সেদিন ট্যাক্সিতে

সুস্মিতা সরকার মৈত্র
কপাল খুবই ভালো। অফিসের সামনে থেকেই ট্যাক্সিটা পেয়ে গেলাম। অনেক রাত হয়ে গেল আজ। সারাদিন বিভিন্ন ক্লায়েন্টের বায়নাক্কা সামলে ভীষণ ক্লান্ত। শরীর আর দিচ্ছে না। ‘বালিগঞ্জ ফাঁড়ি’ বলেই সিটে শরীরটা এলিয়ে দিলাম। আর তখনই হঠাৎ চোখে পড়ল। ড্রাইভারের সিটের পিছনে লেখা ট্যাক্সির নম্বরটা খেয়াল করতেই চমকে উঠলাম। ভুল তো হবার নয়।
আসল ঘটনাটা দিন কুড়ি আগের। সারাদিনের মিটিং শেষ করে মোবাইলটা অন করতেই মিহিরের ফোন। ইমন মিসিং। শরীরটা হিম হয়ে গেল। বাড়ি ফিরেতেই ফোনটা বাজল। “রাতে ৫০ হাজার দিলে মেয়েকে ফেরৎ পাবেন, কোন পুলিশ নয়। নাহলে...” কথাটা বলেই লাইনটা ডেড হয়ে গেল। মেয়ের প্রাণের প্রশ্ন। টাকাটা দিয়েই দেবো ঠিক করলাম। পরের দিন বেলা বাড়লে এটিএম থেকে টাকাটা আনার পরই আবার ফোন, “বাহ, টাকাটা এনেছেন। বুঝলেন তো আপনি নজরবন্দী! টাকাটা হলদিরামের প্যাকেটে ভরে দেশপ্রিয় পার্কের মেইন গেটের সামনে দাঁড়াবেন রাত পৌনে ন’টায়।” আমি আর মিহির সাড়ে আটটা থেকেই দাঁড়িয়ে। শেষমেশ ন’টায় একটা ট্যাক্সি এসে দাঁড়াল। জানলা দিয়ে ঝাঁকড়াচুলো একটা ছেলে হাত বাড়াল; ‘টাকাটা দিয়ে দিন।’ টাকার প্যাকেটটা এগিয়ে দিতেই ছোঁ মেরে নিয়ে ছেলেটা প্রায় ধাক্কা দিয়েই ইমনকে নামিয়ে দিয়ে গেল। ট্যাক্সিটা যখন ছেলেটিকে নিয়ে চলে গেল তখনি মিহির নম্বরটা নোট করেছিল।
মেয়েকে ফেরত পেয়ে ভুলেই ছিলাম। কিন্তু আজ নম্বরটা দেখে কি মনে হল, ড্রাইভারকে সব বিবরণ দিয়ে ছেলেটির কথা জিজ্ঞেস করলাম। ঘ্যাঁচ করে ট্যাক্সিটা দাঁড় করিয়ে, ড্রাইভার আমার দিকে ফিরল। উত্তেজিত হয়ে বলল “তক্ষুনি জানতাম গোলমাল, যখন ট্যাক্সিতে উঠেই চুল খুলে ফেলল। চলুন, শালাদের ঠেকে নিয়ে যাচ্ছি।” “তাহলে বাড়ি থেকে আমার হাজব্যান্ডকে তুলে নিই?” “সেই ভাল”, বলতে বলতে ড্রাইভার ট্যাক্সি স্টার্ট করল আর আমি মিহিরের নম্বর ডায়াল করলাম।
কিন্তু ট্যাক্সি বাড়ির নয়, অন্য রাস্তা ধরল। আন্দাজ করলাম, কি ব্যাপার। তবু বললাম “একি! উল্টোদিকে কোথায়?” “ওদের ঠেকে!” ঠাণ্ডা জবাব। বেকবাগানের একটা গেটে ঠিকানা লেখা বড় ফ্ল্যাটের সামনে দাঁড়িয়ে ফোন করতেই তিনটে ছেলে নেমে এল। “ইমনের মা!” “আরও ৫০, মন্দ কি!” বলেই ওরা আমার ব্যাগ, মোবাইল নিয়ে নিল। তারপর ফ্ল্যাটে বসে আমার সামনেই মিহিরের সাথে টাকা নিয়ে কথা হল। শেষে রাতে আমাকে খেতে দিয়ে দরজা বন্ধ করে পাশের ঘরে চলে গেল সবাই।
পরের দিন, আমার অপেক্ষা আর শেষ হয়না। বেলা একটায় হঠাৎ কলিংবেলের আওয়াজ, আর তারপরেই চেঁচামেচি, পুলিশ এসেছে। একটু পরে ঘরের দরজা খুলে মিহির ঢুকল, “কোন ক্ষতি হয় নি তো? ভাগ্যিস তুমি ঠিকানাটা এসএমএস করে দিয়েছিলে!”

আপনার মতামত জানান