বুমেরাং

অর্ণব মজুমদার
এক চুমুকে এক গ্লাস জল শেষ করে অমিতাভ জিগ্যেস করল-‘কেমিস্ট্রিটা পড়ে রেখেছ ?’
কাঁচুমাচু মুখখানা আরো একটু কাঁচুমাচু করে শুভ উত্তর দিল-‘হ্যাঁ... হ্যাঁ স্যার’।
প্লাস্টিকের চশমার মধ্যে দিয়ে অমিতাভের চোখ ছাত্রের ভাসাভাসা চোখ দুটোকে জরিপ করছিল। মনে মনে বলল-‘এ মাল আজও কিস্যু পড়ে রাখে নি; সিওর, মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। একদিনের জন্যও যদি বাড়ির কাজ ঠিকঠাক করে রাখে ! যাক, আমার কি ? প্রতিমাসের শেষে তোমার বাপের গ্যাঁট থেকে দুটো পাঁচশো টাকার নোট আমার পকেটে ট্রান্সফার হলেই আমি খুশি’।
মুখে কিছু না বলে ফিজিক্যাল সায়েন্সের বইখানা তুলে নেয় অমিতাভ; পৃষ্ঠা উলটে-পালটে শুভকে একটার পর একটা প্রশ্ন দিয়ে যেতে থাকে। লাইকার অ্যামোনিয়ার সংজ্ঞা, অ্যামোনিয়ার বিজারণ ক্ষমতার উদাহরণ, অক্সিজেন শোষক দ্রবণের নাম। সেইসঙ্গে বেশ কিছু রাসায়নিক সমীকরণও লিখতে দেয়। যেমন, কি ঘটে যখন লোহিত তপ্ত লোহার উপর দিয়ে জলীয় বাষ্প চালনা করা হয়, সোডিয়াম ধাতুর সঙ্গে গরম জলের বিক্রিয়া হলে কি হয়...এইসব হাবিজাবি জিনিস আর কি !
শেষ প্রশ্নটা বলে বইটা খাটের ওপরে ফেলে অমিতাভ বলে-‘লেখো, টাইম ম্যাক্সিমাম ফোরটি ফাইভ মিনিটস্‌’।
শুভ সময় নিয়ে একটু দরাদরি করতে চায়-‘এতগুলো প্রশ্ন মাত্র পঁয়তাল্লিশ মিনিটে স্যার !’
এমনভাবে বলছে যেন সবকটা লিখে একেবারে ফাটিয়ে দেবে ! ইকুয়েশনগুলো লিখতেই তো ব্যাটার প্যান্টুলুন হ... ভাবে অমিতাভ। মুখে বলে--‘কেন, তুমি তো সব পড়ে রেখেছ বললে, তা ঝপাঝপ লিখে ফেলো। পঁয়তাল্লিশ মিনিটের অনেক আগেই তো হয়ে যাবার কথা। অবশ্য যদি ঠিকঠাক পড়া হয়ে থাকে তবেই’।
শেষের খোঁচাটার পর শুভ আর কথা বাড়ায় না, লিখতে শুরু করে দেয়। অমিতাভ কিছু করার নেই দেখে টেষ্টপেপারটার পাতা উলটোতে থাকে। সাহানার কথা মনে পড়ে যায়। তিনদিন হয়ে গেল, দেখা-সাক্ষাত কিছুই হয় নি। শুধু ফোনে-ফোনে কথা হচ্ছে। কাল তো শনিবার, আজ রাতে ফোন করে কালকের একটা প্রোগ্রাম ফিক্স করতেই হবে।
অমিতাভ ভাবতে থাকে কাল কোথায় যাওয়া যেতে পারে। কিন্তু আশ্চর্য ! চিন্তাটায় বেশিক্ষণ মনঃসংযোগ করতে পারে না। সাহানার ছবি নয়, চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা দাঁড়ি-গোঁফের জঙ্গলে ঢাকা, ঢুলুঢুলু চোখওয়ালা একটা মুখ। প্রভাতবাবু।
শুভকে পড়াতে শুরু করার পর থেকে প্রায়ই নিজের স্কুল-লাইফের কথা মনে পড়ে যায় অমিতাভর। বিশেষ করে ওকে লিখতে দিয়ে এইভাবে ফাঁকা বসে থাকার সময়টায়।
এইরকম দিন তার নিজেরও গেছে। ভেদ, অসমীকরণ, পরিমিতি, ত্রিকোণমিতি নিয়ে তাকেও গলদঘর্ম হতে হয়েছে, হাবুডুবু খেতে হয়েছে গাদা-গুচ্ছের উপপাদ্যের সমুদ্রে। কিন্তু এখন কী ভীষণ সহজ মনে হয় এই সব কিছু ! চ্যাপ্টারগুলো মনে হয় হাস্যকর রকমের ছোট !
