যাবার বেলায়

সহেলী রায়
জলটুকু পেটে পড়তেই চোখ বেঁধে আসতে পারে, এইটুকুই তো সময় বাকি অস্তিত্বখানা জিইয়ে রাখার। তাই কোনমতে এক ছুট্টে পুকুরপাড়ে বসল দুপুর। সারা পুকুরপাড় জুড়ে সবুজ পর্দার দোলনা। দুপুরকে ছুঁয়ে যাচ্ছে আর আসছে। লুকোচুরিখানা মন্দ নয়।
তবে সময় খুব কম। ইদানীং হঠাৎ হঠাৎ গাঢ় নীল মশারির নীচে চিনতেই পারে না নিজেকে। তবে আজকের দিনটা অন্যরকম। সব কিছুই নিয়ম মতোই চলছে। যে যার ভাগটুকু পেয়েছে। তবে তার বেলাতেই নয় কেন? ছেলেগুলো পথ পেরতে পেরতে বলে গেল, মিঠে রোদ। আহা, মিঠে রোদ মানেই চমনবাহারের গন্ধ। ঘোষপাড়ার দাওয়াই গেলেই পাওয়া যায়।
নাহ আজ আর এখানে কাজ নেই বরং রবিশস্যের খেতে গিয়ে বসা যাক। হলুদ শাড়ির ধান্যবতীদের আরাম পর্ব দেখা যাবে। দুপুর ওদের গায়ে হাত বোলাতে লাগল। আর তো সময় নেই। ওরাও তো সবুজ বসন ছেড়ে আদুর গায়ে সোনার রঙ মেখেছে। পরশুরামের রোগা বউটাও এখখানা সোনার দুল চেয়েছে। এবার বোধয় দিতে পারবে। মালতীর বাবা এবার মেয়ের বে টা দেবেই। সে টাকাটাও হয়ে যাবে। দুপুর জানে সব। তার পিঠে পিঠ রেখই তো এ আলোচনা হয়। স্নেহের হাত, মায়ার হাত , প্রেমের হাত যার যেমন প্রাপ্তি তেমন দিতে ইচ্ছে করে দুপুরের। কিন্তু সময় বড় কম। আর ও তো জানে সবাইকে একসাথে খুশি করা যায় না। চোখটা খচ খচ করছে কেন? শ্যামাপোকা নাকি? পুজো আসছে? ইস আরেকটু যদি সময় পাওয়া যেত।
‘দুপুর ও দুপুর এবার ঘরে আয় মা- তোর সময় শেষ হল যে’ এই যা ডাক এসে গেল যে। মাঝ গঙ্গায় ঝাঁপ দিতে হবে। সমুদ্দুরের মানুষরাও দেখতে পাবে। এখানেই ঘুমলে কেমন হয়? এত মন কেমন করছে কেন? যেতে তো হয় সবাইকেই। আঁচলের খুঁটে কি বাঁধা এটা? ও মনে পড়েছে ঠাকুরের থানের মন্ত্র পড়া কাগজ। সময় বাড়ানোর কত চেষ্টাই না সে করেছে। সবাই তো ছেড়ে গেছে। ওই কাগজটুকুই হাওয়াই ভেসে ভেসে তার আঁচলে বাঁধা পড়ল। ‘অ দুপুর এবার আয় মা-’
ওমা এত লোক কেন? পাঁচ গ্রামের লোক জড়ো হয়েছে। মেলা হচ্চে? আঃ গায়ে এটা কি এসে পড়ল? চোখের জল? রবিশস্যের মাঠে দুপুর গোধূলি হয়ে পড়ে আছে। তার কপালের সিঁদুর, পায়ের আলতা রঙ ছড়াচ্ছে মাঠময়। মানুষগুলো কে কি সুন্দর দেখাচ্ছে। ওরা ভালবাসছে দুপুরকে। না গেলে এটুকু অজানায় রয়ে যেত। ‘এই নে অনেক হল এবার কালো শাড়িটা পরে নে দুপুর’

আপনার মতামত জানান