ইছামতীর ধারে, বিভূতিভূষণকে নিয়ে

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

"কত লোকের চিতার ছাই ইছমতীর জল ধুয়ে নিয়ে গেল সাগরের দিকে, জোয়ারে যায়, আবার ভাঁটায় উজিয়ে আসে, এমনি বারবার করতে করতে মিশে গেল দূরসাগরের নীল জলের বুকে"... সত্যি সত্যি সেদিন বিভূতিভূষণকে বড় কাছ থেকে দেখে এলাম।
কলকাতা থেকে বাইপাস। সেখান থেকে বাসন্তী হাইওয়ে দিয়ে বানতলা হয়ে মালঞ্চ ও সেখান থেকে টাকির রাস্তা ধরা হল।
কলকাতার উপকন্ঠে সেই বহুকাল আগে চীনেদের গড়ে তোলা ট্যানারি, কেমন ভেজা ভেজা, স্যাঁতস্যাঁতে আশপাশ। দেখছি আর ভাবছি, ঠিক তখনি তাকিয়ে দেখি বাঁদিকের বিস্তৃত নালা দিয়ে বয়ে চলা বর্জ্য পদার্থ । সাদা মেঘ ভাসছে নালার জলে? নাহ্‌! ওটা হল ক্ষার জাতীয় কিছু দূষিত ফেনা। কোথায় যাচ্ছে জানা নেই কিন্তু জমা হয়েই চলেছে নালা বন্ধ করে।
বাসন্তী হাইওয়ে ছেড়ে মালঞ্চ পেরিয়ে এবার বাঁদিকে। পেরোলাম অনামিকা একটা নদীর সেতু।
আরো চলার পর অবশেষে এল একটা মোড়। বাঁদিকে বসিরহাট। ডানদিকে হাসনাবাদ। সোজা গেলে টাকি। সোজা গেলাম টাকির দিকে। রাস্তার মানুষজন‌ই গাইড। বাতলে দিল পথ।
টাকি সম্পর্কে আমার জ্ঞান ছিল সীমিত । এবিটিএ টেষ্ট পেপারে পেয়েছি নামী স্কুল টাকী গভর্ণমেন্ট স্পনসর্ড এর নাম। শুনেছি টাকীর বিখ্যাত পাটালিগুড়ের কথা। আর শুনেছি ইছামতি নদীর গল্প।
এপারে টাকি, ওপারে সাতখীরা। মাঝে নদী ইছামতি, কাঁটাতারের বেড়া। নৌকো ভেসে যায় জলের ওপর দিয়ে, ছড়িয়ে ছিটিয়ে, কিছুটা অবিন্যস্ত, কিছুটা খামখেয়ালে। আমার খেয়ালীমন দেয়ালা করে চলে বসন্তের সাথে। বসন্ত চলে যায়। আমার চোখের পাতা ছুঁয়ে যায় ওর মাতাল হাওয়া। আমার মন উশখুশ করে ওকে দেখার জন্য, পাবার জন্য আর ওর সাথে মূহুর্তগুলো ভাগ করে নেবার জন্য। আমি ওর প্রেমিকা হতে চাই। তবুও সে চলে যায়। তাই ইছামতিকে দিয়ে ডেকেনি ওকে। দুদন্ড জিরেন হয় । একটু ভালোলাগা, আধটু ঢেউ গোনা। মাঝে নদী বয়। সময়ের অলিন্দে ভ্যানগাড়ি ডাক দেয়। ইছামতির কোল ঘেঁষে ওর গন্ধ নিই। ঠিক যেন মায়ের গায়ের গন্ধ। নৌকোগুলোর পতাকা ওড়ে বসন্তের মাতাল হাওয়ায়। ওপারের নৌকোর এক রং। এপারের আরেক রং। ওপারের নৌকোর ভাষায় টান। এপারে অন্যটান। বসন্তে ফাগ ওড়ে। এপার-ওপার সেই ফাগ ধরে মুঠো ভরে। জল ভাবে আমি কার? আমি ভাবি আমি একান্ত‌ই বসন্তের। বসন্ত বলে আমি ইছামতির। ইছামতি বলে আমি সকলের। একটা সূর্য ওঠে রোজ ইছামতির পাড়ে, দিগন্ত জুড়ে। এক‌ই বসন্ত আসে বারেবারে। ইছামতির বদল হয়না। দূরে মাছারাঙা দ্বীপ। মাঝিমল্লাদের হৈ হৈ ভেসে আসে....