এই যে রাসায়নিক সমীকরণ-এগুলো মুখস্থ করতেও কম বেগ পেতে হয় নি। তবে কিনা পড়তে পড়তে সে এক দারুণ পদ্ধতির উদ্ভাবন করেছিল, যাতে নাইনের প্রথম তিনমাস ছাড়া আর রাসায়নিক সমীকরণের জ্বালায় আর জ্বলতে হয় নি। বেশ রোমাঞ্চ লাগে আজ সেসব দিনের কথা মনে পড়লে।
লিখতে লিখতে শুভ একবার আড় চোখে দেখে স্যার একভাবে খোলা টেষ্টপেপারটার দিকে চেয়ে আছেন, মুখে বিজয়ীর হাসি।
অমিতাভ তখন প্রভাতবাবুর কথা ভাবছে। সকালে যাদবপুর ইউনিভার্সিটির রিসার্চ স্কলার, সন্ধেবেলা অমিতাভের প্রাইভেট টিউটর। কেমিক্যাল ইকুয়েশনগুলো মুখস্থ রাখার জন্য প্রভাতবাবুর টোটকা ছিল-‘মোট চারবার লেকো, দুবার দেকে দুবার না দেকে’।
ইয়ার্কি নাকি ! এত্ত ইকুয়েশন তাও আবার চার-চারবার করে লিখতে হবে! তোমরা তো শালা মুখে বলেই খালাস-
তবে প্রভাতবাবুর পরামর্শ অমিতাভ পুরোপুরি উড়িয়ে দেয় নি। সে বইয়ের প্রতিটি রাসায়নিক সমীকরণ ক্ষুদে হরফে সুন্দর করে গুছিয়ে তার ফিজিক্যাল সায়েন্স খাতার শেষ দুটো পাতায় লিখে ফেলেছিল। যদিও মাত্র একবার করেই।
কিন্তু একবারই তো যথেষ্ট। তারপর থেকে প্রতিবার প্রভাতবাবুকে প্রতিটি রাসায়নিক সমীকরণ নির্ভুলভাবে লিখে দেখিয়েছে সে। পরীক্ষায়ও কোনোদিন একটাও ইকুয়েশন কাটা যায় নি। শুধু ক্লাসে পড়াটাই যা বলতে পারত না। কিন্তু তাতে আর কি আসে-যায় ?
তার কারণ প্রভাতবাবু লিখতে দিলে অমিতাভ সেই খাতাটাতেই লিখেছে যার শেষ দুটো পাতায় যাবতীয় ইকুয়েশনগুলো লেখা। আর প্রভাতবাবুর সামনে পাতা উলটে দেখাটা কোনো ব্যাপারই ছিল না। লিখতে দিয়েই উনি মুখের সামনে হয় কোনও নাদুসনুদুস লিটল ম্যাগাজিন ধরে থাকতেন, নয়তো খবরের কাগজ। তাছাড়া লোকটা এমনিতেও একটু অন্যমনস্ক টাইপের ছিল। অনেক পরে, মাধ্যমিক পাশ করে যাবার পর অমিতাভ জানতে পেরেছিল মালটার নাকি কবিতা-ফবিতা লেখার বাতিক ছিল !
