মুখখাতার বন্ধু

তুষার সরদার
মুখখাতায় বন্ধুত্ব করার কত বিচিত্র আর কত অদ্ভূত নিয়ম আছে। অদ্ভূততর কত মানুষ-মানুষী আছে সেই মুখখাতার পাতায়। তার পাতায় পাতায় ‘বন্ধুত্ব’ করা ছাড়াও তাদের নানাবিধ নগ্ন বা অর্ধনগ্ন উদ্দেশ্যরা চরে বেড়ায় সেখানে।
বিচিত্র ধরণের আত্মরতির তৃপ্তিসাধনের নিতান্তই হাস্যকর চেষ্টা এবং সেই সঙ্গে সবরকমের ব্যাবসার উদ্যোগ ও প্রচার চলে সেখানে। এমন কী সেখানে নারী ও পুরুষের জন্য প্রকাশ্যে বেশ্যাবৃত্তির আহ্বানও থাকে। অথচ আন্তঃরাষ্ট্রীয় এই সংগঠনটিকে কী চমৎকার একটি দুর্দান্ত রকমের গালভরা নামে ভূষিত করে দেওয়া হয়েছে! - সোস্যাল নেট ওয়র্কিং সাইট!
অদম্যস্পৃহ স্ব-বিজ্ঞাপিত শত সহস্র কবিতে আর অনেক লেখকে শিল্পীতে ছয়লাপ মুখখাতার এই অদ্ভূত জগতে, যেখানে ফ্রেন্ড রিক্যোয়েস্ট পাঠাতে হয় – পাঠানো যায়! কখনও এক ছদ্মবেশী আর এক ছদ্মবেশীকে ফ্রেন্ড হতে রিক্যোয়েস্ট করে। আবার সেই রিক্যোয়েস্ট ‘অ্যাকসেপ্টেড’ হলেই তারা পরস্পরের ‘বন্ধু’ হয়েও যায়, যে যার জায়গাতে বসে থেকে। কেউ কাউকে ভালো করে জানলোই না, তবুও তারা বন্ধু হয়ে যাবে।
মুখখাতার বিধিবদ্ধ নিয়মের মধ্যে দারুণ সতীত্বের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে এও বলা আছে কোন ব্যক্তি কোন অচেনা নারী-পুরুষকে বন্ধুত্ব গড়ার প্রস্তাব দিতে পারবেন না। তা সেই ব্যক্তিটি যেমনই হোক আর যত দূরেই বসবাস করুক না কেন! শিলিগুড়ির চিরশ্রী আর কলকাতার সমীক পরস্পরের একবারেই অচেনা ছিল। তবু শিলিগুড়ির চিরশ্রী সেইভাবে একদিন মুখখাতার পাতায় হাঁটতে হাঁটতে কলকাতার সমীকের বন্ধু হয়ে গেল। নাকি বান্ধবী হয়ে গেল?

প্রথমে ইনবক্সে কুশল বিনিময় টিনিময় ‘আপনি’ দিয়েই চলছিল। কিন্তু চিরশ্রী বেশিদিন দেরি না করে ঝটপট ‘তুমি’তে এগিয়ে চলে এলো। তারপর সেখানেও বেশিদিন আটকে না থেকে মুখখাতার বাইরে এসে চিরশ্রী একদিন সমীকের সরাসরি ব্যক্তিগত ফোনে আচমকা ঢুকে পড়ে বললো –
-‘বলো তো দেখি, আমি কে কথা বলছি! বলো বলো বলো...’!
সফেন ঢেউতোলা অন্তরঙ্গতায় ভেসে আসা সেই তরলিত আগ্রহী নারীকণ্ঠের হঠাৎ আহ্বানে প্রথমটায় বেশ চমকে আর থমকে গিয়েছিল সমীক।
মুখখাতার বৈদ্যুতিন পৃষ্ঠার সীমিত ইনবক্স চ্যাটিং এড়িয়ে প্রায়ই চলভাষের মাধ্যমে কত না কথা সমীককে বলতে থাকলো চিরশ্রী। সমীকের সঙ্গে কথা-বলা কত যে পছন্দ চিরশ্রীর সে কথা, পরিচয়ের আগে থেকে মুখখাতায় সমীকের ছবি দেখে সমীককে নিয়ে কত কী ভেবেছে চিরশ্রী সেসব কথা, সেই সঙ্গে - সমীক জানতে না চাইলেও তার নিজস্ব ভালো-লাগা আর ভালো-না-লাগা, - সব গড়গড়িয়ে সমীকের আড়ষ্টতা কাটিয়ে না উঠতে পারা কানে প্রায় একতরফা ভাবে ঢালতে লাগলো চিরশ্রী।