সেদিন বসন্তের ছুটির ভোর ছিল আন্তর্জাতিক নারী নারীদিবসের । তাই আমার মত সাধারণ কন্যার মুক্তি ঘটল আলোয় আলোয়, নদীর ধারে, খোলা আকাশের নীচে ।
বহু উপন্যাসে ইছামতির কথা পড়েছি। আশুতোষের ইচ্ছামতী, বিভূতিভূষণের ইছামতী আর আজ আমার চোখের সামনে সত্যি ইছামতি। বিভূতিভূষণের অপু ট্রিলজির "অপরাজিত" র শেষ পর্যায়ে ইছামতির ধারে দাঁড়িয়ে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন নায়ক অপুর জন্ম, মৃত্যু, সুখ-দুঃখের মালা গাঁথা জীবনদর্শণ....... "নদীর ধারে আজিকার আসন্ন সন্ধ্যায় মৃত্যুর নবরূপ সে দেখিতে পাইল। মনে হ‌ইল যুগে যুগে এই জন্ম-মৃত্যু চক্র কোন্‌ বিশাল আত্মা দেব শিল্পীর হাতে আবর্তিত হ‌ইতেছে....বহু বহু দূর অতীতে ও ভবিষ্যতে বিস্তৃত সে পথটা যেন বেশ দেখিতে পাইল। কত নিশ্চিন্দিপুর, কত অপর্ণা, কত দুর্গাদিদি-- জীবনের বীথিপথ বহিয়া ক্লান্ত ও আনন্দিত আত্মার সে কি অপরূপ অভিধান"
বিভূতিভূষণ এই ইছমতীকে দেখেছিলেন যশোর জেলার দিক থেকে। নদীর ধারে সবুজ বনভূমিতে থোকা থোকা আকন্দফুলের কথা বলেছিলেন। সোঁদালিফুলের দোলা দেখেছিলেন। ঘাট দেখতে গিয়ে ঝোপের মধ্যে পলতেমাদারের লালফুল, জলজ বন্যেবুড়োর ঝোপ, টোপাপানার দাম আর তিত্পল্লা লতার হলদে ফুলের শোভা দেখেছিলেন। আমি এর কোনোটিও দেখতে পেলাম না কারণ আমার চোখ ওনার মত নয়। শহুরে চোখে এত সবুজ পোষ মানেনা। ধরা দেয়না সহজে। হয়ত ছিল কিন্তু আমার কাছে এল না। আমি বট-অশ্বত্থের ছায়ায় দেখতে পেলাম বিছুটি-বৈঁচির ঝোঁপ আর মাঝেমাঝে বাঁশের ঝাড়। ক‌ই গাঙশালিখের গর্ত তো দেখলাম না। মন পরক্ষণেই মন বলে উঠল "তেনার ছিল প্রকৃতি প্রেমিকের চোখ, তুমি কি আর অমন করে পাবে তাকে?"
আমি খুঁজে চলেছি তখন অপুদের মাকাললতা দোলানো, শেওলা ধরা পোড়োভিটে যেখানে এককোণে ইন্দিরের খোঁয়াড়। দুর্গার নাকে ওড়কলমির নোলক আর অপুর আম কুড়োনো। টাকির পথে হাঁটছি নদীর ধার দিয়ে। ফাল্গুণে আমগাছে ব‌উল এসেছে। চারিদিক সজনেময়তায়। কত পুকুর যত্রতত্র। ভ্যানওয়ালা থামল। " ঐ দ্যাখেন বাবু! জোড়া শিবমন্দির। পান্নাপুকুরের ওপারে ।
টাকীর জমিদার পরিবারের অন্যতম বংশধর গোপীনাথ চৌধুরী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন দুটি শিবলিঙ্গ সহ দুই মন্দির আর খনন করিয়েছিলেন সংলগ্ন পুকুরটি। বর্তমানে টাকী পৌরসভা এগুলি রক্ষণাবেক্ষণ করছে।
এবার সেনাধ্যক্ষ শঙ্কর রায়চৌধুরীদের বাড়ি, নাটমন্দির, দোলমঞ্চ। এখন বট-অশ্বত্থ-চামচিকার দৌরাত্ম্যি সেখানে। তবুও জমিদারবাড়ির ঐতিহ্য বহন করছে ঐ অঞ্চল। ভেঙে পড়া অলিন্দ, মন্দিরের খিলান আর বাগানের মধ্যে যত্রতত্র পিকনিক চলছে সে বসন্তে। ভ্যানওয়ালা বলল, দুপুরের খাওয়াটা পুরসভার হোটেলে বুক করবেন আপনারা? আমরা সম্মতি জানালাম। সেখানে ঢুকে ভাত-গলদার থালির অর্ডার দিয়ে আবারো ইছামতী পরিক্রমায়। টাকী রামকৃষ্ণ মিশনের পাঁচিলের কমলা রং দেখে বুঝলাম সীমান্তেও তারা ধুনি জ্বালিয়ে বসে আছে। আর রয়েছে বন্দুকধারী বিএসএফ জওয়ান। তার কাছে আমাদের গ্রুপের কারো একজনের সচিত্র পরিচয়পত্র গচ্ছিত রেখে যেতে হবে আরো দূরে যার নাম "জিরো পয়েন্ট"। বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো! ভাবছি মনে মনে। ভ্যান ওয়ালাই বলে বসল মনের কথা... "রাতেরবেলায় ওরাই গরু পাচারে কত সাহায্য করে বাবু, মানুষও ঢুকে পড়ে যেমন তেমন করে। সাধারণ ট্যুরিষ্টের জন্য যত্ত হ্যারাচমেন্ট"


