মেঘ

পাপিয়া গঙ্গোপাধ্যায়
সেদিন বিনী ওদের 14 তলার বসতির আকাশ ঘেসা চিলতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছোট ছোট ফুরফুরে মেঘ গুলোর চলাফেরা ,নকশা বদলে যাওয়া দেখছিল আর গোলাপী ঠোঁটে কালো রঙের তেতো কফি ছোঁয়াছিল iভাবছিল এক টুকরো চকলেট ফ্লেক্স থাকলে মন্দ হতনা i ফ্লাটের দরজায় টুক করে আওয়াজ হলো i.মানার মা এল বুঝি রান্না করতেi না, গুন গুন গানের আওয়াজi গানের আওাজ শুনে বুঝল অর্ক এলো ।তিনদিন পর tour থেকে ফিরল / রান্নাঘরের লাইট জালাবার আওয়াজ / তার মানে অরক রান্না ঘরে ঢুকল / এতবার বিনি বলেছ বাইরে থেকে এসে আগে হাত মুখ ধুতে , কিছহুতেই শুনবে না ।বলে হাত পরিস্কার,ওর হাত নাকি নোংরা হয়না ।কি যে ছেলেমানুষি । অন্য সময় হলে বিনি রাগারাগি করত ।আজ ইছহা করছহে না ।সকাল থেকে মন টা আজ উচাটন ।সেই বোহেমিয়ান বাউল বাউল ভাব টা ,মন বারান্দায় ঘোরা ফেরা করছে ।
এই দুকামড়ার ফ্ল্যাটটা কে বিনী নাম দিয়েছে আকাশ বাড়ি । অর্ক আর ও থাকে এখানে । ওরা বিবাহিত নয়। একসাথে থাকে।অনাথ আশ্রমে বড় হয়ে অথা, বিনীর বিশ্বাস ও পরিতক্ত শিশু ছিল।কোনো চিন্তার বশবর্তী হয়ে বিবাহে ওর বিশ্বাস নেই।অর্ক জাস্ট মেনে নিয়েছে। আত্ত্যিও পরিজন কে পাত্তা না দিয়ে অর্ক বিনীর সাথে এই ফ্ল্যাট এ থাকে ।সাপ্তাহান্তে বাবা মা র সাথে দেখা করে ।

কিছুক্ষণ বাদে ঘাম আর পারফিউম মেশানো তীব্র পুরুষালি গন্ধ ছড়িয়ে সোনালী চা নিয়ে ,তার পাশে এসে দাড়ালো অর্ক .
-"কিরে কটা মেঘের ভেলা দেখলি আজ ?"
বিনী র এই বিলাসিতা নিয়ে অর্ক সবসময় হাসি মজা করে ।.
বিনী বলে "দেখবি ওই মেঘেরা কোনো একদিন আমার সাথে দেখা করতে আসবে." ।
অবশ্য বেশিরভাগ সময় না শোনার ভান করে এড়িয়ে যায় বিনী ।এটা ওদের এক মজার টাইম পাস।
-"নতুন ব্যবসা যোগার করলি ?" - বিনি জিগেশ করল ।
-ছাড় এখন ব্যাবসা পত্র।পুজোর ছুটি তে প্ল্যান কি তোর ?
- কিছু ই না !
- তোর স্বপ্ন দেশে যাবি ? দারুন অফার চলছে ।
- মানে ? তুই ফ্লোরেন্সে যাবার কথা বলছিস ?
- কেন তোর স্বপ্নের দেশের নাম বদলে গেছে নাকি ?
- ইয়ার্কি মরিস না ,খরচা কত বল ।একাউন্ট চেক করতে হবে।
এমনি করে কথা শুরুর পর ,সত্যি ওরা ফ্লোরেন্সে পৌঁছল ।সব ব্যাবস্থ্যা অর্কই করল।বিনি পয়সা দিয়ে খালাস ।
সেই ইতিহাসের বই এর শহর।রেনেসাঁর জন্ম স্থান ।মধ্য যুগের এথেন্স বলা হয়।ফ্লোরেন্স নাইটঙ্গেলের জন্মস্থান। শহরের বুক চিরে বইছে আরনো নদী।সুন্দরী এক ছিমছাম শহর । পা দিয়েই এক শিহরণ হলো ।মনে হলো কতদিনের চেনা । চারপাশের পরিবেশ যেন সে আসার উত্সব করছে ।পাথরের বাধানো রাস্তার দুপাশে বাড়ি ,দোকান ,হোটেল।এগুলোর একটা ওদের হোটেল ।অর্ক রিসেপশন এ গিয়ে কথা বলল ,পাসপোর্ট কপি দিল । লালচে মত গোলগাল লোকটি চাবি দিল রুম এর। নিজের পেল্লায় বাড়িটাকে হোটেল এ কনভার্ট করেছে বলে মনে হলো ।
একটু ফ্রেশ হয়ে হাঁটতে বেরলো দুজনা । পাথরের রাস্তা ,পুরনো কালের অট্টালিকা।ওরা এসে পড়ল একটা ছোট্ট চৌমাথায় । চৌমাথা পেরিয়ে রাস্তা র ওপাশে আরনো নদী । টল টল করছে জল। সূর্য অস্ত যাচ্ছে আর মুঠো মুঠো রং মিশিয়ে দিছে আরনো র জলে ।বিনী বায়না করল কাল ও সূর্যোদয় দেখবে অর্কর সাথে । অর্ক রাজি হলো ।
বলল -"অ্যালার্ম দিয়ে উঠে পরব । তারপর একসাথে বেরব"।
ছোট্ট সাকো পেরিয়ে ওপারে গিয়ে দেখল পুরনো চত্বর ।অল্প বয়সী ছেলেমেয়ের দল ফুটপাথে বসে গীটার বাজিয়ে নিজেদের ভাষায় গান গাইছে ।লোকজন পয়সা দিয়ে যাচ্ছে ,সামনে পাতা টুপিতে।ওরাও বসে পরল ফুটপাথে ।কিছুক্ষণ গান উপভোগ করে ফিরে এলো হোটেলে ।বিনীর সব বড় চেনা লাগছে । অস্বস্তি হচ্ছে।