তবে কিনা পরীক্ষায় তো আর খাতা নিয়ে বসা যায় না। নো প্রবলেম। তখন ওই পৃষ্ঠা দুখানি অমিতাভের মোজায় ঢুকে পড়ত মাইক্রো-জেরক্স অবতারে। পরীক্ষার হলে ওতজনের মাঝে চোতা করা তো আরো সহজ। সরকারী স্কুলের টিচারগুলোর অবস্থাও তো তথৈবচ।
কী অপূর্ব ব্যবস্থা ! নামমাত্র খাটনি, একটু ঝুঁকি--কিন্তু অব্যর্থ ফল। ক্লাসের গোমড়া মুখে থার্ড বয় সৌরভ সব শুনে-টুনে তাকে জ্ঞান দেবার ভঙ্গিতে বলেছিল, ‘এসব করে তো আখেরে তোরই ক্ষতি হচ্ছে। তার চাইতে একটু পড়ে নিলে তো পারিস’।
কথাটা মনে পড়লে আজও অমিতাভের মটকা গরম হয়ে যায়। আরে কিসের ক্ষতি রে ! তুই ব্যাটা এইসব হাবিজাবি জিনিস গাঁতিয়ে কোন তীরটা মেরেছিস শুনি? তাছাড়া আমার কি আটকে আছে বল তো ব্যাটা ? শুধু ইঞ্জিনিয়ারিংখানা পাশ করলেই হল। অলরেডি সল্টলেকে একটা চাকরি অপেক্ষা করে আছে। তার ফাঁকে একটা মোটাসোটা ক্লাস নাইনের ছেলের “স্যার” হয়ে বসেছি। হাতখরচের জন্য তোদের মতো বাপের কাছে হাত তো পাতি না।
গাল চুলকোতে গিয়ে একবার ছাত্রের দিকে চোখ চলে যায় অমিতাভের। কোলের ওপর খাতাটা তুলে নিয়ে একমনে লিখছে শুভ। মাঝে মাঝে পৃষ্ঠা উলটে প্রশ্ন দেখছে।
এইটার যদি এই গুণটুকুও থাকতো ! অমিতাভ ভাবে, লেখা-পড়া করিস না, ঠিক আছে, চোতাটা অন্তত ঠিক করে মারা শেখ। তা না...হবে না এদের কিচ্ছু হবে না। শুধু শুধু বাপের পয়সার শ্রাদ্ধ করছে। নতুন এই জেনারেশানটাকে অদ্ভুত লাগে অমিতাভের। এদের একদল দারুণ স্মার্ট, বয়সের তুলনায় অনেক বেশি বোঝে, অনেক বেশি জানে, ফরর করে ইংলিশ বলে, ডিসকভারি চ্যানেল দেখে, কম্পিউটার-মোবাইলের সমস্ত অপারেশন নখদর্পণে। আবার একই এজ-গ্রুপের বেশ কিছু ছেলে-মেয়ে একেবারে হাবাগোবা; প্রথম দলটার থেকে কম করে দশ বছর পিছিয়ে। একই জেনারেশানের মধ্যে এতোটা গ্যাপ অমিতাভের কাছে এক রহস্য।
সেই দ্বিতীয় দলের একজন উজ্জ্বল প্রতিনিধি বসে আছেন তার সামনে।
অমিতাভ শুভর দিকে তাকিয়েই শেষ কথাগুলো ভাবছিল। তাই শুভ যখন আচমকা লিখতে লিখতে মাথা তুলে বলে উঠল ‘হয়ে গেছে স্যার’, তখন সে প্রায় আঁতকে উঠতে গিয়ে নিজেকে কোনোক্রমে সামলে নিলো।
অমিতাভ তড়িঘড়ি করে খাতাটা নিজের দিকে টেনে নেয়। দেখা শুরু করার আগে গলা খাঁকারি দিয়ে শুধু জিগ্যেস করে, ‘সব লিখেছ?’
