ত্রিকোণমিতি

ঈশা দেবপাল
এক।
মা
পড়ার ঘরে বেশ তেরছা করে রোদ এসে পড়েছে। ছেলেটা মন দিয়ে অঙ্ক করছে। ক্লাস থ্রি। এই প্রথম সে প্রবলেম সামস করছে। ---- একটা ছেলে যদি ত্রিভুজের একটি কোণ থেকে যাত্রা শুরু করে তিনটি কোণ ঘুরে আবার প্রথম কোণে এসে পৌঁছচ্ছে, আর ত্রিভুজের প্রতিটি বাহূর মাপ ই যদি হয় ১৬০ সেমি, তাহলে ছেলেটি মোট কত দূরত্ব অতিক্রম করছে ?
--- ছেলেটা কি আমার বয়সী , মা ?
---- তা আমি কি করে জানব ? তুমি অঙ্কটা কর...
ছেলেটা মায়ের মুখের দিকে অল্প তাকায়। মায়ের মুখে রোদ পড়েছে। তার কেমন একটু অচেনা লাগে তার মা কে। তার মা আনমনা হয়ে বই পড়ছে, কিন্তু সেটা যেন ঠিক সত্যি নয়। মা যেন কাঁদছে। আট বছরের ছেলে ভিতরকার কান্নাগুলোর নাম জানেনা, শুধু বুঝতে পারে। সে তার মুখে একটা মিষ্টি ভঙ্গি করে। যে ভঙ্গি টা দেখলে সে সবসময় মায়ের মুখে একটা আলো আলো হাসি দেখেছে সে। কিন্তু এখন মায়ের মুখে একটা আলোর জ্যামিতি। অথচ সেই আলোতে কান্নার দাগ। সে আলতো স্বরে বলে—মা, তোমার ক্ষিদে পেয়েছে ?
মা অন্যদিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ে- না। ছেলেটি কাতর হয়—তাহলে কি বাবা বকেছে ? মা নিরুত্তর। রোদে মুখ ডুবিয়ে এলোমেলো বসে থাকে। মায়ের হাতে সাদা ঝকঝকে মোবাইল টা ও নিরুত্তর। মা আনমনে দেখে—যদি ও জানে আসবেনা আর কোন ও মেসেজ। ছেলের বাবা তাকে চিহ্নিত করেছে –“ আউটসাইডার” বলে, মোবাইলে তার নামটা ও সেভ করা আছে “ আগন্তুক” বলে। বাংলা শব্দ এ কি জাদু একটু বেশি থাকে ? আগন্তুক হারিয়ে গেছে--- বলে গেছে তাকে সংসার করতে মন দিয়ে। সে থাকবে শুধু মনে মনে—সারাজীবন।

দুই

বাবা
কথা তো ছিল ই সারাজীবন থাকবে। থাকা মানে কি ? ভাত রেঁধে দেওয়া ? সকালে টিফিন বানানো আর ছেলের যত্ন-আত্তি ? কিংবা সপ্তাহান্তে অনিচ্ছুক শরীর পেতে দেওয়া ?
কই, গলায় তো আর সেই বসন্তের সুর নেই ? কাঠফাটা রোদে হারিয়ে গেছে যাবতীয় সবুজ জলাশয়।
খুব কাছে, ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে ও গিয়ে সে দেখেছে তার নিজস্ব প্রিয় নদীটির পারে বুঝি বসত গেড়ে ফেলছে বাইরের কোন ও পরিযায়ী পাখি।
সে তো শুধু ঐটুকু ই বলতে চেয়েছিল—আগন্তুকেরা বাইরের লোক। ঋতু বদল হলে ই উড়ে যাবে । তার থেকে ই তো কলহ—বিবাদ –অশান্তি। সে তাই বেড়িয়ে পড়েছে একা। লং ড্রাইভে। ইচ্ছে হলেই ডেকে নেওয়া যেতে পারে যে কোন ও রমনী কে।
যতক্ষণ না আবছা হচ্ছে নদীর বয়ে যাওয়া মধুর স্রোত, তার সন্তানের গর্ভধারিণী।


তিন
আগন্তুক
সে চোখ বন্ধ করলেই টের পাচ্ছে । তাকে কেউ ডাকছে। প্রবল প্রবল ভাবে। অথচ সে জানলা –দরজা বন্ধ করে বসে আছে । ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট ডিএক্টিভহেটেড। মোবাইলে বিশেষ একটা নম্বর রিজেক্ট লিস্টে। তবু তার কাছে এসে যাচ্ছে—দূরাগত শঙ্খধ্বনির মত একটা আওয়াজ। ...তবু সাড়া দেবেনা সে। এই ডাক না শোনার জন্য কদিন ধরে সে পান করছে অনিয়মিত।
সে চেষ্টা করছে তাকে যাতে ভুল বুঝে নদীটি বাঁক নিয়ে নেয় নিজের মত। সে জানে, নাহলে অকাল বানে ভেসে যাবে কেউ কেউ। তার জীবনের বিনিময়ে হারিয়ে যাবে কেউ কেউ...।
ত্রিভুজের তিনটি বাহূ সমান হলে ক্লাস থ্রি র অঙ্ক মিলে যায়, জীবনের অঙ্ক মেলেনা।

আপনার মতামত জানান