দিনে দিনে আরো এগিয়ে গেল কথান। আরো ঘনিয়ে উঠতে লাগলো সম্পর্ক। চিরশ্রী কাছেই সমীক জানতে পারলো চিরশ্রীর স্বামী, থুড়ি হাবি-নির্বাচন নাকি তেমন ভালো হয়নি। একমাত্র কন্যাসন্তানটির মুখ চেয়েই সে এই হাবি-র সঙ্গে বাধ্য হয়ে যে যার মতো এক বাড়ির ছাদের তলায় থাকতে হয় বলেই থাকে। তবে এক বাড়ির ছাদের তলায় থাকলেও তারা এক মনের ছাদের তলায় কখনই থাকে না। সমীকের মনের ছাদের তলা এখন কি তবে পছন্দ হল চিরশ্রীর?
চিরশ্রী প্রতিষ্ঠানগত শিক্ষায় রবীন্দ্রভারতী থেকে ইংরেজিতে এম.এ. করেছে। পেশায় শিলিগুড়ির এক স্থানীয় টেকনিক্যাল কলেজের অধ্যাপিকা। ইংরেজি ও বাংলা দুরকম ভাষার সাহিত্যেরই সে একজন সন্ধিৎসু এবং বিশিষ্ট পাঠক। অন্ততঃ মুখখাতার পাতায় নিজের সম্বন্ধে সেরকমই লিখে রেখেছিল চিরশ্রী নিজেই। মুখখাতার এই এক বিরাট সুবিধা। নিজের সম্বন্ধে নিজের পছন্দ মত কত কিছুই না মুখখাতার পাতায় নির্বিবাদে অসঙ্কোচে লিখে দেওয়া যায়।
সমীক নিজে একজন কেন্দ্রীয়-সরকারি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের আধিকারিক। তার কাজের বেশ কিছু অংশ জটিল এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তধর্মী। শিলিগুড়ির কোন এক টেকনিক্যাল কলেজে আজকাল ইংরেজির অধ্যাপিকাও প্রয়োজন হচ্ছে - সমীকের স্বভাব-সতর্ক মন এই অশ্রুতপূর্ব তথ্যটিতে তৎক্ষণাৎ স্বয়ংক্রিয়ভাবে লালকালি দিয়ে আন্ডার-লাইনড্‌ করে ফেললো।

মোটের উপর বেশ চলছিল সম্পর্কটা। চলতে চলতে সম্পর্কটা হঠাৎ বেশ খোঁড়াতে শুরু করলো। দায়টা পুরো সমীকের ঘাড়ে চাপানো চলে বলেই মনে হয়। চিরশ্রীর নানা কৌতূহলের উত্তরে সমীক জানিয়েছিল তার কোন নিজস্ব ‘কার’ নেই। শুধু তাই নয়, আপাতত কোন ‘কার’ কেনার ইচ্ছাও তার নেই। এমন কী একটা ভালো গোছের মোটরবাইকও পর্যন্ত নেই। তার ল্যাপটপ নেই। প্রচন্ড দামি মোবাইল নেই। ধুত্তোরি, - তাহলে সমীকের আছেটা কী?
এইসব প্রতিকূল এবং হতাশাজনক তথ্য দেওয়ার পরেও আগ বাড়িয়ে যে কথাটা বলেছিল সমীক সেটা কিন্তু মোটেই ভালো কথা নয়। বরং বলা চলে সেটা ছিল গোদের উপর বিষফোড়াঁ! চিরশ্রীর সঙ্গে মুখখাতার বন্ধুত্বের সম্পর্কটা সমীক শুধুমাত্র মুখখাতার মধ্যেই রাখতে চায় – রাখবেও। অর্থাৎ চিরশ্রীর সঙ্গে সমীক মুখোমুখি দেখা করতে ইচ্ছুক নয়। কী আশ্চর্য! নারী-পুরুষের বন্ধুত্ব বেশ চট্‌চটে হয়ে উঠতে এই ধরণের কথা বিশেষ ভাবে বাধা দেয় না কী? এখানে চিরশ্রীর উপর কোনরকম দোষারোপ করা চলে না।