-‘হ্যাঁ স্যার’।
-‘হুম!’, আর মনে মনে বলল, আর কটা ভুল লিখেছ সোনা ? নাকি কটা ঠিক লিখেছ বলতে বললে সুবিধা হবে তোমার ?
কিন্তু খাতা দেখতে গিয়ে আজ অবাক হয়ে যায় অমিতাভ। আজ প্রতিটা প্রশ্নের উত্তর ঠিক-ঠিক লিখেছে শুভ। কেমিক্যাল ইকুয়েশনগুলো একটাও বাদ দেয় নি এবং প্রতিটাই নির্ভুল ! উত্তরের পাশে বড়-বড় করে রাইট দিতে দিতে নিজের অজান্তেই সে বলে ওঠে, ‘বাঃ!’
-‘ভালো! ভালোই তো পড়া হয়েছে আজ’। খাতার দিকে চোখ রেখে বলে অমিতাভ। ‘অ্যাই, সব কটা প্রশ্নের উত্তর লিখেছ তো ?’ বলে প্রশ্নগুলো খোঁজার জন্য খাতার পৃষ্ঠা উলটোতে থাকে সে। কিন্তু অন্যমনস্কভাবে বেশি পাতা উলটে ফেলে। মুখে একটা “পিচ” শব্দ করে নিজের ভুল শুধরে নিতে চায় সে। কিন্তু ততক্ষণে ভুল করে খোলা একটা পাতায় তার চোখ আটকে গেছে।
সেই পাতাটায় এবং তার আগে-পিছের কয়েকটা পাতা জুড়ে অনেকগুলো রাসায়নিক সমীকরণ লেখা। সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর, যেগুলো অমিতাভ আজ লিখতে দিয়েছে বা লিখতে দিতে পারত।
অমিতাভ ভুরু কুঁচকে শুভর দিকে তাকায়। কৈফিয়ত দাবি করার সুরে জিগ্যেস করে, ‘এগুলো কি?’
-‘কি স্যার ? ও-ও, সেই আপনি বলেছিলেন না, রাসায়নিক সমীকরণগুলো লিখে লিখে মুখস্থ করতে, তা আমি আজকাল সব কিছুই লিখে লিখে পড়ি’।
-‘কিন্তু এই খাতায় কেন? আর খাতা নেই?’, অমিতাভ খিঁচিয়ে ওঠে।
-‘আপনিই তো বলেছিলেন স্যার, ফিজিক্যাল সায়েন্সের একটাই খাতা করতে, তাতেই সব কিছু করতে’। শুভ নিজের কাঁচুমাচু মুখখানা আরো কাঁচুমাচু করে তোলে।
অমিতাভ একটা চোখ সরু করে সন্দিগ্ধ গলায় বলে, ‘লেখার সময় তুমি পৃষ্ঠা উলটে দেখেছ ?’
শুভ প্রায় আর্তনাদ করে উঠে বলে, ‘না-আ স্যার! আপনার কাছে দেখে দেখে লিখে কি লাভ বলুন ! পরীক্ষায় কি আর আমি এসব করতে পারব ?’
কাঁচা মিথ্যুকদের কথায় একটা বেসুর বাজে। শুভর কথায় সেই বেসুর অমিতাভর কানে লাগে। কিন্তু মুখে আর কিছু বলে না সে। একটা হাঁটুর বয়সী ছেলের কাছে ঠকে যাওয়ায় তার মেজাজটা বিগড়ে যায়। খানিকক্ষণ গুম হয়ে বসে থাকে। তারপর নিজের মনেই বলে ওঠে, ‘মরগে যাক। আমার কি ! কার ক্ষতি করছে !’

আপনার মতামত জানান