রূপাই ও বইমেলা

নীতা মণ্ডল
(১)
রূপাই আজ সকালে সবার আগে ঘুম থেকে উঠে পড়েছে। আজ স্যাটারডে। আজ স্কুলে পিটিএম। সেই কবে থেকে রূপাই মাকে জিজ্ঞেস করছে, স্যাটারডেটা কবে আসবে! মা বলেছিল, তিনদিন। তিন দিন মানে তো থ্রিডেজ। তাহলে দিনগুলোই কি খুব বড় হয়ে গিয়েছিল! কিছুতেই স্যাটারডেটা আসছিল না যেন। আজকের পিটিএমটা অন্যবারের মত না। আজকে খুব মজা হবে।
কদিন ধরে স্কুলে একটা বইমেলা হচ্ছে। বইয়েরও যে মেলা হয় এই প্রথম দেখল ও। মা শুনে বলল ‘হয়ই তো। কলকাতার বইমেলা যে কত্ত বড়!’ রূপাই ছোট তাই ধুলোয় ওর কষ্ট হবে বলে মা ক-বছর যায় নি বইমেলা। বড় হয়ে গেলেই মা ওকে নিয়ে যাবে বলেছে। বই ওর খুব প্রিয়। তবে স্কুলের মেলায় রংবেরঙের বইগুলোর চেয়েও ওর বেশি ভাল লেগেছে স্পাইডারম্যান-স্কুলব যাগ, বেন্টেন-ওয়াচ, নানারকমের মুখোশ, স্টিকার এইসব। ওয়াচটা সত্যিকারের ওয়াচ না, পিকচার ওয়াচ। দম দিলেই বেন্টেনের নানারকম ছবিগুলো পাল্টে পাল্টে আসে। এছাড়াও আছে কত রকম স্টিকার। সেই স্টিকারে ছোটা ভিম, রাজু, যজ্ঞু, চুটকি, ঢলু, ভলু, কালিয়া আর টুনটুন মাসির ছবি। তবে রূপাইয়ের সবচেয়ে ভাল লেগেছে ফোল্ডিং পেন। এরকম পেন রূপাই আগে কখনও দেখেনি। পেনও রূপাইয়ের খুব পছন্দের জিনিস। পেনসিলের থেকে পেন দিয়ে লিখতেই বেশি ভাল লাগে ওর। কিন্তু বাবা, মা পেনগুলো লুকিয়ে রাখে সবসময়। ও নাকি সব পেন নষ্ট করে দেয়। তাই বাবা অফিস থেকে এসে আগে জামার পকেট থেকে পেন বের করে, তারপর সেটা আলমারিতে ভরে তবে অন্য কাজ করে। রূপাই টাচ করার চান্সই পায় না। মায়ের অবশ্য অত মনে থাকে না। মা অফিস থেকে ফিরেই ব্যাগ নামিয়েই ঘরের কাজে লেগে পড়ে। কিচেনের কাজ করে। রূপাইকে এটাওটা খেতে দেয়। তারপর হোমওয়ার্ক করায়। এই ফাঁকে ও মার ব্যাগের চেনগুলো খুলে দেখে। কত্ত পেন মার, রেড পেন, ব্ল্যাক পেন। সব একেএকে বের করে। একটুখানি লেখার পরই মনে হয়, মা তো শার্পনার ইউজ করে না, তাহলে কি করে এতক্ষণ লেখা যায়! তাই জোর করে পেনগুলো খুলে ফেলে ও। কখনও বুঝতে না পেরে ঘরের মেঝেয় খুব জোরে জোরে ঘষে দেয়, তাও ইঙ্কটা পুরোটা একবারে শেষ করতে পারে না। মা বলে, রূপাইয়ের জন্য মা অফিসে গিয়ে লজ্জায় পড়ে। সই করতে গিয়ে দেখে ব্যাগে পেন নেই। রূপাই তাই শুনে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘লজ্জা মানে কি, মা?’ মা বলেছিল, ‘বড় হও বুঝতে পারবে।’ কত কথার মানেই যে বুঝতে পারে না ও। অনেক সময় মা সুন্দর করে বুঝিয়ে দেয়। এই তো সেদিনই বুঝিয়ে দিল, ‘কষ্ট’ মানে কি। রূপাইয়ের যখন ক্যাডবেরি খেতে ইচ্ছে করে, তখন না পেলে ওর ভেতরে যা হয় তাকেই বলে কষ্ট। কিন্তু ‘লজ্জা’ মানেটা মা কিছুতেই বলল না।
