একলা বৈশাখ

রাতুল


. . . পয়লা বৈশাখ, পঁচিশে বৈশাখ, বাইশে শ্রাবণ – এই তিনটে বাংলা দিন। তবে আজ বলব ঝুমুর কথা।

কোনো একটা সময় আমার শখ ছিল পয়লা বৈশাখে অচেনা গ্রামে গিয়ে ঘুরে বেড়ানো। সেইসময় এই দিনে গ্রামে গ্রামে মুদিখানার দোকানগুলোতে কেমন একটা ধর্মহীন পুজো পুজো ব্যাপার ছিল। আমার দেশের বাড়িটা ছিল একটা গ্রামে। দিনে চারবার লোডশেডিং, কাঁচা রাস্তা, টি.ভিতে চ্যানেল বলতে DD7, আর রান্না হতো কাঠের উনুনে। কম্পিউটারের নামই শুনিনি। ফেরিওয়ালা বলতে গ্রীষ্মকালে ডুগডুগি বাজিয়ে ৩০ পয়সা দিয়ে আইসক্রিম। খেলা বলতে কিত্‌কিত্‌ আর লুকোচুরি। ক্রিকেট ছিল বড়দের জন্য। সুইমিং পুল বুঝতাম না। সাঁতারটা শিখেছিলাম ছোট্ট একটা পুকুরে। গ্রামের নাম দেবগ্রাম পলশা। তখন আমার একমাত্র বন্ধু ঝুমু। শ্যামবর্ণ, চুলে সরষের তেল, কপালে একটা টিপ আর খোঁপায় লাল ফিতে দিয়ে নিজের হাতে বানানো একটা ফুল। সাজগোজ বলতে এইটুকু। প্রসঙ্গত বলে রাখি যে, আমার বাড়িটা গ্রামে হলেও বাড়ির ভিতর গ্রামের ভাষায় কথা বলার উপায় ছিল না। বাড়ির চার দেওয়ালের ভিতর একগুচ্ছ গুরুজনদের তর্জনীর শাসন ছিল। কিন্তু আমার খুব ইচ্ছে করতো ঐ গ্রামের ভাষায় কথা বলতে। সহজ – সরল, নাটকীয়তাহীন সংলাপগুলো আমার মন ছুঁয়ে যেত। খুব তাড়াতাড়ি কথা বলা হয়। ভাব প্রকাশ করতে গিয়ে অধিক পরিমাণে নাক-চোখ-মুখ বেঁকাতে হয় না। বাড়িতে আমার বন্ধু বলতে একমাত্র ঝুমুর প্রবেশ ছিল অবাধ। তাই আমার যত কথা, খেলার সঙ্গী ছিল একমাত্র ঝুমু। ঝুমুকে আমি ‘ঝুমু দিদি’ বলে ডাকলেও ‘তুই তুই’ করতাম। কালবৈশাখী উঠলে একসাথে আম কুরোতে যেতাম। বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে একটা পুকুর ছিল, আর ঐ পুকুরের পাড়ে অনেক আমগাছ ছিল। কিন্তু বাড়ি থেকে একা যাওয়ার উপায় নেয়। তাই হাত ধরার সঙ্গী বলতে ঐ ঝুমু। আমার আবার ভয় ছিল বৃষ্টিতে। আকাশ জুড়ে বৃষ্টি নামলেই আমার মনে ভয় ঢুকে যেত। আরও বেশি ভয় ছিল মাটির রাস্তায় জলকাদায় পা পিছলে যেন পরে না যাই। ঝুমু দিদির সাথে একদিন ঐ পুকুরে আম কুরোতে গিয়ে কালো মেঘ আর বজ্রবৃষ্টি শুরু হল। আমি ভয়ে কাঁদতে শুরু করলাম। ঝুমু দিদি তখন আমার হাতটা শক্ত করে ধরেছিল। আমি যত কাঁদছি ততই ঝুমু দিদি হাসছে আর বলছে “আমি আছি তো। ভয় করছিস কেন !! বৃষ্টি হচে। কত ভাল বল তো, আর তুকে চান করতে হবে না।”
আমি আবার কাঁদতে কাঁদতে বললাম “আমার ভয় লাগছে। আমি পরে যাব পা পিছলে। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে।”
ঝুমু দিদি আবার হাসতে শুরু করলো “আমি তুকে ধরে আছি তো। আমিও কত ভিজে গেলছি দ্যাখ। ভয় করছিস কেন !! আমি আছি তো তুর সাথে।”
আমি রাগ দেখিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলাম “বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছি বলেই তো তুই আমার চোখের জলটা দেখতে পাচ্ছিস না। হাসছিস শুধু। আমাকে বেশি আম দিতে হবে। আমি বেশি কুরোতে পারিনি আজ। তুই অনেকগুলো কুড়িয়েছিস।”
“আচ্ছা বেশ। তাই দুবো।” ঝুমু আবার হাসতে থাকলো। আমার আবার রাগ হল। কিন্তু উপায় নেই, দূর থেকে আমার বাড়িটা দেখতে পেয়ে খুশি হয়ে গেলাম। ঝুমু তখনও আমার হাত ছাড়েনি। আকাশজুড়ে বৃষ্টি আর বজ্রবিদ্যুৎ।