খুব ক্লান্ত লাগছে।room service এ অল্প খাবার order দিয়ে ,চানে ঢুকল বিনি ।অর্ক জামাকাপড় না বদলেই নিজ স্বাভাবমত বিছানায় উলটে t v চালিয়ে দিল ।


পরের দিন অ্যালার্ম এ ঘুম ভাঙ্গলো ভোর বেলা । অর্ক যথারীতি তখন ও নাক ডাকছে ।
- "অর্ক ,ওঠ ।বেরবি না ? ভোর হয়েগেল /"।
জরানো গলায় বেরোতে অনিহা দেখালো।

-'একটু বাদে' পাশ ফিরে আবার ঘুমিয়ে পরল ।
খুব রাগ হল বিনীর ।মনে মনে ভাবল বেরাতে এসেও ঘুমের কমতি নেয়ি ।কাল এতবার বলার পর...
ঠিক করল একাই বেরবে । তৈরী হয়ে বেরিয়ে গেল বিনি ।রাস্তায় নামতেই এক সুন্দর আবছহা আলো আর ঠাণ্ডা বাতাস মনটাভাল করে দিল...কাল যে রাস্তায় গেছিল তার উল্টো দিকে হাঁটা শুরু করলো ।রাস্তা ফাঁকা.পাথর বাঁধানো পথের দুপাশে সারি সারি দোকান সব বন্ধ।চলতে চলতে একটা কুঅরিও shop র দিকে এগিয়ে গেল ।
পুরনো জিনিসের দোকানের শো কেস এ অনেক সুন্দর সুন্দর পুতুল দেখে বয়েস টা কমে গেল।দোকান গুলো খোলেনি কিন্তু উইনডো গুলো খোলা । বিনী কাঁচে নাক লাগিয়ে দেখতে থাকলো খেলনা গুলো.। তারপর একটু এগিয়ে দেখল ছোট একটা বেকারি শপ এ সুন্দর বেকিং এর গন্ধ বেরোচ্ছে । বড় নিঃশ্বাস টেনে যতটা পারল ওর প্রিয় গন্ধ ভেতরে টেনে নিল।.একজন ফুট পাথে দাড়িয়ে কিছু একটা তারের বাজনা বাজাচ্ছে ,কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে শুনলো ।
পায়ে পায়ে এগিয়ে দেখল একটা ছোট্ট পুরনো চার্চ।সামনে টা পরিস্কার করা হচ্ছে, জল দিয়ে ।. চার্চের সামনে অনেকটা খোলা জায়গা তার সামনে আরনো নদী আর নদীর ওপারে সবুজ শহর । দুপাশে দুই মস্ত হোটেলের মাঝখান দিয়ে এই দৃশ্য ।এক অজানা আকর্ষনে এগিয়ে গেল নদীর পাড়ে। সূর্য্য সবে আকাশে আলো জালিয়েছে । বেঁটে বাধান রেলিং এ ভর করে নির্ণিমেষ তাকিয়ে সৌন্দর্য্যে মিশে যেতে থাকলো সে.।.হটাত পাশ থেকে- "গুড মর্নিং " শুনে পার্থিব জগতে ফিরল/চেয়ে দেখল সোনালী চুল সাদা চামড়ার এক যুবক আকাশী লিনেনের শার্ট ও সাদা প্যান্ট পরে দাড়িয়ে ।তার ও দৃষ্টি সুদূরে । প্রতুত্তরে শুভ সকাল বলাতে ভাঙ্গা ইংরিজি তে জিগেশ করলো -"বেড়াতে এসেছ ?"
- মাথা নেড়ে হ্যা বলল বিনী ।
- কোন দেশের ?
- ভারতবর্ষ... তুমি ?
- ফ্রান্স . প্রাচীন ঐতিহাসিক শহরের ওপর একটা বই লিখছি তাই ঘুরে বেড়াচ্ছি । গন্তব্যের মধ্যে কলকাতা শহরের নাম শুনে ভালো লাগলো /চার্চের ঘন্টার আওয়াজ চারপাশ কে আরো অপার্থিব করে দিল ।আগুন্তুক বলল ভাঙ্গা ইংরিজিতে বলল -"আপত্তি না থাকলে চলো চার্চে যাই ...