বাবা, মার কাছে যত পেনই থাক না কেন বইমেলায় দেখা ওরকম ফোল্ডিং পেন কিন্তু নেই। পেনটাকে চারটে ফোল্ড করা যায়। তারপর ওটা একটা ছোট্ট স্কোয়্যার শেপ হয়ে যায়। রূপাই অনেক শেপ চেনে। ও বাবাকে যখন বলছিল, ক্যারমবোর্ড হল স্কোয়্যার, কপিগুলো রেকট্যাঙ্গেল, ওরিও বিস্কিট সার্কেল আর পিৎযার একটা পিসকে বলে ট্রায়্যাঙ্গেল। বাবা বলল, ‘তুই কত কিছু জানিস রে রূপু, এ বয়সে আমরা এত কিছু জানতামই না।’ শুনে খুব মজা লেগেছে। বাবা বোঝে, ছোটরাও অনেক কিছু জানে।
সেদিন ক্লাস থেকে বেরিয়ে বইমেলার দিকে একবার যাবে ভেবেছিল রূপাই কিন্তু ম্যাম ঠিক দেখে ফেললেন, তারপর ওকে বাসে তুলে দিয়ে গেলেন ম্যাম। বাসে আসার সময়ই শ্রেয়াদিদির কাছে ওরকম একটা স্কোয়্যার শেপের পেন দেখেছিল। শ্রেয়াদিদি বই কিনেছে তাই খুশি হয়ে বইয়ের দোকানের আঙ্কেল ফ্রিতে দিয়েছে পেনটা। ফ্রির জিনিস ওর খুব পছন্দ। টিভির অ্যাডগুলো সেইজন্য এত ভাল লাগে ওর। যখন হরলিক্সের সঙ্গে ফ্রিতে কাপ দেয়, ও মা’কে বলে আর কমপ্ল্যান খাবে না, হরলিক্স খাবে। সেবারে তো কেলোগ চকোজের অত বড় প্যাকেটটা কেনা করাল ক্রিস-৩ পেন পাবে বলে। শ্রেয়াদিদির পাশে বসে রূপাইয়ের কেবল মনে হচ্ছিল, শ্রেয়াদিদি যদি ভুল করে পেনটা একবার সিটে নামিয়ে রাখে তাহলেই ও তুলে নেবে। তারপরই মনে হল, কিন্তু মা খুব বকবে যে! মা বলে, কারোর জিনিস না বলে নিতে নেই। মায়ের কথা না শুনলে মা ঠিক বুঝতে পেরে যায়। কি করে বুঝতে পারে রূপাই জানে না! ওর ধারনা মা ঠিক লুকিয়ে লুকিয়ে ক্যামেরা লাগিয়ে রেখেছে ওর বডির কোথাও।
(২)
মা পড়তে ভালবাসে তাই পড়ার জিনিস চাইলে খুব খুশি হয়। মাকে যখন রূপাই বলেছিল বইমেলা থেকে কিছু চাই ওর, মা বলেছিল দেবে। তবে এই থ্রিডেজের মধ্যে ওকে মোট কুড়িটা স্টার কালেক্ট করতে হবে। মা স্টার কালেক্ট করার নিয়মও বলে দিয়েছিল! সকালে নিজেনিজে ব্রাশ করার জন্যে দুটো স্টার, তারপর পাঁচ মিনিটে দুধ খেয়ে নিলে আরও দুটো। রূপাই কোনও দিন তাড়াতাড়ি দুধ খেয়ে শেষ করে না। দুধ খেতে ওর বিচ্ছিরি লাগে। সকালে দুধ খেলেই মা ওকে স্টার দেয়, প্রায় রোজই। তাড়াতাড়ি শেষ না করতে পারলে আরও দুমিনিট গ্রেস দেয় মা। রূপাই জানে মা গ্রেস দেবেই তাই ও ইচ্ছে করে দেরি করে। তবে এই দুদিন করে নি। তাই রোজই ব্রাশ করা আর দুধ খেয়ে নেওয়া মিলিয়ে ও চারটে করে স্টার পেয়েছে। কথা ছিল, সন্ধ্যেবেলা তাড়াতাড়ি হোমওয়ার্ক শেষ করলে তিনটে স্টার আর রাতে নিজের হাতে খেয়ে নিলে আরও তিনটে। মা বলেছিল চেষ্টা করলে রূপাই দুদিনেই কুড়িটা স্টার পেয়ে যেতে পারে। আর পারলেই বইমেলায় ও যা চাইবে মা তাই দেবে। দুদিনে না পারলেও তিনদিনে কুড়িটা স্টার পেয়ে গেছে। মাকে একটুও জ্বালায় নি দুদিন। তাই মা এই কদিন রাগও করে নি। মার মুখটা বেশ হ্যাপি। রূপাই ‘স্যাড ফেস’, ‘হ্যাপি ফেস’ চেনে।