বনের মধ্যে দিয়ে ঢুকে নদীর কিনারায় দাঁড়ালাম। ওপারে সাতক্ষীরা, আমার ঠাকুমা আর দাদুর জন্মস্থান। সেই জন্মলগ্ন থেকে শুনে আসছি আমরা ৫০% বাঙাল। দেশভাগের সময় মাঝরাত্তিরেও মানুষ জানতানা খুলনা জেলার সাতখীরা ওপারে থাকবে। তাই সারাটা জীবন দাদু-ঠাকুমার মুখে সেই দেশভাগের করুণ স্মৃতি তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াত। সাময়িক নস্ট্যালজিয়ায় আচ্ছন্ন হলাম । তারপরেই শুনি ভ্যানচালক বলছে সুন্দরবনের গোলপাতার গল্প। সরকার নাকি সুন্দরবন থেকে গোলপাতা, গরাণ, কেওড়া গাছ লাগিয়েছে । কিন্তু ইছামতির জল মিষ্টি আর নোনা জল ছাড়া সুন্দরী গাছ হয়না। তাই সুন্দরবনের এত কাছে হয়েও টাকির একাকীত্ব সুন্দরী বিহীনতায় ভোগে। সুন্দরী বিবর্জিত টাকি তবুও এভারগ্রিন। ওর যে ইছামতি আছে। নদীর পাড়ে গিয়ে সেকথাই মনে হল। সেই সান্নিধ্যেই টাকি ২৪x৭ বিভোর ।
ইছামতী যেন চিরযৌবনা। যদিও পলি পড়ে নাব্যতা কিছুটা কমে গেছে। তবুও এখনো যা আছে তা অনেকেরি নেই।
ইছামতি নদীর শরীরটা ত্রিভঙ্গে প্রবাহিত । দীর্ঘ মাথা সহ লম্বা বেণীটি পদ্মার শাখানদী মাথাভাঙা থেকে প্রবাহিত হয় এবং ২০৮ কিমি প্রবাহিত হবার পর উত্তর ২৪ পরগণা জেলা‎র হাসনাবাদের কাছে এবং সাতক্ষীরা জেলার দেবহাটার কাছে কালিন্দী নদীর সাথে যুক্ত হয়। নারীসুলভ লাবণ্যময়ী ধড়টি একসময়ের পশ্চিম ঢাকার প্রধান নদী এবং তার দেহের শেষটুকুনি দিনাজপুরের । দুই দেশের মধ্যে দিয়ে ভেঙেচুরে, এঁকেবেঁকে চলতে চলতে তার ক্লান্তি নেই শুধু যদি একটু সচেতনতা থাকত মানুষের।
নদীর ওপারে বাংলাদেশ রাইফেলসের ব্যাটেলিয়ান আর এপারে বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স। মাঝখানে ইছামতী।
আজো ইছামতী কারণে-অকারণে চঞ্চল। আজো সে বহতী নোনাগাঙের দিকে। সেখান থেকে বদ্বীপের গা ঘেঁষে, মোহানা পেরিয়ে, গঙ্গাসাগর ও সবশেষে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে তার আত্মসমর্পণ। কত মহাজনি নৌকায় মাঝি যায় সুন্দরবনের দিকে মধু আনতে। চিংড়ি, কাঁকড়ার বাসায় উঁকি দিতে কিম্বা ঝিনুকের পেটে মুক্তো খুঁজতে । হয়ত বা সে ঘরে ফেরে কিম্বা আর ফেরেও না।
দুর্গাপুজোর দশমীতে বহু মানুষ জড়ো হয় দুপারের বিসর্জনে সামিল হতে। ওপারের নৌকো বাংলাদেশের পতাকা লাগিয়ে প্রতিমা আনে নদীতে। এপারের নৌকো ভারতের পতাকা লাগিয়ে দুর্গা ভাসান যজ্ঞে মেতে ওঠে। সেদিন যেন দুপারের কাঁটাতারের বেড়া এই ইছামতিকে কেন্দ্র করে অদৃশ্য হয় আপাতভাবে। লাগামছাড়া আনন্দে দুপারের বাঙালীরা বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময় করে। পাসপোর্ট-ভিসাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মা দুর্গা নিজেই আইন অমান্য কর্মসূচির বার্তা দেন।
সময়ের খেয়া পেরোতে থাকে। দুপুর সূর্য মাথায় নিয়ে পৌঁছাই টাকী রাজবাড়ির ভগ্ন দুয়ারে। রাজবাড়ির অলিন্দ বেয়ে নেমেছে বটের ঝুরি। ঘরগুলি সব ইছমতীর পার ঘেঁষে। সেখানে জমিয়ে বিক্রিবাটরা চলছে এখন। মন ভারী হয়ে যায় রাজবাড়ির দিকে তাকালে। নদীর ধারে রাজপ্রাসাদ। কি অপূর্ব ছিল একসময়। এখন সেখানে বট অশ্বত্থের স্থায়ী আস্তানা। রাজবাড়ির অলিন্দ বেয়ে নেমেছে বটের ঝুরি। ঘরগুলি সব ইছমতীর পার ঘেঁষে। মুঘল আমলেও এঁরা রাজত্ব করেছেন আর ব্রিটিশ যুগেও ছিলেন দাপটের স্আথে বেঁচে বর্তে। রাজবাড়ির প্রতিষ্ঠাতা কৃষ্ণ দাস রায়চৌধুরী। ভ্রমণপিপাসুদের হাওয়া খাওয়ার জন্য পড়ে আছে রাজবাড়ির সংলগ্ন ইছামতীর ঘাটের বেঞ্চি।
বিদায়ী ফাল্গুণের একরাশ হাওয়া যেন ধেয়ে এল ইছামতীর ওপর থেকে। সেই হাওয়ায় একরাশ মনখারাপ। এবার বিভূতিভূষণের ইছামতীর স্মৃতি হাতড়াতে হাতড়াতে কলকাতার দিকে পা বাড়ালাম।