উত্তর না দিয়ে এগোতে থাকলো বিনী । দুজনে চার্চ এ পৌঁছল । চার্চের সামনেটা তখনও ভিজে ।
ভেতরে ঢুকে মন কেমন প্রশান্তিতে ছেয়ে গেল । অদ্ভুত সুন্দর ফ্রেসকো করা চারিদিকে / সুন্দর সুন্দর মূর্তি /মোমবাতি জ্বলছে/এক জন ও মানুষ নেই সামান্য পুরনো গন্ধ সব মিলিয়ে অন্য জগত । চোখ তুলে বিনী দেখল ,রঙিন কাঁচের কাজ করা বাহারি জানলা দিয়ে ভোরের রোদ ঠিক ক্রুশবিদ্ধ পিছন দিক থেকে ভেতরে প্রবেশ করছে / আলোর পথযাত্র । আপারথিব পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে সব মিলিয়ে /দুজনে কোনো কথা নেই কিন্তু একসাথে দেখে যাচ্ছে চারিপাশ । এক সময় পাশাপাশি দুজনে বসে চেয়ে রইলো ওই যিশুর মূর্তির দিকে ।পাশের লোক টিকে ,যার সাথে কিছুক্ষণ আগে আলাপ মাত্র ,দুজনের ধর্ম আলাদা, তাকে একটুও অচেনা লাগছে না বিনির /
বিনীর ভেতর সেই সবসময় অস্বস্তি কেটে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে এক মেঘের ভেলায় ভেসে যাচ্ছে ।
কিছুক্ষণ বাদে একসাথে দুজনে উঠে দাড়ালো ।যেন আগে থেকে ঠিক করা ছিল ওঠবার সময় । বেরিয়ে এলো চার্চ থেকে ।অদ্ভুত এক আবেশ পরিবেষ্টিত বিনী । যেন এই দেখা হওয়া ,হেঁটে এক সাথে চার্চ এ আসা ,প্রর্থনা করা সব রোজ হয় । চার্চের গেটের সামনে দাড়িয়ে দুজন দুজনকে বাই বলে দুই বিপরীত পথে হেঁটে গেল.। নাম জিগেশ করলো না , ঠিকানা চাইল না ।যেন কাল আবার দেখা হবে ।হোটেল ফেরার পথে এক ই দৃশ্য দেখতে দেখতে বিনী ফিরল কিন্তু সে আত্মস্থ এখন।
রুম এ ঢুকতেই অর্ক বলল
" সরি ,ঘুম ভাঙ্গেনি ।ডাকতে পারতিস তো ! কেমন ঘুরলি ? "
শান্ত স্বরে বিনী বলল " একটা মেঘের সাথে দেখা হলো "।

আপনার মতামত জানান