আজ রূপাই নিজেই উঠে পড়ল ঘুম থেকে। একবার বাবার দিকে ঘুরল, একবার মার দিকে। কেউ চোখ খুলছে না। অন্যদিন সকালে ও উঠতে চায় না বলে বাবা কত রাগ করে। ওর যে সকালবেলা ঘুম ভাঙ্গে না তা নয়, কিন্তু তক্ষুনি ওর উঠতে ইচ্ছে করে না। বাবা ডাকতে এসে সারা গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করে, আর ও চোখ বন্ধ করে পড়ে পড়ে আদর খায়। আরও আদর খেতে ইচ্ছে করে ওর। কিছুক্ষণ আদর করার পরেই বাবা জোরে জোরে ডাকে। তারপর ঝাঁকুনি দেয়। তখনও যদি রূপাই না ওঠে তখন বাবা রেগে যায়। রেগে কোনকোনও দিন টেনে বাথরুমে নিয়ে গিয়ে গায়ে জল ঢেলে দেয়। তখন ও প্রাণপণ চিৎকার করে। তারপর মা বাবার উপর রেগে যায় আর বাবা মায়ের ঝগড়া শুরু হয়। ও চোখ পিট পিট করে দেখে দুজনকে। মা’র দুধ দিতে দেরি হয়ে যায়। আর রূপাইও সেই সুযোগে দুধ না খেয়েই চলে যায় স্কুলে। বিকেলবেলা ফিরে মা কতবার যে ‘সরি’ বলে! রূপাই না খেয়ে বেরিয়ে গেলে মায়ের নাকি খুব কষ্ট হয়। তাই তো ও জিজ্ঞেস করেছিল ‘কষ্ট’ মানে কি। একএকদিন তো ‘সরি’ বলতে বলতে কেঁদেও ফেলে মা। কষ্ট মানে তো বুঝতে পেরেছে কিন্তু রূপাই না খেলে মায়ের কেন কষ্ট হয় এই ব্যাপারটা এখনও বোঝে নি ও।
রূপাই প্রথমে বাবাকে ডাকল ‘উঠে পড়। পিটিএমে যেতে হবে না?’
বাবা উঠল না। মাও ঘুমিয়ে আছে। রূপাই নিজেই গেল বাথরুমে। নিজের ব্রাশে পেস্ট লাগিয়ে নিল। ব্রাশ করে মাকে সারপ্রাইজ দেবে আজ। কিন্তু পেছন ঘুরে দেখল, মা উঠে পড়েছে। দরজা খুলবে কাজের মাসিমনিকে। তাহলে কি করে সারপ্রাইজ দেবে রূপাই! চট করে ওর মাথায় আইডিয়া এল। নিজের সঙ্গে মায়ের ব্রাশেও পেস্ট লাগিয়ে এনে মাকে দিল। মা খুশি হয়ে গালে একটা চুমু দিল, বলল ‘থ্যাঙ্ক ইউ’। খুশিতে রূপাই বাবার ব্রাশেও পেস্ট লাগিয়ে আনল আর বাবাকে ঠেলে জাগিয়ে দিল। ও এখন এসব নিজেই পারে, ফোর ইয়ার্স পেরিয়ে গিয়েছে তো! কিন্তু অন্যদিন ও ইচ্ছে করেই নিজে ব্রাশ করে না। আজ ব্রাশ করে, চান করে বেরিয়ে মায়ের কাছ থেকে নিজেই দুধ চেয়ে নিল। তাড়াতাড়ি দুধ শেষ করার জন্যে আজ কাউকে বলতেই হল না। পরিষ্কার জামা পরে রেডি হয়ে রূপাই দেখল বাবা-মা চা খাচ্ছে আর গল্প করছে। কেউ রেডি হয় নি। বললেও ওরা শুনছে না। খুব রাগ হল ওর। রূপাই জুতোর র্যা ক খুলল, তারপর বাবা, মা দুজনেরই জুতোগুলো এনে দরজার সামনে সাজিয়ে দিল।
শেষ পর্যন্ত যখন ওরা বের হল বেশ রোদ উঠে গিয়েছে। রূপাই বলল, ‘শান্তি হল তো দেরি করিয়ে দিয়ে?’