আজ সকাল থেকে আমাদের গ্রামে কেমন একটা পুজো পুজো ব্যাপার চলে এসেছে। সকাল থেকেই বাড়িতে দু’একটা বাংলা ক্যালেন্ডার ঢুকতে শুরু করেছে। কিন্তু ঝুমু এখনও আসেনি আমাদের বাড়ি। আজ স্কুল ছুটি, তা না হলে ঝুমু এতক্ষণে আমাদের বাড়িতে বসে থাকতো আমাকে স্কুলে নিয়ে যাবার জন্য।
মাকে জিজ্ঞাসা করলাম “ঝুমু দিদি আসেনি মা ?”
মা বলল “আজ তো তোর স্কুল ছুটি। আজ আসবে কেন !”
আমি বললাম “তাহলে আজ আমি খেলবো কার সাথে ?”
“আজ খেলতে হবে না। পড়তে বস” মা গম্ভীর হয়ে উত্তর দিল। তারপর উনুনের পেটে একটা শুকনো কাঠকে ঠেলে ভরে দিল। শ্রীজাত লিখিত ঠিক এইসময়ের একটা কবিতার লাইন মনে পড়লো “আগুন ঠাণ্ডা করুক পেট”
আমার মন খারাপ করতে শুরু করলো। মনে মনে ঝুমুর প্রতি আমার অভিমান জমতে থাকলো। বই খুলে রাগে রাগে চিৎকার করে পড়তে শুরু করলাম –
“আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে /
বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে।
পার হয়ে যায় গোরু, পার হয় গাড়ি,
দুই ধার উঁচু তার, ঢালু তার পাড়ি।
চিক্‌ চিক্‌ করে বালি, কোথা নাই কাদা,
একধারে কাশবন ফুলে ফুলে সাদা।”
দুপুরে নাওয়া খাওয়া সেরে ঘুমিয়ে পড়লাম। আধো আধো ঘুমে ঝুমুর গলা শুনতে পেলাম। জেগে গেলাম। মন দিয়ে শোনার পর বুঝতে পারলাম যে ঝুমু এসেছে নীচে। উঠে পরলাম। দোতলা থেকে সিঁড়ি ভেঙ্গে নামার সময় মেজো কাকুকে জিজ্ঞাসা করলাম “ক’টা বাজছে মেজকাকু ?”
“বিকেল ৪ টে। তোমার ঘুম হয়ে গেল, এতো তাড়াতাড়ি উঠে পড়লে যে !!” মেজো কাকু উত্তর দিয়ে একবার আমার গাল টিপে দিল।
তখনও ঘড়ি দেখা শিখিনি। সবাইকে জিজ্ঞাসা করেই সময় বুঝে নিতাম। আর তাছাড়া তখন সময় বলতে আমার কাছে ঐ সকালবেলা, দুপুরবেলা, বিকেলবেলা আর সন্ধ্যাবেলা – এই চারটেই ছিল সময়। বাকি ঘড়ি দেখা সময়ের গুরুত্ব, তেমন কিছু ছিল না আমার কাছে।