তিনি দেখেছিলেন নদীর পাড়ে চীনা চিত্রকরের আঁকা ছবি। আর পোড়োভিটের সম্বন্ধে ঠিক যেমনটি ভবিষ্যত বাণী করেছিলেন ঠিক তেমনটিই দেখতে পেলাম যেন
"দেখতে পাবে নদীর ধারে পুরণো পোড়োভিটের ঈষদুচ্চ পোতা, বর্তমানে হয়ত আকন্দঝোপে ঢেকে ফেলেছে তাদের বেশি অংশটা হয়ত দু-একটা উইয়ের ঢিপি গজিয়েছে কোনো কোনো ভিটের পোতায়। এইসব ভিটে দেখে তুমি স্বপ্ন দেখবে অতীত দিনগুলির স্বপ্ন দেখবে সেই সব মা ও ছেলের ভাই ও বোনের যাদের জীবন ছিল একদিন এইসব বাস্তুভিটের সঙ্গে জড়িয়ে। কত সুখদুঃখের অলিখিত ইতিহাস....."

ভাবতে ভাবতে সময়ের খেয়া পেরিয়ে মিশে গেলাম শহর কলকাতার ভীড়ে ।
মনে মনে বললাম, তোমার জন্য ইছামতীকে দেখে এলাম, এ কানুর তুলনা নাই!

আপনার মতামত জানান