রূপাইয়ের কথা শুনে বাবা মা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে জোরেজোরে হাসতে লাগল। তাতে ওর আরও রাগ হয়ে গেল। মা যখন বলে, ‘রূপু খেলনাটা ভেঙ্গে তোমার শান্তি হল তো?’ তখন কিন্তু কেউ হাসে না। মাকে রাগতে দেখলে রূপাইয়ের হাসিই পায়। তবুও হাসতে পারে না ও। যদি হেসে ফেলে মা তখন আরও রেগে যায়। তাহলে এখন কেন হাসবে ওরা? ও বুঝতে পারল না। বড় হলে হয়ত বুঝতে পারবে।
স্কুলের গেট পেরিয়ে রূপাই মার হাত ধরে টানতে শুরু করল। আগে বইমেলা ঘুরবে ও। কিন্তু বাবা মা কেউ কথা শুনছে না। ও যখন বেশি বায়না করে মা তখন শুনেও শোনে না। হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় ওকে। এরকম অবস্থায় ও বসে পড়ে মাটিতে। মা বলে, ‘বসেই থাক।’ আজ মা বলল, ‘আগে তোমার রিপোর্ট পাই। ম্যাম যদি খারাপ কিছু বলেন, তোমাকে আমি মেলায় কিচ্ছু কিনে দেব না।’ রূপাই কাঁদোকাঁদো গলায় বলল, ‘আমি যে এতগুলো স্টার পেয়েছি! তাহলেও দেবে না?’ বাবা বলল, ‘সিন ক্রিয়েট কর না, কিনে দেব।’ বাবা ঠিক দেবে ও জানে। বাবা কখনও বাইরে বেরিয়ে বকে না। রূপাইয়ের মনে হল, মা আর বাবার মধ্যে বাবাই বেশি ভাল।
(৩)
রূপাইয়ের পছন্দ মত একটা বইও মা কিনল না। ওর খুব রাগ হল, কষ্টও হল। মা প্রমিস করেছিল টোয়েন্টি স্টার কালেক্ট করলেই ও যা চাইবে, মা তাই দেবে। স্পাইডারম্যানের কালার বুকটা রূপাইয়ের এত পছন্দ ছিল! শুধু স্পাইডারম্যানের ছবি দেখে মা বলল, এরকম বইয়ের দরকার নেই। মা সব নিজের পছন্দ মত কিনল আর বলল, সবই তোমার জন্য। রূপাই ঠিক করল কিছুতেই ওসব বই টাচ করবে না ও। মেলার মধ্যে দুএকজন বন্ধুকে কাঁদতে দেখে ও কাঁদতে শুরু করল। মা বলল ‘অসহ্য’। ‘অসহ্য’ মানে কি? রূপাইয়ের কান্না থেমে গেল কিন্তু তক্ষুনি জিজ্ঞেস করল না মানেটা। নতুন ওয়ার্ডটা দুতিনবার মনে মনে প্র্যাকটিস করে নিল। পরে মাকে জিজ্ঞেস করতে হবে। মায়ের কাছে বায়না করে লাভ হবে না বুঝতে পেরে বাবার হাতটা চেপে ধরল। শেষ পর্যন্ত বাবা ওর পছন্দের একটা বই কিনে দিল। তাতেও মায়ের উপর থেকে রাগটা গেল না। স্পাইডারম্যান-ব্যাগট চাইতেই মা বলল, ‘ওটা কেনার জন্য না। ওটা প্রাইজ।’ একটা বেন্টেন ওয়াচও কিনে দিল না। শেষে মেলা ছেড়ে বেরিয়ে যাবার সময় বইয়ের দোকানের আঙ্কেল রূপাইকে একটা ফোল্ডিং পেন দিল। ঠিক শ্রেয়াদিদির পেনটার মত দেখতে। ঐ ফ্রির পেনটা পেতেই রূপাইয়ের মুখে হাসি ফুটল। মা বাবাকে বলল, ‘দেখলে তো?’ কে জানে মা কি দেখতে বলল বাবাকে!
