অরন্যের ডায়েরী

জয়ন্ত দেবব্রত চৌধুরী
এই আঁধার বনে একলা বসে আর একঘেয়ে জার্নাল লিখতে ইছে করে না। দিনের প্রহরী গাছেরা রাত হলেই ওদের ভূমিকা বদল করে; নিকষ কালো চাদরে অঙ্গ মুড়ে তখন ওরা অচেনা আততায়ী সাজে। আমি ঘাবড়াই না, আমার ডান হাতের আঙুলগুলো শুধু টর্চের পাশে রাখা প্রস্তরকুঠারীর হিমশীতল হাতলটা আঁকড়ে ধরে থাকে। তুমি রোজ দিনের বেলায় আসো, জঙ্গলের ভেতর শেয়াল-হাঁটা পথ মাড়িয়ে মাড়িয়ে; পাহাড়ি ঝর্ণার শব্দ, জংলা ফুলের গন্ধ সারা শরীরে বয়ে। সারাদিন বন মহুয়ার রস খেয়ে আর নদীর জলে শোল মাছ ধরে আমাদের সন্ধ্যা নামে আকাশ থেকে, যেমন করে গৃধ্র নামে গরুর শবে। বৈরি সূর্যের দাবানল নিভে গেলেই তোমার যাবার সময় হয়ে আসে। আমি দিবস শেষের গোধূলিতে শেষবার তোমায় দেখি মুগ্ধ হয়ে, যেমন কোনো আদিম মানব এক রাতে তারার চুইয়ে আসা আলোয় দেখেছিলো আপন সৃষ্ট গুহাচিত্র। তুমি চলে যাও রাত্রি হলেই, অমোঘ শিকারের স্থিরচিত্র অসম্পূর্ণ রেখে। রাত গভীর হলে আমার তাঁবুর পেছনে খসখস শব্দ ওঠে; সর্পকুল দাঁতে সঞ্চিত বিষ কচুপাতার ওপর জমিয়ে রাখে রাতটুকুর মতন, খোলস ছেড়ে ঘুমোতে যায় একে একে। আমি ঝিঁঝিঁর রব শুনতে শুনতে দৈনন্দিন গরলে আলতো চুমুক দিই আনমনে। রাতের তৃতীয় প্রহর আসে যেমন নরখাদক শ্বাপদ তার প্রিয় শিকারের পেছনে আসে নিঃশব্দে। এই বন্য পাড়ায় কোনো নেড়ি কুকুর থাকে না। আমি তাই তাঁবুর বাইরে বেরোই নির্ভয়ে। দুটো শ্যামাপোকা চক্রাকারে ঘুরতে ঘুরতে ক্রমশ ওপরের দিকে উঠতে থাকে, ত্রয়োদশীর চাঁদের সাথে মিলেমিশে খেলা করে, চাঁদের চিরাচরিত কলঙ্ক হয়ে যায় অবশেষে। দূরের ঝোপ থেকে সারি সারি কৌতূহলী চোখের অপলক দৃষ্টি আমার স্নায়ুতে টের পাই। প্রত্যুত্তরে আমি কুলকুচো করে খড়কুটোয় ধিকিধিকি অগ্নিকুণ্ড নিভিয়ে দিই। প্রহর শেষে আমি অকুতোভয়ে মাঝ জঙ্গলে এসে দু’পা ফাঁক করে দাঁড়াই, হাতে রাইফেল নিয়ে আমি ব্যাকুল ব্যাঘ্রের প্রতীক্ষা করতে থাকি; বাতাসে বোঁটকা গন্ধ ভেসে আসে শুধু যেন আশ্বিনের প্রথম মেঘ। আমার সহজেই ক্লান্তি আসে অপেক্ষা করতে করতে। প্রথম থেকেই প্যাঁচা আমার প্রিয়। এখন আমি পছন্দের পাখিকে চোরের মতন কাকের শাবক তুলে আনতে দেখি স্বচক্ষে। দূরে একটা মাদী শূয়র পাঁচটা দুগ্ধপোষ্য ছানা নিয়ে হেলতে দুলতে চলে যায়, একবার পেছনে ফিরে তাকায় সন্দিগ্ধ চোখে; আমি একটানে হাতের বন্দুক ছুঁড়ে ফেলে দিই অন্ধকারে। এবার চোখে ঘুম আসে যেমন অনায়াস স্বপ্নে মা আসে। হঠাৎই মনে পড়ে দক্ষিণের জঙ্গলের মধ্যে একটা পুরনো জৈন মন্দির আছে যার মাঝ বরাবর ফাটল ধরা উলঙ্গ দেবমূর্তি বড়ো জাগ্রত, কাল সকালে ওটা খুঁটিয়ে দেখতে হবে, কিন্তু পায়ে হেঁটে অনেকটা পথ। ঘুমিয়ে পড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে জোর করে চোখ খুলে দেখি আমার ছেলেবেলার রিকশাওলা দাদু, মাথাভরতি শণের মতন চুল, প্যাঁক প্যাঁক শব্দে নিবিড় বনের ভেতর দিয়ে এগিয়ে আসছে তার সেই ভুলে-যাওয়া ভাঙ্গাচোরা রিকশাটা নিয়ে।

আপনার মতামত জানান