আমি নীচে নামতেই ঝুমু ছুটে এসে আমার কানের কাছে ফিস্‌ফিস্‌ করে বলতে শুরু করলো “ঘুরতে যাবি ? তুকে একটো চকলেট কিনে দুবো। কিন্তু ঘরে কুছু বলা যাবে না।”
চকলেটের লোভে আমি রাজি হয়ে গেলাম। মুখে একটু জল ছিটিয়ে ঝুমুর সাথে বেড়িয়ে পরলাম। চা খাওয়ার অভ্যাস ছিল না। ঝুমুর হাত ধরে নিজের গ্রাম পেরিয়ে পাশের গ্রামে চলে গেলাম। আমাদের গ্রাম ছিল খুব ছোট্ট। পাশের গ্রামে গিয়ে একটা দোকানের সামনে ঝুমু দাঁড়িয়ে পড়লো। দোকানের দরজার দু’পাশে কাটা কলাগাছ মাটির কলসিতে ভরে দাঁড় করানো আছে। সামনের কিছুটা জায়গাতে সাদা চুন দিয়ে আলপনা আঁকা। দোকানের দরজায় সুতো দিয়ে একটা একটা করে আমপাতা ঝোলানো আছে। রাস্তা অব্দি জল ছিটিয়ে ভাল করে ঝাঁট দেওয়া হয়েছে বলে অনুমান করা যায়। কিছুটা দূর থেকে দোকানটাকে দেখতে বেশ ছিমছাম লাগছে। বড্ড ভিড় জমে আছে দোকানের সামনে। আমার চকলেটের কথা মনে পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ঝুমুকে বললাম “এই ঝুমু... চকলেট দিবি বলেছিলিস যে...”
ঝুমু ঐ দোকানের দিকে তাকিয়েই উত্তর দিল “দুবো তো। দাঁড়া একটু।”
তারপর ঝুমু কাকে যেন হাত নেড়ে ইশারা করলো। কালো, লম্বা, রোগামতো একটা ছেলে এগিয়ে এলো আমাদের সামনে। ঝুমুকে দেখে হাসছে। ঝুমুও মুখ টিপে হাসছে। কাছে এসে ছেলেটা বলল “বলো ! এতো দের করলে আসতে ?”
আমাকে দেখিয়ে ঝুমু বলল “এ ঘুমাইছিল তখন। একা একা আসতে লাজ লাগছিলো।”
ছেলেটা একটু হেসে আবার বলল “তাইলে কি বলছো বুলো ? আমি তো তুমাকে এনেক দিন আগু বুলেছিলাম। এইবেটিন তুমার কি মত বুলো ?”
ঝুমু আমার হাতটা শক্ত করে ধরে মুখ নামিয়ে উত্তর দিল “মত আছে বুলেই তো আলছি ইখানে...
বুজ না কুছু ! !”
ছেলেটার মুখে অনেক আনন্দ দেখতে পেলাম। কেমন লজ্জা লজ্জা করে হাসতে থাকলো ছেলেটা। আমার আবার চকলেটের কথা মনে পড়লো। আমি ঝুমুর হাত ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলতে শুরু করলাম “চকলেট দে ঝুমু। দোকান বন্ধ করে দেবে তো এবার।”
ঝুমু ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বলল “একটো চকলেট এনে দাও তো...”
ছেলেটা বলল “চলো..., দুকানে চলো। কি চকলেট লিবে কিনে লিবে।”
তারপর আমি, ঝুমু আর ঐ ছেলেটা দোকানের দিকে এগিয়ে গেলাম। যেতে যেতে দেখেছিলাম ছেলেটা ঝুমুর ঘাড়ে হাত রেখেছিল একবার।