ওরা স্কুল গ্রাউন্ড ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিল। বাবার মোবাইলে একটা ফোন এল। ফোনে কথা শেষ করেই বাবা বলল, ‘চল, আরও একবার যেতে হবে স্কুলে। আমরা লাকি ড্র’তে ফার্স্ট প্রাইজ পেয়েছি।’
রূপাইয়ের পছন্দের স্পাইডারম্যান ব্যাগটাই ছিল ফার্স্ট প্রাইজ। মা যখন বলেছিল ওই ব্যাগটা কেনা যায় না, ওর মনে হয়েছিল, মা মিথ্যে কথা বলছে। ও তো জানে বড়রা বলে, ‘মিথ্যা কথা বলতে নেই।’ কিন্তু নিজেরা বলে। ওর মনে হল মা তাহলে সত্যি কথাই বলেছিল তখন। স্পাইডারম্যান ব্যাগটা ওরা পাবে শুনেই রূপাইয়ের যে কি আনন্দ! প্রাইজ, গিফট এসব ফ্রি’র জিনিসের মতই খুব মজার। ও ঠিক করল, এবার থেকে ওই ব্যাগটা নিয়ে স্কুলে আসবে।
বইয়ের প্যাকেটগুলো ব্যাগে ভরে নিয়ে ওরা রিক্সায় চাপল। রূপাই বাবার কোলে। পাশে মা। ফ্রিতে পেন পেয়েছে, প্রাইজ পেয়েছে ব্যাগ। রূপাইয়ের সব রাগ হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। মা জিজ্ঞেস করল, ‘রূপু আমার কোলে আসবে?’ উত্তর দেওয়ার আগেই ঠিক কি হল রূপাই বুঝতে পারল না। উল্টোদিক থেকে একটা অটোর সঙ্গে ধাক্কা লাগল ওদের রিক্সার। রূপাই আর ওর বাবা একদিকে আর মা অন্যদিকে ছিটকে পড়ল। রূপাইয়ের হাত থেকে ব্যাগটাও পড়ে গিয়েছে। ও দেখল, একটা লোক তার উপর দিয়ে সাইকেল চালিয়ে চলে গেল। ‘রূপু, জোরে লাগে নি তো?’ বাবার দিকে তাকিয়ে রূপাই দেখল বাবার প্যান্ট ছিঁড়ে গিয়েছে, পায়ে রক্ত। নিজের কনুইয়ের কাছে জ্বালা করছে। ওখানেও রক্ত। মা চোখ বন্ধ করে পড়ে আছে। ‘রাস্তায় কি কেউ ঘুমোয়?’ রূপাই কিছুই বুঝতে পারছে না মায়ের কি হল। বাবা বলল, মায়ের বোধ হয় মাথায় লেগেছে।
বাবা পকেট থেকে ফোন বের করে ফোন করল, তারপরই একটা সাদা গাড়ি এসে ওদের তিনজনকে তুলে নিল। ওরা হসপিটালে যাবে। রূপাই জানে হসপিটালে কখন যেতে হয়? ‘উই গো টু হসপিটাল, হোয়েন উই আর সিক অর হার্ট।’ বইয়ে পড়েছে ও। কিন্তু কখনও যায় নি। ওখানে ডক্টর থাকে, আর ডক্টরকে হেল্প করার জন্যে থাকে নার্স। ওরা মাকে নিয়ে একটা ঘরে চলে গেল। ওর বইয়ে ছবিতে দেখা ইউনিফর্ম পরা নার্সের মতই নার্স এখানে। ডক্টরের গলায় যেটা ঝুলছে ওটাকে কি যেন বলে! মা শিখিয়ে দিয়েছিল। রূপাইয়ের মনে পড়ল না। বাবাকে আর ওকে ইনজেকশন দিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিল। ইনজেকশনে খুব ব্যথা। কিন্তু বাবা সেটা খেয়াল করল না। মা হলে ঠিক রূপাই এর গায়ে হাত বুলিয়ে দিত। ওর ব্যাথা মা ঠিক বুঝতে পারে, বলতে হয় না। একজন আঙ্কেল এসে ব্যাগটা দিয়ে গেল। বাবা রূপাইকে নিয়ে বাড়ি ফিরল। মাকে আটকে রাখল হসপিটালে।
