল, অবশেষে আমাকে পেল যে ওর জীবনে মঙ্গলদ্বীপ জ্বালিয়েছে বলে ওর বিশ্বাস।
হাঁ, ভালো ভাবেই পাশ করেছিল আমার কোর্সে, এবং অন্যান্য গুলোতেও ভালই করছিল বলে খবর পেয়েছি। যখন-ই কলেজ চত্বরে দেখা হোত দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরত।
মেরী ওর কুড়ি বছরের ব্যাথাভরা পাত্র কতটা খালি করতে পেরেছিল জানি না, কিন্তু আমি ওর জীবনে এরকম অনুপ্রেরণা হতে পেরেছিলাম জেনে আমার জীবনের অনেক পূর্ণতা এসেছিল বলাই বাহুল্য। নতুন বছরে আশা করব এইভাবেই মলিনতা, দীর্ণতা সবার মন থেকে দূর হোক, পৃথিবী হোক আরও সুন্দর।

আপনার মতামত জানান