পরের দিন সকাল বেলায় ঝুমু আমাদের বাড়িতে হাজির। আমি স্কুল যাবার জন্য তৈরি হচ্ছি। আর ঝুমুর সাথে বকবক করছি। কালকের বিকেলের কথা আমি বাড়িতে কাউকে বলিনি। দু’হাতে দু’খানা চকলেট পেয়ে আমি খুশি হয়ে গিয়েছিলাম। ফিরে আসার সময় ঝুমু আমাকে আর একবার সাবধান করে দিয়েছিল “ঘরে বুলিস না কাউকে”
আমি তৈরি হয়ে ঝুমুর হাত ধরে স্কুলের পথে বেড়িয়ে পরলাম। রাস্তায় যেতে যেতে আমি ঝুমুকে জিজ্ঞাসা করলাম “কাল ঐ ছেলেটা কে ছিল বলতো ? আমি আগে তো কোনোদিন দেখিনি ছেলেটাকে !!”
ঝুমু হাসতে হাসতে বলল “তুই বুজবি না।”
আমি রেগে গিয়ে বললাম “বুঝবো না কেন !! বুঝিয়ে দিলে নিশ্চয় বুঝবো...”
ঝুমু লজ্জার হাসি থামিয়ে কানের কাছে মুখ নামিয়ে চুপিচুপি বলল “ভালোবাসা বুজিস ?”
আমি বললাম “ভালোবাসা মানে ? ? আমি তো ছেলেটা, কে ছিল জানতে চাইলাম !!”
ঝুমু বলল “বুললাম তো...”
“তার মানে ছেলেটার নাম ভালোবাসা। কত লম্বা রে ভালবাসাটা। তোর থেকেও লম্বা”
ঝুমু খুব জোরে জোরে হাসতে থাকলো। আমার রাগ হল ভীষণ। রাগী মুখে আমি বললাম “হাসছিস কেন ? ? তোর থেকেও লম্বা ছেলেটা। কি এমন ভুল বলেছি আমি !!”
ঝুমু হাসি থামিয়ে বলল “ভালোবাসা গায়ে গতরের মানুষ লয়। চুখে দিকা যায় না। ভালোবাসা একটা দিন। দিনটাকে মুনে রাখতে হয়... বুজলি কুছু ? ?”
আমি বললাম “বুঝেছি... ভালোবাসা হল একটা অদৃশ্য জিনিস, যাকে মনে রাখতে হয়। কিন্তু আমি যদি লিখে রাখি !! ? লিখে রাখা যায় না ঝুমু ??”
ঝুমু আমার দিকে আফসোসের চোখে তাকিয়ে বলল “আমি কি লেকাপড়া জানি ? মুনে রাখাও যা, লিকে রাখাও তাই”
আমি স্কুলের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ঝুমুকে বললাম “আর আমাকে মনে রাখবি না তুই ?? ! শুধু ঐ ভালোবাসাকেই মনে রাখবি এবার থেকে ? ! আমাকে রাখবি না তো মনে ? ?”
ঝুমু হাসতে হাসতে আমাকে কোলে তুলে নিয়ে গাল টিপে বলল “তুকেও মুনে রাখবো। আজ বিকেলে ঝুড় উঠলে আম কুড়াইতে যাবি ? ?”
এখন আমার মুখে এক গাল হাসি। খুশি হয়ে গেলাম আমি। কোল থেকে নেমেই এক ছুট্টে স্কুলের ভিতর ঢুকে পরলাম।

এরপর ঝুমুর কথা শেষ। ঝুমুর বিয়ে হয়ে গেল। কারণবশত আমরাও সপরিবারে বোলপুর চলে এলাম। তারপর থেকে আর ঝুমু দিদির খবর জানি না। বিয়ের ঘটনাটাও ঠিক স্পষ্ট নয় আমার কাছে। কার সাথে বিয়ে হয়েছিল জানা নেই আমার। তবে এখন আমি এটা নিশ্চিত বুঝতে পাড়ি যে, ঝুমু সেদিন কেন পয়লা বৈশাখ দিনটাকেই নির্বাচন করেছিল ছেলেটার প্রপোজের উত্তর দিতে। ঝুমু ইংরাজি তারিখ বুঝতে পারতো না। ঝুমু বাংলা তারিখ দিয়ে তার ভালোবাসাকে মনে রাখতে চেয়েছিল।

সেদিনের পর থেকে আমার পয়লা বৈশাখ, কেমন যেন একলা (১ লা) বৈশাখ হয়ে আছে... ১৯ বছর পর আজও। আজও নিজের মনের মতো করে অন্য আর একটা ‘ঝুমু দিদি’ পেলাম না। বাংলার তিনটে দিন – পয়লা বৈশাখ, পঁচিশে বৈশাখ, বাইশে শ্রাবণ মনে রাখার দিন। ইদানীং তো কিছু মানুষ “২২ শে শ্রাবণ” বলতে বুম্বাদাকে বোঝে। শ্রাবণে প্রেম জুটলে “নতুন আলুর খোসা” প্রতীক চিহ্ন হয়ে ওঠে।
উদ্ভূত ! ! !

আপনার মতামত জানান