(৪)
রূপাইয়ের এখন খুব মন খারাপ। বইমেলার আনন্দ আর নেই। দুপুরে বাবা খেতে দিয়ে একটুও গল্প করল না। গম্ভীর হয়ে বলল ‘নিজে নিজে খেয়ে নাও।’ ও ভয়ে ভয়ে খেয়ে নিল নিজেই। মা থাকলে রূপাই নিজের হাতে খায় না। মাকে বলে, ‘তোমার হাতে খেতে আমার খুব ভাল লাগে। যখন খুব বড় হব, বাবার মত, তখন নিজেনিজে খাব।’
নিজে নিজে সব কাজ করতে হবে ভাবলেই রূপাইয়ের আর বড় হতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু স্কুলে বইমেলা হবার পর থেকে কদিন খুব বড় হতে ইচ্ছে করছিল ওর। নিজের কাছে টাকা থাকলে নিজের পছন্দ মত জিনিস কেনা যায়। মা তো কতবার বলে, ‘বড় হয়ে কিনো।’ মায়ের কাছ থেকে একটা পার্স চেয়ে নেবে বড় হয়ে। বাবার মত প্যান্টের পেছনের পকেটে টাকা ভর্তি করা পার্স রাখবে। ঐ পার্সে এটিএম কার্ড থাকবে। মেশিনে কার্ড দিলেই টাকা। বড় হলে কত যে মজা! কিন্তু রূপাইয়ের একটাই চিন্তা ও বড় হয়ে গেলে মা তো বুড়ি হয়ে যাবে। তখন কি হবে! মা আবার বলেছে বুড়ো হয়ে গেলে মানুষ মরে যায়। একদিন রূপাইকে যখন মা কবিতা শোনাচ্ছিল, বলছিল এটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা। রূপাই জিজ্ঞেস করেছিল, ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কোথায় থাকেন?’ মা বলেছিল, ‘দূর বোকা, উনি কি আর আছেন? কবেই মারা গিয়েছেন।’ ‘কেন?’ জিজ্ঞেস করতে মা বলেছে ‘মানুষ বুড়ো হয়ে গেলে মরে যায়।’ মরে গেলে নাকি মানুষ আর ফিরে আসে না। তাহলে? রূপাইয়ের খুব ভয় করছে। মা আজ বাড়ি এল না যে! মা কি তবে মরে যাবে? যদি আর কোনও দিন না আসে?
মা কতবার বলে, ‘রূপু গুডবয় হয়ে যাও।’ ও হয় না। কিন্তু আজ গুডবয় হয়ে গেল ও। বাবার আগেই খাওয়া শেষ করে নিয়ে বাবাকে বলল, ‘ফাস্ট ফাস্ট ফিনিশ কর। খাবার নিয়ে এতক্ষণ বসে থাকতে নেই। শোন নি, মা বলে।’
মা বাড়িতে থাকলে নিজে নিজে খাওয়ার জন্যে আজ ঠিক ফাইভ স্টার দিত। খাওয়ার পর বইয়ের ব্যাগ খুলে অবাক হয়ে গেল রূপাই। ওই যে শিয়াল আর আঙ্গুর ফলের গল্প, গাধার সিংহের চামড়া পড়ার গল্প, সবই তো আছে এই বইয়ে। মা তাহলে ওর পছন্দের বই কিনেছে! কিন্তু ও যে নিজেনিজে পড়তে পারে না এখনও! মা যখন বলে, ‘শিখে নাও রূপু, যত তাড়াতাড়ি পার শিখে নাও, নিজে পড়তে পারবে। নিজে পড়লে বেশি ভাল লাগবে।’ তখন রূপাইয়ের মনে হয় মা পড়ে দিলেই বেশি মজা। আজ তো মা নেই, বাবাও ঘুমিয়ে পড়ল। পড়তে চেষ্টা করেও বড় বড় ওয়ার্ডে বারেবারে আটকে গেল রূপাই।