আরো ক’দিন পরের এক আলাপচারিতায় সমীক আর এক বিচিত্র তথ্য জানলো। চিরশ্রীর বয়স পয়ঁত্রিশ বছর হয়ে গেলেও তাকে কিন্তু ‘মহিলা’ বলে উল্লেখ করা কোনমতেই চলবে না। ‘মহিলা’ কথাটার মধ্যে খুব স্পষ্টভাবে বেশি-বয়স্কতার এক বিশ্রী বোঁটকা গন্ধ পায় চিরশ্রী। এদিকে সমীক আবার বেশ খানিকটা নষ্ট্যালজিক স্বভাবের। পরিচিতজনদের কাউকে ছোটবেলার নানা কথা বলতে বিশেষতঃ পরিচিত কারো ছোটবেলার কথা বা ঘটনা শুনতে সে বরাবরই খুব ভালোবাসে। স্বাভাবিক ভাবে চিরশ্রীরও ছোটবেলার কথা সে জানতে চায় - এটা একদিন চিরশ্রীকে জানাবার পরে সে বেশ অবাক হয়ে বলল, সে তো এখনও ছোটই আছে, তার আবার ছোটবেলা কী? এই সময়ের কথা, এখনকার কথাই তো তার ছোটবেলারই কথা!

মারাত্মক গোলমাল বেধে গেল ঠিক এই বয়সের বিষয়টাকে কেন্দ্র করেই। অকপট সমীক পঞ্চাশের কোঠায় পা দিয়ে ফেলেছে এই ভয়াবহ তথ্যটি কথাপ্রসঙ্গে যেদিন চিরশ্রীর কানে ঢুকে পড়লো সেদিন প্রথমটায় নিতান্ত হতবাক হয়ে পড়লো সে। তিক্ত বিস্ময়ের গহন থেকে সেদিন কোনক্রমে সে শুধু বলতে পারলো,-
-তোমার তো অনে-এ-এ-এ-ক বয়স হয়েছে! তুমি তো আমার থেকে বয়সে অনে-এ-এ-এ-ক বেশি বড়!!
আগ্রহী এক বল্লরীর সবকটি আর্কষ নিমেষে অন্তর্হিত হল। ঘনায়মান আন্তরিক বন্ধুত্বের ভাষা এখন তুচ্ছ ফেনা হয়ে ছিটকে বাতাসে মিলিয়ে যেতে লাগলো। ফোনালাপ প্রায় বন্ধই হতে চললো। মুখখাতার পাতাতেও চিরশ্রীর আনাগোনা অদৃশ্য হতে লাগলো।
সমীক ফোন করলে সে ফোন কেটে দিয়ে খানিক পরে চিরশ্রীর অতি সংক্ষিপ্ত মেসেজ আসতো – ‘কলেজে ক্লাস নিচ্ছি’। একবার রাত আটটার সময় সমীকের ফোন কেটে ওই একই মেসেজ এলো। মিনিট পাঁচেক পরে চিরশ্রীর কাছে যথাযথ সফল, তবে সমীকের কাছে সম্পূর্ণ ব্যর্থ এক সংশোধনী মেসেজ এলো – ‘টিউটোরিয়াল ক্লাস নিচ্ছি’।

ক্রমাগত মিথ্যাচারের ঘন কুয়াশায় আটক হয়ে সমীকের ফোন করার আহত ইচ্ছা ক্রমশঃ মৃতপ্রায় হয়ে পড়লো। তাছাড়া এদিকে সে তো আর বয়সে খনিকটা ‘ছোট’ হয়ে যেতে পারবে না কিংবা ওদিকে চিরশ্রী তো আর বয়সে ‘বড়’ হয়ে উঠবেই না! মুখখাতার মাধ্যমে গড়ে উঠতে থাকা সম্পর্কে প্রায় পূর্ণচ্ছেদ পড়ার উপক্রম হল।
তবুও চিরশ্রীর প্রতি হয়তো সমীকের মনের কোনো এক গহন কৌণিক অবস্থিতিতে কিছু গাঢ় মুগ্ধতা থেকে গিয়েছিল। না হলে সে চিরশ্রীর কপটাচার আর আরোপিত উদাসীনতায় কষ্ট পেয়েছিল কেন? কেনই বা সেই যন্ত্রণা তাকে তার কবিতায় বিদ্ধ করলো?.....

মুখখাতার হাজার পাতায়
আমার বিশেষ বান্ধবী নীরশ্রী,
তার সঙ্গে কখনো দেখা হোত না,
কোন চাওয়াও ছিল না – জানে সে,
অথচ গত শনিবার বিকেলে
ফস্ করে ওড়নার আড়াল থেকে
আচমকা দেশলাই বের করে
একটা সুন্দর কাঠি জ্বালালো সে -
ললিত করাঙ্গুলিতে ধরে রেখে
সহাস্যমুখে আমার কাছে এগিয়ে এসে
আরো প্রশংসনীয় ফস্ করে সেটা
গলার আদুল খাঁজে গুঁজে দিল....

আপনার মতামত জানান