বাবাকে ঘুমিয়ে পড়তে দেখে ওর খুব কান্না পেল। মা বকে ঠিকই কিন্তু ঘুমনোর সময় বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে। আর মায়ের বুকে মুখ গোঁজা মানেই আরাম। বোঝাই যায় না কেমন টুপ করে ঘুম নেমে আসে চোখে। বাবা এসব কিছুই জানে না। রূপাইয়ের মনে হল, বাবা না, মা আসলে বেশি ভাল।
বাবা ঠেলছে, ‘রূপু উঠে পড়। আমরা মা কে আনতে যাব।’
‘মা? কোথায়?’ রূপাই ঘুম জড়ানো গলায় বলল।
(৫)
মাকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দিয়েছে। মা ভাল হয়ে গিয়েছে। রূপাই বলল, ‘সরি মা, আর কখনও আমি দুষ্টুমি করব না। আমি জানি গড আমাকে পানিশমেন্ট দিয়েছে, তোমার সঙ্গে আমি দুষ্টুমি করি তাই। আজ আমি গডের কাছে প্রমিস করেছি মাকে আর জ্বালাবো না, মাকে তাড়াতাড়ি বাড়ি পাঠিয়ে দাও। গড আমার কথা শুনেছে। তাই আমিও এবার থেকে তোমার সব কথা শুনব।’
রূপাইয়ের চুলগুলো ওর মা ঘেঁটে দিল, ‘পাগল ছেলে কোথাকার!’
‘বইমেলা থেকে আনা বইগুলো দেখবে না তোমরা?’ বাবা পাশ থেকে বলল।
মা বলল, ‘যাও রূপু নিয়ে এস।’
ছুটে গিয়ে বই, ব্যাগ সবকিছু নিয়ে এল রূপাই।
মার মুখটা খুশিতে জ্বলজ্বল করে উঠল। রূপাই দেখল, ‘হ্যাপি ফেস’। একটা বই খুলে মা নাকের কাছে ধরল। বলল, ‘নতুন বইয়ের কি সুন্দর গন্ধ দেখ রূপু। জোরে শ্বাস নে, দেখ ভাল লাগবে।’
এক্ষুনি সব গল্প শুনে ফেলতে হবে রূপাইকে। ওর আগ্রহ দেখে মাও যেন ভাল হয়ে গেল।
মা পড়তে শুরু করল প্রথম গল্পটা। তারপর আর একটা। তারপর আরও একটা।
(৬)
এখন রূপাই আর কারোর জিনিস না বলে নেয় না। হোমওয়ার্ক করে নেয় নিজেনিজেই। সকালবেলা দুধ খেয়ে নেয় চোঁ চোঁ করে। মা এসে খালি গ্লাস দেখে অবাক হয়ে যায়। আর ওর সব স্টারগুলো এক যায়গা হয়ে গেলে ওকে পছন্দ মত জায়গায় বেড়াতে নিয়ে যায় বাবা মা। কখনও চিড়িয়াখানা, কখনও সায়েন্সসিটি, কখনও দার্জিলিং, কখনও বা শান্তিনিকেতন। এবার টু হান্ড্রেড টার্গেট। পুজোর ছুটিতে তাহলে দিল্লী যাবে ওরা। কে বেশি ভাল, বাবা না মা! সে হিসেব আর করে না রূপাই। ভাবে দিল্লী মানেই কুতুব মিনার, দিল্লী মানেই ইন্ডিয়া গেট, দিল্লী মানেই লালকেল্লা। ছবিতে বাবা ওকে সব দেখিয়েছে। রূপাই রোজ কাউন্ট করে কতগুলো স্টার জমল ওর। নতুন স্টারগুলো এড করে নেয় পুরনোগুলোর সঙ্গে। মা অন্য বইগুলোর সঙ্গে একটা কাউন্টিংয়ের বইও কিনে দিয়েছিল বইমেলাতে। রূপাই তো সবে ওয়ান হান্ড্রেড পর্যন্ত কাউন্ট করতে পারে। মা বলেছে দুটো পেজে ওয়ান হান্ড্রেড করে হলেই টু হান্ড্রেড। স্টারগুলো এড করতে ও মার কাছে হেল্প নেয়। মা কিরকম মনে মনে এড করে ফেলে দেখে অবাক হয়ে যায় রূপাই। রূপাই জানে বড় হয়ে গেলে ও নিজেই পারবে।

আপনার মতামত জানান